‘কোন চিন্তা করো না, সাগরের পানির ওপরে দৌড়ানো আসলে সোজা কাজ। চড়াই উৎরাই নেই, হোঁচট খেতে হবে না। শরীর শীতল থাকবে, ওভার-হিটেড হবে না। মাত্র ৪৩ কিলোমিটার দূরত্ব। শেষ করলে তোমার ক্ষুধা পাবে। ক্ষুধা তীব্র না হলে আমাদের রুশ বাবুর্চি যে জাউ রাঁধবে তা তুমি মুখে তুলতে পারবে না’।– একথা বলে পিঠ চাপড়ে রিচার্ড আমাকে মুচলেকা স্বাক্ষর করতে পাঠিয়ে দিল। রিচার্ড ডোনোভান হল উত্তর মেরুতে অনুষ্ঠিত ম্যারাথন দৌড়ের পরিচালক। গম্ভীর চেহারার এ মানুষটা যে এত রসিক তা আগে বুঝি নি। তার সাথে আমার এই প্রথম সাক্ষাৎ। গত ক মাস ধরে ই-মেইলে যোগাযোগ হয়েছে। মেরু-ম্যারাথনে আমার যোগদানের  বিষয়ে অনেক লেখালেখি করেছি। নিজের মুরোদ নিয়ে বার বার সংশয় প্রকাশ করেছি; রিচার্ড পাত্তা দেয়নি। মেরু-ম্যারাথনে অংশগ্রহণকারীদের মুচলেকা স্বাক্ষরের এ অনুষ্ঠানে আজ প্রথম তার মুখোমুখি হলাম। শেষ বারের মতো আমার দ্বিধাটা জানালাম- টু বি অর নট টু বি। ম্যারাথনে অংশ নেবার ইচ্ছে না থাকলে আমি লক্ষ টাকা বিমান ভাড়া দিয়ে পৃথিবীর এই প্রান্তে যে আসতাম না সেটা রিচার্ড ভালই বোঝে। এত দূর আসার পর তো আর ‘নট টু বি’ হতে পারে না। রিচার্ড একটা দুষ্ট হাঁসি দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে এখানে এসেও এই মিন মিন করাটা আসলে আমার পুরানো রেকর্ড শেষ বারের মত বাজানো ছাড়া আর কিছু না। আমরা এখানে এসেছি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে, এই মর্মে মুচলেকা দিতে যে মেরু-ম্যারাথনে দৌড়াতে যেয়ে অঙ্গহানী হলে আমরা ক্ষতিপূরণ চাইবো না এবং মারা গেলে ভূত হয়ে এসে আমাদের লোভী আত্মীয়-স্বজনকে রিচার্ডের বিরুদ্ধে মামলা করার উস্কানি দেব না।

আল্ট্রা-বাহিনী দৌড় দিয়ে হাওয়া হয়ে গেলআল্ট্রা-বাহিনী দৌড় দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল

জীবনে কোন ম্যারাথনে অংশ নেব ভাবিনি। কিন্তু নিলাম- সেধে নয়, বাধ্য হয়ে। আমার মতলব ছিল উত্তর মেরু যাওয়া। অ্যান্টার্কটিক সফরের পর থেকেই মনে মনে গোপন ইচ্ছা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একটা হাজিরা দিই। খোঁজ খবর নিতে নিতে প্রায় দশ বছর পার হয়ে গেল। বোঝা গেল উত্তর মেরুতে যাবার দুটো সহজ উপায় আছে; এক- স্কি পাগল মানুষের দলে যোগ দেওয়া; দুই- দৌড়বিদের দলে ভিড়ে যাওয়া। বেশ কিছুদিন থেকে উত্তর মহাসাগরের বরফ-টুপির ওপর স্কি করে মানুষ উত্তর মেরু যায়। ইদানিং এখানে ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা ইতিমধ্যে বিশ্বের শীতলতম ম্যারাথন নামে পরিচিতি পেয়েছে, আর পৃথিবীর সর্ব-উত্তরের ম্যারাথন হিসেবে গিনেস বিশ্বরেকর্ডের বইয়ে স্থান করে নিয়েছে। স্কি আর দৌড় দুটোই চলে উত্তর মহাসাগরের পানিতে ভেসে থাকা বরফের ওপর। বরফের এ টুপিটার ব্যাস শত শত কিলোমিটার, যার মাঝখানে উত্তর মেরু। এ ম্যারাথনকে রিচার্ড রঙ্গ করে নাম দিয়েছে ‘পানির’ ওপর দৌড়ানো- জমাট বাঁধা পানি।

উত্তর মেরুতে যেতে হলে আমাকে স্কি করতে হবে অথবা দৌড়াতে হবে। স্কি তো জানিনে; অতএব, ভরসা শুধু দৌড়ের। দৌড় দিতে কে না পারে। ছাত্রজীবনে পাকিস্তানি পুলিশের ধাওয়া খেয়ে আর বাংলাদেশের বোমা ফাটার শব্দ শুনে রাস্তাঘাটে কম দৌড়াই নি। পাখি-শুমারিতে নেমে হাতিয়ার দক্ষিণে ‘দমার চরে’ মহিশের তাড়া খেয়ে যে দৌড় দিয়েছিলাম সেটাই সম্ভবত আমার সর্বোচ্চ গতির রেকর্ড ছিল। তবে, একনাগাড়ে ৪২ কিলোমিটার কখনও দৌড়াই নি। যাই হোক, ঠিক করলাম- উত্তর মেরুতে যাওয়ার জন্য যদি ম্যারাথনে নামতে হয়, তো তাই সই। পারবো কি পারবো না এ নিয়ে রিচার্ডের সাথে অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছে। রিচার্ড বলেছে একশো বার পারবো, আর যদি নাই পারি, যদি মাঝপথে মারা যাই, তা হলে সে আমার লাশ উত্তর মেরুতে নিয়ে যাবে, যাতে মেরু-বিজয়ী পদকটা গলায় দিয়ে বুক ফুলিয়ে দেশে ফিরতে পারি (কফিনের মধ্যে)।

জীবিত অথবা মৃত মেরু-বিজয়ী হওয়ার পুরো গ্যারান্টি পেয়ে আমি ম্যারাথনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলাম। প্রিয়জনের কাছে বিপুল অংকের টাকা ধার নিলাম; শর্ত থাকল-কফিনবন্দী ফিরলে দেনা শোধ দিতে হবে না (কফিনে ঢোকার জন্য এর চেয়ে জোরালো প্রলোভন আর কি হতে পারে)! রিচার্ডকে ফি দিলাম, বীমা করলাম, নরওয়ের ভিসা নিলাম এবং অসলোর টিকিট কিনলাম। অসলো থেকে ট্রমসো হয়ে লঙইয়ারবেন যাওয়ার টিকিট কেনার ভার নিল অনু। অনু ফিনল্যান্ডে লেখাপড়া করে, বাংলাদেশের ছেলে; সেও মেরু-ম্যারাথনে অংশ নেবে। অনুর ভাই অপু আমাকে মেরু-উপযোগী এক প্রস্ত পোশাক উপহার দিয়ে অনেকখানি ভারমুক্ত করল। ম্যারাথনে নামার পথে আমার আর কোন বাঁধা রইল না।  

উত্তর মেরুর বরফ-টুপির ওপর নেমে পড়লামউত্তর মেরুর বরফ-টুপির ওপর নেমে পড়লাম

ঢাকা ছেড়ে দুবাই, ফ্রাঙ্কফার্ট, অসলো, ট্রমসো পার হয়ে এখন আমি উত্তর মেরু থেকে মাত্র ১০ ডিগ্রি দূরে, লঙইয়ারবেন হোটেলের সভাকক্ষে বসে আছি। ২২ দেশ থেকে ৪২ জন ম্যারাথনে এসেছে। সবার মুচলেকা ব্রিফ-কেইসে ঢুকিয়ে রিচার্ড ঘোষণা করল; কাল সকাল থেকে লঙইয়ারবেন বিমানবন্দরে আমাদের হাযির থাকতে হবে, চার্টার  করা রুশ-বিমান তুষারঝড়ের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের নিয়ে মেরুর বরফ-টুপিতে যেয়ে অবতরণের চেষ্টা করবে। প্রায় তিন ঘন্টার ফ্লাইট, আমাদের সবাইকে নিতে বিমান দু বার আসা যাওয়া করবে। মেরু থেকে প্রায় এক ডিগ্রি দূরে বেইস-ক্যাম্প করা হয়েছে। সবাই বেইস-ক্যাম্পে পৌঁছালে ম্যারাথনের সময় ঘোষণা করা হবে। সেখানে তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে বেইস-ক্যাম্পের তাঁবুগুলো উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা আছে, তাঁবুর ভেতরে তাপমাত্রা মাইনাস পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠানো যাবে।  

উষ্ণ-তাঁবুতে ঢুকে আমাদের মুখে হাঁসি ফুটলউষ্ণ-তাঁবুতে ঢুকে আমাদের মুখে হাঁসি ফুটল

লাঞ্চ-টেবিলে ম্যারাথন দৌড়ের অজানা জগতে উঁকি মারার একটা সুযোগ হল আমার। দুচার জন অ্যামেচার ছাড়া এখানে সবাই পাঁড়-ম্যারাথনার। দুনিয়াজুড়ে একটার পর একটা ম্যারাথন ও আল্ট্রা ম্যারাথন দৌড়ানোই এদের সখ। ম্যারাথন তো হল ২৬.২ মাইল দৌড়; ম্যারাথনের চেয়ে লম্বা দৌড়কে এরা বলে ‘আল্ট্রা’- সাধারণত ৪০ থেকে ৮০ মাইল দৌড়ানো। দুনিয়ার এ দৌড়াদৌড়িতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য একটা আন্তর্জাতিক সংস্থাও আছে- অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথনস অ্যান্ড রোড রেইসেস। আছে অনেক পত্র-পত্রিকা, বই আর ইন্টারনেট সাইট। ম্যারাথনের আয়োজন করে না এমন দেশ পৃথিবীতে কম আছে। এই সব দৌড়বিদের দল গাঁটের পয়সা খরচ করে চলে যায় যেখানে ম্যারাথন হয়। যত কঠিন জায়গায় ম্যারাথন, তত বেশি  আকর্ষণ। দুনিয়ার কত দেশে যে গেছে এরা। কিন্তু কেউ কখনো বাংলাদেশে যায়নি। বাংলাদেশে তো আমরা ম্যারাথন শুরুই করিনি।

ম্যারাথন জগতের অনেক মজার মানুষের সাথে কথা হল এখানে। পরিচয় হল আয়ারল্যান্ডের টমাস ম্যাগুয়ারের সাথে। কোরিয়ার ১০০ কিলোমিটার দৌড়ে ১২ তম হয়ে টম সদ্য স্টার-স্টেটাস পেয়েছে। কিন্তু ম্যারাথন দৌড় সে পছন্দ করে না। টম  বললো; ‘২৬.২ মাইল এত ছোট যে শরীরটা দৌড়াতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার আগেই ফিনিশ-লাইন এসে পড়ে; আরাম করে দৌড়ানো যায় না; আমার পছন্দ আল্ট্রা’। মেরুতে আল্ট্রা-ম্যারাথন নেই বলে টম বাধ্য হয়ে এখানে ম্যারাথন দৌড়াতে এসেছে এবং ভয় করছে যে এই ছোট দৌড়ে সে ভাল করতে পারবে না।

মেরু-ম্যারাথনে অংশ নিতে পাঁচ জন মহিলাও এসেছে। একজনের সাথে আলাপ হল, নাম অ্যালিসন গিল। অ্যালিসনও আমার মতো জীবনে প্রথম ম্যারাথন দৌড়াতে এসেছে শুনে মহা-উৎসাহিত বোধ করেছিলাম। কিন্তু সেটা দ্রুত মলিন হয়ে গেল যখন জানলাম রোয়িং অলিম্পিকে সে তিনবার অংশ নিয়েছে। যেচে আলাপ করল রাশিয়ার লুবভ ব্লেইখ। ভদ্রমহিলা বয়েসে আমার সমান, ৩০ বছর ধরে ম্যারাথন ও আল্ট্রা দৌড়ান, সর্ট্‌স পড়ে অ্যান্টার্কটিক-ম্যারাথনে অংশ নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। তবে, সব চেয়ে তাক লাগানো মানুষ হল সিঙ্গাপুরের ডাক্তার উইলিয়াম ট্যান। ট্যানের জীবন কাটে হুইলচেয়ারে বসে, এভাবেই সে অনেক ম্যারাথনে অংশ নিয়েছে; উত্তর মেরুর জন্য বিশেষ হুইলচেয়ার বানিয়ে এনেছে।

উত্তর মেরুর বরফ-টুপির ওপর নেমে পড়লামউত্তর মেরুর বরফ-টুপির ওপর নেমে পড়লাম

২০০৭ সালের ৮ এপ্রিল। রুশ বিমানে করে আমরা উত্তর মেরুর বরফ-টুপির ওপর নেমে পড়লাম; এবং মেরুর ভয়াবহ শীতল বাতাসে কিছুক্ষণ হাঁটার পর বেইস-ক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। মাইনাস পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উষ্ণ-তাঁবুতে ঢুকে আমাদের মুখে হাঁসি ফুটল; তবে সেটা ছিল ক্ষণস্থায়ী সুখ। একটু পরেই রিচার্ড একটা স্কুল ঘন্টা ঢনঢন করে বাজিয়ে দিল। তাঁবু ছেড়ে আমরা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে গেলাম, মেরু-ম্যারাথন শুরু হল। চোখের পলকে টম আর তার আল্ট্রা-বাহিনী দৌড় দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। অন্য সবাই হাঁটতে শুরু করল; ভাবখানা এই যে এত দৌড়াদৌড়ি করার কি আছে, আমাদের তো কেউ তাড়া করে নি। আমি কলক্ষেপ না করে ভালমানুষের দলকেই আমার ম্যারাথন-মেইট হিসেবে বেছে নিলাম।

সবাই যথাসাধ্য জোরে পা ফেলে এগিয়ে চলছে।সবাই যথাসাধ্য জোরে পা ফেলে এগিয়ে চলছে।

ঘড়িতে তখন বিকেল চারটা বাজে। চোখ ধাঁধানো রোদে বরফের বিশাল প্রান্তর সামনে শুধু ধুধু করছে। তাপমাত্রা শূণ্যের নিচে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সবাই যথাসাধ্য জোরে পা ফেলে এগিয়ে চলছে। আমাদের প্রশ্বাসে যে পানি থাকে সেটা নাক দিয়ে বেরিয়েই ভ্রু আর চোখের পাতায় বরফ হয়ে জমে যাচ্ছে, সারাক্ষণ বরফ না ঝাড়লে চোখ বন্ধ। দুএক ঘন্টা পর বুঝলাম রিচার্ডের কথা ঠিক, এখানে যতই হাঁটো আর দৌড়াও, শরীর তপ্ত হওয়ার ভয় নেই। বরং শরীরের তাপটুকু ধরে রাখতে হলে এখানে তোমাকে সারাক্ষণই হাঁটতে বা দৌড়াতে হবে; দাঁড়ালেই সব ঠাণ্ডা। শরীর সচল রাখার তাগিদে তাই হেঁটেই চললাম। রাত দুটোর দিকে আমার ম্যারাথন শেষ হল। তখনও সূর্য জ্বলজ্বল করছে, চারদিকে ঝকঝকে রোদ।

চোখের পাতায় বরফ জমে যাচ্ছেচোখের পাতায় বরফ জমে যাচ্ছে

তাঁবুতে ঢুকে শুনলাম টম সবার আগে ম্যারাথন শেষ করেছে; তিন ঘণ্টার কিছু বেশি সময় লেগেছে তার। আমার অনেক আগেই পাঁচ মহিলা ম্যারাথন শেষ করেছে। কিন্তু হুইলচেয়ার চালিয়ে ডাক্তার ট্যান কেবল অর্ধেক পার হয়েছে, তার আরও ১০ ঘন্টা লাগবে। হুইলচেয়ার চালাতে হলে হাতের তো কোন অবসর থাকে না, তাই ট্যানের চোখ থেকে বরফ ঝাড়ু দেওয়ার জন্য সাথে লোক আছে। আর কোন সুবিধে সে চায়নি, দেয়াও হয়নি। ট্যান জানিয়েছে যে এতগুলো মানুষকে অপেক্ষায় রেখেছে বলে সে দুঃখিত। আমাদের সবার পক্ষ থেকে জবাব গেলঃ ‘আমরা সবাই উষ্ণ-তাঁবুতে বসে আছি ট্যান, আর তুমি একা বরফের সাথে লড়াই করছ, তোমাকে আমরা কুর্নিশ করি’।