চৈত্রের খাঁ খাঁ দুপর। উত্তপ্ত সূর্য রৌদ্রবাণ নিক্ষেপ করছে আমাদের দমাতে। পাখির পেছনে ঘুরছি মাঠকে মাঠ। নির্দিষ্ট কোনো পাখি নয়। যখন যে পাখি চোখে পড়ে সেটারই ছবি তোলার লোভে ডঙ্কা দুপুরে সূর্যের খরতাপ উপেক্ষা করে এই ছুটে চলা। এক সময় ক্লান্ত হতেই হয়। আমরাও হলাম। আমরা বলতে আমি আর দুই কিশোর ভাই। পৌঁছালাম একটা বাগানে। বাগান মানে বিশাল বড় এক আমবাগান। দুর্বা আর শ্যামা ঘাসে ভরা। একপাশে ভাঁট ফুলের ঘন বন। বসন্তে রূপে-গন্ধে অন্যরকম মাদকতা নিয়ে হাজির হয় এরা। 
ফুলের সুবাস আকর্ষণ করেছে। তাই দু-দ- জিরোনোর জন্য বসলাম। বেশিক্ষণ নয়। হঠাৎ ঝরা আম পাতার খস খস শব্দ। প্রথমে উৎসটা চোখে পড়েনি। একটু পরেই পড়ল। নতুন একটা পাখি। আমার ছবির অ্যালবামের জন্য নতুন। চোখের জন্যও নতুন কিনা সে কথা নিশ্চিত করতে পারল না মগজের স্মৃতিকোষগুলো। 

হাতে ক্যামেরা। এমন সুযোগ হারায় কে? পাখিটাও যেন নিজেকে উজাড় করে মেলে ধরল। কমলা দামা। দোয়েলের জাত ভাই। সুন্দর বটে। লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাতার ভেতর। পা-নখ দিয়ে খুঁজে ফিরছে সাধের খাবার। আগে কখনো দেখি-বা না দেখি তাতে কিছু এসে যায় না। ছোট্ট-সুন্দর পাখিটার তামাশা দেখে তখন ভারি আমোদ হচ্ছিল মনে। দামার দেখা সেদিনই প্রথম। তবে শেষবার নয়। এখন প্রায়ই চোখে পড়ে। ছদ্মবেশি পাখি, তাই হয়তো সবার চোখে পড়ে না। গায়ের কমলা আর ধূসর রং লালচে-ধূসর পাতার ভেতর এদের ছদ্মবেশ ধারণে সাহায্য করে। 

ছদ্মবেশি হলেও কিন্তু অতি চালাক নয়। হাঁড়িচাঁছার মতো শিকারি পাখিদের কাছে বড্ড অসহায়। গত গ্রীষ্মে একটা আমবাগানে কিছুদিন আস্তানা গেড়েছিলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে পাখিদের কা--কীর্তি দেখব বলে। বাগানটার পাশেই ছোট্ট একটা আমের ডালে বাসা বেঁধেছে শাবুলবুল। মূলত ওদের জন্যই আমার এই ঘাপটি মারা। উপরি পাওনা হিসেবে পেয়ে গেলাম আরেকটা বাসা। একজোড়া কমলা দামা বাসা বেঁধেছে মেহগনির একট বোঁচা ডালের মাথায় খড়কুটোটো সাজিয়ে। সদ্য গজানো কিছু কচিপাতা আড়াল করে রেখেছে বাসাটাকে। আড়ালটা যথেষ্ট নয়। আমি বাসা থেকে ছানাদের কিচির মিচির শুনতে পাই দূর থেকে। মাঝে মাঝে ছানাদের হাঁ-করা ঠোঁট দেখি। মা কিংবা বাবা পাখি মাঝে মাঝে খাইয়ে আসে ওদের। 

দামাদের আচরণ যেন ঠিক স্বাভাবিক নয়, কেমন যেন ভয় ভয় ব্যাপার আছে। চলনে-বলনে অতি সতর্কতা। কেন? সেটা ভাবছি, তখনই হাজির যমদূত। কারণ বুঝতে তখন আর বাকি থাকল না। একজোড়া খয়রা হাঁড়িচাঁছা হানা দিয়েছে বাগানে। দামার ছানাদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি। শাবুলবুলের বাসায় ডিম-ছানা কিছু আছে কিনা বুঝতে পারছি না। কাছে গিয়ে দেখা ঠিক নয়। তাই তো এত দূরে গা ঢাকা দিয়ে আছি। মাঝে মাঝে ক্যামেরা জুম করে ছবি তুলি। তবু নিশ্চিত নই ওদের বাসায় ডিম-বা ছানা আছে কিনা। কিন্তু হাঁড়িচাঁছার আবির্ভাবের পর ওরা অতি সতর্ক। লেজওয়ালা পুরুষ শাবুলবুল মারমুখি ভঙ্গিতে তেড়ে গেলো হাঁড়িচাঁছার দিকে। দামারা বোধহয় অতটা সাহসী নয়। দূর থেকে কিচির মিচির করেই বকে দিচ্ছে শত্রুদের। 

কিন্তু ওরা কি পারবে শেষ রক্ষা করতে? আকারে তো হাঁড়িচাঁছাদের কাছে দামা নস্যি! গন্তান রক্ষায় ওদের লড়াইটা দেখেছিলাম চারদিন নিয়ম করে। দামারা দুজন, সাথে লড়াকু শাবুলবল দম্পতি। একটা হলদে পাখি এসে জোট বাঁধল ওদের সাথে। বুঝতে বাকি রইল না, হলদে পাখির বাসাও আছে আশপাশে। সব মিলিয়ে বড়সড় একটা দল গড়ে উঠল। বুক চিতিয়ে ওদের লড়াইটা দেখে গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়। ক্লান্ত পাখিরা যখন শত্রুদের হঠিয়ে ফিরে আসে, আমিও তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে ফিরে আসি বাড়িতে। 

একদিন হঠাৎ দেখা শান্ত-নিরীহ কমলা দামাকে মনে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, সেদিন লড়াই শেষে সেই ছোট্ট কমলা দামাই শ্রদ্ধা আদায় করে নিল।