এমেলিয়া মেরি ইয়ারহার্ট, জন্ম ১৮৯৭ সালের ২৪শে জুলাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাসের এই বাসিন্দা ছিলেন বিমানচালনা বিদ্যার পথিকৃৎ এবং লেখিকা। শুধু এটুকুই নয়, তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম মহিলা বিমানচালক যিনি একাই আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেন। ১৯৩৭ সালের জুলাইয়ের ২ তারিখ মাত্র ৩৯ বছর বয়সে প্যাসিফিক মহাসাগর দিয়ে হাওল্যান্ড দ্বীপে যাওয়ার সময় হারিয়ে যান মেরি, পাওয়া যায়নি আর কোন খোঁজ। পৃথিবীর সকলেই তাঁর সাহসিকতা এবং কৃতিত্বের ফলে আজো সম্মাননা জানায় তাঁকে। আজকের আয়োজনে থাকছে আটলান্টিকের উপর পাড়ি জমানো এই প্রথম মহিলা পাইলটের অজানা কিছু কথা

 

আটলান্টিকের উপর পাড়ি জমানো পাইলটদের ইতিহাসে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়

National Archives Handout/ShutterstockNational Archives Handout/Shutterstock

 

এমেলিয়া ছিলেন পৃথিবীর প্রথম মহিলা পাইলট যিনি আটলান্টিক মহাসাগরের উপর পাড়ি জমান, কিন্তু তার মানে এই নয় তাঁর আগে অনেক পুরুষ এই কাজটি করেছেন।  ১৯২৭ সালের মে মাসে এমেলিয়ার আগে শুধুমাত্র একজন আটলান্টিকের উপর দিয়ে বিমান চালান, তাঁর নাম চার্লস লিন্ডবার্গ। তারপরেই ছিলেন ইয়ারহার্ট, তিনি পাড়ি জমান ১৯৩২ সালের মে মাসে। মাত্র ১৫ ঘন্টায় ফ্লাইট সম্পন্ন করেছিলেন ইয়ারহার্ট!

 

ছোটকালে তিনি বিমান মোটেও পছন্দ করতেন না!

AP/REX/ShutterstockAP/REX/Shutterstock

 

এমেলিয়া হারিয়ে যাওয়ার পর স্মৃতি হিসেবে তাঁর লেখা ডায়েরীগুলোকে বই আকারে প্রকাশ করে বাজারে ছাড়া হয়। বইটির নাম ছিল "লাস্ট ফ্লাইট"। সেই বই থেকে জানা যায়, জীবনের প্রথম দিকে তিনি এরোপ্লেন মোটেও পছন্দ করতেন না! যখন তাঁর বয়স মাত্র দশ বছর, তখন তিনি আইওয়ার একটি রাজ্যে অনুষ্ঠিত এক মেলায় জীবনের প্রথম বিমানটি দেখেন। দেখে শুধু এটুকুই বলেন, "এটি দেখে এত আনন্দিত হবার কি আছে!" এমনকি তাঁর কথা শুনে পাশে থাকা কয়েকজন অপরিচিত লোক এই পিচ্চি খুকীকে বুঝানোর চেষ্টা করেন যে এই জিনিসটি আকাশে উড়তে সক্ষম। ইয়ারহার্ট তাঁর ডায়েরীতে লিখেন, তখনো তিনি প্লেনটি দ্বিতীয়বার দেখার জন্য উৎসুক হননি, বরঞ্চ নিজের হাতে থাকা নতুন টুপিটি দেখে আরো বেশি খুশি ছিলেন! কিন্তু কে জানতো, বিমান পছন্দ না করা সেই মেয়েটিই একদিন নিজ হাতে বিমান চালিয়ে শুধু আটলান্টিক নয় বরঞ্চ ইতিহাসেও পাড়ি জমাবেন!

 

তিনি কিন্তু সবার থেকে সেরা ছিলেন না!

Underwood Archives UIG/ShutterstockUnderwood Archives UIG/Shutterstock

 

তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের কারণে আবার মনে করবেন না যে তিনিই তাঁর সময়ের সবার থেকে সেরা মহিলা পাইলট ছিলেন! ১৯২০ থেকে ৩০ সালের দিকে তাঁর কোন রেকর্ডও ছিলোনা! লুই থাডেন ১৯২৯ সালে বিমান চালনার উপর একই সাথে তিনটি রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন। থাডেনের পর রেকর্ড গড়া আরেকজন পাইওনিয়ার ছিলেন রুথ নিকোলস, তিনিও সর্বোচ্চ গতিতে বিমান চালনায় ছিলেন পারদর্শী। কিন্তু দিনশেষে ইয়ারহার্ট এমন এক রেকর্ড করেছিলেন যার ফলে বাকি সবার রেকর্ড ফিকে হয়ে যায়!

 

তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ভাগ্যের জোড়ে, যোগ্যতার বলে নয়!

AP/REX/ShutterstockAP/REX/Shutterstock

 

চার্লস লিন্ডবার্গের আটলান্টিক মহাসাগরে পাড়ি জমানোর সফলতার পর প্রকাশক জর্জ পুতনাম চেয়েছিলেন চার্লসের মত একজন মহিলাও যাতে এমন কৃতিত্বের অধিকারিণী হয়। একদিন তাঁর মনের আশা পূরণ হয় যখন এমি ফিপস নামের একজন মহিলা আটলান্টিকে পাড়ি জমানোর জন্য একটি ছোট আকৃতির বিমান কিনেন। কিন্তু এমির পিতা-মাতা এত বড় ঝুঁকি নিতে রাজি না হওয়ায় এমির আর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই এমি যান পুতনামের কাছে এই ভেবে তিনি যেন সঠিক এক মহিলাকে বাছাই করে নেন। আশ্চর্যের ঘটনাটি ঘটে সেদিন যখন সব রেকর্ডধারী মহিলা পাইলটকে বাদ দিয়ে পুতনাম বেছে নেন এমেলিয়াকে। বাকি সব ইতিহাস! এমেলিয়াকে অনেকে "লেডি লিন্ডি" নামেও ডাকতেন।

 

ইতিহাস গড়ার আগেও তিনি একবার আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন

AP/REX/ShutterstockAP/REX/Shutterstock

 

১৯২৮ সালে যখন এমেলিয়া আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার জন্য নির্বাচিত হন, তিনি চেয়েছিলেন তখনই বিমান নিয়ে একবার আটলান্টিক মহাসাগর ঘুরে আসতে। কিন্তু সেদিন তিনি বিমান চালাতে পারেননি, পাইলট হিসেবে ছিলেন উইলমার স্টালজ। তাঁর ভাষ্যমতে, "আমি সেদিন অনেকটা আলুর বস্তার মতন এক জায়গায় পরেছিলাম" তার চার বছর পর এমেলিয়া সিদ্ধান্ত নেন এবার তিনি একাই ডানা মেলবেন আটলান্টিকের উপর।

 

চা কিংবা কফি কোনটিই তাঁর পছন্দ নয়

AP/REX/ShutterstockAP/REX/Shutterstock

 

ওয়ার্ল্ড হিস্টরি প্রোজেক্ট থেকে জানা যায়, এমেলিয়া নিজেকে চাঙা রাখতে কোনদিনও চা কিংবা কফি পান করেননি। তবে আটলান্টিক মহাসাগর পার হবার সময় জীবনে প্রথমবারের মতন পান করেছিলেন এক মগ "হট চকোলেট"।

 

তাঁর ছিল একই বছরে তিনটি বিশ্বেরেকর্ড

AP/REX/ShutterstockAP/REX/Shutterstock

 

১৯৩৫ সালের প্রথম ৫ মাসেই ইতিহাসের প্রথম পাইলট হিসেবে রেকর্ডের খাতায় নাম লিখান তিনি। ইতিহাসের প্রথম পাইলট হিসেবে জানুয়ারিতে হনলুলু, হাওয়াই থেকে ওকল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত মোট ২৪০৮ মাইল অতিক্রম করেন। এপ্রিলে লস এঞ্জেলস থেকে মেক্সিকো সিটি এবং তাঁর কয়েকদিন পরেই মেক্সিকো সিটি থেকে নিউইয়ার্ক! পুরুষ হোক কিংবা, এমন রেকর্ড তাঁর আগে আর কেউ করার কথা হয়ত স্বপ্নেও চিন্তা করেননি!

 

১৯৩৭ সালে সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি হারিয়ে যান প্যাসিফিক মহাসাগরে

AP/REX/ShutterstockAP/REX/Shutterstock

 

১৯৩৭ সালে তাঁর দিকনির্দেশক ফ্রেড নুনানকে নিয়ে প্যাসিফিক মহাসাগর সহ পৃথিবীর বাকি সমস্ত স্থানগুলো ঘুরে আসার জন্য আকাশে পাড়ি জমান। কিন্তু জুলাইয়ে ২ তারিখ তাদের শেষ ট্রিপ সম্পন্ন করে ফিরে আসার সময় প্যাসিফিক ওশ্যানের মাঝে রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যান তাঁরা। সরকার তাদের খুঁজে বের করতে অনেক অনুসন্ধানও চালিয়েছিল কিন্তু কোন লাভ হয়নি। কেউ আর খুঁজে পায়নি তাঁদের। আর এভাবেই ইতিহাসের মাঝে হারিয়ে গেলেন ইতিহাস গড়া এমেলিয়া মেরি ইয়ারহার্ট। হয়ত তিনি হারিয়ে গিয়েছেন সেই প্যাসিফিক মহাসাগরেই, কিন্তু তিনি তাঁর কৃতিত্বের জোড়ে এখনো অনুপ্রেরণা হিসেবে বেঁচে আছেন হাজারো পাইলটের অন্তরে।

 

তথ্য সুত্রঃ রিডার্স ডাইজেস্ট