মূল রচনাঃ সারাহ লাস্কো

রূপান্তরঃ জোহরা মিলা

প্রায় এক শতাব্দী আগে, কলকাতার (ভারত) জলাভূমিগুলো ছিল উজ্জ্বল গোলাপী শিরের লাজুক এক হাঁসের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। প্রকৃতপক্ষে এই প্রজাতিটি ‘গোলাপিমাথা-হাঁস’ (Pink-headed Duck) নামে পরিচিত। পুরুষ হাঁসটির ছিল রক্তিমাভ গোলাপী চঞ্চু, যার মাথা এবং গ্রীবার পালকগুলোও ছিল গোলাপী। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে আবার ঈষৎ গোলাপী অথবা ‘পেপটো-বিসমল’ নামক রাসায়নিক উপাদানের মত উজ্জ্বল গোলাপী পালকেও দেখা যেত। এই পাখিটি সচরাচর দেখা না গেলেও শিকারীদের দৃষ্টি এড়াত না। কারন সেসময় শিকার করাই ছিল এক অদ্ভুত খেলা। শেষ যে বুনো গোলাপী শিরটি দেখা গিয়েছিল তাও দেখা গিয়েছিল এক শিকারী কুকরের মুখে। তখন সময়টা ছিল ১৯৩৫ সালের জুন মাস, মৃত হাঁসটি কুকুরের মুখ থেকে পৌছায় র্চালস এম. ইনগ্লিস নামে জনৈক ব্যক্তির কাছে। যিনি দার্জিলিং জাদুঘর এর তৎকালীন কিউরেটর ছিলেন।

গোলাপিমাথা-হাঁস বিশ্বে মহাবিপদাপন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। যদিও গত কয়েক বছরে বেশ কিছু রির্পোট পাওয়া গেছে তবুও বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করেন, পাখিটি শুধু বিরল বা লাজুক নয়, বিলুপ্তও বটে।

কিন্তু রিচার্ড থর্নস এদের তালিকাভুক্ত ব্যাক্তি নন। ২০০৯ সালে থেকে তিনি এই বিরল হাঁসটির খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত ছয় বার তিনি এই প্রজাতির খোঁজে মায়ানমার গিয়েছেন এবং তিনি  বিশ্বাস করেন প্রায় ৫০ টি হাঁসের একটি ঝাঁক এখনও সেখানে টিকে আছে।

৫৩ বছর বয়সী এই উৎসাহী ইংরেজ ১৯৯৭ সালের দিকে এক লাইব্রেরী থেকে বিলুপ্ত পাখির উপর লেখা একটি বই পড়ে অনন্য সৌন্দর্যের এই প্রজাতিটি সর্ম্পকে প্রথম জানতে পারেন। আর এই বইই তাকে একজন অতি সাধারণ মানুষ থেকে দুঃসাহসিক অভিযাত্রী করে তোলে। ঐ সময় তিনি একটি বিপনী বিতানের সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। কিন্তু তিনি যখন অত্যাশ্চর্য, বিরল পাখিদের সর্ম্পকে নানারকম চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারলেন; এলিফ্যান্ট ঘাস, লোটাস ফুলের মধ্য দিয়ে এদের অবাধ বিচরণের বর্ণনা পরে তার মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতির সঞ্চার হল। তাঁর ভাষ্যমতে, “আমি আর বিপনী বিতানের সহকারী হয়ে থাকতে চাইনা। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে গোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে যাবার। আমি তাই করেছিলাম এবং এখনো তাই করছি।”

গোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে Richard Thornsগোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে Richard Thorns

মায়ানমার ভ্রমণের সময়ই থর্নস একটি সূত্র উদ্ভাবন করেছিলেন যে, ঠিক কোথায় এই প্রজাতিটি লুকিয়ে থাকতে পারে। এবং সেই পরিকল্পনা মতেই ”হারানো প্রজাতির খোঁজে”-এই প্রচারনার অংশহিসেবে ৭ম বারের মতো অনুসন্ধান চালাতে ফিরে যান। এই প্রচারণার সৃত্রপাত ঘটে অস্টিন ভিক্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে, যার উদ্দেশ্য বিশ্বের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। তবে এই  প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রায় ১২০০-এরও বেশি প্রজাতির পুনর্বাসন; যেসব প্রজাতি হারিয়ে গেছে বলে ধরা হচ্ছে, বা অনেক আগে দেখা যেত অথবা রেকর্ড করা হয়নি কিংবা প্রায় বিলুপ্তির পথে।

এক শতাব্দী আগেও মায়ানমারে গোলাপিমাথা-হাঁস দেখা যেত এবং তাই থর্নসের বিশ্বাস যে এখনো হাঁসগুলো দেশটির কোথাও না কোথাও আছে যেখানে আজ পর্যন্ত কোন পাখি পর্যবেক্ষক অথবা সংরক্ষণ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের পদচিহ্ন পড়েনি।

গোলাপিমাথা-হাঁসের হাতে আঁকা ছবি গোলাপিমাথা-হাঁসের হাতে আঁকা ছবি

যদিও এই পাখিটিকে বাস্তবে প্রায় সব স্থানেই বিলুপ্ত ধরা হয় তবুও আপাতদৃষ্টিতে এই বাস্তব জ্ঞানহীন অভিযানের পিছনে কিছু যুক্তি থেকেই যায়। থর্নসের মতে, “যারা এখনো এই হাঁসটি খুঁজে পেতে আগ্রহী তারা অব্যশই অন্য উপায়ে চিন্তা করবে। এটি হতে পারে একটি গোয়েন্দা কাহিনী। এমনও হতে পারে যে আমরা অল্পের জন্য হাঁসটিকে দেখতে পাইনি? অথবা এরা কি সেখানে লুকিয়ে আছে যেখানে কেউ যেতে পারেনা।”

থর্নস-ই প্রথম ব্যাক্তি নন যিনি এই অভিযানে নেমেছেন। ১৯৮০ সালের দিকে একজন আমেরিকান অভিযাত্রী এবং লেখক ররি নুগেন্ট তার এক বন্ধুর কাছ থেকে এই হাঁসটির সর্ম্পকে প্রথম জানতে পারেন।  তার দুই মাস পর তিনি তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে এবং সম্পত্তি জামানত রেখে সেই অর্থ নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। থর্নসের মত নুগেন্টও বিশ্বাস করতেন যে, তিনি বিশ্বের যে কোন অংশে হলেও গোলাপিমাথা-হাঁসকে খুঁজে পাবেন। যখন সেগুলো ধ্বংসের কবলে পরে নাগালের বাহিরে চলে গেছে। ভারতের আসামে তিনি কয়েক মাস অপেক্ষা করেছিলেন ব্রহ্মপুত্র নদীতে ভ্রমনের অনুমতির পাবার আশায়। এই অন্তর্বতীকালীন সময়ে তিনি হাঁসটির খোঁজে কলকাতার পাখির মার্কেটে, সিকিমের শহরগুলোতে, ভারত এবং তিব্বতের সীমানায় চষে বেড়িয়েছেন। অবশেষে অনুমতি পেয়ে তিনি এবং তাঁর চিত্রগ্রাহক ও শিল্পী বন্ধু শঙ্কর বড়ুয়া (নতুন দিল্লিতে যার সাথে পরিচয় হয়েছিল) দু’জনে কয়েক সপ্তাহ্ ব্রহ্মপুত্র খুঁজে বেড়িয়েছেন হারিয়ে যাওয়া এই প্রজাতিকে । নুগেন্ট কখনই তাঁর অনুসন্ধানে স্পষ্ট কোন আভাস দেখতে পাননি। তবে তাঁর অনুসন্ধান শেষে তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, “আমরা হাঁসটিকে দেখেছি। হয়তো সঠিকভাবে পর্যবেক্ষন করতে এদের পারিনি.....তবে তারা বিলুপ্ত নয়, শুধুমাত্র এদের খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য।” তাঁর রচিত ভ্রমণ বিষয়ক বইতে অবশ্য তিনি হাঁসটিকে দেখতে পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেছেন।

গোলাপিমাথা-হাঁসকে ঘিরে যে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছিল তার একটি অংশ জুড়ে ছিল-কেন এটি অদৃশ্য হতে শুরু করল। বেশিরভাগ প্রজাতিই বাসস্থান ধ্বংস, মানুষের শিকার বা ক্ষতিকর প্রজাতির শিকারের লক্ষ্যে পরিণত হওয়া- এসব কারণে বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে। কিন্তু গোলাপিমাথা-হাঁসের অদৃশ্য হবার পেছনে সঠিক কারণ পাওয়া যায়নি। যদিওবা এই প্রজাতির বাসস্থান ধ্বংস হয়েছে বা প্রজাতিটি শিকারের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে, কিন্তু এমতাবস্থায় অন্যান্য পাখি প্রজাতি ঠিকই প্রকৃতিতে টিকে থেকেছে। শুরু থেকেই যেহেতু এই হাঁসটি সর্বদা বিরল, সেহেতু এটি অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে এমন কল্পনা অসম্ভব নয়। হাঁসটির টিকে থাকার বিষয়ে নুগেন্ট-এর রিপোর্ট অনুসারে, ১৯৬৮ সালে মায়ানমার থেকে পাওয়া তথ্য এবং তৎকালীন অন্যান্য পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট জোরালো প্রমাণ হিসেবে এখনও বিবেচ্য নয়। কিন্তু এই হাঁসটি দেখতে পাওয়া নিয়ে আজও নানা রহস্য উঁকি দিচ্ছে এবং বেশিরভাগ তথ্যই আসছে মায়ানমারের ঐ এলাকা থেকে যেখানে থর্নস তাঁর অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।

গোলাপিমাথা-হাঁস দক্ষিন-পুর্ব এশিয়ার এমন জলাশয়ে পাওয়া যেতোগোলাপিমাথা-হাঁস দক্ষিন-পুর্ব এশিয়ার এমন জলাশয়ে পাওয়া যেতো

১৯১০ সাল। একটি গোলাপিমাথা-হাঁস স্টাফ করে নিউইয়র্কের ”আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি -তে রাখা হল। তার আগ পর্যন্ত শহরের উত্তর অঞ্চল থেকেই হাঁসটির সর্ম্পকে অনিশ্চিত রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছিল। ২০০০-এর শুরূর দিকে দুইটি সংরক্ষণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ”বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল” এবং ”মিয়ানমার বায়োডাইভার্সিটি এন্ড ন্যাচার কনজারভেশন এসোসিয়েশন (BANCA)” গোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে নদী, লেক এবং জলাভূমিগুলোতে জরিপ শুরু করল।

ডিসেম্বর, ২০০৪-এ দলটি অবস্থান করছিল ইন্দাগাই লেকের (Indawgyi Lake) উত্তরে নাং কুইন (Nawng Kwin) জলাভূমিতে; যেখানে তারা স’ অং নামে একজন যুবকের সাথে পরিচিত হল, যে এই হাঁসটির সাথে পরিচিত ছিল। একদিন সকালে যখন দলটি একটি তৃণভূমি থেকে বেরিয়ে আসছিলেন তখন দেখলেন স’ অং একঝাঁক হাঁসকে জলাভূমি থেকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু সংখ্যক নীলমাথা হাঁস উড়ে গেল। তিনজন পাখি পর্যবেক্ষক টেলিস্কোপের সাহায্যে দেখলেন যে, একটি হাঁস ঝাঁক থেকে বের হয়ে আরও উঁচুতে উঠে গেল এবং ২-৩ মিনিট চক্রাকারে ঘুরে তৃণভূমিতে নেমে এলো। এই ঘটনাটি সম্পর্কে দলটি তাদের রির্পোটে উল্লেখ করেছিলেন। ঐ তিনজন পর্যবেক্ষকের মতে, পাখিটি ছিল মাঝারি আকারের; ফ্যাকাসে মাথা এবং ঘাড়, কালচে দেহ এবং ডানার উপরের অংশও ছিল কালচে। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যের সাথে দেশি মেটে হাঁসের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে। তাদের আলোচনায় এই তথ্য বেরিয়ে আসল যে, দেশি মেটে হাঁসের ডানার নিচের পালকগুলো সাদা হয়ে থাকে। তাঁরা কি সেই পালক দেখেছিলেন? তিনজন পর্যবেক্ষকের একজন মনে করেন যে, তিনি গোলাপী শিরের মতোই কিছু দেখেছিলেন, কিন্তু অন্য দু’জন এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। তাই তাঁরা যে ভিন্ন প্রজাতির দেশি মেটে হাঁস দেখেননি-এই সম্ভাবনাকে একবারে বাতিল করে দিতে পারলেন না। তাঁরা এর সমাপ্তি টানলেন এভাবে যে-এই রেকর্ডটি গোলাপিমাথা-হাঁসের সম্ভাব্য কিন্তু অনিশ্চিত পর্যবেক্ষণ।” এই উত্তেজনাকর মুহূর্তগুলো অনিশ্চিয়তার কারনে খুব তাড়াতাড়ি অতিবাহিত হয়ে গেল।

এই অনুসন্ধানের শুরুতে, থর্নস এত মনোযোগী পাখি পর্যবেক্ষক ছিলেন না। তিনি বলেন, ”এই ব্যাপারে আমার ভাই ছাড়া কথা বলার মতো কেউ ছিল না। সে ছিল একজন প্রকৃত পাখি পর্যবেক্ষক।” থর্নস আসলে একজন যখন গোলাপিমাথা-হাঁস সম্পর্কে জানতে পারলেন, জানতে পারলেন এর সৌন্দর্য এবং অপরূপ বাসস্থান সম্পর্কে, তখন থেকেই তিনি আর পাখিটিকে ভুলতে পারেননি। তিনি বলেন, ”আসলে আমি বংশগত ভাবে আমার দাদার কাছ থেকে অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠার সহজাতক প্রবৃত্তি লাভ করেছি। আমি অনেক ভেবেছি .....আমি আসলে বেশিকিছু করতে পারিনি। আমার মনে হয়না সব করতে পেরেছি। গোলাপিমাথা-হাঁস এক প্রকার অলীক বস্তুর মতো। কিন্তু এই পাখিটি সত্যিই সুন্দর।” প্রকৃতপক্ষে বহু বছর ধরে হারিয়ে যাওয়া কিছু খুঁজে বের করার পরিকল্পনা থর্নসকে জীবনের একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।

গোলাপিমাথা-হাঁসের মাথার চিত্রগোলাপিমাথা-হাঁসের মাথার চিত্র

মায়ানমার প্রথম পরির্দশনের সময় থর্নস নিজেকে এবং তাঁর আগমনের উদ্দেশ্যকে গোপন রাখতে চেষ্টা করেছিলেন। কারণ ২০১১ সালের আগ থেকেই অর্থাৎ ১৯৬২ সালে ক্ষমতা প্রাপ্তির পর দেশটি সামরিক জুন্টা দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিল। এবং আজ পর্যন্ত দেশটির কোন কোন স্থানে বিদেশি পর্যটকের প্রবেশাধিকার নেই। মায়ানমার স্বর্ণ এবং অন্যান্য নানা সম্পদে প্রাচুর্যমন্ডিত দেশ। কিছু কিছু সম্পদে পরিপূর্ণ এলাকা তাই নাগালের বাইরে। এমনকি দেশটির উত্তরভাগে এখনো সরকারি সৈনিকদের সাথে স্থানীয় নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সৈন্যদের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। কিন্তু এই বিশেষ পাখি প্রজাতির জন্য ঐ সকল স্থান খুবই গুরুত্ব বহন করে; যে স্থানগুলো জলাশয়পূর্ণ এবং এখনও অনুন্নত। থর্নস ঠিক করলেন যে তাঁকে লুকিয়ে হলেও সেখানে যেতে হবে, যা সাধারণ পন্থায় সম্ভবপর নয়।

থর্নস ইতিহাস অনুসরন করে আই-ইরাবতী (Ayeyarwady River) নদীকেন্দ্রিক শহর এবং ইন্দাগাই (Indawgyi) লেক পরির্দশন করতে উত্তরের পথ ধরলেন, যা ছিল ২০০৪ সালের অভিযান অনুযায়ী সম্ভাব্য স্থান। ভামোতে তিনি শেন ডইন নামে একজন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করলেন। থর্নস সেখানকার একটি Lonely Planet Guide-G GB-এ এই ব্যাক্তি সম্পর্কে জানতে পারেন, যিনি নিজে নিজে হেলিকপ্টার তৈরিতে দক্ষ হিসেবে স্থানীয়ভাবে বেশ বিখ্যাত ছিলেন। থর্নস ভাবলেন যদি এই ব্যক্তি হেলিকপ্টার তৈরিতে যথেষ্ট অদ্ভুত স্বভাবের হন তবে তিনি আমার গাইড হতে আপত্তি করতে পারবেন না। এরপর তাঁরা সরকারী অনুমতি ছাড়া লুকিয়ে নদীর উৎপত্তিস্থলের দিকে ঠিকই যাত্রা করলেন, কিন্তু দৃষ্টির অগোচরে যেতে পারলেন না। একসময় তাঁরা রাত পর্যন্ত নৌকায় অপেক্ষা করলেন লুকিয়ে নদীর শেষ প্রান্তে যাওয়ার জন্য। এরপর তাঁরা নদীর শেষ প্রান্তের মন্দিরে লুকিয়ে রইলেন, যাতে স্থানীয়রা মনে করেন তাঁরা দক্ষিণ দিক থেকে শহরে ফিরে এসেছেন। পরে তিনি নদীর উল্টাদিকের লেকে অন্বেষণ পর্ব চালালেন। লেকটি অতিক্রম করতে অবশ্য এক মাঝিকে ”এক লক্ষ কিয়াত” যা প্রায় ১০০ ডলারের সমান অর্থ দিতে হয়েছিল।

গোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে ২০১৪ সালেগোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে ২০১৪ সালে

সব ঝুঁকিপূর্ণ কাজেরই একটা প্রভাব পরবর্তীতে থেকে যায়। ২০১২ সাল, থর্নসের এর ৩য় বারের মত মায়ানমার যাত্রা। এতদিনে দেশটির উত্তরের সংঘাত বেড়ে গেছে। তাই লুকিয়ে নৌকায় নদীতে নামার কোন উপায়ই কাজে লাগলো না। এই অবস্থায় থর্নস ১টি সাইকেল ভাড়া করে শহরের দিকে ছুটে গেলেন। শহরের এক গলিতে মটরসাইকেলের সাথে আচমকা সংঘর্ষে থর্নস হাতে বেশ গুরুতর আঘাত পান। যদিও একজন ভদ্র মহিলা এগিয়ে এসে তার হাতে অয়েন্টমেন্ট লাগাতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন তার হাতটি আসলে ভেঙ্গে গেছে। এমনকি আজও তিনি তার এই হাতটি ঠিকমত নাড়াতে পারেন না। ঐ বছরের বাকী দিনগুলো থর্নস বেশিরভাগ সময় সমুদ্র সৈকতে বিশ্রাম করে কাটান। কিন্তু এটি ছিল আসলে এক প্রকার সাময়িক বিরতিপর্ব। তিনি এই বিরল পাখিটি সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন ১৯৩০ এর শুরুর দিকে যখন তিনি ছিলেন চল্লিশোর্ধ। তিনি এক যুগেরও বেশি গাড়ী চালকের কাজ করেছেন; তবে বেশিরভাগই স্থানীয় হাসপাতালের হয়ে। কিন্তু এ থেকে তিনি পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারেননি। এই অভিযাত্রার অর্থায়নের ব্যবস্থা করার জন্য আসলে একটাই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কিন্তু সেখানে তাঁকে পূর্বের ঋণ পরিশোধ আর অন্যদিকে ভবিষ্যত অভিযানের জন্য অর্থ জমানোর কাজটাও এক সাথেই করতে হচ্ছিল। তিনি জানান অনেক আগে তাঁর একজন মেয়ে বান্ধবী ছিল, এখন নেই। যদিও কয়েক বছর ধরেই তিনি একজন অজ্ঞাতনামা সাহয্যকারীর কাছ থেকে অর্থ সহায়তা পাচ্ছিলেন। তাঁর হিসেব অনুযায়ী এই নিস্ফল অভিযানে এই পর্যন্ত তিনি প্রায় ১২,০০০ পাউন্ড যা বর্তমানে ১৫,০০০ ডলারের সমমানের অর্থ ব্যয় করেছেন। তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে, এটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু এর একটা গুরুত্ব ছিল। আর তা হলো যদি তিনি এই প্রজাতিটি খুঁজে পান তবে তা ইতিহাসকে পাল্টে দিবে। শুধু তাঁকে এখন কৌশলটা পাল্টাতে হবে। তিনি লুকিয়ে খোঁজা বন্ধের একং কর্তৃপক্ষকে অসুবিধায় না ফেলার একটা সমাধান বের করলেন ।

BANCA এর সাহায্যে থর্নস গাইড এবং ভ্রমণ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করলেন যাতে তিনি তাদের সহায়তায় এই হাঁসটির সকল সম্ভাব্য এবং গুরুত্বপূর্ণ দূরবর্তী হটস্পটগুলোতে প্রবেশের অনুমতিপত্র ব্যবস্থা করতে পারেন। ২০১৬ সালের প্রায় সকল অভিযানের পর তিনি অনুভব করলেন যে, তিনি তাঁর লক্ষ্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। ফিল্ডের শেষ দিনটিতে তিনি একটা গ্রামে পৌঁছান যেখানে তিনি ২০১০ সালেও এসেছিলেন। সেখানকার এক ক্যাফেতে বসে তিনি এবং তাঁর গাইড স্থানীয় অধিবাসীদের পাখির বই দেখাছিলেন। এমন সময় একজন লোক আসলেন এবং তিনি গোলাপিমাথা-হাঁসের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন যে, এটি অনেক বিরল পাখি। থর্নস তাঁর গাইড লে উইন এর সাহায্যে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ”তুমি কি কখনো দেখছো?” লোকটি বলল, ”না”। থর্নস রহস্যভেদের চেষ্টায় আবার জানতে চাইলেন, ”অন্য কোথায় কি দেখছো?” লোকটি এবার বলল যে, সে অন্য জায়গায়  দেখেছে। তা প্রায় ৫/৬ বছর আগে- জলাভূমির দিকে। থর্নস জানাল, ”আমি ২০১০-এ সেখানে ছিলাম। আমি তখন সম্ভবত গ্রামের ভুল ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। লোকটি বলেছিল যে, পাখিটি খুব বিরল এবং খুবই লাজুক প্রকৃতির। তুমি শুধু জলাভূমির কিছু অংশে একে খুঁজে পেতে পার। ঐ রাতে থর্নস এবং তার গাইড জলের ধারে বসে বিয়ার পান করছিল। থর্নস তখন তার  ”বেশ সর্তক” গাইডের কাছে ঐ লোকাটর দেয়া তথ্যের উপর মতামত জানতে চাইলো। গাইড জানাল, ’’হ্যাঁ, আমি মনে করি লোকটি দেখেছে।’’

সংরক্ষিত  গোলাপিমাথা-হাঁসসংরক্ষিত গোলাপিমাথা-হাঁস

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে BANCA এর সাথে আলোচনার পর থনর্স এখন বিশ্বাস করেন যে, হাঁসটি হয়তো র্বষা মৌসুমে অন্য কোথাও মাইগ্রেশনের আগে ঐ জলাভূমিতে আসে, হয়তো উপত্যকার কোথাও; যেখানে বছরের ঐ সময়ে কোন বহিরাগতের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, ”যারা পাখিটি সম্পর্কে রির্পোট করেছেন তাঁরা কেউই পাখি পর্যবেক্ষক বা পর্যটক নন। তারা কেউ কেউ শিকারী/ ভ্রমণবিলাসী/ কৃষক, যাদের বর্ষা মৌসুমে জলাভূমিতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।”

এখন থনর্সের পরিকল্পনা এই যে, তিনি শরৎ-এর শুরুতে মায়ানমার আসবেন এবং অক্টোবরের শুরুতে অনুসন্ধান শুরু করবেন যখন দেশটিতে ভ্রমণ হবে ”ওয়াশিং মেশিনের” ভিতর ভ্রমণের স্বরূপ। তাই তিনি অর্থ সহায়তা পাবার বিষয়ে ”গ্লোবাল ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড”-এর সাথে আলোচনা করছেন। কিন্তু তাঁর দলের সদস্যরা অবশ্য চেষ্টা করছেন নিজেরাই কিছু ব্যবস্থা করার। এবার থর্নস-এর ইচ্ছা একটি হাতি ভাড়া করার যার সাহায্যে তিনি হাঁস তাড়ানোর কাজ করবেন। যাতে গোলাপিমাথা-খুঁজে পাবার সম্ভবনা বেড়ে যায়। থনর্স ও তাঁর সংঙ্গীরা- প্রকৃতিবিদ এবং লেখক ইরল ফুলার, আলোকচিত্রী জন হজেস এবং হজেস-এর সঙ্গী পিলার ব্যুনো পরবর্তী অভিযানে যদি হাঁসটি দেখতে পান, তবে অবশ্যই এর সঠিক অবস্থান গোপন রাখতে হবে। থর্নস বলেন “আমি বেশ জোর দিয়ে বলতে পারবোনা কিভাবে একটি গোলাপিমাথা-খুঁজে পাওয়া যাবে, তবে আপনাকে খুব সর্তক থাকতে হবে”।

গোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে মায়ানমারে গোলাপিমাথা-হাঁসের খোঁজে মায়ানমারে

প্রকৃতপক্ষে থর্নস যেখানে অনুসন্ধান চালাবেন সেই একই স্থানে ইতিমধ্যেই একজন ইউরোপীয়ান পাখি পর্যবেক্ষক হাঁসটিকে দেখেছেন। যখন থর্নস প্রথমবারের মতো সেই এলকা পরিদর্শনে গিয়েছেন তখন তাঁকে বলা হয় যে, গত ৫ বছর ধরে প্রতি বছরই একজন ডাচ ভদ্রলোক হাঁসটি খুঁজতে আসেন এবং একটি হাতি ভাড়া করেন। ডাচ ভদ্রলোক যখন ৫ম বারের মতো এলেন তখন তিনি জলাভূমি থেকে ফিরে এসে স্থানীয়দের জানান যে, তিনি বিজয়ী। কারণ তিনি পাখিটিকে দেখেছেন কিন্তু ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।

গোলাপিমাথা-হাঁসের ছবি ১৮৮০গোলাপিমাথা-হাঁসের ছবি ১৮৮০

থর্নস হাঁস অন্বেষণ সম্পর্কে বলেন, ”তুমি নিজেই জানোনা তুমি কিভাবে কাজ করবে। আমার মনে আছে একবার আমাকে পরিত্যক্ত আবর্জনার স্তুপ থেকে একটি ওপাল পাথর খুঁজতে হয়েছিল। সব কিছুরই শেষ আছে- আমি শুধু ওপাল পাথর খুঁজতেই যাইনি, বরং চেয়েছিলাম আমার পকেটে একটি ওপাল পাথর থাকুক। এমন কিছু ঘটতেই পরে। শুধু এটা জানতে পারা বেশ কঠিন যে তুমি কিভাবে সাড়া দেবে।”

যদি সবকিছুই ব্যর্থ হয় তবে হয়তো একই চিত্র দেখা যাবে। প্রায় একযুগ হয়ে গেল কেউই সুনির্দিষ্টভাবে হাঁসটিকে দেখতে পায়নি। পরিশেষে যদি থর্নস বিরল এই হাঁসটিকে সনাক্ত করে ছবি তুলে পুনরায় আবিষ্কার করতে পারেন; তবে শুরু হবে বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়- প্রকৃতি থেকে কিছুই হারিয়ে যাবার নয়।

রিচার্ড থর্নসের ভাষায়- ”যদি কেউ গোলাপিমাথা-হাঁস খুঁজে পায়, তবে সে আমিই হতে চাই।”