শীতের আমেজে পাহাড়ে যাবার আনন্দ অন্য রকম। টিওবি'র বদৌলতে চন্দ্রনাথের গুণগান মোটামুটি চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আজকে একটু অন্য রকম ভ্রমণ কাহিনী শুনাবো। সফরের শুরুতেই আমাদের চন্দ্রনাথ আসার কোন প্ল্যানিং ছিল না। আমাদের যাবার কথা ছিল বাগেরহাট। আমি পুরাদন্তু সাহেব বাবু সেজে ফর্মাল ড্রেসে পরে বের হয়েছিলাম। পরে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল আসার পর জানতে পারলাম বাগেরহাটের শেষ গাড়ী রাত ১০টা বাজে ছেড়ে দিয়েছে এখন যেতে হলে সংবাদপত্রের পিক আপ শেষ ভরসা। হতাশার চোটে বাসায় ফিরে যাব ঠিক করেই ফেলেছিলাম। এর মধ্যে আমাদের গ্রুপের সবচেয়ে বড় বদমাইসের মাথায় বুদ্ধি আসলো চন্দ্রনাথে যাবার।

বাসা থেকে যখন বের হয়েছি যখন ফিরবো কেন চলেন চন্দ্রনাথ যাই। আগে পাহাড়ে উঠার অভিজ্ঞতা থাকলেও কোনদিন সাহেব বাবু সেজে পাহাড়ে যাই নাই। তাই প্রথমে আমতা আমতা করলেও রাজী হয়ে গেলাম এবং ভাগ্যবসত ইউনিকের শেষের দিকে কয়েকটা সিট পেয়ে গেলাম। সকাল বেলা সকালে সীতাকুন্ডু বাজার নামার পর আমাদের সাথে দেখা হয়ে গেল এক ডাক্তার দাদার। ভদ্রলোক কে দেখে একটু অবাক হলাম কোনদিন পাহাড়ে উঠেন নাই, শুধু সন্তানের জন্য মানত করেছেন তাই চলে এসেছেন চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাবার জন্য। চন্দ্রনাথ মন্দির কি রকম কোথায় তার অবস্থান বিন্দুমাত্র ধারনা নাই। উনাকে সাথে নিয়ে শুরু হল অদ্ভূত এক মুসাফির দলের যাত্রা।

চন্দ্রনাথ পাহাড় উঠা হয়তো এতটা কঠিন না, যতটা কঠিন মনে হয়েছে একটা প্রপার ট্রেকিং স্যান্ডেল/জুতা না থাকার কারনে। মনে হচ্ছিল জুতাখানা ছুড়ে ফেলে দেই। আমাদের সাথের দাদার পাহাড়ে উঠতে অনেক কস্ট হচ্ছিল। পাহাড়ে গিয়ে হয়তো তার সাথে দেখা আর পাহাড় মানুষ কে উদার করতে শিখে, তো দাদা কে ফেলে যাই কি ভাবে। আমাদের সাথে গল্পগুজব করতে করতে উনি কখন যে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে শীর্ষে পৌচ্ছে গেলেন নিজেই টের পেলেন না। পাহাড় থেকে পুরা সীতাকুন্ডু শহরটাকে দেখতে অদ্ভূত সুন্দর লাগে। আর সাথে যদি হয় মেঘের সাথে মিতালী তাহলে তো কথাই নাই। আমরা মেঘের রাজ্যে কিছুক্ষনের জন্য হারিয়ে গেলাম। এখান থেকে সাগরও দেখা যায়। দাদার মানত শেষ হবার পর আমরা আবার নামা শুরু করলাম। যে পথে উঠেছি এর উলটা পথ দিয়ে নামা শুরু করলাম। এই পথের সিড়ি গুলার গ্যাপ অনেক বেশি। আমরা নামার সময় দেখতে পেলাম বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে এক দল এই পথ দিয়ে উপরে উঠছে প্রতিজনের জামা খোলা। তেল ভাল মত বের হয়েছে। আনন্দ ভ্রমণ যে প্যারার ভ্রমণ হয়ে যাবে তাদের হয়তো ধারনা ছিল না।

এত প্রতিকূল পরিবেশ স্লো ট্রেকিং পার্টনার থাকা সত্ত্বেও আমরা ৩ ঘন্টার ভিতর ট্রেক করে সমতলে ফিরতে পেরেছি। তবুও আমাদের ট্রেকিং এবার সার্থক। এত দিন অন্যের গাইডিং এ আমরা অনুসরন করে গিয়েছি। এবার নিজেরাই গাইড হয়ে নিয়ে গেলাম আমাদের চল্লিশ ছুই ছুই ডাক্তার দাদাকে। সন্তানের প্রতি তার ভালবাসা আর মনের জোরের কারনেই উনি উঠতে পেরেছেন চন্দ্রনাথের শীর্ষে। (সংগত কারনে দাদার নাম প্রকাশ করলাম না। বেচে থাক দাদা আরও অনেক বছর।)

বি:দ্র: চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যেতে হলে চট্টগ্রামের বাসে সীতাকুন্ডু বাজারে নামবেন। এখান থেকে সিএনজি নিবেন আপনাকে নামিয়ে দিবে একবারে পাহাড়ের পাদদেশে। এরপর এখান থেকে ট্রেকিং শুরু।