এই নামে যদি নিউজিল্যান্ড কে পরিচয় না করিয়ে দিই তবে খাদ্য রসিকদের কাছে আজীবন অপরাধী হয়ে থাকতে হবে। ঘুম থেকে উঠে দেখি বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। অধিবাসীদের জন্য এখন সামারের শুরু , কিন্তু আমি কনকনে হাওয়ায় কেঁপে উঠলাম। বৃষ্টির জন্য বের হতে না পেরে রিসিপশনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখি এক তরুণী হোস্টেলের পুরো লণ্ড্রী গোছাচ্ছে, সাহায্য করতে চাইলে বলল, তোমার হাত ফ্রি থাকলে করতে পার।

ফিশ মার্কেটের পথেফিশ মার্কেটের পথে

আবহাওয়া আর নানা কিছু নিয়ে প্রশ্ন করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, নাশতা করবো কই বলো তো? --- এখনতো প্রায় দুপুর, কাছেই একটা ফিশ মার্কেট আছে; মাউরি এক ভদ্রমহিলা চালায়; ওইখানে খেয়ে আস, ভাল লাগবে।

রৌদ্রস্নাত ফিশ মার্কেটের সামনে।রৌদ্রস্নাত ফিশ মার্কেটের সামনে।

 

বৃষ্টি বন্ধ হতেই বের হলাম। বাইরে প্রকৃতি মনে হয় ক্লিন শেভ করেছে, সবকিছু চকচক করছে। ওয়াটারফ্রন্ট ধরে হাঁটছি আর ভাবছি, চারদিক এত সুন্দর, জীবনের শিকল না থাকলে এখানে মাছ ধরে আর সীগালদের খাইয়ে একজীবন সহজে পার করে দেয়া যায়। কিন্তু কিছুতেই মাথায় আসছে না, ফিশ মার্কেটে কি খাব, কাঁচা মাছ?

ফিশ মার্কেটের ভিতরেফিশ মার্কেটের ভিতরে

 

দূর থেকেই ফিশ মার্কেট দেখতে পেলাম Boby's Fish Market, ভিতরে ঢুকতেই দেখি কাঁচা, রান্না সবরকম ব্যবস্থাই আছে। বিশাল এক মেনু দেখে ক্লান্ত হয়ে গেলাম, শেষমেশ পরিচিত ফিশ এন্ড চিপস এর বাইরে যেতে পারলাম না। এককথায় সী ফুডিদের জন্য অমৃত সমান, বড় বড় মাছের টুকরো, মোটেই তৈলাক্ত না, সাথে অনেক চিপস (ফ্রেন্স ফ্রাই) নিউজপ্রিন্ট এর মত কাগজে মুড়ে দিয়ে সুন্দর এক হাসি দিয়ে বলল, নাও এবার ঝকঝকে রৌদে লেকপাড়ে বসে জীবন উপভোগ কর।

ফিশ এন্ড চিপসফিশ এন্ড চিপস

 

চারপাশে সীগালের উরাউরি আর সামনে টাটকা গরম সুস্বাদু মাছ, মন চনমনে হয়ে উঠাই স্বাভাবিক। সী ফুড যারা ভালবাসে তাদের জন্য স্বর্গ হচ্ছে নিউজিল্যান্ড। ফিশ এন্ড চিপস ছাড়া নিউজিল্যান্ড জীবন হতে পারেনা, তেমনি পানীয় এর মধ্যে L&P. লেমনের এক পানীয়। যেদিন প্রথম পাইয়ের সাথে পরিচয় হয় সেদিন টা অন্যরকম হয়ে গেল। Food can change your mood, যে বলেছিল সে নিশ্চিত পাই খেয়েই তা বলেছিল। পাইয়ের টুকরোতে প্রথম কামড় বসানোর সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম নিউজিল্যান্ডে যত পাই আছে সব খেয়ে ফেলব। পাতলা রুটির পাতের মধ্যে এত্তগুলা মাংস আর পনীর। পাইয়ের দোকানও মাশাল্লাহ, রাস্তায় রাস্তায় পাওয়া যায়। খেজুর, আপেল থেকে শুরু করে বিচিত্র সব পাই পাওয়া যায় আর বিচিত্র তাদের স্বাদ। তবে আমার কাছে মাংসের টাই সেরা।

সাজানো গোছানো লোভনীয় সব মাছসাজানো গোছানো লোভনীয় সব মাছ

 

মাছ আর পাই দুটোই এদের খুব প্রিয়। মাছের মত দেখতে চকলেট নিউজিল্যান্ডেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য, ফিশ চকোলেট --মার্শমেলো, চকলেট দিয়ে তৈরী, মাছের মত দেখতে কিন্তু মাছ না। এমনিতে নিউজিল্যান্ডের চকলেট গুলো আপনার টেস্টবাডকে চাংগা করে তুলবে। নিউজিল্যান্ড এ খাব আর দুধের কথা হবেনা তা তো হতে পারে না। গরুর দুধের স্বাদ গন্ধ আপনাকে তরতাজা রৌদ্রউজ্জ্বল এক সকালের অনুভুতি এনে দিবে। সুপার শপে দুধের আরেক রূপ পনির আর দই দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়। শুধু একটাই কথাই বলা যায়, তুই চিজ আসলেই চিজ। দইয়ের সাথে ফ্রুটস এর মিক্স বড় ছোট বিভিন্ন প্যাকে পাওয়া যায়, লাঞ্চ আর ডিনারের ডেজার্ট হিসেবে অতুলনীয়।

 মাংসের পাই মাংসের পাই

হকি পকি আর গামি আইসক্রিম এ দুটো অসাধারণ। ভ্যানিলা আর মধু মেশানো হকি পকি খেলে নিশ্চিতভাবে শুধু ভ্যানিলা ফ্লেভার আর কেউ খেতে চাইবে না।

 

ফিশ চকলেটফিশ চকলেট

একটা টিপিক্যাল নিউজিল্যান্ডীয় নাস্তা কেমন? দুধে ভেজানো weet bix (গমের চারকোণা টুকরো, কর্নফ্লেক্স এর অমার্জিত রূপ), কফি বা হট চকলেট। ব্যতিক্রম হলে কড়া টোস্ট, বয়স্করা ভিটামিন বি এর একটা পেস্ট সাথে ছড়িয়ে নেয় vegemite নামে পরিচিত, খুবই অখাদ্য, বিশ্রী স্বাদ, ছোটরা কেউ খায় না। এই হচ্ছে সাধারন নাস্তা। দুপুরে সাধারন খাওয়া কেমন, তার একটা গল্প বলি।

হাঞ্জি মাউরিদের উৎসবের খাবার ছবিঃwikiহাঞ্জি মাউরিদের উৎসবের খাবার ছবিঃwiki

 

ভেড়ার দুধের পনীর দিয়ে তৈরি স্পঞ্জকেকভেড়ার দুধের পনীর দিয়ে তৈরি স্পঞ্জকেক

একদিন রাত ১১ টায় আমার বাড়িওয়ালী ভদ্রমহিলা হাসপাতালের ডিউটি শেষ করে বাসায় এসে ক্লান্ত হয়ে বলল, কেমন লাগে বল দেখি এখন যদি আমার ছেলের জন্য আগামীকালের লাঞ্চ তৈরি করা লাগে? আমার খুব মায়া লাগল, আহারে, সারাদিন অফিস করে এত রাতে এই বয়স্ক মহিলাকে রান্না করতে হবে। এমনিতে এই মহিলা কিছু রান্না করেনা, হাতের কাছে তৈরি যা পায় তাই দিয়ে দিন পার করে। এখন ছেলের জন্য তো করতেই হবে। তার লাঞ্চের আয়োজন দেখে হেসে দিলাম। দু টুকরো পাউরুটির মধ্যে এক স্লাইস মাংস দিল, দুটো ক্যাডবেরি, একটা ওয়েফার, দুই প্যাকেট চিপস, একটা আপেল, একটা কলা-- এই হচ্ছে লাঞ্চ। এই লাঞ্চ পুরো নিউজিল্যান্ড এর জন্য সত্য, আমরা এশিয়ান ছাড়া। আমি যে স্টোরে কাজ করতাম সেখানেও দেখতাম কলিগরাও এই ধরনের লাঞ্চ করে অভ্যস্ত। এই লাঞ্চ কখনওই একবারে খাওয়া হয়না, কিছুক্ষন পরপর একটা একটা করে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে খাওয়া হয়। কাউকে কাউকে দেখতাম ঘরে বানানো স্যান্ডউইচ দুই কামড় খেয়ে আধাঘণ্টা পর আবার খেতে। এরা প্রচুর ফ্রুটস খায়, আপেল, চেরী, ব্লুবেরী, এভোকাডো, কিউই। এক ভাবীর কথা শুনে একবার আলুভর্তার মত করে এভোকাডো ভর্তা করেছিলাম, অসাধারণ স্বাদ, এরপর আর আলুভর্তা ভাল লাগতো না।

ক্রিস্টমাসে বাসার আয়োজনক্রিস্টমাসে বাসার আয়োজন

 

 ক্রিস্টমাসে অফিসে আয়োজন। ক্রিস্টমাসে অফিসে আয়োজন।

 

ল্যাম্ব অন্যতম জনপ্রিয় এক আইটেম খাদ্যতালিকায়, বিশেষ করে উৎসব বা বিশেষ আয়োজনে। রেস্টুরেন্টের মেনুতে ল্যাম্ব স্টেক, রোস্ট, চপ থাকেই। রেস্টুরেন্ট এর মধ্যে তার্কিশ রেস্টুরেন্ট অনন্য, তাদের কাবাবের খ্যাতি তো বিশ্বজোড়া। হাংগি বা হাঞ্জি হচ্ছে মাউরিদের উৎসবের জনপ্রিয় খাবার, মাংস আর সবজীর খিচুড়িও বলা যায় একে। মুরগি, পর্ক, ল্যাম্ব এর মাংস আর সাথে মিস্টি কুমড়া বা বিভিন্ন সবজী একসাথে করে স্লো কুকারে বা মাটির মধ্যে গর্ত করে গরম পাথরের অনেকক্ষন ধরে রান্না করা হয়। এরা স্লো কুকারে অনেক ধরনের রান্না করে।

কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডস, বার্গার কিং এর খাওয়া দাওয়া কম মশলাদার কিন্তু আমাদের তুলনায় সস্তা। কুকিজ (চকলেটে পরিপূর্ণ বিস্কিট) ল্যামিংটন্স (স্পঞ্জ কেক) আফগান নামের একটা কুকিজ হালকা নাস্তা বা স্ন্যাক্স হিসেবে খুব জনপ্রিয়। আমার খুব ভাল লেগেছিল ভেড়ার দুধের পনীর দিয়ে তৈরি স্পঞ্জ কেক, খাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল মুখের ভিতর মিস্টি মাখন নাড়াচাড়া করছি, গলা দিয়ে যখন নামে এমনিতেই চোখ বুজে আসে, আহ্। উৎসবের খাওয়াঃ ক্রিসমাসে (নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার ক্রিসমাস কিন্তু হোয়াইট ক্রিসমাস না অর্থাৎ বরফে মোড়ানো শীতকাল নয় এখানে ক্রিসমাসের সময় গ্রীষ্মকাল থাকে) বাড়িওয়ালী ঘোষনা দিল, মজি (মাসুদ) আগামী দুইদিন তোমার রান্না করার দরকার নেই, বাসায় প্রচুর রান্না হবে, এত খাওয়ার লোক নেই, তুমি আমার সাথে খাবে। স্টোর থেকেও বলল, আগামী কয়েকদিন লাঞ্চ আনার দরকার নেই, অফিস থেকে লাঞ্চ করাবে। রান্নার যন্ত্রণা থেকে বেঁচে আর উৎসবের আমেজে আমার খুশি আর ধরেনা।

কলিগদের সাথে আড্ডায় খাওয়াদাওয়াকলিগদের সাথে আড্ডায় খাওয়াদাওয়া

 

খাওয়ার একটা বর্ণনা দিই, খুব হাল্কা মশলায় গোটা মুরগির সাদাটে রোস্ট, একদম স্বাধহীন। একগাদা সিদ্ধ সবজি, ডিম আর আলু সিদ্ধ, অনেক ধরনের bun, সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয় ginger bun, দই, কাস্টার্ড, কনডেন্স মিল্ক, মেয়নিজ, মার্শমেলো আর মিক্সড বাদাম, এবার নিজের মত করে খাও। অফিসে বাড়িতে একই ধরনের খাবার।

বিদেশের মাটিতে দেশি খাওয়ার আয়োজন।বিদেশের মাটিতে দেশি খাওয়ার আয়োজন।

 

বাংলাদেশি ভাইরা প্রায়ই দাওয়াত দিত, ভাল কিছু রান্না করলেও খেতে ডাকত। আর আমিও রান্নার ভয়ে সুড়সুড় করে রাজি হয়ে যেতাম। দেশি সব রান্না, উপকরণ ভেজালহীন হওয়ায় আর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় স্বাদে উপাদেয় আর দেখতে অতুলনীয় হয়ে উঠত। রানা ভাইয়ের বাটার পরোটা, শুভ ভাইয়ের ফ্রাইড রাইস, জাহিদ ভাইয়ের বাসার খাবারের স্বাদ মুখে লেগে থাকবে অনেকদিন।

খালি পায়ে হাঁটার দেশ--পর্ব ২ (সাশ্রয়ী থাকা)

খালি পায়ে হাঁটার দেশ-নিউজিল্যান্ড পর্ব ১