শীতের পরিযায়ী পাখিরা সাধারণত ফেব্রুয়ারী/মার্চের দিকে ফিরতি পরিযায়ন করে। অনেক পাখিই দলবদ্ধ ভাবে যেমনি আসে তেমনি ফেরার সময়ও দলবদ্ধ হয়ে ফিরে যায়। এতে সুবিধে হচ্ছে দলবদ্ধ গ্রুপে শত্রু আক্রমণ কম হয়, দলের কেউ শত্রুর উপস্থিতি টের পেলে অন্যদের সতর্ক করে ইত্যাদি। সিলেট বিভাগের টাঙ্গুয়ার হাওড় পরিযায়ী পাখিদের অভয়াশ্রম হিসেবে দীর্ঘ পরিচিতি লাভ করেছে। সে জন্য শীতের পরিযায়ী পাখিরা খাবার ও বাসস্থানের প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে থাকা অঞ্চল থেকে একত্রিত হতে থাকে, আর এই সময়টিতে হাওরের পানিও শুকাতে থাকে, ফলে পাখিদের অনেকটাই ক্যামেরা ল্যান্সের নাগালের মধ্যে পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে হাঁস এবং জিরিয়া প্রজাতির পাখী। তাই এই সহজ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি, তাছাড়া সামনেই বাবাকের বার্ষিক আলোকচিত্র প্রদর্শনী আছে। ভালো কিছু ছবি তোলার প্রত্যাশা নিয়ে ২৪-শে ফেব্রুয়ারী রাতের বাসে রওনা করি টাঙ্গুয়ার উদ্দেশ্য সঙ্গী মানিক ভাই। পরদিন ভোরে পৌঁছলাম সুনামগঞ্জ শহর, ঐখান থেকে সিএনজি করে তাহিরপুর বাজার। তাহিরপুর থেকে প্রয়োজনীয় রসদ কিনে পূর্বেই অপেক্ষমাণ শামিম ভাইয়ের বোটে করে রওনা করলাম।

পাখিদের অভয়াশ্রমপাখিদের অভয়াশ্রম

Golden Fronted LeafbirdGolden Fronted Leafbird

পথিমধ্যে গাংদিবা বিলের উপর দিয়ে কালালেজ জোরালির আকাশ কালো করা ঝাঁক দেখলাম, কম করে হলেও পাঁচহাজার হবে। উত্তরে টিটির ১৯ টি এসে বিলে বসলো। ছবি পাওয়া যেতে পারে ভেবে নেমে, বিল ঘুরে তিলা লালপা, গেওলা বাটান, কয়েক প্রজাতির হাঁস, খয়রা কাস্তেচরার প্রায় দুইশত দশটির মতো গুণতে পেরেছি। বিলের বিপরীত দিকে নদীপাড়ের মাঝারি সাইজের করচ গাছে পালাসি কুরাঈগলের বাসা। পাশেই ঈগল যুগল বসে আছে। দিন বিশেক আগেও এদের রিঙ্গিং ক্যাম্পে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম একটিকে বাসায় বসা অবস্থায়। সকালটা বেশ ভালোই কাটলো। সামনে এগুতে থাকলাম, ঘন্টা দেড়েক পর পৌঁছালাম গোলাবাড়ি। হাওড় বিলাস নামক বিশ্রামাগারে উঠে দুপুরের খাবার খাই। রামসার সাইটে অর্থাৎ বৈশ্বিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত অঞ্চল টাংগুয়ার হাওড়ের মূল সাইটে ইঞ্জিন বোটে নিষেধাজ্ঞা থাকায় দুলাল চাচার ধাড়বাওয়া নৌকা করে ভেতরে প্রবেশ করি। হাতিরগাতা বিল পর্যন্ত গেলাম প্রচুর হাঁস আছে কিন্তু আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের কারনে হাওরের পানি গতো দুইদিনে দশ থেকে পনের হাত বেড়ে বাঁধ ডুবে উপচিয়ে পড়ছে। ফলে পাখীরাও ছড়িয়ে পড়েছে, ছবি তুলবো কি বাইনোকুলার দিয়েও নাগাল পাচ্ছিনা। আর পানিও হু-হু করে বাড়ছেই। বুঝলাম এবার আর ছবি তোলা যাবেনা, ফিরতি পথ ধরতে হবে।

Northern LapwingNorthern Lapwing

Indian Spotbilled DuckIndian Spotbilled Duck

রাত্রটা কোন রকম থেকে, পরদিন ভোরে রওনা করি পথিমধ্যে যদি কিছু পাই সেই আশায় গতকালের বিলে, মানে গাংদিবার বিলে গেলেম। খয়রা কাস্তেচরা, কালালেজ জোরালি ও দেশে মেটে হাঁস পেলেম, তেমন কিছু নেই তাই দ্রুত ফিরলাম ঈগল জোড়ার বাসার কাছে যদি একটা ভালো ছবি পাই!! বাসার কাছে আসতেই একটি সম্ভবত পরুষ ঈগলটি বারবার চিৎকার করে করে আমাদের দিকে তেড়ে আসছে আর অন্যটা বাসার কাছের পাশের ডালে মন খারাপ মতো করে বসে আছে। ভালো ফটোর আশায় আমরা কাছে আসতে আসতে অনেক কাছে চলে আসলেও তার বিকার নেই! আমাদের দিকে বার কয়েক তাকিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে নেয় কিন্তু উড়ছেনা।

ঈগলঈগল

বাম পায়ে বাঁধা রশির ছেঁড়া অংশবাম পায়ে বাঁধা রশির ছেঁড়া অংশ

ঈগল ছানার মৃত দেহঈগল ছানার মৃত দেহ

ঘটনা কি বুঝার জন্য আশ-পাশ খুঁজে নিচে একটি ঈগল ছানার মৃত দেহ দেখতে পাই। ডানার পালক কয়েকটা ছিঁড়া, এদিক সেদিক পড়ে আছে, আর বাম পায়ে বাঁধা রশির ছেঁড়া অংশ। তেমন দুর্গন্ধ নেই, মনে হচ্ছে দু’একদিন আগে মারা গেছে বলা ভালো মেরে ফেলেছে। পায়ে রশি বাঁধা দেখে বুঝতে মোটেই অসুবিধে হয়নি একে হত্যা করা হয়েছে। হয়তো কৌতুহুলী কোন কিশোরের দলের খেলার দুরন্তপনায় প্রান গেছে ঈগল ছানার। মনটা প্রচণ্ড রকমের খারাপ হয়ে রইলো। অতি বিরল পালাসি-কুরাঈগল যেটা কিনা বৈশ্বিক ভাবে Vulnerable  আর বাংলাদেশের জন্য Critically Endangered হিসেবে বিবেচিত। সেটাও রেহাই পেলনা অথবা করা গেলনা। পালাসি কুরা ঈগল আশির দশকেও এদেশে স্থায়ী পাখির তালিকায় ছিলো এখন শুধু মাত্র শীত মৌসুমে হাওড় ও অগভীর জলাশয়ের যখন পানি কমে আসে,এতে তাদের মাছ শিকারে সুবিধে হয় তখন এরা আশ-পাশে উঁচু গাছে বাসা বাঁধে। বাচ্চা দেয় এবং বড় হয়ে উড়তে শিখলে বাচ্চা সমত হিমালয়ের উত্তরে উরাল দেয়। আবার পরবর্তী শীত মৌসুমে ফিরবে। কিন্তু এই ঈগল জোড়ার বাচ্চা বিয়োগের দুঃখস্মৃতি ভুলে আবার ফিরে আসে কিনা! কে জানে ?? আমার মনে হয় উঁচু গাছের অভাবে এরা এবার তুলনামূলক মাঝারি গাছে বাসা বাঁধার ফলে দুষ্ট লোকের সহজে দৃষ্টিগচর হয় যার ফলশ্রুতিতে নিষ্ঠুর ভাবে প্রান গেলো ঈগল ছানার। ঢাকা থেকে এতো দূর এসে আকস্মিক বন্যার ফলে টাঙ্গুয়ায় তেমন ছবি পাইনি, তার উপর ঈগল ছানার মৃত্যু মনটাকে আরো খারাপ করে দিলো। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যাওয়ার পথে সাতছরি জাতীয় উদ্যান হয়ে যাবো।

vernal Hanging Parrotvernal Hanging Parrot

ঢাকার বাসে উঠলেও শায়েস্থাগঞ্জ এসে নেমে গেলাম। রাতে হোটেলে অবস্থান করে পরদিন খুব ভোরে সিএনজি করে সাতছরি। কোন ট্রেলে না গিয়ে সোজা ওয়াচ টাওয়ার এ উঠলাম। কারণ গত কয়েক সপ্তাহ ফেইসবুক জুড়ে ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন মান্দার গাছের ফুল সমেত পাখিদের দর্শনীয় আলোকচিত্রে ভরে গেছে। আমরা বাদ যাবো কেনো? তবে মৌসুম শেষের দিকে তাই মান্দার গাছে ফুল শেষ পর্যায়ে তাই পাখিদের আনাগোনা অনেক কমে গেছে। তারপরেও আমরা বাসন্তী লটকনটিয়া, খয়রালেজ কাঠশালিক, সোনাকপালি হারবোলা, ফুলমাথা টিয়া, উদয়ি ধলাচোখ, কালাঝুটি বুলবুলের ছবি পেয়েছি। আর অনন্যা গাছে এক ঝাঁক পাহাড়ি ময়না, এক জোড়া উদয়ি পাকরা ধনেশ, বড় রেকেট ফিঙ্গে, সিধুরে সাহেলি সহ বেশ কয়েক জাতের পাখি দেখি। দুপুরের পর সাতছরি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করি। তবে শ্রমিক ধর্মঘট থাকায় বেশ বেগ পেতে হয়।