এক বন্ধুকে নিয়ে হঠাৎ করেই বান্দরবানে চলে গেছিলাম। চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা ছিলো, শেষ মুহুর্তে অন্য কোনো কিছু চিন্তা না করেই দু’দিনের জন্য বান্দরবানে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। বান্দরবান সম্পর্কে অল্পবিস্তর যা জানতাম, সেটুকুই সম্বল – সাথে অনুদা’র কাছ থেকে আরো আইডিয়া নিয়ে যাত্রা শুরু হলো।

বান্দরবানে বেড়ানোর পাশাপাশি আরেকটা বিশেষ উদ্দেশ্য ছিলো ওখানকার খাবারদাবার খাওয়া। মারমা রাজপরিবারের হোটেলে থাকার সময় ওদের কাছ থেকেই “তোজাহ” রেস্টুরেন্টের ঠিকানা পেলাম, আর দুপুরে ওখানেরই এক মারমা অটো ড্রাইভারের সাথে পরিচয় হয়ে গেলো, উনিই নিয়ে গেলেন সেই রেস্টুরেন্টে।

এই রেস্তোরাঁতেই প্রথমদিন দুপুরে এবং দ্বিতীয়দিন রাতে ওদের যতগুলো খাবার ছিলো, দু-একটা বাদে প্রায় সবগুলোই খেয়ে দেখা হয়েছে। সেই খাবারগুলোর ছবির পাশাপাশি এক-দু’লাইনের বিবরণ না দিলেই নয় –

দুপুরের খাবারে পাহাড়ী মোটা চালের ভাত। প্রথমে দেখে মনে হয়েছিলো যে হয়তো খেয়ে তেমন সুবিধা করতে পারবো না, তবে অন্য খাবারের সাথে খেতে ভালোই লেগেছে।

পাহাড়ী মোটা চালের ভাতপাহাড়ী মোটা চালের ভাত

বেশ পাতলা ডাল, হালকা টকভাব ছিলো। ডাল ছাড়া ভিতরে আর কী দেওয়া ছিলো জানি না।

বেশ পাতলা ডালবেশ পাতলা ডাল

রেস্তোরাঁর দেয়ালে একটা বোর্ডে “বাঁশ কুড়ুল” লেখা দেখে এটাও অর্ডার করা হয়েছিলো। নরম কচকচে বাঁশের সাথে তরল অংশে লেমনগ্রাসের মতো একটা সুন্দর স্বাদ ও গন্ধ; বেশ মজাদার এই খাবারটা মুহুর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছিলো।

বাঁশ কুড়ুলবাঁশ কুড়ুল

তোজাহ – পাহাড়ী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ সেদ্ধ করা, হালকা কাঁচা গন্ধ থাকলেও সাথে লেবুজাতীয় কোনো ফল আর ঝাল লঙ্কার সসের মতো জিনিসটা দিয়ে খেতে বেশ অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়েছে (ঝালের কারণে অবশ্য চোখে জল আসার উপক্রম হয়েছিলো)।  

তোজাহতোজাহ

সবথেকে মজাদার খাবারের মধ্যে এটা – মুরগির চাটনি। হাড়ছাড়া মুরগির মাংস হলুদ-আদা দিয়ে সেদ্ধ করে ঝাল লঙ্কা, আদা, পেঁয়াজ ইত্যাদি দিয়ে প্রস্তুত করা  – এককথায় খুব সাধারণভাবে বানানো মজাদার একটা খাবার (লিখতে লিখতেই জিভে জল এসে পড়েছে)।

মুরগির চাটনিমুরগির চাটনি

শুয়োরের মাংস ভুনা – তুলনামূলক কম মশলা ও ঝাল দিয়ে করা, তবে মাংস বেশ নরম ও সুস্বাদু।

শুয়োরের মাংস ভুনাশুয়োরের মাংস ভুনা

হাঙরের মাংস – অন্যরকম, কীসের সাথে তুলনা করা যাবে, তা মাথায় আসছে না, তবে প্লেট খালি করে ফেলতে বেশি সময় লাগে নি।

হাঙরের মাংসহাঙরের মাংস

দ্বিতীয়দিন রাত্রে যাওয়ার পর প্রথমেই এটা খেতে দিয়েছিলো। মুরগির স্টক যেভাবে তৈরি করা হয়, তার সাথে আরো কিছুর মিশিয়ে এই সুরুয়া বানানো।

সুরুয়াসুরুয়া

যেই খাবারের জন্য অধীর আগ্রহে বসে ছিলাম – ব্যাঙ-এর মাংস। মিশ্র অনুভূতি নিয়ে প্রথমবার খাওয়ার চেষ্টা করলাম, আর সত্যি কথা বলতে ওখানে খাওয়া সবথেকে মজাদার খাবারের মধ্যে এটা একটা। মাংসের অন্যরকম একটা স্বাদ আছে, তার পাশাপাশি রান্নাও ভালো। পুরোটাই একা খেয়েছি (আমার বন্ধু বুঝলো না যে ও কতো মজার একটা খাবার মিস করেছে)।

ব্যাঙ-এর মাংসব্যাঙ-এর মাংস

গরু ভুনা – আমাদের লোকাল রান্নার মতো করেই করা।

গরু ভুনাগরু ভুনা

সাংফোয়া – পাহাড়ী সবজি (খেতে অনেকটা কলার মোচার মতো)।

সাংফোয়াসাংফোয়া

তারা।

তারাতারা

বান্দরবান গেলে ওখানের পেঁপে আর পাহাড়ী কলা না খেলেই নয়। আমি নিজে পেঁপে পছন্দ করি না, কিন্তু ওখানের পেঁপের বেলায় আমার কোনো “না” নেই। বান্দরবানে “ফিস্ট রেস্টুরেন্ট”-এ এই পেঁপের জ্যুসটা খেয়েছিলাম (বাংলা-চাইনিজ খেতে চাইলে এই রেস্তোরাঁ বেশ ভালো)।

পেপে জুসপেপে জুস

বান্দরবানে বেড়াতে গিয়েছিলাম – তা বেশ লম্বা একটা সময় হয়ে গেছে। তবে ওখানের খাওয়াদাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তেমন বিস্তারিত কোনো লেখা হয় নি। আদিবাসীদের খাবারগুলো খাওয়ার অভিজ্ঞতা বেশ অন্যরকম ছিলো, আমাদের স্বাদের থেকে আলাদা এই খাবারগুলো খেতে যেমন ভালো লেগেছে, তার থেকে বেশি মুগ্ধ হয়েছি ওখানের এই মানুষগুলোর আতিথেয়তায়। এমন হয়েছে যে শেষদিন আমরা বাঁশ কুড়ুল অর্ডার করেও পেট ভরে যাওয়ায় খেতে পারি নি, জোর করেও ওটার দাম দিতে পারি নি, যেহেতু খাই নি এজন্য ওরা দাম রাখবে না!  

যাদের হালাল-হারাম খাবার নিয়ে সমস্যা আছে, তাদের অনুরোধ করবো এখানে না যাওয়ার জন্য, আর গেলেও এইসব কারণে অযথা এই মানুষগুলোকে হ্যারাস না করতে। অবাক লাগে এই চিন্তা করে যে বেড়াতে যাওয়া বাঙালিরাই ওখানে বেড়াতে গিয়ে উল্টো এই সহজসরল মানুষগুলোকে ঠকানোর চেষ্টা, বিশ্রী ইঙ্গিত, এবং অতো সুন্দর পাহাড়ী অঞ্চলগুলোয় আবর্জনা ফেলে নষ্ট করে আসে (যেগুলো ভ্রমণকালে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে)। আশা করেই যাই, আমাদের মধ্যে কোনোকালে শুভবুদ্ধির উদয় হবে।