আগের রাত্রি থেকেই তুমুল বৃষ্টি, আর সকাল থেকে তো কথাই নেই। দু'চার মিনিট থেমে থেমে ঝরছে তো ঝরছেই!! বাঘা উপজেলার আমার হরিনা গ্রামের মানুষেরা এ সময়ের বৃষ্টিকে বলি "আশ্বিনী গোইন", যার মানে সম্ভবত আশ্বিন মাসের বাদলা টাইপের কিছু। আমার আম্মা বলতেন, আশ্বিন ইজ গোইং- অর্থাৎ আশ্বিন চলে যাচ্ছে, এই বৃষ্টির পরেই আসবে রাজশাহীর বিখ্যাত শীত।

তো যা বলছিলাম, এই বৃষ্টি মুখর দিনের বিকেল ৪:২৫ এ ফোন বাজতেই দেখি আমাদের স্মার্ট মাঝি অনীক কল দিয়েছে। সে বললো যে, গত ৬ অক্টোবর যে রাঙা-মানিকজোড় ( Painted Stork) এর বিরাট ঝাঁক দেখা গিয়েছিলো সেই ঝাঁকটা আবার দেখা যাচ্ছে। ৬ তারিখেও এই খবর শুনে পদ্মায় নেমেছিলাম কিন্তু প্রচন্ড রোদ্রে ঘন্টা তিনেক পদ্মায় খুঁজেও তাদের দেখা সেদিন পাইনি। মাথা খুব দ্রুত কাজ করতে লাগলো! যাবো, নাকি যাবোনা? কালো আকাশ, একটুও আলো নেই বললেই চলে। এই মুহুর্তে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিওও হচ্ছে!! ভাবছি..... মনে হলো, না গিয়ে আফসোস করার চাইতে গিয়ে আফসোস করাই ভালো। অনিককে বললাম, আমি রওনা দিলাম, আধা ঘন্টার মধ্যেই পদ্মায় চলে আসবো। এর মাঝে যদি পাখিগুলো উড়াল দেয় তাহলে যেন ফোন করে - আমিও ফিরে আসবো সেক্ষেত্রে।

প্রায় ৫ টায় পদ্মায়, ঘাটে অনিক বা তার নৌকা নাই! ফোন দিলাম, সে নদিতে পাখির আশেপাশে আছে। অন্য এক অচেনা মাঝি সে ঠিক করে রেখেছে। অচেনা মাঝির সাথেই রওনা দিলাম।

 পেলিক্যান, পেলিক্যান,

 

আজ পদ্মায় বড় বড় ঢেউ, পুর্ব আকাশ ঘোর কালো। ফিরফির বৃষ্টি - আস্তে আস্তে বড় বড় ফোটা শুরু হলো। রেইনকোট পরে ক্যামেরা গামছায় মুড়ে জুবুথুবু হয়ে উবু হয়ে আছি। আমি ভিজলে অসুবিধা নাই ক্যামেরা ভিজলে আমার আর ক্যামেরা-লেন্স কিনার সামর্থ্য নাই!

পদ্মায় পেলিক্যান !পদ্মায় পেলিক্যান !

 

কিছু সময় পরেই দেখলাম #হাস্নাতেরচর ( #Hasnaterchor) এসে গেছি। দুরে অনিক হাত নাড়ছে। নৌকা চরে ভিড়লো নামার পরে অনিক যেখানে দেখালো দেখলাম। হ্যাঁ, বড় এক ঝাঁক রাঙা-মানিকজোড় বেশ দূরে নিচু জায়গায় বসে আছে - শুধু মাথা দেখা যায়! বাধ্য হয়ে ক্রলিং শুরু করলাম। সেই স্কুলে বয়স্কাউট আর কলেজে বিএনসিসি করার সময় থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে অনেক ক্রলিং করেছি। আজ এত বছর পরে সেই ক্রলিং!! কনুই আর হাঁটু জ্বলছে, একটু একটু করে আগাই - থামি! হাঁপ ধরে যায়, থামি আবার কয়েক ফুট আগাই - ছবি তুলি। আবার.... আবার...প্রায় ৫০০ গজ চলে এসেছি! রেইনকোট গায়ে প্যান্ট - সারা শরীর ভিজে আর বালু খিচখিচে হয়ে গেছে। আর এগুনো ঠিক হবেনা।

এবার লেন্স তুলতেই আমার রিং পরানো হার্ট ধড়াস ধড়াস শুরু করে দিলো। ওরে আল্লাহ, আধো আলো অন্ধকারে এ কি দেখছি! প্রায় ৫০ টা রাঙা-মানিকজোড় এর মাঝে একটা পেলিক্যান!! আমি ঠিক দেখছি তো? পেলিক্যান, তাও বাংলাদেশে, তাও রাজশাহীতে, তাও #Hasnaterchor এ, তাও আমি ছবি তুলছি। আমি?

 পেলিক্যান, তাও বাংলাদেশে, তাও রাজশাহীতে পেলিক্যান, তাও বাংলাদেশে, তাও রাজশাহীতে

 

শ্রান্তি তে নাকি অবিশ্বাসে আমার ভেজা শরীর থরথর করে কাঁপছে জানিনা। তবে বৃষ্টির পানির সাথে দু'একফোটা চোখের পানিও পদ্মায় মিশে যাচ্ছে তা অনুভব করছি। শুধু রাজশাহী নয়, সমগ্র বাংলাদেশেই কেউ কখনো এই "Spot-billed Pelican" দেখেনি! এর বাংলা নাম অদ্ভুত সুন্দর, চিতিঠুঁটি-গগনবেড় "! যখন উড়ে তখন এর বিশাল পাখা যেন পুরো গগনকেই বেড় দিয়ে ফেলে! ব্রিটিশ আমলের কিছু পত্রিকাতে এই পাখিটির আমাদের দেশের এককালে ছিলো বলে জানা যায়। তারপরে দীর্ঘ সময় ধরে এই পাখিটির কোন  হদিসই ছিলো না। অন্তত এটুকু নিশ্চিত হলাম এই অসাধারণ বিশাল পাখিটি এখনো বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয় নি।   

পদ্মায় পেলিক্যান !পদ্মায় পেলিক্যান !

 

আমার এই পাখির ছবি ফেসবুকে দেখার পরে অভিনন্দনের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছি  সবাইকে অনেক ধন্যবাদ, শুভকামনা আর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা , আনন্দের দিনে যারা পাশে আছেন তাঁদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, দয়া করে, আমার খারাপ সময়ে - বিপদের দিনেও এইভাবে পাশে থাকবেন। আমি আরো অনেক - অনেক ফিরিয়ে দিবো ইনশাআল্লাহ !

অনেক অনেক অভিনন্দনের মাঝে আমার সেরা প্রাপ্তি - সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রাণীবিদ  ড. রেজা খান স্যারের কমেন্ট, "Congratulation, it's a record for life time. " আমি সবার ভালোবাসায় ধন্য।