হারানো অভয়ারণ্যে মদনটাক বিল ভাতিয়া। নামটা প্রথম দেখি ইন্টারনেটে, বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলির তালিকা দেখতে যেয়ে। দেখি অভয়ারণ্যটি খোদ আমার বাড়ি চাঁপাই নবাবগঞ্জের মধ্যেই পড়েছে। যদিও আব্বার চাকরির সূত্র ধরে বেড়ে ওঠা চাঁপাইয়ের বাইরেই, কিন্তু কখনওই ওই জায়গার কথা কারও মুখে শোনা হয়নি। বাড়ি এসে অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু কেউই ওই জায়গা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। ইন্টারনেটেও শুধু জায়গাটার নাম ব্যতিত আর কোন রেকর্ড কিংবা কেন এটাকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য করা হলো সে ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করা নেই। তাই নিজের ভেতরেই সেই জায়গায় যাবার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল শুধুমাত্র কি আছে সেখানে তা দেখবার জন্যে। এমনিতে আমার এক আত্মীয়ের কাছে শুনেছিলাম বিল ভাতিয়া স্বাদু পানির মাছের জন্যে মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে অনেক বিখ্যাত। মাছের মৌসুমে শৈর, গজার, কৈ, সিং, ভাদা, পুটি, টাকি, মাগুর, খলিসা গুচিসহ আরও হরেক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। শীতকালে মেলে বাহারি পাখির সমাহার, শুকনো মৌসুমে হয় ধানের আবাদ।

বিল ভাতিয়াবিল ভাতিয়া

বর্ষা মৌসুমে বিল ভাতিয়ায় জলার পরিমাণ প্রায় ১৫হাজার বিঘা। বিল ভাতিয়ায় ২০১৫সালে বর্ষাকালে ঈদের ছুটিতে একবার সেখানে গিয়েছিলাম কিছু বন্ধুদের নিয়ে। সেবার সেখানের বিশাল জলাভুমিতে মাছধরা নৌকায় করে গিয়ে লালচে বক, কালিম, গো-বক, পানকৌড়ি, শ্যামখোল, মাছরাঙাসহ বেশ কিছু পাখি চোখে পড়েছিল। রাস্তা ভাঙ্গা ছিল বলে এরপর যাবো যাবো করে আর যাওয়াই হচ্ছিলো না। এবার কিছুদিন আগে শুনলাম সেখানের রাস্তা নাকি নতুন করে ঠিক হয়েছে। বিল ভাতিয়া চাঁপাই শহর থেকে মোটামুটি ৪৪কিলোমিটার দূরে। যেতে হয় সেমি নামের এক বাসে অথবা মহানন্দা ব্রিজ পার হয়ে মাহিন্দ্রতে করেও যাওয়া যায়। যেকোন পাবলিক ট্রান্সপোর্টেই আনুমানিক পৌনে দুই ঘন্টা থেকে দুই ঘন্টা লাগেই, সাঁপের মতোন আঁকাবাকা রাস্তা।

বিল ভাতিয়াবিল ভাতিয়া

বিল ভাতিয়া অভয়ারণ্যের জিপিএস লোকেশনটা গুগুল ম্যাপে দেয়া আছে, এবার যাবার সময়ে ম্যাপ ধরে ধরে একেবারে এক্স্যাক্ট জায়গায় নামার জন্যে ম্যাপে লোকেশন দেখে দেখে একেবারে জায়গামতো নেমেছিলাম। গিয়ে দেখি যেখানে আগে বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখেছিলাম তাইই এখন বিস্তীর্ণ আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। আশেপাশে চাষবাস চলছে। এবার সাথে বাইনোকুলার ছিল, রাস্তাটা আবাদি জমি থেকেও বেশ উঁচু। তাই চোখে লাগিয়ে রাস্তা থেকেই দূরদূরান্তে পাখির তালাস করছিলাম।

বিল ভাতিয়াবিল ভাতিয়া

চোখে কেবল ভুবনচিল আর লম্বা-পাঁ তিষাবাজ চোখে পড়ছিল, কিন্তু হঠাৎই এক পাখির দিকে চোখ আঁটকে গেল। প্রথমে মনে হয়েছিল হয় শ্যামখোল কিংবা কোন এক জাতের মানিকজোড়। দূরবীনে চোখ আঁটকে রাখলাম, ভাল করে দেখতে লাগলাম। ভাল করে দুই তিন মিনিট দেখাতে বুঝতে পারলাম যে সেটার মাথা থেকে শরীরের দুরত্বটা মানিকজোড়দের মতো না, অর্থাৎ ঘাড় লম্বা না। মাথাটা শরীরের সাথে লেগে আছে, আগেও মদনটাকের উড়ন্ত ছবি ইন্টারনেটে দেখেছি তাই বুঝতে পারি যে এটা মদনটাক। যখন এটাকে দেখলাম এটা ছিল অনেক ওপরে। ছবি তুলেছিলাম, ছবি দেখে শুধু এটাযে মদনটাক সেটা বোঝা যাচ্ছিল। উড়তে উড়তে দূর প্রান্তে সেটা হারিয়ে গেল। খালি হাতে কেবল রেকর্ড শট নিয়ে ফিরতে মন চাচ্ছিলো না। বসে ছিলাম ঘন্টা দেড়েক।

মদনটাকমদনটাক

কিন্তু আর কিছু না দেখতে পেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে ফিরেই আসছিলাম, দূরে হঠাৎ কি যেন নামতে দেখে ব্যাগ থেকে তৎক্ষণাৎ দুরবিন চোখে নিয়ে দেখতে পাই একটা মদনটাক দূরে এক আবাদী ভূমিতে নামছে। এদৃশ্য দেখে আমাকে আর পায় কে? কাছে গেলাম অনেক পাঁ টিপে টিপে, বড় পাখি, এরকম নির্জন জায়গায় তার বিপদের কমতি নেই। একটু বিপদ মনে করলেই ফুড়ুৎ। কাছে গিয়ে অনেক গুলি ছবি তুললাম, সে ভালই সুযোগ দিচ্ছিলো, কিন্তু অন্যপাশে রাখাল অনেকগুলি গরু চরাচ্ছিল। গরুর পাল তার বেশী কাছাকাছি চলে আসায় বিপদ মনে করে পাখিটি উড়ে যায়। আবার হয়তো নিচেই নামতো, অন্তত ভাব দেখে তাইই মনে হচ্ছিলো। কিন্তু সেই সময়ে এক চিল তাকে তাড়া করায় বিশাল ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে আবার দূর আকাশে সেটি বিলীন হয়ে যায়। আর আমিও আবার ব্যাগ গুছিয়ে মাহিন্দ্র ধরে চাঁপাই ফিরে আসি।

বিল ভাতিয়াবিল ভাতিয়া

পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সালেহ রেজা স্যারের মাধ্যমে জানতে পারি ১৯৮০ সালের দশকে চাঁপাইয়ের এদিকটাতে মদনটাক দেখতে পাওয়া যেত। এরকম একটা হারানো অভয়ারণ্যে এরকম একটা দুর্লভ পাখির সাক্ষাৎ তাই আমার কাছে সবসময়ই রোমাঞ্চকর, এবং এইজন্যেই নিত্য নতুন হারিয়ে যাওয়া কিংবা নতুন পাখির অনুসন্ধান আমাকে পাখি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে সর্বদাইই অনুপ্রাণিত করে।