খুব ছোটবেলায় একটা কাকের বাচ্চা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম নানা বাড়ির বাঁশবাগানে। এতটুকু বাচ্চা মাটিতে পড়ল কীভাবে? কেউ বলল, চিলে নিয়ে যাচ্ছিল, মাঝপথে মাটিতে পড়ে যায়। কেউ বলল, ঝড়ো হাওয়ায় পড়ে গেছে। দুটো কথায় তখন বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু এখন সেদিনের কথা ভাবতে বসলে অত সরলভাবে মেনে নিতে পারিনে। চিলে কোনো পাখির ছানা চুরি করলে তা আকাশের মাঝপথে ফসকানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তাছাড়া চিলের নখ বিঁধে যাওয়ার কথা ছানাটার গায়ে। কিন্তু ছানাটার গায়ে নখের আঁচড়টিও ছিল না। ঝড়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রেও তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ বাঁশবাগানে, জমাট ঝোপ-জঙ্গলের ভেতর শেয়াল গুইসাপ, বেজির মতো মাংসভোজি প্রাণীর অভাব ছিল না! কীভাবে তাহলে ছানাটা আমার হাতে পৌঁছেছিল তা এক রহস্যই।

ছানাটা আমি পুষতে চেয়েছিলোম। কিন্তু বেচারী বোধহয় আমার ওপর খুব অভিমান করেছিল। একটা দানাও মুখে তোলেনি। শেষে তিন-চারদিন পর ক্ষুদার চোটেই মারা যায়। এরপর কাকদের সংস্পর্শে তেমন যাইনি। কিন্তু শহরে লেখাপড়া করতে আসার পর দেখতে পাই কাকদের আসল চেহারা। যশোর ক্যান্টোনমেন্টের গাছাগাছালিতে অজস্র কাকের আড্ডা। ভোর হতেই না হতেই শহরে হানা দিত কাকগুলো। ডাস্টবিনই তাদের সবচেয়ে কৌতূহলের বিষয়। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কা- করত ওরা--ভীষণ মার দিতে ইচ্ছে করত। রান্নাঘর থেকে মাছ মাংস-ডিম চুরি যেত প্রায়ই। গায়ে, মাথায় টয়লেট করার কথা না-ই বা বললাম। সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হতো যখন টিউবওয়েলের মাথায় বসে ব্যারেলের ভেতর টয়লেট করত। কয়েকদিন পর্যন্ত পানি খাওয়া যেত না।

কাকের চুরির বিষয়টা এখনও আমার কাছে রহস্যময় লাগে। পায়রাঘর থেকে প্রায় ডিম চুরি হতো। জানতাম কাকে করে, কিন্তু বিশ্বাস করতে মন চাইত না। কারণ ডিমের খোসা পাওয়া যেত না আশপাশে। তারমানে কাক ডিম খায়নি, চুরি করে পালিয়েছে। কিন্তু নিল কীভাবে। কাকের নখরের ভেতর পায়রায় ডিম আঁটবে না। ঠোঁটে করেই বা নেবে কীভাবে? কিন্তু একদিন সত্যি সত্যিই তাজ্জব করে দিল এক কাক। দেখলাম অপূর্ব ভঙ্গিমায় সে পায়রার ডিম দুই ঠোঁটের ফাঁকে ধরে নিয়ে পালাচ্ছে। ভেবেছিলাম পিছলে ডিমটা পড়ে যাবে। কিন্তু পড়ল না।

কাক অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। না ভাই, হাসির কিছু নেই। মানুষের সাথে যতই অসামাজিক আচরণ করুক, নিজেদের ভেতর ওদের ভীষণ রকমের ভাতৃত্ববোধ আছে। কতবার দেখেছি কোথাও একটা কাক মরলে শতশত কাক এসে সেখানে জড়ো হয়। কা-কা স্বরে চিৎকার করে মাথা ধরিয়ে দেয়। মনে হয় যেন হত্যাকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে।

সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের কর্নেল সিরিজের একটা বইয়ে কাক সম্পর্কে দারুণ এক তথ্য পেয়েছিলাম। কাক নাকি তার বাসায় নানা ধরনের টুকিটাকি জিনিস জড়ো করে। যেমন-- ভাঙা চুড়ি, কাঁচের টুকরো, ছোট-খাটো নাট-বল্টু। বইটা যখন পড়ছি তার কিছু দিন আগে খুব কাছ থেকে কাকের বাসার কিছু ছবি তুলেছিলাম। বইটা পড়ার সময় মনে হলো, দেখি না আমার ছবিতে এমন কিছু আছে কিনা। ছবি দেখে তাজ্জব! সত্যিই আমার এই প্রতিবেশী কাক মামারও তাদের বাসায় আজব একটা জিনিস সংগ্রহ করেছেন। পাঠক ছবিগুলোতে চোখ বুলিয়ে দেখুন, একটা পেঁচানো ইলেট্রিক তার অবহেলায় পড়ে রয়েছে কাকের বাসায়।

আমার এই প্রতিবেশী কাকের গল্পটা আবার বিষাদে ভরা। ২০১৪ সালের প্রায় অর্ধেকটা কাটিয়েছি আজিমপুরের চৌধুরী বাজার এলাকায়। মেসে থাকতাম। চারতলার ওপরে। আমার ঘরের জানালার পাশেই একটা মেহগনি গাছ। ফাল্গুন মাসে সে গাছের একেবারে মগডলে খড়কুটো জড়ো করতে শুরু করে একজোড়া কাক।

একজোড়া কাকএকজোড়া কাক

জড়ো মানে একেবারে অগোছালোভাবে খড়কুটোর স্তূপ করা। টুনটুনি, বুলবুলিদের বাসা তৈরির শৈল্পিক কারুকাজ দেখেছি স্বচোক্ষে। আবার শালিক কিংবা চড়–ই পাখিদের অগোছালো বাসাও দেখেছি। কিন্তু কাকের মতো এমন ছন্নছাড়া বাসা আর দেখিনি। ওরা বাসা তৈরি করছিল আর আমি ভাবছিলাম, এই বাসার ছোট্ট ছোট্ট ছানাগুলো থাকবে কী করে!

অগোছালোভাবে খড়কুটোর স্তূপঅগোছালোভাবে খড়কুটোর স্তূপ

বাসা তৈরি হলো, কিন্তু কখন কীভাবে ডিম পাড়ল টেরই পেলাম না। বাচ্চারা আলোবাতাসের মুখ দেখার পর যখন তাদের অস্তিত্ব জানান দিল, তখন বুঝলাম বাসা একেবারে মন্দ করেনি কাকেরা। কারণ বাসাটা বেশ গভীর ছিল। তাই আমার জানালার প্রায় সমান্তারালে থাকলেও ডিম কিংবা ছানার চেহারা দেখতে পাইনি। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা হাতে অপেক্ষা করতে লাগলাম, কখন ছানারা মাথা উঁচু করে। কিন্তু কাকেরা ব্যাপারটা বুঝে ফেলে। জানালার পাশে মুখ নিয়ে গেলেই জেট বিমানের মতো বাতাসে ডাইভ দিয়ে তেড়ে আসে চোখ বরাবর। বাধ্য হয়ে মুখ সরিয়ে নিতে হয়। কিন্তু ছবি আমি তুলবই। এরপর ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়াই জানালা থেকে বেশ দূরে। একেবারে ঘরের মাঝখানে। জুম করে ছবি তুলি। কখনও কাকের, কখনও বাসার, কখনও ছানার। কয়েকদিন অন্তর অন্তর ছানাগুলোর ছবি তুললাম। প্রথমে পালকবিহীন ছানাগুলো দেখে বোঝাই যেত না এরা বড় হয়ে কুচকুচে কালো হবে।

পালকবিহীন ছানাপালকবিহীন ছানা

মায়ের কাছে বাচ্চাদের বায়না দেখে ভারি মজা পেতাম। বাচ্চার হাঁ করে মা-বাবার কাছে খাবার চাচ্ছে। মা-বাবা তাদের আবদার মেটানোর চেষ্টা করছে। এই নৈশ্বির্গিক দৃশ্য চাক্ষুসের মতো আনন্দ খুবই কম ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়।

বাচ্চার হাঁ করে মা-বাবার কাছে খাবার চাচ্ছেবাচ্চার হাঁ করে মা-বাবার কাছে খাবার চাচ্ছে

কিন্তু ভয় হয় রাতে। কালবৈশাখী প্রবলবেগে হানা দিত। গাছপালা ভেঙে যাবার যোগাড়। ভাবতাম, আজ বুঝি আর ছানাদের রক্ষা নেই। কিন্তু সকালে উঠেই আমার ভুল ভাঙত। কাকেরা নিজেরা কাকভেজা হয়ে বাচ্চাদের আগলে রেখেছে পরম মমতায়।

আগলে রেখেছে পরম মমতায়আগলে রেখেছে পরম মমতায়

সপ্তাহ তিনেকের মধ্যে ছানাগুলো বেশ বড় হয়ে উঠল। গায়ে কালো পাখনার আস্তর লেগেছে। কেন জানি মনে হচ্ছিল দুই-একদিনের মধ্যেই বাচ্চাগুলো উড়তে শিখে যাবে। কিন্তু হায়! সেই দুয়েকদিন আর পার হলো না। একদিন সকালে উঠে দেখি, বাচ্চা দুটো মরে সটান হয়ে বাসায় পড়ে আছে। মা আর বাবা কাক দুটো কখনও গাছের ডালে বসে, কখনও বাসায় গিয়ে মৃত বাচ্চাদের উল্টে-পাল্টে দেখে বিলাপ করছে। তিনদিন ধরে শুনতে হলো কর্কশ কাকের করুণ কান্না।

ছানা দুটো কেন মরল তা রহস্যই রয়ে গেল। আগের রাতে তুমুল বৃষ্টি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ছানারা যখন আরও ছোট ছিল তখন কেন মরেনি?