তাদের সব্বাইকে মুখ ভেংচি আর বুড়ো আঙুল!

যারা বারবার করে বলেছিলেন, এখন রিশপ-লাভা যেওনা, এখন ওখানে শুধু মেঘ আর মেঘ, কাঞ্চনজঙ্ঘা তো দূরের কথা, সামনের পাহাড়ই দেখা যাবেনা! অবশ্যই সবাই আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, ভালোর জন্যই বলেছিলেন।

কিন্তু আমি তো জানি, আজ পর্যন্ত প্রকৃতির কাছে যা যা চেয়েছি, প্রকৃতি তার সবটুকু রূপ ঢেলে দিয়েছে আমায়! কখনোই হতাশ করেনি সে আমায়। তাই ছিল ভীষণ আত্ন-বিশ্বাস। আর সেই আত্ন-বিশ্বাসের জোরেই ঘন কুয়াশা, কালো মেঘ, ঝুমঝুম বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া আর পাহাড় ধসের মত ঝুঁকিপূর্ণ সময়েই গিয়েছিলাম অনেক দিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের জন্য রিশপ-লাভার এর স্বপ্নিল পাহাড়ি স্বর্গ উদ্যানে।

Sajol ZahidSajol Zahid

যে সকালের অদ্ভুত আর আচ্ছন্ন করে রাখা বিমোহিত স্বর্গের ছোঁয়া এখনো হাতছানি দিয়ে যায় প্রতিটি সকালকে! সেই সকালের পর থেকে প্রতিটি সকালে ঘুম ভাঙে ফেলে আসা সেই স্বর্গে মোড়ানো রূপকথার সকালের স্মৃতিকে সাথী করে! যে সকালের একটি মুহূর্তও এখনো ফিকে হতে পারেনি, দুচোখের সামনে থেকে! যেন চোখে লেগে আছে আর আমাকে এখনো আচ্ছন্ন করে রেখেছে সেই সকাল! যে সকালের সঠিক গল্প বলার শব্দ আমার জানা নেই। 

Sajol ZahidSajol Zahid

তবুও বলি সেই সোনায় মোড়ানো সকালের  পাহাড়ের স্বর্গ উদ্যানের গল্পটি......

তার আগে লাভা থেকে এক গভীর অরণ্যর ভিতর দিয়ে একা একা হেটে আসার সেই রোমাঞ্চকর ‘যাহ কুত্তা, কাম বয়েস!” গল্পটা নিশ্চয়ই পড়েছেন আপনারা? 
জঙ্গল পেরিয়ে রিশপের সীমানায় এসে পড়তেই কুকুর দুটো থেমে গেল, আর সামনে এগোলনা! খুব অদ্ভুত ভাবেই। আমিও আর এদিক ওদিক না তাকিয়ে হাটতে শুরু করলাম। সামনে ছোট্ট একটি পাহাড়ি বাঁক। এক থেকে দুই মিনিট। সেই পাহাড়ি বাঁক পেরোতেই, চোখের সামনে কোন এক পাহাড় তার পাহাড়ি মায়া দিয়ে আচ্ছন্ন করে, একটি ক্যালেন্ডারের পাতা মেলে ধরলো!

হ্যাঁ ক্যালেন্ডারের পাতাই যেন, যেদিকে তাকাই সিঁড়ির মত থরে-থরে সাজানো পাহাড়, আর সেইসব পাহাড়ের গাঁয়ে গাঁয়ে জড়িয়ে থাকা সাদা মেঘের চাদর, যেন পাহাড়ের ঠাণ্ডা না লাগে! এমন করেই আদরে জড়ানো সব মেঘেদের চাদর, চারদিকের সব পাহাড়ের শরীরে! একটু বাতাস হয়, আর সেই বাতাসে শীতের চাদর যেন সরে যায় পাহাড়ের গা থেকে।

বেরিয়ে পরে পাহাড়ের গায়ে গায়ে সেজে থাকা লাল-নীল-হলুদ-বেগুনী আর নানা রঙের ছোট ছোট বাড়ি। ঠিক বাড়ি যেন নয়, পাহাড়ের গায়ে-গায়ে বসে আছে শত রঙের রঙিন প্রজাপতি! এই মেঘে ঢেকে যায়, তো এই বাতাসে একটু করে দেখা দেয়। আবার কখনো কখনো মনে হচ্ছিল যেন মেঘ সরে গিয়ে নয়, রঙিন প্রজাপতিগুলো যেন উড়ে-উড়ে বেড়াচ্ছে সবুজ ও সাদার মাধুরী মাখা পাহাড়ে গায়ে-গায়ে!

Sajol ZahidSajol Zahid

সামনে যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় পাহাড় আর পাহাড়। ডান থেকে বামে আর বাম থেকে ডানে রাশি রাশি পাহাড় চুড়ারা যেন ডাকছে আর হাসছে ওর মাধুর্যতা আর সম্মোহন দিয়ে। ভাবছিলাম ওখানেই বসে থাকবো, নাকি সামনে এগোবো? সামনে এগোলে যদি এই পাহাড়ের চুড়া গুলো হারিয়ে যায় চোখের সামনে থেকে? তবে বড় মন খারাপ হবে! সত্যি খুব মন খারাপ হবে।

কিন্তু এসেছি যখন সামনে তো এগোতেই হবে। দেখি ধীরে-ধীরে, হেটে-হেটে রিশপটাকে। ডানের পাহাড় শারির চুড়া গুলোর দিকে তাকিয়ে সামনে হাঁটছি... ডানে পাহাড়ের চুড়া গুলোতে মেঘের লুকোচুরি দেখতে দেখতে আর সামনে তাকানোর কথা ভুলে গিয়েছিলাম! ধাক্কা খেলাম এক পাহাড়ের গায়ে! কিন্তু ধাক্কা তো খাবার কথা নয়, আসলে ধাক্কা খাইনি, ওই পাহাড়টি যেন জোর করে আমার গায়ে এসে ধাক্কা দিল, আর বলল আরে গাধা ডানে আর কত দেখবিরে... সামনে তাকা, দ্যাখ সামনে কি অপেক্ষা করছে তোর জন্য?

এবারই প্রথম সামনে তাকালাম... একটি ছোট্ট সাইন বোর্ডে লেখা রিশপ! সবুজ ঘাসের মাঝে-মাঝে বিছিয়ে রাখা রঙিন পাথরের কুঁচি, দুইপাশে ঘন সবুজ ঘাসের গায়ে গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা, সেখানে সদ্য জেগে ওঠা সূর্যের আলো পরে চিকচিক করছে মুক্ত দানার মত! পায়ে-পায়ে জড়িয়ে ধরছে নাম না জানা রঙিন ফুলেরা! পাহাড়ের গায়ে দাড়িয়ে থাকা গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়ছিল জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা, গান শুনিয়ে যাচ্ছিল অবিরত নাম না জানা পাখিদের দল!

Sajol ZahidSajol Zahid

দাড়িয়ে থাকা গম্ভীর পাহাড়ের চুড়ায় সূর্যের আলো পড়ে দেয়া পাহাড়ের মৃদু হাসি, মেঘেদের ছোটাছুটি, রঙিন প্রজাপতিদের ওড়াউড়ি, পাখিদের গান, ফুলের রঙ ছড়ানো, বৃষ্টি ফোঁটার আদর মাখা ছোঁয়া, কুয়াশার জড়িয়ে ধরা, আর মিহি পথের মাঝে হাঁটবো না এক যায়গায় দাড়িয়েই থাকবো সেই ভাবনায় যখন কাতর, তখনই হুট করে প্রকৃতির ডাকে পড়লো!

সামনেই দাড়িয়ে থাকা এক পাহাড়ের গায়ে রঙিন একটি কটেজে গেলাম, পাহাড়ের গায়ে গায়ে পাথর বিছিয়ে করা রাখা সিঁড়ি দিয়ে। গিয়ে এক সুন্দরী গোর্খা মহিলাকে প্রয়োজনের কথা জানাতেই তিনি তাদের গেস্টদের (পর্যটকদের) জন্য তৈরি করা রুমের ভিতরেই এটাচ বাথরুমের চাবি দিলেন, খুবই আন্তরিকতার সাথে। ফ্রি হয়ে বের হয়ে, রুমের দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুরতেই বিস্ময়!

যে পাহাড় গুলো আর চুড়ার মায়া ছাড়তে পারছিলামনা, সেগুলো এখন যেন হাত ছোঁয়া দুরত্বে! কটেজের লম্বা কাঠের বেলকোনি জুড়ে শুধু সাদা মেঘ আর মেঘ! এক অপার্থিব সুখে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে! ওখানেই ঠায় বসে ছিলাম ৩০ মিনিট অনুমতি নিয়েই। আর ভাবছিলাম আজ আর কোথায় না গেলেও চলবে! এখানে সারাদিন বসেই কাটিয়ে দেয়া যাবে অনায়াসে। পাহাড় দেখে, পাহাড় ছুঁয়ে আর পাহাড়ে পাহাড়ে হারিয়ে গিয়ে। 

কিন্তু তারপরও উঠতে হল, যেহেতু এখানে বেশিক্ষণ থাকা কতটা যৌক্তিক হবে সেটা ভেবে। যে পথে উঠেছিলাম এই পাহাড়ি কটেজে ঠিক তার উল্টো পথে নেমে গেলাম এক অরণ্য ভেদ করে, অন্য পাহাড়ের সেই মিহি পথ ধরে। সেই ভদ্র মহিলাই এই পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সেই পথ দিয়ে হাটতে হাটতে গিয়ে পৌঁছালাম। আর এক পাহাড়ের পিঠে দাড়িয়ে থাকা বাড়ির ছাদে!

হ্যাঁ ছাদেই রাস্তা থেকে সরাসরি কটেজের ছাদেই, আর মূল কটেজে ঢুকতে হলে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে খাঁজ কেটে আর রঙিন পাথর বিছিয়ে তৈরি করা সিঁড়ি বেঁয়ে নিচে নেমে গিয়ে! সেই ছাদে বসে বসে সকালের চা উপভোগ করছিলেন কটেজের মালিক। দেখেই খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে সম্ভাষণ জানালেন অনেকদিন পরে কোন পর্যটক দেখে। আর দূরে তাড়িয়ে থাকা তুষার শুভ্র পাহাড়ের চুড়া দেখিয়ে বললেন ওটাই কাঞ্চনজঙ্ঘা!

দুই মাস পরে আজ কাঞ্চন দেখা দিল, আপনি এলেন সেজন্যই বুঝি! আপনি অনেক অনেক লাকি! ঠিক দুই মাস পরে আজকে তিনি (কাঞ্চন) দেখা দিলেন!

এর পরের গল্পটা অন্য রকম,

তাই আর একদিন......!