ঘুম ভাঙলো বহুদিনের রাঁধুনি ময়নার চিৎকারে, 'ও ভাবী তাড়াতাড়ি নামেন, দেইহা যান ডাহুকের বাচ্চা!' এমন চিৎকারে শুয়ে থাকা দায়। হুড়মুড়িয়ে নেমে আসি নীচতলায়। দেখি তিনি হাতে নিয়ে আদর করছেন সাদাকালো ডোরাকাটা পাখির বাচ্চা। হাঁসের বাচ্চা। নানা! বুনোহাঁসের বাচ্চা। তার কথামত ডাহুকের বাচ্চাতো নয়ই। সাথে সাথেই এই কাজে মানা করে যেখানে ছিলো সেখানে রেখে আসতে বললাম। ওমা! দেখি আমাদের ঘরের পাশের পুকুরেই সবাই ভাসছে। দুটো বুনোহাঁস। সাথে সবমিলিয়ে সাত সাতটা বাচ্চা।

দুটো বুনোহাঁস, সাথে সবমিলিয়ে সাত সাতটা বাচ্চাদুটো বুনোহাঁস, সাথে সবমিলিয়ে সাত সাতটা বাচ্চা

 

কোথায় ডিম পাড়লো, কখন ফুটলো কিচ্ছু বলতে পারবোনা। পুকুরে আরো দুটি পোষা পাতিহাঁস আগে থেকেই ছিলো। বাড়িতে চার-চারটে বিশালদেহী জার্মান শেফার্ড কুকুর। ঘুরঘুর করছে পুকুরের চারপাশে। তার মধ্যে দুটোতো পানিতেই সাঁতরে বেড়ায় সারক্ষণ। ভয়ই পেয়ে গেলাম। তাদের সবাইকে আটকে ফেলা করা হলো। কাঠমিস্ত্রী বাবু ঘর মেরামতের কাজ করছিলো। তাকে বলা হলো বিকেলের মধ্যেই কুকুর আর পুকুরের মধ্যে বেড়া দিতে হবে, বাড়িতে যা সরঞ্জাম আছে তা দিয়েই। আর কোনভাবেই কেউ যেন বুনোহাঁসগুলোকে বিরক্ত না করে। বিশেষ করে খাঁচায় আটকে পোষার চেষ্টা না করে।

আমাদের সবার মন ভরে গিয়েছে হাঁসের ছানাগুলো দেখে। সবাই ঘরের বারান্দার ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছি আর আশ্চর্য হচ্ছি। ভীষণ প্রটেকটিভ আচরণ বাবা-মায়ের। ছানাগুলোকে মাঝে রেখে দুজনে সামনে পিছনে। কিংবা ডানে বামে। একসাথেই গায়ে গা লাগিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে পুকুরময়।
খুব বড় নয় কিন্তু পুকুরটা। কোণাকুণি মাপলে বড়জোর ৪০ থেকে ৫০ হাত হবে। কখনো দেখছি তারা ছোট্ট পুকুরটার উত্তর-পশ্চিম কোণের ছোট খেজুরগাছটার ঝোপের আড়ালে বিশ্রাম নিচ্ছে। যে গাছটার ডালপালা এখনো মাটি ছুঁয়ে আছে। পুরোটা মিলে একটা ঝোপের মত। আবার দক্ষিণের পাড়ঘেষা এলাচী আর ইন্দ্রানী ফুলের বড় ঝোপটার নীচে। এই ঝোপটা পানিতে নুইয়ে একটা গুহার মত আশ্রয় তৈরি করেছে। এর ঠিক ঘা ঘেঁষেই পাঁচটা পান্থপাদপের সারি। তার পাশেই ঘরের বারান্দা বরাবর উপরের দিকে উঠে গ্যাছে মধুমঞ্জুরীর লতা। জালের মত ছড়িয়ে রয়েছে ঘরের এই পাশটা জুড়ে। এখানেই বেশ কয়েকটা পাখির বাসা। হাঁড়িচাচা, ঘুঘু আর শালিক। এ লতাটাই আমাদের পুরো ঘরটাকে পুকুর থেকে আড়াল করে রেখেছে। উত্তরপাড়ে কুমড়ো আর লাউয়ের মাচা। মাচাটার বেশি অংশই পানির উপর। বাঁশ দিয়ে বানানো। কয়েকটা বাঁশতো প্রায় মাঝপুকুরেই চলে এসেছে। সেগুলোতেই কানিবকগুলো সারাদিন বসে বসে ঝিমোয়। আর মাছরাঙারা বসে থাকে মাচাটারই উলম্ব পুতে রাখা বাঁশগুলোর মাথায়। এর উল্টোদিকে বাঁশের সিঁড়িমত ঘাট বানানো। এখানেও বসে থাকতে দেখেছি বুনোহাঁসগুলোকে। কখনো পাড়ে উঠে কলাগাছগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে কখনো নুয়ে পড়া হিজলের পাশ দিয়ে কখনো আমগাছের ছায়ায় কিংবা বাদাম গাছটার চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলো।

চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলোচারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলো

 

এদিকে আমিতো ভেবে ভেবেই সারা। কীভাবে বেড়ে উঠবে, কী খাবে, কতদিন থাকবে ইত্যাদি। শংকায় দুচরণ পদও মাথায় ঘুরঘুর করতে লাগলো।
“আইলা পাখি কুটুমবাড়ি শুভ শারদপ্রাতে,
কেমনে তোমায় আঁদর করি নেইতো কিছু হাতে!
তোমরা না হয় আমার মতন খাইলে দুটি চাল।
কীযে খাবে ভেবে মরি ছোট্ট ছানার পাল॥

পাখিটা আমার তেমন পরিচিত নয়। দেখেছি হয়ত কখনো সখনো। নামধাম কিছু জানিনা। হঠাৎই মনে পড়লো অণুর কথা। ফেসবুকে বার্তা দিয়ে রাখলাম, সে বললো, “দাদা এটা যদি পাতি-শরালী না হয় তবে একটা রেকর্ড হয়ে যাবে। কোনো বাড়ির ভেতর কোনো বুনোহাঁস দম্পতির সংসার করার কথা সাধারণত শোনা যায় না। কিছু ছবি তুলে জলদি পাঠান।” এগুলো শুনে আমরা রীতিমত উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। এতটা উচ্ছ্বাস আগে পুকুরটা নিয়ে কারো মধ্যে দেখিনি। এই পুকুরে দুটো কানিবক সারাদিন থাকে। তিনপদের মাছরাঙা। ডাহুক। এমন কী পানকৌড়ি পর্যন্ত যাওয়া আসা করে। তারপরও। বুনোহাঁস বলে কথা।

শরালির সংসারশরালির সংসার

 

আমি আগেই বেশ কিছু ছবি তুলে ফেলেছিলাম। সাথে সাথেই পাঠিয়ে দিলাম। অণু জানালো, “এগুলো পাতি-শরালি। এরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা, বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরগুলোতে থাকার কারণে সারা দেশেই এরা বেশ পরিচিত।
রেকর্ড হয়নি বলে একটুও মন খারাপ হয়নি। একদমই বুনো একজোড়া হাঁস আমাদের বাড়িতে চড়ে বেরাচ্ছে এক দঙ্গল ছানাপোনা নিয়ে, এ খুশিতেই আমরা আত্মহারা। বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় আমরা নানা ধরনের খাবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখলাম। কিন্তু সেদিকে মনে হলনা তাদের কোন আগ্রহ আছে। সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে কিছু যেন খুঁজছে। আসলে খাবারই খুঁজছে বুঝলাম। জানলাম ওরা ক্ষুদেপানা খায়। ইশ্! ক’দিন আগেই পুকুরের ক্ষুদেপানাগুলো পরিষ্কার করেছিলাম। না হলে ওগুলোই হাঁসছানারা খেতে পারতো। মহাটেনশনে পড়ে গেলাম। কী খাবারের ব্যবস্থা করবো। কীভাবে করবো। এভাবেই সন্ধ্যা হল। রাতটাও কাটলো। বেশিরভাগ সময় ছানাসহ হাঁসগুলো পুকুরেই ভাসলো।

পরদিন সকালেও হাঁসগুলো পুকুরেই সাঁতার কাটছিল। তারপর বেলা বাড়লে পাড়ে উঠে আসে। গট গট করে হাটতে হাটতে বাড়ির মূল গেটের দিকে যেতে শুরু করে। মা আর বাবা হাঁস উড়াল দিয়ে পাচিল পার হয়ে গেল। সাতটি ছানা গেটের তলা দিয়ে বেড়িয়ে হাটতে হাটতে পাশের জমিতে ঘাসের আড়ালে চলে গেল। যেখানে এখন বর্ষার জল জমে আছে। আর আছে নানা জলজ উদ্ভিদ। মানে হাঁসদের প্রচুর খাবার সেখানে ভরপুর। মানুষ কিংবা অন্যপ্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে পারবে কিনা জানিনা কিন্তু খাবারের কোন অভাব থাকবেনা তাদের। মনটা একটু খারাপই হল। খুব কাছ থেকে একটা বুনোহাঁসের সংসার বেড়ে ওঠা দেখতে চেয়েছিলাম আমরা। আবার ভাবলাম, নাহ্ ঠিকই আছে। প্রকৃতিতে আপন বলয়েই মিশে থাক ওগুলো।