"ব্যাংকে কেরানীগিরির মাঝে সপ্তাহের এই একটি দিন সকালেই প্রিয় ক্যামেরা নিয়ে বের হতে পারি বলেই বোধহয় সব শুক্রবারেই সকালটা থাকে হয় কুয়াশায় মোড়া নয়তো মেঘগোমড়া ! ৫ মে ২০১৭ , শুক্রবার ভোর ৫.৩০ এ যথারীতি ঘুম থেকে জেগে বুঝতে পারলাম আজ আরো বেশী অন্ধকার থাকবে ! খুব স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ হলো । তবু যাহয় হবে বলেই বাইকে স্টার্ট দিলাম । পাখিগ্রাফির নিত্যসঙ্গী ডঃ Saleh Reza স্যারকে বাইকে তুলে নিয়ে চললাম । রাজশাহী শহর থেকে " ঢিল ছোড়া " দুরত্বের গন্তব্যে যখন পৌঁছলাম তখন মনে হলো আলো একটু বেড়েছে , আশাও বাড়তে থাকলো...

তেমন কোন পাখির দেখা নাই , মাঝে মাঝে এশিয়ান প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচারের ডাক শুনি কিন্তু এই দেখি তো এই হাওয়া । দুই তিনটা টিট ( Cinerous Tit ) খুব ব্যস্ত হয়ে বড় এক কড়ই গাছের বাকলের ফাঁকে ফাঁকে পোকা খুঁজছে - খুঁটে খাচ্ছে , ছোট পেঁচার (Spotted Owlet )একটা পুরো পরিবার বেশ জ্ঞাণীর মতো আমাদের দু'জনের প্রতিটা নড়াচড়া লক্ষ্য করছে , মাঝে মাঝে সতর্ক ডাক দিয়ে বাচ্চা দুটোকে সাবধান করছে , একটা কোকিলের বাচ্চা এ ডাল-সে ডালে - বোঝাই যায় সে এখনো অনেক অনভিজ্ঞ ,একটু দূরে কালাপাখ কাবাসির ডাক শুনছি ...মাঝে মাঝে ছবি তুলছি । যদিও ছবি তোলা না বলে শাটার টেপা বলাই ভালো কারণ আকাশ ক্রমে আরো কালো হয়ে গেছে !

এর মাঝে বড় কড়ই গাছটাতে একটা বাতাবী কাঠকুড়ালী ( Fulvous - breasted woodpecker ) এসে বসলো । ও বসতেই সেই ডাল থেকেই কি জানি একটা উড়ে গেলো মনে হলো । আমি খুব সন্তর্পনে ফলো করতে লাগলাম এবং হঠাতই সবুজ পাতার ব্যাকগ্রাউন্ডে তাকে দেখতে পেলাম । গায়ের রঙ এমনই যে , গাছের গায়ে লেগে থাকলে গাছের সাথে মিশে যায় - প্রায় চোখেই পড়ে না । খুব ছোট - খুবই ছোট একটা পাখি । অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গাছের পোকা ঠোকরাচ্ছে , এ ডাল হতে সে ডালে ছুটছে , চোখের পলক ফেললেই পরে আর খুঁজে পাওয়া ভীষনই কষ্ট ...। এরকম কোন পাখির ছবিও কখনো আমার চোখে পড়েনি । সালেহ রেজা স্যারও বেশ কনফিউজড । তবে আমরা দুজনেই বুঝতে পারছি যে পাখিটা কমন নয় ।

বেশ উঁচু গাছগুলির ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছি , ফোকাস করার আগেই আবার হারিয়ে যাচ্ছে ( যা হয় আর কি) , তবু কিছুটা আন্দাজেই শাটার টিপে যাচ্ছি ,আশা করছি যে দু'চারটে আইডেন্টিক্যাল শট হতেও পারে । বেশ কিছু শট নিলাম , ইতোমধ্যে আলো কমতে কমতে এমনই হলো যে সকাল ৯টার সময় মনে হতে লাগলো বুঝি ঘোর সন্ধ্যা নেমেছে । নিতান্তই বাধ্য হয়ে ক্যামেরা ট্যামেরা গুটিয়ে বাড়ির পথ ধরতে হলো ।

দুপুরের পরে পাখিটার একটা ছবি ফেসবুকের Birds Bangladesh এবং Ask Id's of Indian Birds গ্রুপে পোস্ট দিলাম এবং প্রিয় Shahriar Rushdee , Mehedi Hassan Ovi , Abdul Mazid Shah Shakil খুব খুশী এবং উচ্ছসিত হয়ে বললেন যে এটা Brown-capped pygmy woodpecker (Indian pygmy woodpecker) - হবার সম্ভাবনা আছে । তাই যদি হয়, তবে এটা হবে একদম নতুন একটা আবিষ্কার , বাংলাদেশের পাখির তালিকায় একটা নতুন নাম সংযোজিত হবে !!!! পাখিটা শ্রীলঙ্কা , নেপাল এবং ভারতের কিছু এলাকায় দেখা যায় তবে বাংলাদেশে আমার আগে কেউ কখনো দেখেনি ।

খয়রাটুপি বাটকুড়ালিখয়রাটুপি বাটকুড়ালি

বাংলাদেশ পেলো নতুন আরেকটা পাখি ।

বেশ শিহরণ জাগলো , যারা ওয়াইল্ডলাইফ নিয়ে কাজ করেন বা এসব ব্যাপারে একটু হলেও ইন্টারেস্ট আছে তারা সকলেই বুঝবেন যে , একবিংশ শতাব্দীতে এসে খুঁজে পাওয়ার মতো নতুন কোন পাখি অবশিষ্ট থাকা বেশ অসম্ভব এক ব্যাপার !!!

একটু পরেই বাংলাদেশের প্রথম সারির পাখি বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম শ্রদ্ধেয় Monirul Khan ভাই এবং প্রিয় Sayam U. Chowdhury কনফার্ম করলেন যে এটা সেই বিরল পাখিই । তারা সহ অনেকেই আমাকে কংগ্রাচুলেট করলেন , সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ।

এর পরেও আমার মাঝে একটু অতৃপ্তি কাজ করছিলো কারন আমি বাংলাদেশের পাখিবিজ্ঞানীদের মধ্যে সর্বজনশ্রদ্ধেয় জনাব Enam Ul Haque স্যারের মন্তব্য আশা করছিলাম । ০৮ মে উনি জানালেন যে তাঁর পাঠানো ছবি দেখে পাখি বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, বাংলাদেশে এটি নতুন পাখি। বাংলাদেশ একটি নতুন পাখি পেল। আগে কেউ দেখেনি, তাই বাংলায় এই পাখির কোনো নাম ছিল না।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব পাখিটির নাম প্রস্তাব করেছে ‘খয়রাটুপি বাটকুড়ালি’(Brown-capped pygmy woodpecker) তাঁর কাছ থেকেও অভিনন্দন পেলাম ।

সামান্য এক পাখির খুঁজে পাওয়া নিয়ে এতোবড় এক গল্প পড়ে অনেকেই হয়তো বিরক্ত হলেন , কেউ কেউ হয়তো পুরোটা পড়েন ও নি । তাদের সকলের কাছেই আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি ।

খয়রাটুপি বাটকুড়ালিখয়রাটুপি বাটকুড়ালি

আমার আবিষ্কার, বাংলাদেশে একদম নতুন এই পাখিটা আমি একজন মানুষকে উতসর্গ করেছি । কেন তাঁকে উতসর্গ করছি সে বিষয়ে অনেক অনেক কথা বলা যায় কিন্তু আমি শুধু একটা কথাই বলবো - আমার পাখির ফটোগ্রাফি , আমার এই জীবন , আমার বেঁচে থাকা - এর পিছনে শ্রদ্ধেয় Jalal Ahmed স্যার { Additional Secretary ( Budget and Expenditure Control), Finance Division at Government of Bangladesh }, এর বিরাট অবদান আছে ।

সকলের সুস্থ জীবনের জন্য দোয়া করছি , আমার এবং আমার পরিবারের জন্যও সবার কাছে দোয়া চাইছি ।"