থাইল্যান্ডে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য কনফারেন্সে অংশ নেওয়া এবং ঘুরে-বেড়ানো হলেও এর পাশাপাশি একটা বড় অংশ ছিলো ওখানে বিভিন্ন রকমের খাবার খাওয়া। থাই খাবারের পাশাপাশি অন্য দেশীয় খাবার – বিশেষ করে যেগুলোর দেখা আমাদের দেশে মেলে না, সেগুলো চেখে দেখার আগ্রহ থেকেই নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে খাওয়া হয়েছে। এই পোস্টটায় মূলত থাই খাবারের পাশাপাশি অন্য কুইজিনের কিছু খাবারও উল্লেখ করা আছে, যেগুলো আমার বেশ পছন্দ হয়েছিলো।

কুমিরের মাংসঃ

থাইল্যান্ডে বেশ কিছু কুমিরের ফার্ম রয়েছে যেখান থেকে এসব মাংস পাওয়া যায়। এর আগে বিভিন্ন ব্লগ থেকে কুমিরের মাংস সম্পর্কে পড়লেও এই প্রথম খেয়ে দেখার সুযোগ হলো। মাংস হিসেবে বেশ সুস্বাদু, হাল্কা আঁশটে ভাব থাকলেও খেতে অনেকটা টার্কির সাথে মিল আছে। কম মশলায় স্ট্যর-ফ্রাইড এই মাংস (P̄hạd crak̄hê) খেতে বেশ মজাদার, এবং সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা ছিলো।

স্ট্যর-ফ্রাইড ক্রোকোডাইল (P̄hạd crak̄hê)স্ট্যর-ফ্রাইড ক্রোকোডাইল (P̄hạd crak̄hê)

ম্যান্টিস শ্রিম্পঃ

ম্যান্টিস শ্রিম্প (https://en.wikipedia.org/wiki/Mantis_shrimp)-এর চেহারা দেখে অনেকের অস্বস্তি লাগতে পারে, কিন্তু স্বাদের দিক থেকে এক কথায় অপূর্ব। ব্যাংকক থেকে ফুকেট-এ যাবার আগের রাতে কাং বান ফে রেস্তোরাঁয় এটা খেতে যাওয়ার পর দেখি তখন রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিচ্ছে। ওদের ওয়েট্রেসকে অনুরোধ করার পর সে ব্যবস্থা করলো যেনো আমার জন্য আরো কিছু সময় খোলা রাখা হয়। বড়সড় একটা বোল-এ ম্যান্টিস শ্রিম্পের পাশাপাশি প্রণ, স্কুইড আর অন্যান্য সিফুড বোঝাই ন্যুডলস স্যুপ দেখে প্রথম দর্শনে শেষ করতে পারবো কি না, তা নিয়ে সন্দিহান থাকলেও স্বাদের কারণে কোনো সমস্যাই হয় নি। এই বোল-এর রেকমেন্ডেশন ঐ ওয়েট্রেসেরই দেওয়া, সাথে আমাকে এক গ্লাস সিট্রাস আইসড টি নিতেও বলেছিলো, সেটাও এই খাবারের সাথে খুব ভালোমতো মানিয়ে গিয়েছিলো।

ম্যান্টিস শ্রিম্প আর স্যুপ-ন্যুডলস বোলম্যান্টিস শ্রিম্প আর স্যুপ-ন্যুডলস বোল

সিট্রাস আইসড টিসিট্রাস আইসড টি

ম্যাংগো-স্টিকি রাইসঃ

ব্যাংককের প্রায় সর্বত্রই আরেকটা খাবার খুব জনপ্রিয়, ম্যাংগো উইথ স্টিকি রাইস(Khao Neeo Mamuang)। খুবই আঠালো, খানিকটা লবণাক্ত ভাতের সাথে সুগন্ধী মিষ্টি আম আর ঘন নারকেল দুধ দিয়ে পরিবেশন করা এই খাবারটা আমার খাওয়া খাবারগুলোর মধ্যে সবথেকে পছন্দের একটা ছিলো!

ম্যাংগো-স্টিকি রাইসম্যাংগো-স্টিকি রাইস

স্মোকড ডাক উইথ ন্যুডলসঃ

ব্যাংককের চায়নাটাউনে বেড়াতে গিয়ে খাওয়া সবথেকে মজাদার স্ট্রিটফুডের একটা এই স্মোকড হাঁস ও ন্যুডলস (ba mee bpet haeng)। আস্ত হাঁস দীর্ঘ সময় ধরে তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে স্টিম করে নরম করে ফেলা হয়, তাও খুব সামান্য লবণ আর মশলা দিয়ে। স্মোকড নরম মাংসের স্বাদ ও ফ্লেভার এক কথায় অতুলনীয়। সাধারণত স্যুপ ন্যুডলস এর সাথে সার্ভ করা হলেও আমি স্যুপ ছাড়াই নিয়েছিলাম। খুব কম দামে পেট ভরে খাওয়ার মতো একটা সুস্বাদু খাবার।

স্মোকড ডাক উইথ ন্যুডলস (ba mee bpet haeng)স্মোকড ডাক উইথ ন্যুডলস (ba mee bpet haeng)

পাখির বাসার স্যুপঃ

চাইনিজদের মধ্যে প্রচলিত এই স্যুপটি সুইফট্‌ পাখির বাসা দিয়ে তৈরি করা হয়। এই বাসাগুলো বানানো হয় পাখির লালা থেকে। চাইনিজ ভাষায় এই খাবারটি Yàn Wō নামে পরিচিত। অস্বাভাবিক রকমের দামি এই স্যুপ খেতে কেমন হবে, প্রথমে সেটা নিয়ে চিন্তা থাকলেও প্রথমবার মুখে নিয়ে একটু অবাকই হতে হয়েছে। আমি তো নোনতা অথবা পানসে কোনো স্বাদ (সাথে উদ্ভট কোনো গন্ধ) থাকবে ভেবেছিলাম। অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ উল্টো,  কিছুটা মিষ্টি ভাব আছে, চাইলে আরো মিষ্টি করে খেতে ইচ্ছে করলে আলাদাভাবে মধু দিয়ে নেওয়া যায়। ছবিতে মাঝের হলুদগুলো গিঙকো নাট, ওগুলোও হালকা মিষ্টি। আর স্যুপটা নোনতা করে খেতে হলে হাফ বয়েলড্‌ ডিমও সাথে দেওয়া ছিলো, আমার কাছে ডিম দিয়ে খেতেই বেশি ভালো লেগেছে।

পাখির বাসার স্যুপপাখির বাসার স্যুপ

অপরাজিতা ফুল-এর চা এবং ফ্রুট টার্টঃ

পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অপরাজিতা ফুল থেকে তৈরি করা নীলরঙা পানীয় (nam dok anchan) বেশ জনপ্রিয়। গরম এবং ঠান্ডা – উভয়ভাবেই এটা পরিবেশন করা হয়ে থাকে। জিম থম্পসন-এর বাসা (বর্তমানে মিউজিয়াম) পরিদর্শনের সময়ে মিউজিয়াম সংলগ্ন রেস্তোরাঁয় আমি ঠান্ডাটাই খেয়ে দেখেছি। নীল রং-এর পানীয়ে লেবুর রস মিশালে পিএইচ লেভেলে পরিবর্তনের কারণে এটি বেগুনী রং ধারণ করে। আলাদা তেমন কোনো গন্ধ নেই, তবে লেবু, আদা ও মিন্টের মিশ্রণে ব্যাংককের আদ্রতার মাঝে এটা বেশ আরামদায়ক একটা পানীয় ছিলো।

অপরাজিতা ফুলের চা (nam dok anchan)অপরাজিতা ফুলের চা (nam dok anchan)

এক-ই রেস্তোরাঁতে ওদের ফ্রুট টার্টটা দেখে লোভ সামলাতে না পারায় ওটাও অর্ডার করে বসেছিলাম, আর একথা না বললেই নয় যে এটা আমার খাওয়া সেরা ফ্রুটটার্টগুলোর মধ্যে একটা। সাথে দেওয়া উইপড-ক্রিমটাও এই টার্টের সাথে বেশ মানিয়ে গেছিলো।

 ফ্রূট টার্ট ফ্রূট টার্ট

উনাগি ডনঃ

ফ্রেন্ডস টিভি সিরিজটার যারা ভক্ত, তাদের কাছে এই শব্দটা নিঃসন্দেহে অতিপরিচিত। এজন্য নাম দেখেই এটা অর্ডার করতে কোনোপ্রকার দেরি করি নি। উনাগি মূলত হচ্ছে স্বচ্ছ জলে বিচরণ করা ঈল (eel), যা দুই ধরণের রাইস ওয়াইন (মিরিন ও সাকে), চিনি ও সয়া সস দিয়ে তৈরি করা সস দিয়ে চারকোলে গ্রিল করা হয়। হাল্কা মিষ্টিভাব থাকা মাছটি খুবই সুস্বাদু। হাল্কা মিষ্টিস্বাদযুক্ত ভাত-এর সাথে পরিবেশন করা উনাগি কিছুটা দামি।

উনাগিউনাগি

স্টিমড মাসেলসঃ
মাটির পাত্রে লেমনগ্রাস, বেসিল, আদা, বিভিন্ন রকমের মরিচ, ও নানা সুগন্ধী আর্ব-এর সাথে এই সবুজ ঝিনুকগুলো সেদ্ধ ও স্টিম করা হয়। আমাদের এখানে এগুলো খেতে যেমন পকেটে টানাটানি পড়ে যায়, ওখানে এগুলো রীতিমতো সস্তা। আর একদম ফ্রেশ হওয়ায় স্বাদেরও কোনো কমতি ছিলো না।

স্টিমড মাসেলসস্টিমড মাসেলস

আরেকটা খাবারের কথা একদম পোস্টশেষে মনে পড়লো, যারা ডেজার্ট পছন্দ করেন ব্যাংককে সুকুমভিত্‌ সয় ৩/৪ এর কাছে থাকলে দ্য ল্যান্ডমার্ক হোটেলের বেকারীতে ঢুঁ মেরে আসতে পারেন। আমি নিজে ডোনাট খুবই পছন্দ করি, আর এখানেই আমি আমার খাওয়া সবথেকে সেরা ক্রিম চিজ ডোনাট পেয়েছি। যারা আমার মতো ক্রিম চিজ আর ডোনাট পছন্দ করেন, তারা ব্যাংকক গেলে একবার হলেও এটা ট্রাই করে দেখবেন।

ক্রিম চিজ ডোনাটক্রিম চিজ ডোনাট