নির্বাচিত কসমোনাটদের করোলভ আদর করে লিটল ঈগল বলে ডাকতেন, প্রথম থেকেই গাগারিন এবং লিওনেভকে তার বিশেষ পছন্দ হয়, তবে তিতভের সাথে সখ্যতা খুব একটা জমে উঠে নি কারণে হিসেবে বলা যেতে পারে এক বনে যেমন দুই বাঘ থাকে না তেমন দুই প্রবল ব্যক্তিত্বশালী পুরুষ একজন আরেকজনের অধীনে কাজ করতে পারে না ( বইয়ের দুই লেখক এই নিয়ে বেশ ত্যানা পেঁচিয়েছেন, তিতভ কিছুটা বুর্জোয়া পরিবারের ছেলে, তার বাবা ছিলেন শিক্ষক, তার নাক উঁচু, আত্মঅহংকারে ভুগতেন যে কারণে তাকে অনেক কিছু থেকেই দূরে রাখা হত। কিন্তু লেখকেরা ভুলে গেছে যে আমরা সহজেই বুঝে নিতে পারবে যেহেতু তিতভকে সোভিয়েত রাশিয়ার শ্রেষ্ঠ ২জন কসমোনাটদের একজন প্রথম থেকেই বলা হত সেটা তার যোগ্যতার কারণেই)। করোলভ তার লিটল ঈগলদের একদিন মহাকাশযানটিও দেখান, অবশ্য সেই কিম্ভূতকিমাকার যন্ত্র কী কাজে লাগবে তা বুঝতে কেউই সক্ষম হন নি।

 

এরপরে এসেছে করোলভের বাছাই প্রক্রিয়ার কিছু ঘটনা, তিনি যেমন যখন তখন সবার সামনে মিথ্যা অভিযোগ করতেন বজ্রকণ্ঠে, যেমন- ইউরি, তুমি কেন দাঁত বাহির করে হাসছ? অথচ আদপে ইউরি হাসছিলই না, এখন কিভাবে শান্ত ভঙ্গীতে সে বিগ বসের এই অভিযোগের জবাব দিবে এইটা যাচাই করাই ছিল করোলভের মূল উদ্দেশ্য। তিনি সবসময়ই স্বাধীনচেতা, নির্ভীক, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ পছন্দ করতেন, বিশেষ করে যারা তার মুখোমুখি দাড়িয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। অবশেষে সেই বিশেষ দিনটি আসে যা পরবর্তীতে প্রথম মহাশূন্যে হাঁটার রেকর্ডের অধিকারী অ্যালেক্সেই লিওনভের সাক্ষ্যে আমরা জানতে পারি যে নভোযান ভস্টকের সামনে যেয়ে তার ভিতরে প্রবেশ করার জন্য তিনি কসমোনাটদের জুতা খুলে ভিতরে যাবার আহ্বান জানান। সবার আগে ইউরি গাগারিন ইয়েস স্যার বলে জুতা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়েন, অন্যরা খানিকটা হতচকিত অবস্থায় ছিল, যেখানে রকেটের মধ্যে জুতা পরেই ঢুকতে হবে সেখানে এখন জুতা খোলার দরকার কী এইটাই হয়ত তাদের মনে কাজ করছিল। কিন্তু ইউরির দেখাদেখি বাকী সবাইই জুতা খুলে তার অনুগামী হল। লিওনেভের মতে সেই মুহূর্ত থেকেই ইউরি গ্যাগারিন অলিখিত ভাবে প্রথম মানব হিসেবে মহাশূন্যে যাবার জন্য করোলভের গুড বুকে উঠে যান। সেই সাথে থাকে সাহায্য করেছিল হয়ত রাশান গ্রামাঞ্চলে বাড়ীর ভিতরে প্রবেশের আগে জুতা খোলার রীতি!

 

যাই হোক, জোর তালে প্রস্ততি চলতে থাকে। এর মাঝে ব্রিটিশ কম্যুনিস্ট বিরোধী খবরের কাগজে একাধিক খবর আসে যে সোভিয়েত মানুষ মহাশূন্যে গেছে কিন্তু অবতরণের সময় যান্ত্রিক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি ( আমার দেশ টাইপ আবর্জনা যুগে যুগেই ছিল দেখা যাচ্ছে)।

 

ভোস্টকের আটো সীটে আটার জন্য কিছুটা খর্বাকৃতির নভোচারী দরকার ছিল সেই হিসেবে লিওনেভ রেস থেকে ছিটকে পড়েন। উচ্চতায় ৫ ফিট দেড় ইঞ্চি ইউরি টিকে যান, এবং তিতভও। এই নিয়ে পরে সাক্ষাৎকারে তিতভ বলেছেন অবশ্যই আমিই নির্বাচিত হতে চেয়েছিলাম, কেবলমাত্র প্রথম মানুষ হবার লোভের নয়, সেই সাথে আমরা দেখতে চেয়েছিলেম কী আছে ঐ অসীমে। ১৯৬১র ৭মার্চ ইউরির ২য় কন্যা গালিয়ার জন্ম হয়, তার তিন সপ্তাহ পরেই ইউরি বিকানুর রওনা দেন জরুরী কাজে। সেখানে কসমনাটদের শেখানো হয় স্পেস স্যুট পরা এবং খোলা। বিশেষ ইন্টারভিউয়ের জন্য হাজির হন আরেক মহাপরাক্রমশালী ব্যক্তি, সোভিয়েত মহাকাশ যাত্রার কসমোনাট প্রশিক্ষণের প্রধান জেনারেল নিকোলাই পেত্রোভিচ কামানিন। তার একটা প্রশ্ন ছিল যদি সকল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় তখন একজন পাইলটের কি তার আসন শূন্যে উৎক্ষিপ্ত করা উচিৎ? এর উত্তরে তিতভ বলেছিলেন- খামোখা এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করে সময় নষ্ট করার মানে হয় না, কন্ট্রোল রুম কোন না কোন ভাবে সব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে কয়েক মুহূর্তের মাঝে সে তো জানা কথা। আর ইউরি বলেছিলেন- যদি সকল ব্যবস্থা ভেঙ্গেই পড়ে তাহলে আসন ইঞ্জেক্ট আমাকে একটা বাড়তি সুযোগ দিবে।

 

করোলভ এবং কামানিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিলেন এই দুইজনের উপরে, এবং কামানিনের মতে তিতভ ছিলেন অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী চরিত্রের, ফলে তাকে রাখা হয় ২য় মহাকাশ অভিযানের জন্য যা কিনা ২৪ ঘণ্টার বেশী সময় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকবে আর ইউরিকে নির্বাচিত করা হয় প্রথম মানুষ হিসেবে দুই ঘণ্টারও কম সময়ের প্রথম যাত্রার জন্য। অবশেষে বিশেষ মিটিং ডেকে জানানো হয় ইউরি গাগারিন হতে যাচ্ছেন প্রথম অভিযানের কমান্ডার এবং তিতভ তার ব্যাকআপ। এই ঘটনায় তিতভের হতাশা পরিষ্কার প্রকাশ পায়, তিনি অকপটে বলেওছেন যে তাকে নির্বাচন করা হবেই এমনটাই ভেবে নিয়েছিলেন সবসময়ই।

 

গাগারিন ও তিতভ গাগারিন ও তিতভ

 

অবশ্য নির্বাচনের শেষ চাবিকাঠি নাড়া হয়েছিল আরও অনেক উপর থেকে, সোভিয়েত রাষ্ট্রের কর্ণধার নিকিতা ক্রুশ্চেভ আর ইউরি গাগারিনের মিল ছিল অনেক দিক থেকেই, দুইজনই এসেছেন কৃষক পরিবার থেকে। দুইজনই সদাহাস্যমুখি, কোলাহলমুখর। বিশেষ করে যে সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার কথা ছিল সোভিয়েতদের তাদের একজন কৃষকের ছেলে যে কিনা নিজেও বাবার সাথে কাজ করেছে, তরুণ কালে ফেরীতে মজুর হিসেবে শ্রম দিয়েছেন, সেই লোকই যদি মহাকাশে যায় তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রের আমরা সবাই-ই সমান এই প্রোপাগান্ডার জন্য তার চেয়ে বেশী শক্তিশালী প্রমাণ আর কী হতে পারে?

 

ইউরি গাগারিনইউরি গাগারিন

 

চূড়ান্ত যাত্রা আগের বর্ণনা আছে পুরো এক অধ্যায় জুড়ে, সেখানে স্বয়ং গাগারিনের লেখা পাতলা বই The Road to The Stars ( বাংলা হয়েছিলে সম্ভবত পৃথিবী পেরিয়ে নামে) এর রেফারেন্স দিয়ে বলা হয়েছে সেইবারই প্রথম ইউরি তার চিফ ডিজাইনার করোলভকে কিছুটা ক্লান্ত দেখেন। ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু আগের টানটান উত্তেজনার আবেগময় মুহূর্তগুলোর কথা উঠে এসেছে কয়েকজনের রোজনামচায়।

 

ইউরি গাগারিন এর বই ইউরি গাগারিন এর বই

 

শুরু হল ১০৮ মিনিটের সেই অবিস্মরণীয় মহাযাত্রার শুরু, তার আগে অবশ্য নাসার মত ৪-৩-২-১-০ স্টাইলে কাউন্টডাউন করা হত না রাশিয়ায়, বরং পূর্ব নির্ধারিত সময়ে ১২ এপ্রিল, ১৯৬১, মস্কো সময় সকালে ৯ টা ৬-এ রকেটের উড্ডয়ন শুরু। এরপরে স্বয়ং ইউরির কথাতেই বলা হয়েছে ঘণ্টায় ২৮,০০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা মহাকাশযান থেকে রিপোর্টে তিনি জানান সব ঠিক আছে, জানালা দিয়ে মেঘ দেখা যাচ্ছে, সব কিছুই দেখা যাচ্ছে এবং সবকিছুই খুবই মনোমুগ্ধকর। ইউরি ভাবছিলেন পৃথিবীর মানুষ এই যাত্রার কথা জানতে পারলে কিরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে। শিশুকালে যে মা তাকে ঘাড়ে চুমু খেয়ে প্রতিদিন ঘুম পাড়াতেন, মা কি জানেন তিনি মহাকাশে? কারণ মাকে যাত্রার আগে কেবল বলে এসেছিলেন ব্যবসাজনিত কাজে দূরে যেতে হবে। উৎকণ্ঠিত মা প্রশ্ন করেছিলেন, কতদূরে ইউরা? অনেকদূরে মা !

 

অভিযান নিয়ে প্রকাশিত সংবাদঅভিযান নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ

 

সেইদিনই পরে রেডিওতে তার নাম এবং যাত্রার কাহিনী শুনে সারা পরিবার উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছিল, এবং দুই শিশুকন্যা রেখে এমন অর্বাচীন যাত্রায় যাবার জন্য কিছুটা ভৎসনাও করা হল। কিন্তু গ্রামের বাড়ীতে কেউ কিছু জানত না। তার বাবা অ্যালেক্সেই গাগারিন নিজের কাজে বেশ ভোরে বাড়ী থেকে বাহির হয়েছিলেন পথে একজন তার ছেলে ইউরি সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করাই তিনি কারণ জানতে চাইলে সেই লোক বলল- তুমি জান না ! রেডিওতে বলল মেজর গাগারিন নামে একজন মহাশূন্যে গেছে!

 

সাধাসিধে বাবা বললেন- আপনার ভুল হচ্ছে, আমার ছেলে স্রেফ একজন সিনিয়র লেফটেন্যান্ট। তবে সাধুবাদ দিই তাকে যে মহাশূন্যে গেছে। তারপরও নিছক কৌতূহল বশে স্থানীয় পার্টি অফিসে যেয়ে দেখেন সেখানের কর্মকর্তাকে ফোন করে বলা হচ্ছে গ্রামের নথি দেখে নিশ্চিত হবার জন্য যে ইউরি গাগারিনের জন্ম এই গ্রামেই। সেই কর্মকর্তা আবার উল্লসিত কণ্ঠে বলছিল- নথি দেখার কোন দরকার নেই, সেই ছেলের বাবা স্বয়ং আমার সামনে! বলেই বাবা গাগারিনের হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়েছিল ঊর্ধ্বতন কারো সাথে কথা বলার জন্য।

 

মহাশূন্য থেকে ১০৮ মিনিট পরে অবতরণ করলেন প্রথম নভোচারী ইউরি, ছোট গ্রাম Smelkovka তে, ট্রাক ড্রাইভার ইয়াকভ লুসেঙ্কো তাকে দেখলেন প্যারাস্যুটে করে ঝাপিয়ে পরতে, সেদিকে তিনি এগোলেন গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে, এবং গাগারিন হাসিমুখে তাদের বললেন- আমি ইউরি অ্যালিক্সিয়েভিচ গাগারিন, মহাকাশের প্রথম মানুষ। এখনই অনেক মানুষ, গাড়ী, ক্যামেরা আসবে এইখানে, তোমার কোথাও যেও না, এই স্মৃতি আমরা বাঁধিয়ে রাখব।

 

এছাড়াও সেই গ্রামের এক মহিলা এবং তার শিশুকন্যা ইউরিকে আকাশ থেকে নেমে আসতে দেখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল। ইউরি চিৎকার করে বলেছিল, আমি তোমাদের বন্ধু কমরেড, একজন বন্ধু! মহিলা কোনমতে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তুমি কী পৃথিবীর বাহিরে থেকে আসছ? এক গাল হেসে ইউরি বলেছিল- ঠিক তাই!

 

তার আগের বছর গ্যারি পাওয়ার্স নামের এক মার্কিন গুপ্তচরকে রাশিয়ান বাহিনী গুলী করেছিল যার ঘটনা সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন জানত, কাজেই সেই গ্রামের অনেকেই প্রথমে ভেবে নিয়েছিল ইউরি আরেক মার্কিন গুপ্তচর। যদিও তার হেলমেটে লেখা CCCP তাদের সন্দেহ দূর করেছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সারা গ্রাম সামরিক বাহিনীর লোকে লোকারণ্য হয়ে গেলে, আগত মেজর গাসিয়েভকে স্যালুট করে ইউরি বলল- কমরেড মেজর, সোভিয়েত কসমোন্যান্ট সিনিয়র লেফটেন্যান্ট গাগারিন রিপোর্টিং। গাসিয়েভ হেসে বলেছিল- আপনিও এখন মেজর! উড়ন্ত অবস্থাতেই প্রোমোশন দেওয়া হয়েছে আপনাকে!

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্ণধার নিকিতা ক্রুশ্চেভের সাথে তার ফোনালাপ ছিল নিম্নরূপ-

 

প্রমোশন পেয়েছেন ইউরি প্রমোশন পেয়েছেন ইউরি

 

ক্রুশ্চেভ : তোমার কণ্ঠ শুনতে পারে খুবই ভাল লাগছে গাগারিন অ্যালেক্সিয়েভিচ।

গ্যাগ্যারিন : নিকিতা সের্গেইভিচ, আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে মহাকাশে প্রথম মানব মিশন সফল হয়েছে।

 

ক্রুশ্চেভ : বল দেখি ফ্লাইটের সময় কেমন লাগল? মহাশূন্য কেমন? কী কী দেখলে?

গ্যাগ্যারিন : এমনিতে ভালই ছিলাম। অনেক বেশী উঁচু থেকে বিশ্ব দেখলাম। সাগর, পর্বত, বড় শহর, নদী, বন সব দেখা যাচ্ছিল।

নানা রাষ্ট্রীয় কথার মাঝে ক্রুশ্চেভ বারবার তার কৌতূহল প্রকাশ করছিলেন, এবং আনন্দে আতিশয্যে পুঁজিবাদী দেশগুলোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বললেন ওরা পারলে আমাদের টপকে দেখাক। গাগারিন তাকে এমন সুযোগ দেবার জন্য অসংখ্যা ধন্যবাদ দিয়ে জানালেন যে ভবিষ্যতে দেশের জন্য এমন আরও মিশনে তিনি প্রস্তত।

কী সেই মিশন? সম্ভবত চাঁদ।

(চলবে...)