কিংবদন্তীর জাপানিজ চিত্রকর হকুসাই ও হিরোসিগের কাঠখোদাই করা অপূর্ব সব শিল্পকর্ম সেবার প্রথমবারের মত এসেছে জাপানের চৌহদ্দি পেরিয়ে ইউরোপে, হেলসিংকিতে সে চিত্তহরণ করা প্রদর্শনী দেখে বেরোতে যাচ্ছি জাদুঘরের বাইরে। সেখানেরই একজন কর্মচারী বলল পাশেই চলা প্রাচীন জাপানের জনজীবন নিয়ে অন্য ধরনের এক প্রদর্শনী যেন অবশ্যই দেখে যাই, সেখানে নাকি তুলে আনা হয়েছে কয়েকশ বছর আগের জাপান।

মঙ্গোলিয়ানরা চায়ের সাথে দুধ আর লবণ 'রান্না' করে পরিবেশন করে!মঙ্গোলিয়ানরা চায়ের সাথে দুধ আর লবণ 'রান্না' করে পরিবেশন করে!

 

বেশ চিত্তাকর্ষক ছিল প্রদর্শনীটি, জাপানী জীবনের নানা ঘটনায় ও বৈশিষ্ট্যে ভরপুর, তবে মনে বিশেষ ভাবে দাগ কেটে গেছিল তাদের চা-পানের বিষয়টি- সে যেন কেবল পানীয় গলাধকরণ নয়, বরং উপাসনার একটি অংশ। কিভাবে জাপানীরা চিত্ত শুদ্ধ করার জন্য বাগানের মাঝে অবস্থিত বিশেষ কুটিরে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ঢুঁকে, বিশেষ টুলের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে যেভাবে সন্মান ভরে চা-পান করেন তাকে উপাসনা বলাই শ্রেয়।

জাপানের মাচা চাজাপানের মাচা চা

এবং তা কেবল জাতি বিশেষের জন্য নয়, চীন থেকে আগত এই অদ্বিতীয় পানীয়, নানা ঘটনা-পরিক্রমা, ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রসার ইত্যাদির কারণে আজ ঠাই নিয়েছে সারা বিশ্বে, যে তুষারস্নাত ঊষর প্রান্তরে কোন শস্য হয় না, সেখানের অধিবাসীরাও আজ চায়ের জাদুতে বিমোহিত। সুদূর ল্যাতিন আমেরিকার দেশে চিলি যে কস্মিনকালেও চা উৎপন্ন হয় না সেখানের বাসিন্দাদের দুই বেলা এই চিজটি থাকতেই হবে! চা-য়ের সাথে সাথে থাকছে আড্ডার প্রসঙ্গ। বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই চা-পান শুধুই চা পান করা নয়, এর সাথেই আছে ইয়ারদোস্তদের সাথে মিঠেকড়া বাক্য বিনিময়ের ব্যাপারস্যাপার। মাস কয় আগেই বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় দেখলাম সেখানের লোকেরা সারাদিনই রোদে বসে হয় চা, না হয় কফি নিয়ে ব্যস্ত! জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল যে কোন সুযোগে কাজের ফাঁকে আড্ডায় বসার জন্য চা-কফির কোন বিকল্প নেই! অনেক সময়ই দেখা গেছে একই অফিসের বিগ বস এবং কর্মচারীরা একসাথে চা পানে ব্যস্ত।

আর্জেন্টাইনরা 'মেট' চা পরিবেশন করেআর্জেন্টাইনরা 'মেট' চা পরিবেশন করে

 

তুরস্কে ব্যাপারটি আরও চোস্ত, কোন অজুহাতের দরকার নেই, রাস্তায় দেখা হলেই প্রথম কথা হবে- চা হয়ে যাক ? তুর্কিদের দিনে অনেক অনেক কাপ চা খাওয়া হয়ে যায় এই ভাবেই, যে কারণে মনে হয় তারা ছোট মাপের কাচের পাত্র আবিস্কার করেছে দিনে অসংখ্য বার চা পানের জন্য। যে কোন তুর্কি ক্যাফেতে (চ্যাফে কেন নয় কেউ তা জানে না!) দেখা যাবে স্বচ্ছ হালকা লিকারের শত শত কাপ চা হারিয়ে যাচ্ছে খানিক পরপরই জনতার সাগরে, তার বিলের হিসাব কে যে রাখছে আর কেই বা দিচ্ছে সে বোঝা প্রায় অসম্ভব কোন বিদেশীর জন্য।

তুরস্কের চা! তুরস্কের চা!

 

আবার চায়ের জন্ম যে চীনদেশে তারই একাংশে, হিমালয়ের কোলে অধিষ্ঠিত তিব্বতে চা খাওয়া হয় ভিনগ্রহের পদ্ধতিতে, চিনি নয় বরং লবণ দিয়ে ! এখানেই শেষ নয়, ঘন সেই চায়ে মিশিয়ে দেওয়া হয় চমরী গরুর দুধ থেকে তৈরি মাখনে এত্ত বড় এক ডেলা যাতে লেপটে থাকে তিব্বতের কোন অজানার তাবুর ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ। প্রথম যখন সেই অদ্ভুতুড়ে পানীয় আস্বাদ করেছিলাম, তখন সেই ঘন ক্বাথকে চা-য়ের বদলে স্যূপ বলে করাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়েছিল। হিমালয়ের হিমকে এর মাধ্যমেই দূর করতে পেরেছিলাম অনেকক্ষণের জন্য।

'পু-ইর্থ' চা নামের এক ধরণের চা চীনারা খুব পছন্দ করে।'পু-ইর্থ' চা নামের এক ধরণের চা চীনারা খুব পছন্দ করে।

তিব্বতি গরুর দুধের মাখন, দুধ আর লবন দিয়ে হলদেটে এই চা হলো তিব্বতের বিখ্যাত চাতিব্বতি গরুর দুধের মাখন, দুধ আর লবন দিয়ে হলদেটে এই চা হলো তিব্বতের বিখ্যাত চা

আবার মধ্য ইউরোপে চা-বার বেশ জনপ্রিয়, এক দোকানেই মিলতে পারে কয়েক শত ধরনের চা! চা যে কেবল চা পাতা দিয়ে তৈরি হতে হবে এমন কোন কথা নেই চীনে, ফলে নানা ধরনের গাছের পাতা, লতা, ফুল সবকিছু দিয়েই তৈরি হয় জাত-বেজাতের চা এবং সেগুলো এখন ঠাই নিয়েছে দেশ ছাড়িয়ে নানা মহাদেশের বিপণন কেন্দ্রে। দানিয়ুব তীরের হাঙ্গেরির এক দোকানে প্রথমবারের মত জেসমিন ফুলের চা পানের কথা বেশ উজ্জল ভাবে মনে পড়ে, শুকিয়ে থাকা এক রত্তি গুড়ো কিসিমের একটা জিনিস যখন গরম জলের সংস্পর্শে আস্তে আস্তে পাপড়ি ছড়াতে ছড়াতে কাপের উপরিভাগে বিশাল এক পদ্মের মত ভেসে উঠল, মনে হয়েছিল- চা পানের সাথে সাথে পরিবেশনটাও কিমি. গুরুত্বপূর্ণ নয়।

রাশিয়ায় ব্ল্যাক টি খুব জনপ্রিয়রাশিয়ায় ব্ল্যাক টি খুব জনপ্রিয়

 

খোদ বিলেতবাসীদের বৈকালিক চা প্রীতির কথা বিশ্ব নন্দিত, এমনকি রাণী এলিজাবেথের জন্য স্পেশাল চা যে দার্জিলিং থেকে যায় একথা সকলেরই জানা, যদিও চায়ের দেশ আসামের চা পান করে রাণীর কৃপা কেন এদিকে পড়ে ভেবে বিস্ময়াভূত হয়েছিলাম বটে।

বৃটিশরা রং চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে চায়ের মধ্যে একটা ক্রিমি অবয়র তৈরি করে যা পান করতে সুস্বাদু আর দেখতেও সুন্দর।বৃটিশরা রং চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে চায়ের মধ্যে একটা ক্রিমি অবয়র তৈরি করে যা পান করতে সুস্বাদু আর দেখতেও সুন্দর।

তুরস্কের লোকেরা চায়ে দুধ মেশানোর কথা বললেই তোবা তোবা করে ওঠে, ঠিক যেমন আমরা বাংলা মুলুকের লোকেরা আঁতকে উঠি চায়ে লবণ মিশিয়ে দিলে! এভাবেই চা আজ পরিণীত বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়তে- যার পরিবেশনা, উপস্থাপনা এমনকি উপাদান পরিবর্তিত হয়েছে অঞ্চলভেদে কিন্তু আবেদন থেকেছে অটুট হয়ে। জয় চা!