চৈনিক পর্বতারোহী জিয়া বয়্যু তার পঞ্চম বারের প্রচেষ্টায় এভারেস্ট এ আরোহনে সক্ষম হয়েছেন। তবে এই সামিট আর ১০ টি সামিটের থেকে একদমই আলাদা।

১৯৭৫ সালে এভারেস্ট অভিযানে আসেন বয়্যু। সেবার সামিটের মাত্র ২০০ মিটার নিচ থেকে বাজে আবহাওয়া ও ঝড়ের কারণে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাদের দলের। ফেরার পথে তার তিব্বতী টিমমেট স্লিপিং ব্যাগ হারিয়ে ফেলে। সেই সময়ের টগবগে তরুন বয়্যু আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, হিমালয়ের শীত সহ্য করে নিতে পারবে তার শরীর, তাই টিমমেটের প্রাণ বাচাতে দিয়ে দিলেন নিজের স্লিপিং ব্যাগ। 

পরদিন সকালে তার ঘুম ভাংগে অসহ্য যন্ত্রণা আর দুপায়ে ফ্রস্ট বাইট নিয়ে। ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। কোনরকম জীবন নিয়ে ফিরলেন বটে, কিন্তু  দুটো পা ই কেটে ফেলতে হয় তাকে। একমুহূর্তের জন্য হয়ত তখন বয়্যুর আজীবনের স্বপ্ন ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার মনোবল ছিল হয়ত তার স্বপ্নের থেকেও বেশি। 

Daily MailDaily Mail

কিছুদিন বাদে এক বিদেশী ডক্টরের শরনাপন্ন হন তিনি। ডক্টর তাকে বলেন নকল পা লাগিয়ে বয়্যু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে, এমনকি হয়ত পাহাড়েও উঠতে পারবে। নতুন করে শুরু হয় বয়্যুর সাধনা। তিনি বেইজিং এর ছোট পাহাড় গুলোতে উঠতে শুরু করেন, সেই সাথে তার নতুন পা নিয়ে প্রচুর হাটা অনুশীলন করতে থাকেন।

ব্যাপারটা এতটুকুও থাকতে পারত, কিন্তু বিধাতা সম্ভবত বয়্যুর ধৈর্য্যের শেষ দেখতে চাইছিলেন। ১৯৯৬ সালে তার শরীরে লিম্ফ ক্যান্সার ধরা পড়ে। তবে ক্যান্সার ও দমিয়ে রাখতে পারেনি প্রায় অদম্য এই মানুষটাকে। তার কাছে যেকোন প্রতিবন্ধকতাই ছিল সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন প্রেরণা।  “I know that I can succeed with new achievements only by overcoming difficulties,”- এটাই ছিল তার পথচলার মূলমন্ত্র!  তিনি বলতেন “I never give up.” এবং তিনি এটি করে দেখিয়েছেন। 

ক্যান্সার কে মোকাবিলা করে আবার নেয়া শুরু করেন পর্বতারোহনের প্রস্তুতি। ২০১৪ সালে ফিরে আসেন সাগরমাথার কোলে। কিন্তু এবারও এভারেস্ট ফিরিয়ে দেন তাকে। এভালাঞ্চ তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পরের বছর ভয়াবহ ৮.১ মাত্রার ভূমিকম্পে কেপে ওঠে নেপাল।  এবারও ব্যার্থ মনোরথে ফিরে যেতে হয় বয়্যু কে। 

TwitterTwitter


তার দেশের ন্যাশনাল টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকার এ তিনি বলেন "আমি জীবনে কোন আফসোস রাখতে চাইনা। সামনের বছর আমি আবার যাব এভারেস্ট এ। এটাই আমার জীবনের লক্ষ্য যা অর্জনের জন্য আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে গিয়েছি" (I don’t want to feel any regrets in my life. I will go to Mount Everest next year. This is my goal, which I’ve always tried my best to achieve.)

 ২০১৬ সালে সাফল্যের প্রায় দ্বারপ্রান্তে  পৌছেগিয়েছিলেন বয়্যু। সামিটের ১০০ মিটারের মধ্যে পৌছে যান, কিন্তু এবারও বিধি বাম! সহসা এক তুষার ঝড় ফিরিয়ে দেয় তাকে সামিটের মাত্র ৯৪ মিটার নিচ থেকে। 

তারপর আসে এক অকস্মাৎ ধাক্কা। নেপাল সরকার আইন প্রণয়ন করে অন্ধ এবং দুই পা বিহীন ব্যক্তিদের এভারেস্ট আরোহন নিষিদ্ধ করে দেয়।তো এভারেস্ট এর স্বপ্ন জয় করতে এই আইন কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রীম কোর্টে আপিল করা ছাড়া আর কোন উপায় রইল না বয়্যু'র জন্য। যতবার বাধা এসেছে ততবারই উদ্দিপীত হয়েছেন নতুন করে, লড়েছেন আইনী লড়াইও। এবং শেষ পর্যন্ত গত মার্চে নেপালের সুপ্রীম কোর্ট বয়্যুর পক্ষে রায় দেয়, নিষেধাজ্ঞা রদ করে নেয়।
ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে সুদীর্ঘ ৪৩ বছর। ১৯৭৫ এর প্রথম ধাক্কা খাওয়ার পর থেকেই একটু একটু করে নিজেকে গড়েছেন জিয়া বয়্যু। পুরো পৃথিবীর পর্বরোহীদের নজর ছিল বইয়্যুর এবারের অভিযানে। এবং গতকাল সোমবারে পাওয়া গেছে সেই কাংখিত সামিটের খবর। সামিটে পৌছেন তিনি। দাড়াতে পেরেছেন এভারেস্টের চুড়ায়। 
এখন শুধুই অপেক্ষা তার সফল ভাবে নেমে আসার।