ঢাকার উপকন্ঠে নতুন উন্নয়নশীল উপশহর পূর্বাচল।  আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের আবাসিক ঠিকানা হতে যাচ্ছে।  বিশাল এ স্থানটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে।  তবে মালিকানা সত্ত্বে মানুষের বসবাস শুরু হতে এখনো ঢের বাকী।  আর সেই সুযোগে এখানে তৈরী হয়েছে চমৎকার পাখির রাজ্য, ঢাকার নতুন পাখিপাড়া।

হলদেপা-হরিয়ালহলদেপা-হরিয়াল

নিজ আবাসের কাছাকাছি হওয়াতে মাঝেমাঝেই সেখানে যাওয়া পড়ে আর খোলামেলা পরিবেশে মনটা চনমনে হয়ে যায়।  মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয় তবে সেই হাঁটাটা ক্লান্তিবিহীন।  এলাকার অনেকটা জুড়ে পাকা রাস্তা হয়ে যাওয়াতে চলাফেরা বেশ স্বচ্ছন্দে করা যায়।  জমির মালিকরা অনেকেই তাঁদের জায়গায় ক্ষণস্থায়ীভাবে নিন্মবিত্ত কিছু পরিবারকে থাকতে দিয়েছেন সম্ভবত: দুৃটি কারনে।  প্রথমত: তাঁদের জায়গার নিরাপত্তা নিশ্চীত করা দ্বিতীয়ত: মাটিটা ভালোভাবে বসে যাওয়া।  সে সমস্ত বাসিন্দারা নিজেদের প্রয়োজনেই সেখানে মাটিতে এবং মাচা বানিয়ে বিভিন্ন শাক-সব্জি চাষ করছেন যা সেই সব প্লটগুলির আকর্ষণও বাড়িয়েছে।

খয়রা-হাড়িচাচাখয়রা-হাড়িচাচা

এলাকাটিতে কিছু গাছপালা এবং শাকশব্জির মাচাগুলোই প্রধানত: পাখির অবস্থানক্ষেত্র।  দেশীয় বনের পাখির বেশ বড় একটি অংশ এই অঞ্চলটিতে দেখতে পাওয়া যায়।  আমার দেখা পাখিগুলির মধ্যে আছে পাতি-ফটিকজল, হুদহুদ, কালামাথা-বেনেবউ, তিলা-ঘুঘু, লাল-রাজঘুঘু, খুড়–লে-প্যাঁচা, হলদেগাল-টিটি, খয়রা-হাড়িচাচা, ধানি-তুলিকা, হলদেপা-হরিয়াল, সবুজঠোঁট-মালকোয়া, মেটেপিঠ, তামাপিঠ ও বর্মি লাটোরা, ইউরেশীয়-ঘাড়ব্যথা, পাতি-কেস্ট্রেল, বাংলা-নীলকান্ত, ছোট-নথজিরিয়া ইত্যাদি।  খুঁজলে হয়তো আরো অনেক বের হবে।  তবে আমার কাছে মনে হয় যে পরিমান থাকার কথা ছিল বাস্তবে পাখি আছে তার চেয়ে কম।  কারনটিও পরিস্কার, নিয়মিত কীটনাশকের ব্যবহার।  পতঙ্গভুক পাখিগুলি এর ফলে ব্যাপকভাবে কমে গেছে, কমে গেছে মধুপায়ী ছোট্ট সুন্দর পাখিগুলিও।

কাবাসিকাবাসি

 

লাটোরার উড়াললাটোরার উড়াল

এবার স্থানটিতে কিছু অনিয়মিত লাটোরার আকর্ষনে আলোকচিত্রীদের বেশ আনাগোনা লক্ষ্য করা গেছে, কোনকোন দিন  হয়তো একটু বেশী।  লাটোরাগুলি তাদের মোড়ল স্বভাবের কারনে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যায় না।  ফলে এই পাখিগুলি প্রায় সবাই দেখতে পেরেছেন।

হলদেগাল-টিটিহলদেগাল-টিটি

সবুজঠোঁট-মালকোয়াসবুজঠোঁট-মালকোয়া

পূর্বাচলে সবুজঠোঁট-মালকোয়া দেখে আমি একটু আশ্চর্য্য হয়েছি।  এই পাখিটি আদমপুর জাতিয় উদ্যানেও ভালোভাবে দেখতে বা ছবি তুলতে পারিনি।  এখানে ২২ ডিসেম্বর ২০১৫ সকালে প্রথমে একটি গাছের ঝোপের মধ্যে কোন বড় জিনিষের নড়াচড়া খেয়াল করি।  একটু পরেই দেখলাম লম্বা লেজওয়ালা বেশ বড়সড় একটি পাখি বের হয়ে পাশের গাছে গিয়ে বসল।  এবার বেশ খোলা জায়গায় এবং পোজ নিয়ে যেন বলতে চাইল “নাও এবার আমার ছবি তোল।“  আমিও তুললাম তার অনেকগুলো ছবি।  তবে নিশ্চিত না হওয়াতে একটু পিছিয়ে এস সহ-পর্যবেক্ষক ইসরাতকে দেখালাম।  তিনি নিশ্চিত করলেন যে এটি সবুজঠোঁট- মালকোয়া।

 

পাতি-কেস্ট্রেলপাতি-কেস্ট্রেল

শুরুতেই বলেছি পূর্বাচল বিশাল এলাকা, সব পাখিই এক স্থানে পাওয়া যায় না।  সবার চেনা জায়গাটি থেকে বেশ একটু দূরে মাঝারি আকারের একটি বটগাছে পেয়ে গেলাম হলদেপা-হরিয়াল।  সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বা পশু গবেষনা ইনষ্টিটিউটে দুবার গিয়েও এ অপূর্ব সুন্দর পাখিটির ভালো ছবি তুলতে পারিনি অথচ এখানে ০৫ জানুয়ারী ২০১৬ সকালে খুব কাছ থেকে তাকে প্রাণ ভরে দেখলাম এবং ছবি তুললাম।

তিলা-মুনিয়াতিলা-মুনিয়া

অঞ্চলটিতে উন্নয়নের কাজ চলছে বিরামহীনভাবে।  বালু ব্রিজের পরে মূল রাস্তার পাশে কিছু অস্থায়ী কাঁচাবাজার ও দোকানপাট আছে।  ভ্রমনে গেলে সেখানকার দোকানে বসে চা পান না করলে সফর অসম্পূর্ন  মনে হয়।  চায়ের দোকানের একটু পিছনে নীচে মিষ্টির দোকানে সদ্য তৈরী হওয়া গরম লালমোহন কি করে যেন উপভোগ করা হয়ে যায় মূল্য একটু বেশী হওয়া সত্বেও।  শেরে বাংলা একবার অনেকগুলো আম ‘স্যাম্পল‘ হিসেবে খাওয়ার পর বিডি হাবিবুল্লাকে বলেছিলেন “বুদু আমগুলি বড় মেষ্ট।“  পূর্বাচলের লালমোহন ভক্ষণ করার পর আমার সেই উক্তিটি মনে পড়ে যায়, কে জানে হয়তো পাখির নিবাসের কাছে বলেই।