প্ল্যানটা অনেকদিনেরই। পটুয়াখালীর লেবুখালি ফেরি এর ডান পাশে বিস্তীর্ন বিঘাই নদীর চরটাকে পাখি দেখার জন্য আকর্ষনীয় স্থান মনে হচ্ছিল। কুয়াকাটা থেকে ফেরার পথে কয়েকটা কাল মাথা কাস্তেচরা পাখিকে দেখলাম ওইদিকে উড়ে যেতে। আমি আর শাকিল তখনি ভেবে রাখলাম যে ওখানে একটা ঢু মারতে হবে। কিন্তু হয়ে উঠছিল না। হঠাৎ করেই ২০১৪ সালের ১লা মে একটা সুযোগ এল।

‘বিশ্ব মে দিবস’- সরকারি ছুটি ধরে সকাল সকালই আমাদের সবসময়ের পাখি দেখার স্থান বরিশালের রুইয়া তে হাঁটছিলাম আমরা দুজন। আচমকাই মনে হল বন্ধের দিনেই কেন ঘুরে আসি না লেবুখালি থেকে। বাসস্টপে পৌঁছেই আবিষ্কার করলাম মে দিবস উপলক্ষ্যে সকল যানবাহন বন্ধ। কিন্তু অনেকদিনের প্ল্যান কে বাস্তবায়ন করতে আমরাও নাছোড়বান্দা। মটর সাইকেল,অটো রিক্সা নিয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পৌঁছালাম লেবুখালি। ভাটার সময় পৌঁছে হাঁটু কাদা ভেঙে নদীর পাড় ধরে হাটতে থাকলাম।

চটকচটক

চরটা লোকালয়ের বেশ কাছে তবুও অনেকটা জনবিরল। মে মাস হলেও কয়েকটা পরিযাজী পাখি যেমন পাতি সবুজপা, পাতি বাটান, সোনা বাটান দেখে কিছুটা অবাক হলাম। ভাবলাম হয়ত শীতশেষে পরিযাজন এখনো ওদের শুরু হয়নি। বিশাল চরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় ফেরিঘাটের কর্মমুখী মানুষের আনাগোনা দিগন্তে হারিয়ে গেল। আমরা যেন পাখি দেখার নেশায় এগিয়েই চলছি। জুলফি পানচিল, কালমাথা কাস্তেচরা, বহুরূপি শিকড়ে ঈগল, রাঙা চ্যাগা, ভোমরা ছোটন সব গুলো পাখিই চরটির প্রাকৃতিক সুস্থ পরিবেশের কথা জানান দিচ্ছিল। হঠাত করেই চড়ুই সদৃশ ছোট্ট একটা পাখি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করল। খুব নিচু দিয়ে দ্রুত গতিতে উড়ে বেড়ানো পাখিটাকে ভালভাবে দেখারই সুযোগ পাচ্ছিলাম না। অনেক কষ্টে কয়েকটা ছবি তোলার পর শাকিল একে চিনতে পারল চটক পরিবারের বিরল পাখি লালকান চটক (Chestnut eared bunting) হিসেবে। স্বভাবতই আমরা বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলাম নতুন পাখি দেখার খুশিতে। ভালভাবে পর্যবেক্ষন করে দেখলাম অন্তত ৩০টি পাখি বিচরণ করছে চরটিতে। পাখিগুলো চরে জন্মানো ঘাস এর বীজ খাওয়ার জন্য বারবার মাটিতে নামছে আর সাথে সাথেই বড় ঘাসের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। কখনো বিশ্রাম নেয়ার জন্য বহুদূরে গাছের ডালে গিয়ে বসছে। মোট কথা ভাল ছবি তোলার কোন সুযোগই দিচ্ছে না।

সময় বাড়ার সাথে নদীতে জোয়ার এল। তখন পর্যন্ত জোয়ারটাকে আশীর্বাদ ই মনে হল। পানি বাড়ার সাথে সাথে চরের বেশীরভাগ অংশ প্লাবিত হয়ে গেল আর পাখিগুলো চলে এল একটু শক্ত মাটির দিকে। ধানক্ষেতের পাশে জন্মানো বড় ঘাসের আশে পাশে লুকানোর জায়গাগুলোকে লক্ষ্য রেখে ভাল ছবির আশায় আমরা কড়া রোদে আর প্রচন্ড গরমে শুয়ে থেকে চরম ধৈর্যের পরীক্ষা দিলাম। পুরুষ পাখিগুলোকে চিনতে পারলাম তাদের গলায় বাহারী রঙিন দাগ দেখে। মেয়ে পাখির তুলনায় ওদের মনে হল বেশ সচেতন। ছবি তোলার ব্যাপারে খুব উৎসাহী নয়। আমাদের উপর দয়াপরবশ হয়েই কিনা জানিনা, একটা মেয়ে চটক আমার বেশ কাছে কাটা ধান গাছের গোড়ার উপর বসে খানিকক্ষন পোজ দিল। শাটারের ক্রমাগত শব্দ তখন বুকের মাঝে উত্তেজনার ধুকধুক শব্দকে ম্লান করে দিল। বিকেলের আলোতে বেশ কয়েকটা ভাল ছবি পেলাম।

চটকচটক

এবার ফেরার পালা। কিন্তু হায়! প্লাবিত চর পানিতে টইটুম্বুর - চর ধরে হেঁটে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই। ক্ষুধা-তৃষ্ণাতে দূর্বল হয়ে পরা আমাদের দুজনেরই প্রায় ৩/৪ কিলোমিটার বেশি ঘুরে গ্রাম ধরে এগোতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত আমরা দুজন একটা মাটির গ্রাম্য মসজিদ এর সিড়িতে বসে পড়লাম। গ্রামের এক লোক আমাদের সব কথা শুনে বাড়ি থেকে পানি আর তরমুজ এনে খাওয়াল। বিরল পাখি দেখার সাথে সাথে সাধারণ মানুষের আতিথিয়তা আমাদের মুগ্ধ করল।

পাখি দেখার শখটা সত্যি ই মনোমুগ্ধকর। আর পাখি দেখার সাথে সাথে যে অভিজ্ঞতার ঝুলি সঞ্চিত হয় তা আরো অনেক রোমাঞ্চকর। জীবনে চলার পথে এই পাখিগুলো হয়ত আবারো দেখব কিন্তু প্রত্যেকবারের অভিজ্ঞতা গুলো হয়ে থাকবে রঙিন মলাটের স্মৃতির বইয়ের এক একটা অধ্যায়। ভাল থাকুক পাখিরা, বেড়ে চলুক জীবন স্মৃতি বইয়ের অধ্যায়।