২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া "Cast Away" সিনেমার চাক নোল্যান্ড (টম হ্যাঙ্কস) এর কথা মনে আছে কি? একজন নিষ্ঠাবান ফেডেক্স এক্সিকিউটিভ যিনি কাজের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় তার যাত্রাগামী বিমানটি ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে এবং পতিত হয় প্যাসিফিক ওশ্যানে।চাক নোল্যান্ড ভেসে ভেসে এক দ্বীপে পৌছায় এবং সেখান থেকে শুরু হয় তার নিজ শহরে ফিরে যাওয়ার এক রোমাঞ্চকর যুদ্ধ।

হয়ত অনেকেই দেখেছেন সিনেমাটি, এবং সিনেমাটিকে তুলনা করেছেন 'রবিনসন ক্রূসো'র সাথে। যদিওবা "Cast Away" সিনেমার কাহিনী আসল ছিলনা, ছিল এক অবাস্তব কিংবা কল্পনা নির্ভর সিনেমা। কিন্তু, আপনারা কি জানেন সত্যিকার অর্থেই এরকম ঘটনা ঘটেছে এক ব্যক্তির সাথে? জ্বী হ্যা! এমনটিই ঘঠেছে সালভাদোর আলভারেঙ্গা নামক এক সালভাদোরিয়ান ব্যক্তির জীবনে।  চলুন জেনে নেয়া যাক কি হয়েছিল তার সাথে- যাকে সত্যিকারের এডভেঞ্চার বলে যায়! 

হোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা, মধ্য আমেরিকার এল সালভাদের নামক ছোট্ট এক দেশের মানুষ, যার জন্ম ১৯৭৫ সালে আহুচাপানে। দেশটি ছোট হলেও প্যাসিফিক মহাসাগরের জন্য সুপরিচিত। আলভারেঙ্গা পেশায় ছিলেন একজন মৎস্যজীবী। স্ত্রী এবং ১৩ বছর বয়সী এক মেয়ে নিয়ে ছিল তার সাজানো এক ছোট্ট সংসার। পেশায় ছিলেন একজন জেলে। ছিলেন সাংঘাতিক মদ্যপায়ী একজন মানুষ।

দিনটি ছিল ২০১২ সালের ১৭ই নভেম্বর, ৩৭ বছর বয়সী আলভারেঙ্গা তখন কাজ করতেন মেক্সিকোতে। একদিন মদ পান করতে করতে হঠাৎ তিনি সিদ্ধান্ত নেন ১৮ তারিখ সকাল ১০ টায় মাছ ধরার জন্য প্যাসিফিকের উদ্দেশ্যে নৌকা ছাড়বেন এবং থাকবেন ১৯ তারিখ বিকাল ৪ টা পর্যন্ত। একদিনের কষ্টের বিনিময়ে আরাম-আয়েশে আনায়সে কেটে যাবে পুরো এক সপ্তাহ। যেই ভাবা সেই কাজ। সাথে ছিল ২২ বছর বয়সী সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত "এজেকুয়েল কর্ডোবা"।

আসলে সালভাদোরের কথায় রাজি না হয়েও করার কিছু ছিলনা কর্ডোবার, একে তো সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত আর তাছাড়া সালভাদোরকে নিষেধ করার মতনও কেউ ছিলনা। তার স্ত্রী-কন্যা তখন এল সালভাদোরে। তাই হয়ত এমন ঝুকিপূর্ন যাত্রায়ও রাজি হয়ে যায় কর্ডোবা। অথবা বিধাতা তাঁর নিজ হাতে এমন কিছুই তাদের কপালে লিখে রেখেছিলেন যা হয়ত অগ্রাহ্য করতে পারেনি তারা! নভেম্বরের ১৮ তারিখ কর্ডোবাকে সাথে নিয়েই যথা সময়েই নিজের সেই ইঞ্জিন চালিত প্রিয় ২৫ ফুট লম্বা ডিঙ্গি নৌকায় রওনা দেন সালভাদোর।

নৌকায় ছিল এক হাজার পাউন্ড ওজনের নানান প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং ৪ ফুট লম্বা একটি আইস বক্স যেখানে রাখা হবে নানান যাতের দামি দামি মাছ। দিনটি হয়ত তাদের জন্য অশুভই ছিল। কারণ তাদের রওনার একটু আগেই সমুদ্রে শুরু হয় ঝড়। তাঁকে সাবধানও করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে বারণ করার মতন তেমন মানুষও উপস্থিত ছিলনা বিধায় তাঁকে কেউ আটকে রাখতে পারেনি।

 

dailymail.co.ukdailymail.co.uk

সমুদ্রের বিশালাকার ঢেঊ গুলো অতিক্রম করে ভুমি থেকে প্রায় ৭৫ মাইল দূরে চলে আসার পর আলভারেঙ্গা মাছ ধরার প্রস্তুতি নেয়। সকালের তুলনায় দুপুরের দিকে ঘুর্নিঝড়টি হয়ে যায় আরো বেশি শক্তিশালী। সময় তখন ১ টার কাছাকাছি, ঘুর্নিঝড়ের প্রভাবে সমুদ্রের ঢেউ গুলো হয়ে উঠে আগের থেকেও বেশি শক্তিশালী।

এতটাই শক্তিশালী হয়ে গিয়েছিল ঢেউগুলো যে, ঢেউয়ের ধাক্কায় তাদের নৌকা প্রায় অনেকটুকু কাত হয়ে যায়। তা দেখে কর্ডোবার হয়ত বুঝতে আর বাকি রইল না সামনে আরও বেশি বিপদ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। আছড়ে পড়া বিশালাকার ঢেউগুলো দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে কর্ডোবা। অবস্থা বেগতিক দেখে চিৎকার দিয়ে আলভারেঙ্গাকে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। হয়ত অনেক দেরি করে ফেলেছিল তারা।

পাহাড় সমান ভয়ানক ঢেউগুলো ক্রমাগত আছড়ে পড়ার ফলে অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই তাদের নৌকায় পানি উঠতে শুরু করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের নৌকা সমুদ্রের পানিতে ভরপুর হয়ে যায়। এমন বেগতিক আর ভয়ানক পরিস্থিতি দেখে সালভাদোরের মাথায় একটি বুদ্ধি আসে। সরঞ্জামে ভরপুর ভারী নৌকাটির ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় আলভারেঙ্গা।

যেই ভাবা সেই কাজ, তার নৌকায় থাকা হাজার পাওন্ড ওজনের সরঞ্জাম আর দুপুর পর্যন্ত ধরা সমস্ত মাছ ফেলে দেন সমুদ্রে এবং নৌকা ঘুরিয়ে ফেলেন তীরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তার নিজ শহরের বন্দরে পৌছানোর জন্য রওনা দেন যেটি তাদের মুল অবস্থান থেকে প্রায় ৬ ঘন্টার দূরত্বে অবস্থিত চকোহুইতালে। তারপর তিনি তার বসকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানানোর জন্যে রেডিও করেন।

সন্ধ্যা নামার কাছাকাছি সময়ে তারা আবিষ্কার করে তাদের কিছুটা সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক বিশালাকার পর্বত যা তারা প্রথমে খেয়ালই করেনি। এটি দেখে আলভারেঙ্গা খুব দ্রুত তাদের গতিপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তার একটু পরই তাদের মোটরও আর কাজ করছিলনা। তারা তখন মাত্র ১৫ মাইল দূরে। আর তখনই হয় দুর্ঘটনা, তাদের মোটর বন্ধ হয়ে যায়। তারা উঠে পড়ে লেগে যায় মোটর পুনরায় চালু করতে। আলভারেঙ্গা মোটরের তার ধরে টান দেয় মোটরটি চালু করার জন্য কিন্তু বারবার যখন তার প্রচেষ্টা সফল হচ্ছিলনা এক পর্যায়ে তিনি খুব জোরেই টান দেন তারটি আর এতেই বাঁধে বিপত্তি। খুব জোরে টান পড়ায় মোটরের তার যায় ছিড়ে।

বৃহদাকার ঢেউ দেখে আলভারেঙ্গার মনোবলও অনেকটা ভেঙ্গে যায় আর সাথে সাথে তার বস উইলি কে রেডিও করে বলে, "উইলি! উইলি! উদ্ধার করতে চাইলে দয়া করে এখনই আমাদের উদ্ধার করতে আসো" ওপার থেকে জবাব আসে, "চিন্তা করোনা। আমরা এখনই আসছি, আমাদের জানিয়ে দাও তোমাদের অবস্থান এখন কোথায়?" কিন্তু ভাগ্যের কি নিদারুন পরিহাস! আলভারেঙ্গা তাদের অবস্থান কোথায় সেটি বলার আগেই তাদের একমাত্র রেডিওটি অফ হয়ে যায়। ঘুর্ণি বায়ু আর বৃহদাকার ঢেউ তাদের সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

দীর্ঘ পাঁচ দিন পর বাতাস কিছুটা কমে আসে। তখন তারা তীর থেকে প্রায় ২৮০ মাইল দূরে। এই অবস্থায় কারো সাহায্য ছাড়া আসলে তাদের নিজেদের কিছুই করার ছিলনা। যেখানে তীর থেকে কেউ মাত্র আধা মাইল দূরে গেলেই যাকে খালি চোখে আর খুঁজে পাওয়া যায়না সেখানে তখন তারা ছিল ২৮০ মাইল দূরে! আর এমন একটি অবস্থানে তারা ছিল যেখানে কোন নৌকাও মাছ ধরতে যায়না। যেন ছিল এক উভমুখী সংকট।

কর্ডোবা ভয়ে বারবার বলছিল, "আমাদের মৃত্যু সন্নিকটে" আলভারেঙ্গা নিজেও হয়ত বুঝতে পেরেছিল কিন্তু কর্ডোবাকে আশ্বস্ত করে বলে এমন কিছুই হবেনা, অতি শিঘ্রয়ই তাদের উদ্ধারের জন্য মানুষ আসবে। সুমুদ্রে অবস্থান করার সময় একেকদিন তাদের জন্য হয়ে উঠেছিল চ্যালেঞ্জময়। দিনের বেলা রোদের প্রখরতা, রাতের ঠান্ডা পরিবেশ তাদের করে ফেলেছিল কোণঠাসা। তারুপর তারা এতটাই ক্ষুধার্ত ছিল যে দিনটির বর্ননা দিতে গিয়ে আলভারেঙ্গা বলেছিল, "আমি এতটাই ক্ষুধার্ত ছিলাম যে আমি আমার নিজের হাতের আঙ্গুল কামড়াতে শুরু করি!"

দীর্ঘ চার দিন এভাবে অতিবাহিত হবার পর নেমে আসে বৃষ্টি। এটি ছিল তাদের জন্য অনেকটা মৃত্যুর  মধ্যে বেঁচে থাকার কিঞ্চিত আশার যোগাড়। সেই বৃষ্টিতেই তারা গোসল করে এবং তারা সমুদ্রেই পাচটি পানির গ্যালন ভেসে থাকতে দেখে। সেগুলো নিয়ে তারা সেগুলোতে বৃষ্টির পরিষ্কার পানি মজুদ করে রাখে। পাঁচ গ্যালন পানি দিয়ে তারা কোনমতে এক সপ্তাহ পার করতে পারবে।

দীর্ঘ ১১ দিন পর তাদের কাছে খাবার হিসেবে ছিল আলভারেঙ্গার হাতে ধরা একটি মাত্র টাইগার মাছ আর একটি কচ্ছপ। এমন পরিস্থিতিতে আলভারেঙ্গা সেগুলো কোনমতে মানিয়ে নিতে পারলেও কর্ডোবা পারছিলনা। আলভারেঙ্গা অনেক বুঝায় তাকে বেঁচে থাকতে হলে তাদের এখন এসব কাঁচা খাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু কর্ডোবা এসব মানতে নারাজ। সে অনেকটা অবচেতন মনেই বলতে থাকে তাঁকে কমলা কিনে দিতে। আলভারেঙ্গা বুঝতে পেরেছিল কর্ডোবার অবস্থা। তাই তাঁকে শান্তনা দিতে বলে এখন সুপারস্টোর বন্ধ, এক ঘন্টা পর খুলবে।দোকান খুললেই তোমার জন্য কমলালেবু কিনে দিব। তার কথা কাজে এসেছিল সেদিন। কর্ডোবা তার কথাগুলো বিশ্বাস করে ঘুমিয়ে পড়ে।

কয়েক মাস এভাবে সমুদ্রে অতিবাহিত হবার পর আলভারেঙ্গা নিজেই নিজের জন্য একটি দৈনিক রুটিন তৈরি করেন। তিনি প্রতিদিন সকাল পাচটায় উঠে যেতেন মাছ এবং কচ্ছপ ধরার জন্যে। এতদিনে তাদের মধ্যে হয়ে যায় খুব ভাল বন্ধুত্ব। তারা নিজেরা গল্প করে, গান গায়। সন্ধ্যার কথা, আলভারেঙ্গা আর কর্ডোবা সেদিন একটি পাখি শ্বিকার করে খেয়েছিল। এতে কর্ডোবা অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। পরে আলভারেঙ্গা বুঝতে পারে সে পাখির পাকস্থলীর অংশটুকু খেয়েছিল যার ভেতরে ছিল একটি বিষধর সাপ। খুবই কষ্টকর ভাবে সময়গুলো অতিবাহিত করতে হয়েছিল কর্ডোবার। 

আরও দুই মাস এভাবে অতিবাহিত হয়। কর্ডোবার শরীর এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল তাঁকে দেখলে মনে হত যেন এক জিবন্ত কঙ্কাল। তার হাতগুলো দেখলে মনে হত যেন চিকন কঞ্চি। দেখলে যে কেউই বলত এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে তার দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়াই ভাল। হঠাৎ কর্ডোবা বলে উঠে, "বিদায় চাঞ্চা"। চাঞ্চা ছিল আলভারেঙ্গার ডাকনাম। কথাটি শুনে আলভারেঙ্গা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলে এভাবে নিজেকে হত্যা করোনা। এরপর তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এবং গান শুনায়, আস্তে আস্তে কর্ডোবা ঘুমিয়ে পড়ে। 

আলভারেঙ্গারও খুব মায়া হচ্ছিল কর্ডোবার প্রতি। কেন তার এমন সিদ্ধান্তে এক নওজোয়ানের জীবন যায় যায় মতন অবস্থা? কিন্তু অন্তিম সময়টুকুও চলে আসে কর্ডোবার জিবনে। কয়েকদিন পর কর্ডোবা তার প্রিয় বন্ধু আলভারেঙ্গাকে বিদায় জানিয়ে দেয় এবং বলে, "আমি চলে যাচ্ছি" আলভারেঙ্গা পাগলের ন্যায় চিৎকার করছিল আর বলছিল, "আমাকে একা ফেলে তুমি চলে যেওনা"। কিন্তু কর্ডোবা শুনেনি তার কথা। সেদিনই আলভারেঙ্গাকে একা ফেলে এই নিষ্ঠুর পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সে। চিৎকার দিয়ে কাঁদেন সেদিন তাঁর বন্ধুর জন্য কিন্তু তাঁর কান্না কেউ শুনার মতনও ছিলোনা ।

হয়ত বিধাতা এটাই চেয়েছিলেন। নিজের একমাত্র সঙ্গীকে হারিয়ে আলভারেঙ্গা অনেকটা পাগলপ্রায়। এজন্য কর্ডোবার নিথর দেহটিকে রেখে দিয়েছিলেন তারই সাথে। মাঝে মাঝে তিনি অবচেতন মনে কথাও বলেছিলেন তাঁর সাথে, যেমনকি স্বর্গ থেকে শুনতে পেয়ে তাঁর কথার জবাব দিচ্ছিল কর্ডোবা!   

"কেমন আছো চাঞ্চা?"
"ভাল আছি। ওপারে কেমন আছো, কর্ডোবা?'
"আমিও ভাল আছি। মৃত্যুর পরের জীবন অনেক আনন্দময়, জানো? তুমিও চলে আসো"
"না! আমি এখন মরতে চাইনা। আমি আমার ফাতিমা কে দেখতে চাই।"
এভাবেই আচমকা ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর।

Getty ImagesGetty Images

দিনরাত শুধু একমাত্র মেয়ে ফাতিমার কথা মনে পড়ত। তাঁর মেয়ের বয়স এখন ১৪ বছর। কতদিন হয় তাঁকে দেখেন না! এভাবে অতিবাহিত হচ্ছিল দিনগুলি। ৬ দিন পর কর্ডোবার দেহকে পানিতে ভাসিয়ে শেষ বিদায় জানিয়ে দেন আলভারেঙ্গা। 

হঠাৎ  একদিন তিনি একটু আশার আলো দেখতে পান। তাঁর পাশ দিয়েই যাচ্ছিল কন্টেইনারবাহী জাহাজ। জাহাজটি বরাবর তাঁর সামনে দিয়ে আসছিল, যদি তিনি তাঁর নৌকা না সরান, তাহলে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া জাহাজটি তাঁর নৌকাকে দুই টুকরা করে চলে যাবে।নৌকাকে কোনমতে পাশ কাটিয়ে আলভারেঙ্গা চিৎকার দিয়ে তাদের কাছে সাহায্য চায়।

সৌভাগ্যবশত তাঁকে জাহাজের লোকেরা দেখতেও পায়। কিন্তু না! তাঁকে দেখতে পাওয়ার পরও কিন্তু কেউ তাঁকে উদ্ধার করার জন্যে মানুষ পাঠায়নি। আলভারেঙ্গা চিৎকার দিয়ে তাদের বলে, "তোমাদের কি মনে হয়, আমি ইচ্ছা করে করছি এসব তোমাদের সাথে? বাঁচাও আমাকে। আমি আমার বাড়ি যেতে চাই"। কিন্তু না! অনেক চিৎকার করে সাহায্য চেয়েও সেদিন তাঁকে উদ্ধার করেনি কেউ। আশায় গুড়োবালি।

প্রায় ১১ মাস অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে সমুদ্রে। আলভারেঙ্গা তখন শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনেক দুর্বল। খেয়ে না খেয়ে দিন অতিবাহিত করেন। গায়ে শুধু একটি মাত্র ছেঁড়া কাপড়। দিনটি ছিল ৩০শে জানুয়ারি, ২০১৪ সাল। তাঁর নিজ শহর থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূরে তখন তাঁর অবস্থান। তিনি সমুদ্রে ভাসমান কিছু নারিকেল দেখতে পান। পরে আশে পাশে তাকিয়ে আবিষ্কার করেন অনেক দূরে একটি দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। আনন্দে নেচে উঠেছিল আলভারেঙ্গার মন।

কিন্তু সেখানেও বাঁধে বিপত্তি। তাঁর নৌকার সামনে ঘুরাঘুরি করছিল মাঝারি আকৃতির হাঙ্গর। হাতে ধারাল কিছু ছিলোনা বিধায় বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিলনা তাঁর।  দ্বিপটিতে পৌছাতে প্রায় আধা দিন লাগে আলভারেঙ্গার। তীর থেকে মাত্র ১০ ফুট দূরে তখন আলভারেঙ্গা, আর তর যে সয়না! নৌকা থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে যান তিনি এবং সাগরের ঢেউ তাঁকে নিয়ে যায় তীরে।
দ্বীপে পৌঁছানোর পর সর্বপ্রথম নিজ হাতে কিছু মাটি হাতে নেন, এরপর মাথা দিয়ে রাখেন বালুচরের উপর। এভাবেই তিনি বেহুশ হয়ে পড়ে থাকেন বালুচরেই।      

আলভারেঙ্গাকে সেখান থেকে উদ্ধার করেন এক দম্পতি যারা এই দ্বীপে একা বাস করতেন। দ্বীপটি ছিল দক্ষিণ মার্শাল আইল্যান্ডের ইবন এটোলে। ভাগ্য যে কিছুটা সহায় হয়েছিল তাঁর সাথে সেদিন, তাই হয়ত এই দ্বীপেই আসেন তিনি। নাহয় যে বেঁচে থাকার জন্য তাঁর উঠতে হত সেখান থেকে আরও তিন হাজার মাইল দূরে, ফিলিপাইনে!  

দীর্ঘ ১১ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ্য হয়ে উঠেন আলভারেঙ্গা এবং রওনা দেন এল সালভাদোরের উদ্দেশ্যে, নিজের বাড়িতে তাঁর একমাত্র মেয়ে ফাতিমাকে দেখার জন্য। অবশেষে চলে আসে সেই আনন্দের মুহুর্তটি।

CNN.comCNN.com


ফাতিমাকে দেখতে পান আলভারেঙ্গা, সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি আর নেই এই দুনিয়াতে, হারিয়ে গিয়েছেন সমুদ্রে। জড়িয়ে ধরেন তাঁর আদরের মেয়ে ফাতিমাকে আর বলেন, "বেশি ভালবাসা স্বত্তেও হয়ত আমি তোমাকে তেমন কোন কিছুই শিখাতে পারিনি, কিন্তু আজ আমি তোমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিয়ে যাব যাতে তুমি লড়াই করে চলতে পার ভুলের বিরুদ্ধে"। কথাগুলো তখন ফাতিমা শুনেছিল কিনা বলতে পারেন না তিনি, কিভাবে শুনবে? পিতাকে দীর্ঘ ৪৩৮ দিন না দেখে পাগলপ্রায় ফাতিমাও যে তার পিতাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতন।

আর এভাবেই শেষ হয় প্রায় ৪৩৮ দিনের ভয়ানক এক সমুদ্র যাত্রা। সাতদিনের আয় একদিনে কামানোর লোভ সামলাতে না পেরে হারিয়ে বসেন জিবনের ৪৩৮ টি দিন এবং প্রিয় বন্ধু কর্ডোবাকে।

৪৩৮ দিনের এই সুদীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার কাহিনীই বলে দেয় কিভাবে কেটেছিল আলভারেঙ্গার দিনগুলি। আর তাই হয়ত পৃথিবীর ইতিহাসে জায়গা করে নিলেন একইসাথে অত্যন্ত অভাগা আবার অত্যন্ত ভাগ্যবান এই ব্যক্তিটি।   


তথ্যসুত্রঃ রিডার্স ডাইজেস্ট