এক হাজারের বেশি পাখির পায়ে রিং পরানো হয়ে গেছে এ বছর। কাজটি আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি শীতে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব এবং আই.ইউ.সি.এন-বাংলাদেশ রিং-ক্যাম্প পরিচালনা করে। এবার ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২০ দিনের ক্যাম্প হয়েছে। অনেক লম্বা সময়, নানা নতুন অভিজ্ঞতায় ভরপুর। সে অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে অল্প কিছু রইল এখানে।

হাকালুকি ক্যাম্প 
বরাবরের মতোই আমাদের শিক্ষক ছিলেন বিল জোন্স এবং স্টিভেন স্যামওয়ার্থ। তাঁদের সাথে এসেছিলেন ম্যাট প্রায়ার এবং ডীন রিয়া। রিং করার কাজে ম্যাট খুবই অভিজ্ঞ; কিন্তু বায়োকেমিস্ট ডীন অপেক্ষাকৃত নবীন। শিক্ষার্থী হিসেবে হাজির ছিলেন তারিক কবির, ওমর শাহাদাৎ, সারোয়ার দিপু, তারেক অণু, শফিকুর রহমান, মহসিন মিরন এবং জোহরা মিলা। এছাড়া ছিলাম আমি এবং ছিলেন এক নবীন শিক্ষার্থী, ইসমত এ্যানি। শিলচর থেকে এসেছিলেন আসাম বিশ^াবিদ্যালয়ের ছাত্র মিরাজ হোসাইন। তিনি এসেছিলেন রিং করার কাজে হাতেখড়ি নিতে। আমাদের রিং-ক্যাম্পে তিনি তৃতীয় বিদেশি শিক্ষার্থী। ২০১৩ সালে উগেন তেনজিন এবং কোনচো গেলজে নামে ভুটানের দুজন শিক্ষার্থী আমাদের রিং-ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিলেন।

photo by Mohsin Kabir Miron
 
২১ জানুয়ারি ‘আগাম-দল’ হাল্লা বিলে পৌঁছে গিয়েছিল ক্যাম্প দাঁড় করাতে। পরদিন ঢাকা থেকে বাকি সবাই এসে পৌঁছালো। শুরু হলো আমাদের নেট-রাইড কেটে জাল ফেলা। রোজকার রুটিন ছিল পাখি ধরে রিং পরানো, টেলিমেট্রি ও সোয়াব সংগ্রহ করা। ক্যাম্পের পাশে খাল-পাড়ে কিছু একটা দেখে ম্যাট একদিন সেখানে জাল পাতলেন। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে তিনটি পাতি-চ্যাগা হাতে এল এবং পরদিন একটি জ্যাক-চ্যাগা ধরা পরল। প্রথমবারের মতো জ্যাক-চ্যাগাকে রিং পরানো হলো এদেশে।photo by Mohsin Kabir Miron

২৮ জানুয়ারি হাকালুকি ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলা হলো। কুলাউড়ায় সি.আর.পি রেস্ট-হাউসে আধাবেলার বিশ্রামের ব্যবস্থা ছিল। বিল জোন্স বিশ্রাম নেওয়ার লোক নন; তিনি রেস্ট-হাউসের আশেপাশে জাল পাতলেন। তবে, সময়-সল্পতায় তিনি সার্থকতার মুখ দেখতে পাননি।

 photo by Mohsin Kabir Miron photo by Mohsin Kabir Miron

টাঙ্গুয়া ক্যাম্প 
২৯ জানুয়ারি আমাদের দল টাঙ্গুয়া হাওড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে বিকেলেই পৌঁছে গেল ক্যাম্প-সাইটে। ঢাকা থেকে এসে যোগ দিয়েছিলেন সায়েম চৌধুরী, মোহাম্মদ ফয়সাল ও শুভ সাহা। পরদিন জাল পাতা শুরু হলো। পানিতে জাল পাতা হলো হাঁস ধরার উদ্দেশ্যে এবং মাটিতে চেষ্টা চলল খুদে পাখি ধরার। হাঁস ধরার দলটি বিকাল থেকে সারারাত কাজ করে ভোরে ঘুমোতে যেত; আর অন্যদল ভোর-রাতে উঠে সারাদিন কাজ করত।  

একদিন হাতিরগাতায় জাল পাতা হলো। তিনটি বেইলন-গুরগুরি, তিন প্রজাতির খঞ্জন, রিচার্ডের তুলিকা এবং পাতি-আবাবিল পাওয়া গেল। ক্যাম্প এলাকাতেও উঁচু করে জাল পাতা হয়েছিল। সে জালে অনেক খয়রালেজ-কাঠশালিক ও সবুজ-সুইচোরা পাওয়া গেল। তবে ,সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তিনটি লালগলা-ফিদ্দা পাখিকে রিং পরানো।

  Bbc IUCN Ringing Camp Bbc IUCN Ringing Camp

রাজশাহী ক্যাম্প
৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী পদ্মার চরে রিং করার কাজ শুরু হয়েছিল। বিরান চরে রিং করার চাঞ্চল্য ছিল ভিন্ন মাত্রার। সামান্য কয়েকটি জাল পেতে দারুণ সব পাখি পাওয়া গেল। ধলালেজ-শিলাফিদ্দা, বালি-ভরত, ভোমরা-ছোটন, উদয়ি-অভ্রভরত, বাংলা-ঝাড়ভরত, নিরল-প্রিনা, হলদেভ্রু-ফুটকি, ধানি-তুলিকা, গাঙ-শালিক সহ মোট ২০ প্রজাতির পাখির পায়ে রিং পরানো হল। 

অপ্রত্যাশিতভাবে ধরা পড়ল একটি সাইক্সের-রাতচরা; বাংলাদেশের জন্য নতুন পাখি। পশ্চিম-ভারতের মরু-এলাকার এ পাখি; এতটা পুবে এর আসার কথা নয়; তবে, হাতে পেয়ে এর অস্তিত্ব তো আর অবিশ্বাস করা যায় না।

Bbc IUCN Ringing Camp Bbc IUCN Ringing Camp

দমার-চর ক্যাম্প
দমার চরে যাওয়ার দিন আবহাওয়া খারাপ হল। বৈরী আবহাওয়াতেই যেতে হল উপকূলীয় দ্বীপটিতে। বৃষ্টি আর ঝড়ে দুদিন কোন কাজ করা গেল না। পরদিন আকাশ ভালো দেখে জাল পাতার পর ঝড় আসলো; জলদি সব গুটিয়ে চলে আসতে হলো। তবে খালি হাতে নয়; অল্প সময়েই পাঁচ প্রজাতির আটটি পাখি পেয়েছিলাম। পরদিন পেলাম আর ২৩টি পাখি; ছোট-ধুলজিরিয়া, বড়-ধুলজিরিয়া, গুলিন্দা-বাটান, পাতি-বাটান এবং ছোট-চাপাখি। 

১০ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের দীর্ঘতম এই রিং-ক্যাম্পের সমাপ্তি টানা হলো। এই ২০ দিনে আমাদের অর্জন কী? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো এক এক সদস্য এক এক ভাবে দেবেন। তবে, কেউই বাংলাদেশের জন্য নতুন পাখি সাইক্সের-রাতচরা হাতে পাওয়ার কথা উল্লেখ না করে পারবেন না।