সুইফট বার্ডের নাম প্রথমবার জেনেছি শৈশবে সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের পাতায়। ছোট্ট এই পাখি নিজের মুখের লালা দিয়ে যে নীড় বানায় তা আদমসন্তান চুরি করে নিয়ে এসে স্যুপ বানিয়ে ছাড়ে! প্রাচ্যের কিছু দেশে নাকি তা আবার সবচেয়ে দামি খাবার। নেট খুঁজে দেখি উইকিপিডিয়ার এক পাতায় সুইফট পাখির বাংলা নাম ‘পাতি বাতাসি’। যে পাখি নাকি ঘণ্টায় ১৭১ কিলোমিটার বেগে উড়ে বেড়িয়ে উড্ডয়ন ক্ষমতা অনুসারে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম পাখির তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে তাকে ‘পাতি’ বাতাসি নামে ডাকা হয় এটা ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। ইংরেজি SWIFT শব্দের সরাসরি বঙ্গানুবাদ করে ‘দ্রুতগামী’ পাখি নামে ডাকলে ব্যকারণগত ভাবে ঠিক থাকে কিন্তু আমার পছন্দ শুধু ‘বাতাসি’ নামটি।

বাতাসি ছোট অকৃতির(১৬-১৭ সে.মি. ওজনে ৩৫-৫৬ গ্রাম) আকাশচারী পাখি।এদের দেহ কালচে বাদামি অথবা ছাই বর্ণের পালক দিয়ে আবৃত। পালকে সাদা বা ধূসর ছাপ দেখা যায়। গোত্রীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এদের পা ক্ষুদ্র। দৈহিক গড়নের দিক থেকে মেঠো আরাবিল(Barn Swallow)বা চাতক পাখির সাথে এদের অসম্ভব সাদৃশ্য থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এরা দু'টি ভিন্ন দলের পাখি। দলবদ্ধভাবে আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় এঁদের আলাদা চেনাটা আসলেই দুরূহ। কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে অবশ্য দুই দলের পাখার গঠনের ভিন্নতা বোঝা যায়। চাতক পাখি গাইতে জানে কিন্তু বাতাসি গায় না। পোস্টে জুড়ে দেয়া প্রাপ্তবয়স্ক চাতক পাখির ছবি দুটি কষ্ট করে নিজেই তুলেছি।

চাতক পাখি (barn swallow)চাতক পাখি (barn swallow)

আবহাওয়া পূর্বাভাসের পাখি হিসেবে খ্যাত চাতক পাখি বাংলাদেশের মত ইতালিতেও লাইন ধরে সুউচ্চ টেলিফোন/বিদ্যুতের তার আঁকরে বসে থাকে।

ইতালিতে চাতক পাখিকে রন্দিনে(RONDINE) নামে ডাকা হয়।ইতালিতে চাতক পাখিকে রন্দিনে(RONDINE) নামে ডাকা হয়।

 

প্রাপ্তবয়স্ক সুইফট অর্থাৎ বাতাসি পাখি মাথার উপর দিয়ে সেই বসন্তকাল থেকে উড়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু তাঁর প্রোফাইল পিক তোলার মত মুরোদ আমার নেই। আমার ব্যর্থতার কারণ অবশ্য পোস্টের বাকি অংশেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

প্রাপ্তবয়স্ক বাতাসি (নেট থেকে প্রাপ্ত ছবি)
 প্রাপ্তবয়স্ক বাতাসি (নেট থেকে প্রাপ্ত ছবি)

ইতালিতে বাতাসিকে সবাই চেনে রন্দনে(RONDONE)নামে। বৈজ্ঞানিক নাম Apus apus

সরু, পশ্চাদমুখী ডানা বাতাসিকে দ্রুত উড়তে সাহায্য করে। প্রায় সারাজীবনই এরা উড়াউড়ি করে। এঁদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যিই হল অফুরন্ত উড্ডয়ন ক্ষমতা। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে চিপ সংযুক্ত এক বাতাসি নাকি একজীবনে ৪০ লক্ষ মাইল উড়ে বেড়িয়েছে এমন প্রমাণও আছে। মোটামুটি হিসেবে বাতাসি পাখি এক সৌরবছরে ১ লক্ষ ৯০ হাজার কিলোমিটার উড়ে বেড়ায়। প্রতি গ্রীষ্মে প্রজননকালে মাস তিনেকের জন্য যে পাখিগুলি ইতালি উড়ে আসছে সুদূর মধ্য আর দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলি থেকে তারাও কমপক্ষে ৬০০০ কিলোমিটার ননস্টপ ভ্রমণে অভ্যস্ত। উড়ন্ত অবস্থাতেই এরা ঘূমায়, স্নান করে আর খাদ্য সংগ্রহ করে থাকে। এদের খাদ্য তালিকায় আছে বিভিন্ন কীট-পতঙ্গ যেমন, উই পোকা, প্রজাপতি, ফড়িং, বোলতা, মৌ্মাছি, উড়ুক্বু পিঁপড়া ইত্যাদি।

সঙ্গমক্রিয়ার মত আপাতত জটিল কর্মও বাতাসি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতেই চুকিয়ে ফেলে। প্রাপ্তবয়স্ক এক জোড়া বাতাসির ঘর-সংসার করার ইচ্ছে জাগলে এরা ‘ভূমিতে অবতরণ’ এর পরিকল্পনা করে। আগেই বলেছি গঠনগত দিক থেকে বাতাসির দুর্বল দিক হচ্ছে এদের পা, যা ছোট আকৃতির এবং এজন্য এদের পক্ষে গাছ আঁকড়িয়ে ধরে রাখা খুবই কষ্টসাধ্য। সমতল ভূমিতে সামান্য হাঁটার ক্ষমতাও এঁদের নেই। লাফিয়ে চলতেও এরা অক্ষম। শুধুমাত্র ডিম পাড়ার সময় হলে বাতাসি নীল আকাশ ছেড়ে নেমে আসে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি। উঁচু পাথর বা দেয়ালের খাঁজে স্ত্রী ও পুরুষ পাখি একত্রে বাসা তৈরি করে। নীড় বানানোর মালপত্তর বাতাসি উড়ন্ত অবস্থাতেই যোগাড় করে। বাতাসে ভাসতে থাকা গাছের পাতা, তুলা, কাঠি থেকে শুরু করে ঘোড়ার লোম পর্যন্ত সংগ্রহ করে তাঁর সাথে মুখ-নিঃসৃত আঠালো লালা সিমেন্ট হিসেবে কাজে লাগিয়ে দেয়ালের কার্নিশে বানায় বাসা।

ভবিষ্যৎ পিতা-মাতা দুজনেই পালাক্রমে ডিমে তা দেয় এবং বাচ্চাদের লালনপালন করে থাকে। সাধারণত চল্লিশ দিন পর বাচ্চা বাতাসি নীড় ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু করে তাঁর আকাশচারী জীবন। প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ ৩-৪ বৎসর পুরো না হলে আর নীড়ে ফেরার তাগিদ অনুভব করে না। ডানার জোরে এরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পারে কিন্তু প্রকৃতি বাতাসিকে দিয়েছে এক অপূর্ণতা, সহজভাবে টেকঅফ বা উড্ডয়ন শুরুর শৈলীতে রয়ে গেছে ত্রুটি। আসলে মাটিতে বসে থাকা অবস্থায় বাতাসি কখনোই উড়াল দিতে পারবে না তাঁর ক্ষুদ্র পদযুগলের জন্য। শুধুমাত্র নীড় থেকে নিচের দিকে অনেকটা বাঞ্জি জাম্প স্টাইলে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকা অবস্থায় আহরিত গতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাতাসি মেলে দেয় তাঁর লম্বা ও সরু অর্ধচন্দ্রাকৃতি-বুমেরাং সাদৃশ্য পাখা।

মিশন বাতাসি

লাঞ্চ ব্রেকে বাসায় আসি প্রতিদিন। একদিন মুখ কালো করে খাচ্ছি দেখে গিন্নী জিজ্ঞেস করল ঘটনা কি? আমতা আমতা করে বলে দিলাম “অফিস থেকে বাসায় আসার আগমুহূর্তে এক চাতক পাখির ছানাকে আমার পার্ক করা গাড়ির নিচে ঝিমুতে দেখেছি। উটকো ঝামেলা এড়াতে ছানাটিকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে একটু ছায়াঘেরা উঁচু স্থানে রেখে এসেছি”।

কৌতূহলবশত গিন্নী খাবার টেবিলেই ইন্টারনেট ঘেঁটে কি জানি কি খুঁজে পেল আর তাড়াহুড়া করে অর্ধভুক্ত আমার হাতে একখানা খালি পাদুকার প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে আদেশ দিল অতিসত্বর ছানাটিকে বাসায় নিয়ে আসতে। দোটানা মন নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ফিরে গিয়ে দেখি যেখানে রেখে এসেছিলাম সেখানেই চুপটি করে বসে আছে। শৈশবে একাধিকবার মাটিতে পড়ে থাকা চড়ুইয়ের ছানা নিজের হাতে তুলে নিয়ে নীড়ে ফিরিয়ে দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু চাতক পাখি বাসা বানিয়েছে দোতলা সমান উঁচু এক খাড়া দেয়ালে। ফায়ার সার্ভিসের মই লাগবে সেখানে পৌঁছুতে। ছানাটিকে জুতার বাক্সে ভরে গিন্নীর হাতে তা সমর্পণ করে চটজলদি ফিরে যাই কর্মক্ষেত্রে।

সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে শুনি এটি চাতক পাখির ছানা নয়, এ হল বাতাসি (রন্দনে)। ইতালির সবচেয়ে বড় পক্ষী সংরক্ষণ ক্লাব লিপু’র (Lega Italiana Protezione Uccelli, LIPU) সাথে ফোনে যোগাযোগ করে জানা গেছে বাতাসির ছানাকে বাসায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত একশত ভাগ সঠিক। শালিক বা চড়ুই পাখি যেভাবে মাটিতে পড়ে থাকা ছানাকে খাবার যুগিয়ে দেয় বাতাসি সেটা করতে পারে না কারণ একবার মর্তে অবতরণ করলে তো আবার টেকঅফ করার ক্ষমতা নেই। পঞ্জিকা অনুসারে ছানাটির বাঞ্জি জাম্প দিয়ে নীড় ছাড়ার বেশীদিন বাকি ছিলনা। জন্মের ৪০-৪২ দিন পর বাতাসির পাখনার দৈর্ঘ্য আর শরীরের ভর সঠিক অনুপাতে আসে যা তাকে পরবর্তী ২-৩ বছর একনাগাড়ে উড়তে সাহায্য করে। এসময়টাতে আদর্শ খাদ্য ভক্ষণ না করলে পাখার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে না, পরিশ্রুতিতে কোনদিন আর উড়াও হবে না বেচারির। টেলিফোনেই লিপু’র স্বেচ্ছাসেবকেরা জানিয়ে দিল পরদিন তাঁদের পশুচিকিৎসক ছানাটিকে নিতে আসবে তাই ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক খাবার দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের।

১৯ দিন বয়সি বাতাসি ছানার পালক (নেট থেকে প্রাপ্ত ছবি)১৯ দিন বয়সি বাতাসি ছানার পালক (নেট থেকে প্রাপ্ত ছবি)

 

৪২ দিন বয়সি বাতাসি পাখির পালক (নেট থেকে প্রাপ্ত ছবি)৪২ দিন বয়সি বাতাসি পাখির পালক (নেট থেকে প্রাপ্ত ছবি)

শুরু হল আমাদের পরিবারের ‘মিশন বাতাসি’। চড়ুইয়ের ছানা হলে তো কথা ছিল, সাদা ভাত পিষে দলা পাকিয়ে মুখে ঢুকিয়ে দিলেই তো চুকে গেল ন্যাটা। বাতাসি পাখি শুধুমাত্র উড়ন্ত অবস্থায় পতঙ্গ শিকার করে খায়। নীড়ে থাকা ছানাকে তাঁর মা আর বাবা পোকা ঠোঁটে আটকে রেখে উড়ে এসে খাইয়ে যায়। পশুচিকিৎসক না আসা পর্যন্ত ছানাটিকে বাঁচিয়ে রাখাই অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। আমার ছয় বছরের ছেলে ফ্লাই স্যটার হাতে নেমে পড়ল মাছি শিকারে।

গিন্নী ফার্মাসি থেকে কিনে আনল ছোট কাঁচের জারে থাকা বেবিফুড। লিপু’র স্বেচ্ছাসেবকেরা কিমা মাংস খাওয়ানোর বুদ্ধি দিল। কিন্তু বড় সমস্যা তো আরেকটা, নিজে থেকে তো খেতে শেখেনি ছানাটি। সাহস করে দুই যুগ আগের চড়ুই ছানাকে খাওয়ানোর অভিজ্ঞতার আলোকে বাতাসির ছানাটিকে মুঠোবন্দি করে আরেক হাত দিয়ে আলতো করে ঠোঁট দুটিকে খুলে টুথপিক দিয়ে অল্প অল্প করে প্রতি তিন ঘণ্টায় খাইয়ে দিলাম পাঁচমিশালি অন্ন। ছোট সিরিঞ্জের সাহায্যে পানি পান করানোটাও বাদ গেল না।


অধমের মুঠোয় ছোট্ট বাতাসিঅধমের মুঠোয় ছোট্ট বাতাসি

পরদিন সাতসকালে কাজে যাওয়ার পূর্বে শেষবার খাইয়ে দিলাম বাতাসিকে। কপাল ভাল ছিল বলে সকাল ১০ টায় যখন লিপু’র পশুচিকিৎসকের হাতে গছিয়ে দেয়া হল বাতাসিকে তখনও নাকি বাক্সের ভিতর ঝটপট করে পাখা ঝাপটানোর মত শক্তি অবশিষ্ট ছিল। সন্ধ্যাবেলা টেলিফোনে যোগাযোগ করতেই জানিয়ে দিল বাতাসির সুস্থতার কথা।

ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে নাকি জানা গেছে ছানাটি ‘সাধারণ সুইফট’ (common swift) নয়, আকারে সবচেয়ে বড় ‘আল্পিয় সুইফটের’(alpine swift)বাচ্চা। আমাদের দেয়া পাঁচমিশালি অন্নও নাকি সঠিক ছিল, একটু এদিক সেদিক হলেই নাকি এর ডানার পালক অপুষ্টি আর অপরিপক্কতার কারণে খসে পড়ত। আগস্ট মাসেই সুইফট পাখি ইউরোপ ছেড়ে আফ্রিকা চলে যাবে তাই অতিজলদি ছানাটিকে উড়াল শেখানোর কোর্স শুরু করানো হবে শুনে হাসতে হাসতে শুভকামনা জানিয়ে রেখে দিলাম মুঠোফোন।

স্বস্তির এক ঘুম দিয়ে সকালে মুঠোফোন অন করে সদ্য আসা এক ক্ষুদেবার্তা পড়ে এক অচেনা আবেগে হঠাৎ আলোড়িত হই। উড়ে গেছে আমার বাতাসি, প্রিয় বাতাসি। নীল আকাশ তো এই অধমের কাছে শুধুই এক সীমারেখা, উড়তে যারা ভালবাসে আকাশ তাঁদের বিচরণক্ষেত্র। ভাল থেকো বাতাসি।

চুপটি মেরে বসে আছেচুপটি মেরে বসে আছে

 

চুপটি মেরে বসে আছেচুপটি মেরে বসে আছে

যে নীড় থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল বাতাসি সেখানে চুপটি মেরে বসে আছে ওর ভাইবোন। নিচের ছবিদুটি ‘মিশন বাতাসি’র পরদিন তোলা।

আল্পিয় সুইফট পাখির ছানাদুটি(বাতাসির ভাইবোন) ছবিটি তোলার পরদিনই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এক দিনের ব্যাবধানে তিন ভাইবোনই শুরু করে তাঁদের আকাশচারী জীবন।