“দেবপাড়া” 

পাখিপ্রেমিদের অনেকেই হয়ত নাম শুনেছেন। আবার পাষাণ কুলাঙ্গার ভোজনরসিক খ্যাতরাও হয়ত জানেন। নয়তবা ধারাবাহিকভাবে একই ঘটনা বার বার ঘটতো না। 

সেই জায়গার নাম!
না, কোনও পাখির স্বর্গ বা পাখিবাড়ি নেই এখানে। আছে কিছু স্বার্থপর মানুষ যারা বনের পাখিকে ধরে এনে এখানে বিক্রি করে। কারা কেনে? কারা আবার কিনবে! কিছু মানুষ রুপি জানোয়ার, যারা সৌন্দর্যের গলা টিপে মেরে ফেলতে ভালবাসে। এই জঘন্য জায়গায় আমার নিজের দেখা ৪টি ঘটনা বলছি যাতে সবাই বুঝতে পারে এখানের নির্দয় মানুষের কথা। সেই জায়গার নাম!


২০১৫ সালের এপ্রিলের ঘটনা । আইইউসিএন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত রিঙ্গিং ক্যা¤প থেকে ফেরার পথে ফয়সাল ভাইয়ের চোখে পরে অনেক গুলো পাতি সরালি যা কিনা গাড়িকে লক্ষ্য করেই দেখান হচ্ছিল। ওখানে আরও ছিল দেশি বক, বাটান ইত্যাদি। সেই পাখি শিকারি/বিক্রেতাকে ভাল ভাবেই চিনে নিয়েছি। সেবার তাদের নাম মাত্র জরিমানা ও  ভবিষ্যতে আর যেন একাজ না করে তার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল।  


২০১৬ সালে ফেব্রæয়ারিতে যথারীতি আমাদের রিঙ্গিং ক্যা¤প এর জন্য যাত্রায় একই জায়গায় আবার কিছু মেটে মাথা টিটি পেয়ে যায় আইইউসিএন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের একটি দল। দিপু ভাইয়ের তাড়া খেয়ে পাখি ফেলেই পালিয়েছিল পাখি বিক্রেতা।  


৩য় ঘটনাটি এবছরই আগস্ট মাসের, পুনরায় গন্তব্য টাক্সগুয়া। এবার যাচ্ছিলাম আইইউসিএন এর উদ্যোগে একটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে। হবিগঞ্জের সে দেবপাড়ায় পোঁছাতেই আবার সেই একই ঘটনার মুখে পড়লাম। ৪ টি ছোট পানকৌড়ি নিয়ে ইশারা করছে একজন। আমাদের গাড়ির সামনেই একটা প্রাইভেট কার দাড়িয়ে ছিল। এর ঘটনাটা একটু পরেই বলছি। গাড়ির দরজা খুলতেই পাখি হাতে লোকটা ভোঁদৌড়। আসলে আমাদের ক্যামেরা বের করা দেখেই চালাক ব্যাটা পালাতে চেয়েছিল। কি জানি ভেবে সে আবার একটু এগিয়ে এলো। আর তাকে ধরে ফেলে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যাবার জন্য সেখান থেকে পানকৌড়ি নিয়ে বেশ দূরে এনে ছেড়ে দেয়া হল। 

খাঁচা বন্দী ঘুঘুখাঁচা বন্দী ঘুঘু


সেই ট্যুর থেকেই ফেরার পথে যোগ হল একই অভিজ্ঞতা। এবারে প্রায় ২০-২২ টি তিলা ঘুঘু। কি আর করা! বেটাদের আচরনে এবার বেশ ঘাবড়ে যাওয়ার মতই। চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে।এক্ত উচনিচ কথা বললেই খেপে যাওয়ার মত উপক্রম। জলদি পখি গুলোকে ছেড়ে দিয়ে ওখান থেকে চলে আসা হল। 

শেষ ২ টি ঘটনায় যা বেশ দুঃখজনক ছিল তা হল দুবারেই ওরা আমাদের পাখি ছেড়ে দেয়াতে বেশি কথা বাড়ায়নি উল্টো বরং পাখির দাম চেয়েছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এদের সাহস একটু বেশিই হয়েছে। আর সেই যে একটি প্রাইভেট কারের কথা বলেছিলাম অরা আসলে পাখিগুলো দাম করছিল। ওই মুহূর্তে আমরা চলে আসাতে নিজেদের খুব আন্তরিক ভাবে প্রকাশ করছিল। আর পানকৌড়ি নিয়ে আমরা যতক্ষণ ওদের ছেড়ে দেয়ার উপযুক্ত জায়গা খুঁজেছি এই গাড়িটা আমাদের ফলো করেছে। শেষ পর্যন্ত পানকৌড়িদের ছেড়ে দেয়া হলে ওদের একটি মন্তব্যই আমার মনে বেঁধেছে যা হল “কার হায়াৎ কখন বাড়ে কখন কমে কে জানে। এই কথা দিয়েই বুঝে গিয়েছিলাম এই পিশাচসম মানুষ দুটোকে। 

পাখি বিক্রেতারাপাখি বিক্রেতারা


এই ঘটনার পর সাথে সাথেই বন বিভাগকে জানানো হয়। যতোই এই শিকারিদের ধরা হয় ততোই ওরা বেশি বেশি পাখি শিকার করে। হবিগঞ্জের  জীব-বৈচিত্র্য কর্মকর্তা রাজীব ভাইকে সাথে নিয়ে পুরো এলাকায় বিশেষ করে হাকালুকি হাওড়ের পাড়ে ব্যাপক সচেতনতা মূলক কর্মকাÐ চালানোর জন্য ব্যবস্থা করা হবে আইইউসিএন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে, যাতে এই দেবপাড়াতে আমরা আর কখনও দরিবাধা পাখি দেখতে না পাই। পাখিরা যেন নির্ভয়ে এই হাওড়ের দেশে উড়ে বেড়াতে পারে।