সতর্কীকরণ— গোমাংসে যাদের অ্যালার্জি আছে তারা এবং নিরামিষভোজীরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।

সে অনেক অনেক দিন আগের কথা, জ্ঞানকোষ নামে এক বই আনা হয়েছিল বাড়ীতে , ভবেশ রায়ের সম্পাদনায় বিশ্বের নানা দেশ ও জাতির বিবিধ বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ কিন্তু মজার আলোচনা, এক জায়গায় প্রশ্ন ছিল বিশ্বের কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশী গরুর মাংস খেয়ে থাকে?

উত্তর – আর্জেন্টিনা।

কোন আর্জেন্টিনা? আরেহ- দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। যাক, একটা নতুন তথ্য জানা গেল, এর বাহিরে বিশেষ কিছু ছিল না সেই বইতে। এর অনেক পরে সেবা প্রকাশনীর আন্দেজের বন্দী পড়ার সময় আর্জেন্টিনার গরুর মাংসের সুখ্যাতির কথা আবার ফিরে আসে, যদিও সেখানে খুব ভাল ভাবে উল্ল্যেখ করা হয়েছিল যে উরুগুয়েতেই বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট গরুর মাংস উৎপাদন হত কিন্তু এখন সেই স্থান আর্জেন্টিনার দখলে।

ইউরোপের নানা মহানগরীর অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোতে দেখেছি আর্জেন্টিনার গরুর চাপ (STEAK) পাওয়া যায় এমন বিশাল সব বিজ্ঞাপন। বাহির থেকে দেখেই সুখী থাকতে হয়েছে, ঐ ধরনের রেস্তোরাঁয় ঢুকে সেধে সেধে তিনদিনের খরচ এক বেলায় করতে ইচ্ছে করে নি। কিন্তু একটু অবাকও হয়েছি ভেবে যে বিশ্বের দুই শতাধিক দেশের মাঝেই কেন আর্জেন্টিনার গরুর মাংসের সুনাম সবচেয়ে বেশী, কি এমন আছে সেই দূর দেশের গরুর রসাল মাংসের পরতে যা কিনা বাংলা গরুর চেয়েও সরেস? পুরান ঢাকার চিত্তচঞ্চলকারী সমস্ত কাবাবের চাইতেও কি ঐ গরুর মাংসে কামড় দেবার মজা বেশী?

ঠিক সেই প্রশ্নের উত্তর জানবার জন্য না, সেই সাথে আরও কিছু কারণে জীবননদীর এক বাঁকে আমরা উপস্থিত হলাম আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের শহরকেন্দ্রে, ডেল স্যুর হোস্টেল থেকে আমাদের তিনজনের ( ইয়াইয়াস, হুয়ান, অণু ) সাথে জুটেছে ব্রাজিলের ছেলে ম্যাতিয়াস। সে আবার দিন কতক হল মজে আছে বুয়েন্স আয়ের্সের টানে, চিনে ফেলেছে এলাকার রোদচশমাওয়ালী লাস্যময়ী এবং পানশালার অবস্থান সেই সাথে অবধারিত ভাবে চাপ খাওয়ার সেরা জায়গাগুলো।

রেস্তরাঁটি খুব দৃষ্টিনন্দনরেস্তরাঁটি খুব দৃষ্টিনন্দন

ক্ল্যাসিকক্ল্যাসিক

চিন্তা ভাবনা করে এক স্পেশাল রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল ছোকরা আমাদের, এবং জানিয়ে রাখল দামটা একটু বেশীই পড়বে, কিন্তু খাবার হবে সেরা! সেই সাথে পানীয় হিসেবে সাংরিয়া চেখে না দেখা নাকি মহাপাপ হবে! রেস্তরাঁটি খুব বেশী ধরনের দৃষ্টিনন্দন, একেবারে যাকে বলে ক্ল্যাসিক ( সেদিন কোন শিবঠাকুরের আপন আরব দেশে পড়লাম অতি সুদর্শন হবার কারণে তিন যুবককে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে যাতে তাদের যৌবনদীপ্ত মুখভঙ্গী তরুণীদের পাপকাজে প্রলুব্ধ না করে! ঐরকম পাগলা প্রশাসন থাকলে এই ধরনের রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিতে পুলিশ, জনগণকে নির্লজ্জ ভাবে বারবার প্রলুব্ধ করে ফিরিয়ে আনার জন্য!), প্রবেশদ্বারের পাশেই বিশাল ওভেন, তার সামনে বাবুর্চি সাহেব দাড়িয়ে মাংসের ফালি নাড়াচাড়া করছেন, অর্ডার পেলেই সে হিসেবে মাংসল একটা চাক্তি সেঁধিয়ে দিবেন ধিকি ধিকি আগুনে।

বাবুর্চি সাহেববাবুর্চি সাহেব

এই মাংসের ফালির মধ্যেই আছে যত রহস্য, তবে মূল রহস্য নিহিত আছে এই বদ্ধ হেঁশেলে না, পাম্পাসের আদিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমিতে। সেখানে যে বিশেষ ধরনের ঘাস হয়, সেগুলো খেয়েই না এই গরুগুলো হয়ে মোটাতাজা, লাল মাংসের ভাজে ভাজে আশ্রয় নেয় সাদা চর্বি, আবার আছে গবাদি পশুগুলোর চরে বেড়ানোর অভ্যাস। অনেক আগে ফ্রান্সের চীজ নিয়ে গল্প লিখেছিলাম এই পোস্টে, আর্জেন্টিনার গরুর মাংস উৎপাদনের ইতিহাস আর রকমফের শুনে সেই কথা মনে পড়ে গেল।

লাল মাংসলাল মাংস

পেটে তখন ছুঁচোর কেত্তন, ইম্বল আর বাতাবিকেও জলযোগ করে ঢেঁকুর তুলতে পারি আর এ তো নিরীহ গরু মাত্র। চেয়ার-টেবিলে জাকিয়ে বসেই অর্ডার দেওয়া হল- সেরা মাংসের চাপ নিয়ে আস, এক নম্বর, কোন ফাঁকিবাজি বরদাস্ত করা হবে না। আর হ্যাঁ, এক জগ সাংরিয়া। যদিও ম্যাতিয়াস আগে একাধিকবার চাপ খেয়ে যাওয়াই চাহিদা পেশ করল একটা টি-বোন স্টেকের।

প্রথমেই জগ ভর্তি মোহময়ী সাংরিয়া চলে আসল, তাতে বরফের কুচির সাথে সাথে ফলের টুকরো ভাসছে। দক্ষিণ গোলার্ধের আইঢাই গরমে দেখেও শান্তি পানীয়ের পাত্রে জমা বিন্দু বিন্দু জল। এসে গেল সসেজ আর আলুর দম জাতীয় এক মশলাহীন খাবার, সাথে আঁচার জাতীয় কিছু একটা। অতপর উহাদের একটির আগমন টের পাওয়া গেল দূ----র থেকে! ওরে বাবা, এযে বি--শা—ল !

 আগমন আগমন

এসে গেল টি-বোন স্টেক আর আমাদের চাপ। ছুরি কাঁটা দিয়ে ব্যবস্থা করে ছোট এক টুকরো যেই না মুখে দিয়েছি – আহ, ওহ! কি যে স্বর্গীয় প্রশান্তি সেই কচকচে শব্দের মাঝে যা কিনা উৎপন্ন হয়েছে উৎসাহের আতিশয্যে চোখ বন্ধ করে অতিশয় সুস্বাদু মাংসের চাবানোর ফলে, সেই সাথে আছে জিহবার টাকরার সাথে গালের সমন্বয়ে উৎপন্ন বিস্ময়বোধক শব্দ, কী যে অপূর্ব সেই চীজ! মনে হল জীবনে প্রথম বারের মত সত্যিকারের মাংস খেলাম! আসলে মাংস খেতে হলে এমনই খাওয়া উচিৎ!

 এযে বি--শা—ল ! এযে বি--শা—ল !

প্রথমেই বলে দিয়েছিলাম চাপ যে মিডিয়াম হয়, বেশী ভাজার দরকার নেই, আবার খাঁটি সাহেবদের মত কাঁচা কাঁচা রাখবার দরকার নেই যে মাংসে কামড় দিলে রক্ত বাহির হবে। কিন্তু মিডিয়াম আঁচে সামান্য মশলা দিয়ে নানা পক্রিয়ার মাঝে প্রস্তত হওয়া এক সামান্য মাংসের ফালি যে এত স্বর্গসুখ প্রদান করতে পারে তা যদি আগে জানতাম!

আরামের আবেশে চোখ মুদেই চাবিয়েই যাচ্ছি যেন অনন্ত কাল ধরে, মনে মনে আশা করছি তা যেন শেষ না হয়, ছুরি-কাঁটা-প্লেটের টুংটাং বোল চলছে সমান তালে, মাঝে একবার অন্যদের দিকে আর চোখে তাকিয়ে দেখি তাদেরও অবস্থা বিশেষ আলাদা কিছু নয়। সবাই মেতে আছে চাপের চাপায়। সেই মাংসের টুকরোর স্বাদের বর্ণনা দেওয়া খুব একটা কাজের কিছু না, বলতে পারি- খুব সুস্বাদু, বলতে পারি স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়, বলতে পারি রান্না গুণে একেবারে কচি নধর, মুখে দিতেই গলে যায় আরাম ছড়িয়ে, আঁশে আঁশে লুকিয়ে আছে মাদকতাময় তৃপ্তি, সেই সাথে আকণ্ঠ এক ইচ্ছার নাগপাশ ঘিরে ধরে আমাদের অস্তিত্বকে- খেয়েই যায়, খেয়েই যায়, এমনটা মনে হয়! কিন্তু তাতে কী কিছু বোঝা গেলে বিশ্বের সেরা মাংসের চাপের স্বাদ!

না, বোঝাতে পারলাম না।

কিন্তু এটুকু বলতে পারি, আর্জেন্টিনার গরুর চাপ কে যে বিশ্বের সেরা চাপ বলা হয়, তা বিন্দুমাত্র অতিশোয়াক্তি নয় ! সেই সাথে আছে ঝাঁঝালো সাংরিয়ার পরিমাপ করা চুমুক, সোনায় সোহাগা সব দিক দিয়েই। আর হ্যাঁ বিলের দিকে দিয়েও, এত উচ্চ মানের রেস্তোরাঁতেও খাদ্য, পানীয়, টিপস সহ প্রতিজনের বিল আসল ২০ ইউরোর মত, মানে জনপ্রতি ২০০০ টাকা, একটু কমদামী রেস্তরাঁতে গেলেই যা অর্ধেকে নেমে আসত।

এরপর তৃপ্ত মন-প্রাণ-দেহ-উদর নিয়ে কোনমতে পা টেনে টেনে চললাম খাওয়াজনিত ক্লান্তি ঘটিত দিবানিদ্রার উদ্দেশ্যে।