১৪ অক্টোবর ২০১৬ , শুক্রবার । কেমন জানি শীত শীত গন্ধ , দিনের বেলা গরম লাগে আর রাত্রে কাঁথা ! শুক্রবার মানে সুর্যের আগেই আমার ঘুম থেকে ওঠা এবং সামান্য কিছু খেয়ে বা না খেয়েই পদ্মায় নেমে যাওয়া । আজকের মাঝিটা একদম নতুন , সে বুঝেই পাচ্ছেনা যে একটা মানুষ এই বড় ক্যামেরা নিয়ে এরকম আলো- আঁধার সকালে পদ্মায় কি করবে !!!!

বর্ষার পানি সবে নামতে শুরু করেছে , আর মাস খানেকের মধ্যেই পদ্মার বুক দেখলে কোন এক বিশাল বিরান মরুভুমি বলে ভ্রম হবে । এখন ছোট ছোট চর কেবল জাগছে । এসব শিশু চরের যতোটা সম্ভব গা ঘেঁষে চলার জন্যমাঝিকে বললাম । সেমতো চলছি ...
ক্রমে আলো ফুটলো , রোদ বাড়তে থাকলো । একসময় গরম লাগা শুরু হলো । একটার পরে একটা চরের পাশ দিয়ে নৌকা চলছে তো চলছেই । কোত্থাও কিচ্ছু নেই !!!

দুপুর পার হতে চললো ,মাথার উপর গনগনে সুর্য । নৌকা নিকটস্থ পাড়ে ভিড়াতে বললাম । নদীর পাড়ে ছোট বাজারমতো জায়গায় নৌকা থামালো মাঝি । দুজনে নামলাম , ভীষণ ঝাল দিয়ে রান্না করা ছোট মাছ আর ভাত খেয়ে আবারো শুরু হলো চলা । 

সরু-ঠুটি গাংচিলসরু-ঠুটি গাংচিল

দুপুর প্রায় তিনটা , এখন পর্যন্ত কয়টা ছোট পানকৌড়ি আর পাকড়া মাছরাংগা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি । একটু মন খারাপ হতে লাগলো । বুঝতে পারলাম যে আমার বার্ডিং এ আরেকটা " ফ্লপ ডে " যোগ হতে যাচ্ছে ! 

বেশ কিছুটা দূরে একটা মাঝারী চরের দিকে দেখিয়ে মাঝি প্রশ্ন করলো অতদুর পর্যন্ত যাবো কিনা । সিদ্ধান্ত নিলাম যে ওটাই শেষ , এরপর ফিরে আসবো কারন যে পর্যন্ত এসেছি তাতে ফিরে যেতে প্রায় ৩ ঘন্টা একটানা যেতে হবে- সন্ধ্যা পার হয়ে যাবে ।

মাঝির দেখানো চরের দিকে যাচ্ছি, চোখে ক্যামেরা লাগিয়ে কেমন জানি লাগলো । যতোই কাছে যাচ্ছি দেখতে পাচ্ছি প্রায় ৫০০ বর্গগজের মতো ক্ষুদ্র এক চরে হাজার হাজার ছোট বাবুবাটান বসে আছে !!! চরটা কিছুটা লম্বাটে হয়ে এক দিকে ক্রমশঃ সরু হয়ে নদীর সাথে মিশে আছে । ঠিক সেখানে দুইটা গাংচিল বসে আছে । আরেকটু কাছে যেতেই মন খুশীতে নাচতে লাগলো । কোন 'লাইফার' চোখে পড়লেই মুখের মাঝে কেমন জানি শুকিয়ে যাওয়া আর হৃদস্পন্দন একটু একটু বেড়ে যাওয়ার সেই অসম্ভব ভালো লাগা - নেশা জাগানো সেই পুরোনো কিন্তু বিরল অনুভুতি !!!! হাজার হাজার ছোট বাবুবাটানের মাঝে বসে আছে বিরল প্রজাতির অদ্ভুত সুন্দর কয়েকটা "উদয়ী বাবুবাটান" !!! রাজশাহীতে প্রথম রেকর্ড !!!! 
আরো আছে প্রশান্ত সোনাজিরিয়া , কিছু ছোট চা-পাখি, কেন্টিশ প্লোভার ইত্যাদি । 

সরু-ঠুটি গাংচিলসরু-ঠুটি গাংচিল

এরকম চরে যে কোন জায়গায় চোরাবালি থাকতে পারে । তিন তিনবার চোরাবালিতে রীতিমতো নাকানি চুবানি খেয়েছি আমি, তাই খুব সাবধানে চরে নামলাম । পাখিগুলো আমাকে তেমন ভয় পাচ্ছেনা ,শুধু ৩/৪ ফুট দূরে সরে সরে যাচ্ছে । আমি মহানন্দে উদয়ী বাবুবাটানের ছবি তুলছি । 
এক সময় মনে হলো এইবেলা গাংচিল দুইটার কিছু ছবি তুলি । একটাকে দেখেই চিনতে পারলাম যে এটা ' পালাসের গাংচিল ' আরেকটা বেশ ছোট দেখে অনভিজ্ঞতার কারনে ধারনা করলাম যে এটা পালাসের বাচ্চা কাচ্চা হতে পারে । কে জানতো যে এই ছোট গাংচিলটাই আবার নতুন করে বদলে দিবে রাজশাহীর বার্ডিং রেকর্ড !!! 

বেশ অনেক ছবি তুললাম । এরপর আর দেরী করা উচিত হবেনা ভেবেই মাঝিকে বলে ফিরতি পথ ধরতে বাধ্য হলাম । 
পরবর্তীতে ছবিগুলো প্রসেস করে ফেসবুকের Birds Bangladesh গ্রুপে পোস্ট করলাম । জানতে পারলাম যে , ছোট সেই গাংচিল - যাকে আমি কিছুটা অবহেলা করে ছিলাম তার নাম "সরু-ঠুটি গাংচিল" বা Slender billed gull . এই পাখিটা মূলত সমুদ্র উপকুলেই থাকে , কক্সবাজারের পরে পাখিটা রাজশাহীতেই প্রথম দেখা গেলো । নদীতে এই পাখি দেখা যাবার এটাই সম্ভবত প্রথম রেকর্ড ।