ডিসেম্বরের শুরুতেই হাড় কাঁপনো শীত জেঁকে বসছে। আয়েসি মানুষগুলো দশটার আগে লেপ-কাঁথা ছাড়ে না। কিন্তু নজীর আহমেদ-এর মতো দিন মজুরদের অতবেলা করলে চলে না। সাত সকালে উঠেই মাঠের পথ ধরতে হয় রাতের বাসি পানি-পান্তা খেয়ে। শীত-গ্রীষ্মের সাথে নিত্য যাদের বসবাস, শীত তাদের কাবু করতে পারবে কেন। তাই কার কাছে উপহার পাওয়া ছেঁড়া ট্রাক-স্যুট পরে তিনি বেরিয়ে পড়েন মাঠের উদ্দেশে। কিন্তু মাঠে গিয়ে কাজ শুরু করতে পারলেন না। অতিকায় একটা পাখি পড়ে আছে ক্ষেতে মাঝখানে। নজীর আহমেদ ছুটে গেলেন পাখিটার কাছে। না, মরেনি পাখিটা। জীবন্ত। অসুস্থ্। উড়তে পারছে না। এতবড় পাখি কখনও দেখেননি নজীর। শুধু নজীর কেন, গাঁয়ের কেউ কখনও দেখেছে বলে মনে হয় না। কাজ ফেলে পাখিটাকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন নজীর। ডাকলেন ডাক্তার। পশু ডাক্তার নয়। মানুষের ডাক্তার। তাও আবার হাতুড়ে। নাপা-টাপা মিলিয়ে কয়েকটা মানুষের ওষুধ খাইয়ে দিলেন ডাক্তার। দিলেন কয়েকটা ইনজেকশনও। অবাক ব্যাপার তাতেই কিছুটা সুস্থ্ হয়ে উঠল পাখিটা

এরপর আশপাশে দশগ্রামে সাড়া পড়ে গেল-- ভবনগর গ্রামে বিরাট একটা পাখি এসেছে। দলে দলে লোক ছুটে আসতে লাগল দূর-দূরান্ত থেকে। এতবড় পাখি একবার স্বচোক্ষে দেখার লোভ সামলাতে পারে কজন? তখন নজীরের মাথায় এলো নতুন বুদ্ধি। পাখিটার চিকিৎসার পেছনে বেশ কিছু টাকা খসেছে। প্রতিদিন খাবরও যোগাড়ও করতে হচ্ছে। খরচ খুব বেশি না হলেও অভাবের সংসারে সেটা যোগাতেই হিমশিম খেতে হয় নজীরকে। নতুন বুদ্ধি তার আর্থিক কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে পারে। অতএব দর্শনার্থীদের কাছ থেকে পয়সা নিতে হবে। পাঁচ-দশ থেকে শুরু করে যে যেমন দেয়। তা লোকে দিচ্ছেও। দেবেই বা না কেন, আহাঃ বেচারির নুন আনতে পান্তা ফুরায়, এত বড় পাখি পালার পয়সা পাবে কোথায়?
দর্শনার্থীদের কেউ কেউ পাখিটাকে কিনতে চায়। ফিস্ট করে খাবে। দু-হাজার পর্যন্ত দাম উঠে যায়। কিন্তু দু-হাজারে নজীর বেচবে কেন? দর্শনার্থীদের কাছে যা পাওয়া যাচ্ছে তা কম কীসে! কে বা কারা বুদ্ধি দেয়, সবুর কর, দাম আরও চড়বে। শহর থেকে সাহেব-সুবরা আসে। ৫০-৬০ হাজারে কিনে নিয়ে যাবে, দেখিস!
৫০-৬০ হাজার! সে-তো অনেক টাকা! রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে নজীর। শুধু নজীর কেন, এলাকার নেতা-পাতি নেতাদেরও চোখ চকচক করে ওঠে। টাকা তারা নজীরকে একা ভোগ করতে দেবে না। বখরা তাদেরও চাই।

পাখির খবরটা আমি পাই প্রায় সপ্তাহখানেক পরে। ফোনে। শুনলাম পাখিটাকে মদনটাক বলে চিহ্নিত করেছে এলাকার কোনও কোনও মুরব্বি। কিন্তু নিশ্চিত নয় কেউই। তবে পাখিটা উদ্ধারে নাকি কারও মাথা ব্যথা নেই। তা যে থাকবে না সে আমি ভালো করেই জানি। যে গাঁয়ে সরকারি হাসপাতালের ওষুধ টাকা নিয়ে গরিব মানুষের কাছে বিক্রি করে ডাক্তার, দেখার কেউ নেই-- সেখানে একটা বুনো পাখি নিয়ে কার এত মাথাব্যথা! বাড়ি যাওয়ার সুযোগ খুঁজি। অনেকটা মেরেকেটে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি গাঁয়ের উদ্দেশ্যে। অবশ্য আরও একটা কারণ ছিল। বন্দুক দিয়ে ঘুঘু-হরিয়াল শিকার করছে কয়েকজন শিকারি। সেটারও তদন্ত দরকার। 


ভবনগর গ্রামটা আমাদের গ্রামের ঠিক পাশেই। আমাদের গ্রামটা ইউনিয়েনর কেন্দ্রবিন্দু। ২৫ হাজার জনসংখ্যার বিশাল গ্রাম। পাঁচটা ওয়ার্ডে ভাগ করা। মেম্বারও পাঁচজন। ইতিহাস বলে আমাদের গাঁয়ের বাইরে থেকে ইউপি চেয়ারম্যান হয়নি কেউই। আর বর্তমান চেয়ারম্যান আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। অতএব বাড়তি একটা সুবিধা আমার ছিল পাখি উদ্ধার করতে। 
ভাবছেন মশা মারতে কামান কেন?
বিষয়টা মোটেও তা নয়। যেকোনও বিষয়ে যখন রাজনৈতিক নেতারা হস্থক্ষেপ করেন, তখন আর তা সহজ থাকে। আর ভিলেজ পলেটিক্স তো আরও মারাত্মক জিনিস।

পরদিন সকালে একটা মটরসাইকেল ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম ভবনগরের উদ্দেশ্যে। সাথে এক বড় ভাই। ক্যামেরাটাও সাথে নিয়েছিলাম। অনেক খুঁজে-পেতে নজীরের বাড়িটা বের করতে পারলাম অবশেষে। বাড়িতে একজন মহিলা আছেন শুধু। গৃহকর্তা মাঠে কাজ করছেন। সাংবাদিক ভেবেছেন আমাদের, তাই হয়তো টাকা চাইলেন না মহিলা। তাঁর কাছে বিস্তারিত সব জানলাম। সেগুলো ওপরেই বর্ণনা করেছি। পাখিটাকে রাখা হয়েছে গোয়াল ঘরে। এক পা দড়ি দিয়ে বাঁধা। মাথার টাকে রং লাগানো হয়েছে। গরুর চোনা আর গোবরে স্যাঁতসেঁতে গোয়াল ঘরটা। তারওপর পাখিটাও প্রাতকৃত সেরেছে। সব মিলিয়ে বনের পাখির জন্য সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর এক পরিবেশ। এখানে থাকলে আর দু সপ্তাহও বাঁচবে কিনা সন্দেহ।
‘বন বিভাগের লোক আসেনি?’ জিজ্ঞেস করলাম মহিলাকে।
‘না।’ মহিলার জবাব। ‘তবে কয়েকজন সাংবাদিক এসে ছবি নিয়ে গেছে।’
‘বন বিভাগকে খবর দেননি?’ 
‘কনে পাবো বন বিভাগের নম্বর? মোরা কি আর অত চিনি-জানি?’
‘তাহলে খবরটা আমরা দিই।’

মদনটাকমদনটাক


‘দেন। তবে পাখি মোরা দবো না। চিকিস্সার পেছনে সাতশো ট্যাকা গিয়েছে। প্রতিদিন দুকেজি করে মাছ খাওয়াতে হয়, ১৭ দিন ধরে এই চলছে। এখন মোদের ক্ষতিপূরণ কিডা দেবে?’ পয়সা নিয়ে পাখি দেখানোর ব্যাপারটা পুরোপুরি চেপে গেলেন মহিলা। আমিও তখন পর্যন্ত ব্যাপারটা জানি না।

বললাম, ‘ঠাণ্ডা মাথায় শোনেন, অপরাধ আপনারা মেলা করেছেন। বুনো পশুকে মাঠ থেকে তুলে আনাই তো অপরাধ। ওটা মরলে শিয়াল-বেজিতে খেত। বনের পাখি খেত বনের জন্তুতে । আপনারা শিয়াল-বেজিকে বঞ্চিত করেছেন। দ্বিতীয় অপরাধ, আন্দাজে হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করেছেন। তৃতীয় অপরাধ, ১৭ দিন একটা বুনো পাখিকে আটকে রেখেছেন। এতগুলো অপরাধ! এরজন্য আপনাদের জেল হতে পারে। এখন ভালোয় ভালোয় পাখিটা বন বিভাগের হাতে তুলে দেন। ক্ষতিপূরণ পেলেও পেতে পারেন।’
জেল হওয়ার হুমকিটা কাজে দিল। মহিলা আমাকে আমাকে অনুরোধ করলেন, যেন বন বিভাগকে খবর দিই। 
‘বন বিভাগের লোক না আসা পর্যন্ত যেন পাখিটা মরে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। আর পাখি সরিয়ে ফেললে বা জবাই করে খেয়ে ফেললে জেল কেউ আটকাতে পারবে না।’ একথা বলে আবার আমার মটর সাইকেলে চেপে বসলাম। উদ্দেশ্য উপজেলা শহর। কিন্তু মাঝপথে গিয়ে মনে পড়ল, আজ শুক্রবার, বন বিভাগ বন্ধ থাকবে নিশ্চয়ই। 
‘তাহলে উপায়!’ সাথের বড় ভাই বললেন।
‘উপায় একটা আছে। বন বিভাগের অফিসারের বাড়ি খুঁজে নেব। সেখানে তাঁর সাথে কথা বললে আরও ভালো হবে।’

গিয়ে দেখি বনবিভাগে তালা ঝুলছে। কয়েকজন তরুণকে জিজ্ঞেস করলাম বন বিভাগের পরিচালককে কোথায় পাওয়া যাবে। তারা একটা ঠিকানা দিল, সেখান থেকে তার নম্বর জোগাড় করলাম। ভদ্রলোকের নাম মোবারক। ফোন দিলাম। কিন্তু তিনি অসুস্থতার অজুহাতে দেখা করতে রাজি হলেন না। তারপর যখন বললাম আমরা বার্ডক্লাবের পক্ষ থেকে এসেছি, দেখা না করলে তার সমস্যা হতে পারে। তখন সে তিনি বাড়ির ঠিকানা দিলেন। 

কিন্তু বাড়ি গিয়ে বুঝলাম তিনি মোটেও অফিসার গোছের কেউ নন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তাকে সবিস্তারে সব বললাম। তিনি তখন জানালেন তার দুর্দাশার কথা। বললেন, সপ্তাহখানেক আগে নাকি ভবনগর গিয়েছিলেন পাখিটা উদ্ধার করতে। কিন্তু পাখিটা তাকে দেখাতেই দেয়নি। পাড়ার সব মহিলা মারমুখী ভঙ্গিতে তেড়ে আসে তার দিকে। অবশেষে তিনি বলে আসেন, ঠিক আছে, পাখিটা সুস্থ্য হলে বনবিভাগ আর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সাথে নিয়ে পাখিটাকে উড়িয়ে দিতে হবে।
‘কিন্তু যে রকম অসুস্থ্ দেখলাম, ও পাখি তো আর উড়তে পারবে না। এই পরিবেশে থেকে ক’দিন বাঁচে তাতেই সন্দেহ!’ বললাম আমি।
‘তাহলে উপায়?’ মোবারক বললেন। 
‘আপনার অফিসারকে লাগবে।’
কিন্তু মোবারক জানালেন, মহেশপুর উপজেলায় বন বিভাগের কোনও অফিসার নেই। অফিসার থাকেন কালিগঞ্জে। তিনিই মহেশপুর বন বিভাগের চার্জে আছেন। লোকটার নাম এহিয়া। এহিয়া সাহেবের ফোন নম্বরটা নিয়ে ফিরে এলাম মহেশপুর থেকে।

মদনটাকমদনটাক

ব্যাপারটা যতটা সহজ মনে হয়েছিল মোটেও অতটা সহজ হলো না। তখন আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য চিন্তা। ইনাম ভাইকে জানাতে হবে। ইনাম ভাই মানে আমাদের সবার প্রিয়, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা পাখিবিদ ইনাম আল হক। তার আগে এহিয়া সাহেবকে বাজিয়ে নিই।

বিকেলে বাজারে বসে ফোনটা দিলাম। বাজারে বসে, সমমনা কিছু লোকের সামনে। এহিয়া সাহেব ফোন রিসিভ করলেন। আমার পরিচয় আর কী দেব, তেমন কোনও পরিচয় নেই। তাই সরাসরি পাড়লাম পাখিটার কথা। জানতে চাইলাম ভবনগরের পাখিটা সম্পর্কে কোনও তথ্য তাঁর কাছে আছে কিনা। ভদ্রলোক নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, ‘না, কোনও পাখি-ফাখি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’
আমি তখন মোবারকের কথা বললাম, তার এক সপ্তাহ আগের অভিযানের কথা বললাম। তখন এহিয়া সাহেব কণ্ঠে তাচ্ছিল্য বজায় রেখে বললেন, ‘ও, তো পুরোনো সাবজেক্ট।’
‘আমিও তো নতুন কোনও সাবজেক্টর কথা বলছি না--’ আমিও পাটকেল ছুঁড়লাম।
‘তো আমাকে এখন আমাকে কী করতে হবে?’
‘পাখিটা নিয়ে যেতে হবে।’ বললাম আমি।
‘আপনার পারলে দিয়ে যান।’ লোকটা হুক-পুল করে আমাকে উড়িয়ে দিতে চাইল যেন। আমিও নাছোড়বান্দা। বললাম, ‘পাখিটা রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের কিনা বলুন।’
‘হ্যাঁ,’ বললেন এহিয়া সাহেব।
‘তাহলে আপনাকেই নিয়ে যেতে হবে, নইলে বনবিভাগের হেড অফিসে জানাব।’
লোকটা থতমত খেয়ে বলল, ‘ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি। আপনারা পাখিটা ওদের হাত থেকে উদ্ধারে ব্যবস্থা করে দিন।’
‘ঠিক আছে, আমি বিডিআর ক্যাম্পে বলে রাখছি। আপনি লোক পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবারক ফোন দিয়ে জানাল সে আগামীকাল আসছে।

এরমধ্যে ইনাম ভাইকে কয়েকবার ফোন দিয়েছি। উনি বোধহয় ব্যস্ত ছিলেন। ফোন রিসিভ হলো না। রাতে ইনাম ভাই নিজেই আমাকে ফোন দিলেন। সবিস্তারে সব তাঁকে জানালাম। ইনাম ভাই বললেন, ‘ঠিক আছে, চিন্তা করবেন না। আমি সব ব্যবস্থা করছি।’
ওনাকে এহিয়া সাহেবের ফোন নম্ববরটা দিলাম। ইনাম ভাই বললেন, ‘দেখবেন কাল ওদের ভেতর পাখি উদ্ধারের জন্য দৌড়াদৌড়ি পড়ে যাবে।’
সত্যিই তা-ই! কয়েকমিনিট পর এহিয়া সাহেব নিজেই আমাকে ফোন দিলেন। তার কণ্ঠে তখন নরম সুর। বললেন পাখি উদ্ধারের যাবতীয় ব্যবস্থা তিনি করবেন।
আমরা বিডিআরকে বললাম। বিডিয়ার জানাল, তাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে টহল পার্টি পাঠাবে। এরপর চেয়ারম্যানের অফিসে গেলাম গেলাম কয়েকবার। কিন্তু ওকে পেলাম না।

পরদিন সকাল ন’টার দিকে মোবারক ফোন করে জানালেন, তিনি এসে পড়েছেন। আমি কয়েকজন সাথে নিয়ে প্রথমে গেলাম বিডিআর ক্যাম্পে। কথা রাখেনি তাঁরা। তাঁদের পক্ষে এখন পাখি উদ্ধার অভিযানে যাওয়া সম্ভব নয়, জানিয়ে দিলেন বিডিআর কমান্ডার। 

ওদিকে আমাদের আগেই নজীরের বাড়িতে পৌঁছে গেছেন আমাদের গাঁয়ের কয়েকজন নেতা টাইপের লোকজন। ভেবেছিলাম ওনারা আমাদের সহযোগিতা করতে এসেছেন। কিন্তু পরে বুঝলাম ব্যাপার অন্যরকম। কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েকশো লোক জুটে গেল। এলেন স্থানীয় মেম্বার থেকে যুবলীগ নেতা পর্যন্ত। বিএনপি নেতাও কম ছিলেন না।

এ ব্যপারটারই ভয় পাচ্ছিলাম আমি। তা-ই হলো। শুরু হয়ে গেল ভিলেজ পলেটিক্স। আমাকে প্রথমে যুবলীগ নেতাকে বোঝাতে হলো, কেন পাখিটাকে উদ্ধার করা দরকার, কেন পাখিটা নজীর রাখতে পারবেন না ইত্যাদি। তিনি বুঝলেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যা হয়-- ‘তালগাছ আমার’--তাই হলো। কোনভাবেই কেউ মানতে চাইছেন না, পাখিটা বনবিভাগ নিয়ে যাবে। গ্রামের খেটে-খাওয়া মানুষগুলো নিতান্তই সহজ-সরল। তাদের ভেতর চাপা রাগটা কিন্তু মারাত্মক। তবে এইসব সহজ-সরল মানুষগুলোকে কীভাবে বশে রাখতে হয়, কীভাবে ক্ষেপিয়ে তুলতে হয়, সে কাজটা নেতারা ভালোই পারেন।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু দলের নেতাই এখন এক হয়ে পাবলিককে ক্ষেপিয়ে তোলার কাজটা করে যাচ্ছেন সুচারুভাবে। অতএব আমাদের দিকে যতরকম নোংরা ভাষা আছে তা তিরের মতো একে ধেয়ে আসছে। কতক্ষণ আর ধৈর্য ধরে রাখা যায়। তবু রাখতে হচ্ছে। এর মধ্যে মোবারক করেছেন এক মহাভুল। নিজের পরিচয় পত্র সঙ্গে নেননি বেচারা। 
আমার সাথে গিয়েছিলেন আমাদের ওয়ার্ডের মেম্বার। তিনিই দেখালেন আসল কারিশমা। ভিলেজ পলেটিক্স কী, এর কতরকম রূপ-- একে একে প্রদর্শন করে গেলেন। আমি তো ‘থ’! এই লোকটা আমার পক্ষে পাখি উদ্ধার করতে এসেছে নাকি, আমার অভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিতে। দ্বিতীয়টাই ঠিক। আমাদের গাঁয়ে নেতাদের মুখের ওপর অপ্রিয় সত্য কথা বলার সাহস একমাত্র আমারই আছে। ইতিমধ্যে বহুবার আমি সে কাজ করেছি। আজ সুযোগ পেয়ে ছাড়বে কেন?

মেম্বার সাহেব বারবার আমারক পাবলিক সেন্টিমেন্ট বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তত জনতা উত্তেজিত হচ্ছে। আমার কী লাভ? আমি এতে নাক গলাচ্ছি কেন? এসব প্রশ্নও শুনতে হচ্ছে বারবার। আসালে স্বেচ্ছাশ্রম বলে কিছু আছে সেকথা এদেরকে কে বোঝাবে। মেম্বার তখন মোবারককে বললেন, আপনি যে বন বিভাগের লোক তার কী প্রমাণ আছে। 

মোবারক তখন তার বসের ফোন নম্বর দিতে চাইলেন, ইউএনও অফিসের হেড ক্লার্কের ফোন নম্বর দিয়ে কথা বলতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু সে কথায় কেউ কর্ণপাত করলেন না। তাদের একই কথা--পাখি কিছুতেই নিয়ে যেতে পারবে না। পাখি নিতে হলে চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকতে হবে, মেম্বাররা থাকবেন, ইউএনও থাকবেন, উপজেলা চেয়ারম্যান থাকবেন, থাকতে হবে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বড় নেতাকেও।

মাথায় তখন রক্ত চড়ে গেল আমার। এরা কী চায়? উপজেলা চেয়ারম্যান জামাতের লোক, তার মুখও দেখতে চাই না আমি। আর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বড় যে নেতা-- তিনি আমাদের গাঁয়ের তিনশো বছরের পুরোনো অশ্বত্থ গাছটাকে হজম করার চেষ্টা করেছিলেন। তখন যশোরের সাংবাদিকদের নিয়ে আমি রুখে না দাঁড়ালে সেটা কবে গায়েব হয়ে যেত। ও ব্যাটার সাথে বসতেও আমি রাজি নই। তাছাড়া ইনাম ভাইয়ের ভরসা যখন আছে, তখন দুর্নীতিবাজ নেতাদের কাছে মাথানত করব না আমি কিছুতেই।

গরম মাথাটা ঠাণ্ডা করতে তখন গলাটা চড়িয়ে বললাম, ‘আমাদের দেশে এত সমস্যা কী জন্য জানেন, সব কিছুতেই দলতান্ত্রিক, নেতাতান্ত্রিক জটিলতা! আমি কোনও নেতা-ফেতার সাথে বসতে রাজি নই। গাছখোর নেতার সাথে তো নয়ই।’
প্রেস্টিজে ঘা পড়ল নেতাদের। জনতাকে উসকে দিয়ে তারাও মারমুখি ভঙ্গিমায় অবতীর্ণ। বিশেষ করে যুবলীগের সেই নেতা। কী আর করা, চুপ করে যেতে হলো। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে, তাদের সামনে ইনাম ভাইকে ফোন করলাম। বললাম, ‘সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না ভাই। এ পাখি নিয়ে যাওয়া চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারির কম্ম নয়।’

শুভাকাঙ্খি হিসেবে সবসময় পাশে পেয়েছি সদা প্রতিবাদী মুক্তমনা বাবু ভাই ও মোস্তাফিজুরকে। নেতারা যখন উতেজিত্ত আরেকটা কথা বাড়ালে যখন মাথায় বাড়ি পড়ার অবস্থা, তখনই ওরা আমাকে রক্ষা করলেন। বাবু ভাই বললেন, ‘রনি চলো। এখানে আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে।’
আমিও উঠে পড়লাম। তবে ফেরার আগে বলে এলাম, ‘পাখি কাল বন বিভাগের হাতে চলে যাবে। আমারও আসা লাগবে না। সব নেতারা এক হয়ে পারলে ঠেকাবেন। আর হ্যাঁ, পাখি যদি আজকের মধ্যে মরে যায় বা হারিয়ে যায় তার জন্য সবাইকে দায়ি হতে হবে। চোদ্দশিকের ভাত খাইয়ে ছাড়ব সব ব্যাটাকে।’
রাস্তায়ই আছি, ফরেস্টার এহিয়া সাহেব ফোন করে বললেন, ওই গাঁয়ের মেম্বার নাকি তাকে ফোন করেছিলেন। মেম্বারের দাবি, এলাকার লোক পাখি দেখে আনন্দ পাচ্ছে, দূর-দূরান্ত থেকে দেখতে আসেছে, থাকুক না আর কটা দিন।
আমি বললাম, ‘ওদের কথায় কান দেবেন না, পাখি বিক্রি করার ধান্দায় আছে। সে টাকার বখরা মেম্বারও পাবে। অতএব পাখি কালই নিয়ে যান, নইলে আপনাকে ভুগতে হবে।’
রাতে আবার ইনাম ভাইকে ফোন দিয়ে ঘটনার বিবরণ দিলাম।

পরদিন ইউপি চেয়ারম্যানকে (আমার বন্ধু) নিয়ে এহিয়া সাহেব ও খুলনা ওয়াইল্ড লাইফের একটা টিম এসে পাখিটাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু এ উদ্ধার প্রক্রিয়া এত সহজ হত না। এর পেছনে খুলনার বন সংরক্ষক তপন কুমার দে মশাইয়ের ভূমিকা ব্যাপক। ইনাম ভাইয়ের ফোন পেয়ে তিনি ঝিনাইদহ জেলা বন কর্মকর্তাকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাঠিয়ে দেন খুলনা ওয়াইল্ড লাইফের একদল কর্মীকে। মূলত তাঁর হস্তক্ষেপে তঠস্থ হয়ে পড়েন দুর্বিনীত ফরেস্টার এহিয়া সাহেব। প্রথম অভিযান ব্যর্থ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাখি উদ্ধার হয়ে যায়। 
তপনবাবুর তো ধন্যবাদ প্রাপ্যই, তবে বিশেষ ধন্যবাদটা প্রাপ্য ইনাম ভাইয়েরই। তিনি উদ্যোগ না নিলে কোথায় পেতাম তপন বাবুকে, কোথায় পেতাম খুলনা ওয়াইল্ড লাইফের টিমকে। পাখিটারই বা কি গতি হত?
ঢাকায় ফিরে এনাম ভাইকে পাখিটার ছবি দেখালাম। তিনি নিশ্চিত করলেন এটা ছোট মদনটাক। বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র চারশো থেকে পাঁচশোটি মদনটাক টিকে আছে।