‘সার, আর বাঁচন নাই, আপনার লাই হগ্‌গলতে আইজ দইরায় ডুইবা মরলাম’। ঝড়ের গর্জনের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের বোটের মাঝি বিলাপ করে চলেছেন, ‘আল্লারে , মরলে আমার এতিম পোলারে তুমি দেইখো’। তাঁর বিলাপের সব আকুতি আল্লার দরবারে, আর সংগত কারণেই, সব গালমন্দ আমার বরাবর। আমিই তাকে সাগরে নামিয়েছি আবার এখন বলছি, ‘ খবরদার, বোট ঘোরাবেন না, ঝড়ের দিকে গলুই রেখে টপ-স্পিডে চালিয়ে যান। এভাবে চললে আমরা বেঁচে গেলেও যেতে পারি; এদিক-ওদিক করলে তুফানের ঝাপটা বোটের পাশে লেগেছে কি মরেছেন’। বাঁচতে হলে বোটের গলুই যে ঝড়-মুখো রাখতে হবে সে ব্যাপারে মাঝির দ্বিমত নেই; কিন্তু ঘুটঘুটে আঁধারে এভাবে বোট চালিয়ে আমরা যে ক্রমেই উত্তাল সাগরে গিয়ে পড়ছি, শঙ্কাটা তাঁর সেখানে।

টাঙ্গুয়ার হাওড়ে ইনাম আল হকটাঙ্গুয়ার হাওড়ে ইনাম আল হক

তুফানের তোড়ে বোট কখনও ডানে কখনও বাঁয়ে হেলে পড়ছে, মনে হয় এই গেল, আর বাঁচবে না। বন বিভাগের বোট, ড্রাফট ছোট, কেবিন বড়, ঢেউয়ের ঘায়ে টলমল; নিস্তরঙ্গ নদী-বিহারে বাবুদের নিয়ে গেলে ভালই চলে, সাগরে বড়ই কাবু। পাখি-পর্যবেক্ষণের কাজে সাত দিনের জন্য আমরা ধার নিয়েছি এ বোট। চার মাঝি-মাল্লা সুন্দরবনের অগুনতি গাঙ, খাল আর ভারানিগুলো ভাল চেনে না। আমিসহ আর দুই পর্যবেক্ষকের অবস্থা তথৈবচ, বড় পাঁচ গাঙ আর এক ডজন পাখি-সমৃদ্ধ খাল ছাড়া সবই অচেনা। তবে চতুর্থ পর্যবেক্ষক খসরু চৌধুরী সুন্দরবনের আঁতিপাঁতি জানেন। পাঁঠাকাটা খালে ঢুকে বেতমোড় চ্যানেল হয়ে কটকা যাওয়ার জটিল পথটা তিনি চেনেন বলেই আমরা শ্যালাগাঙ ধরে দক্ষিণে এসেছিলাম। কিন্তু দুপুর নাগাদ তিনি প্রান্তে এলাম; জ্বরের ঘোরে পাঁঠাকাটা খাল চিনতে পারলেন না। দিনের শেষে আমরা শ্যালাগাঙের শেষ প্রান্তে এলাম; এবং পুরো এক দিনের পথে ফিরে যাওয়ার চেয়ে ঝুঁকি নিয়ে সাগরে ঢুকে ডুবোচর ঘুরে কটকা যাওয়ার হটকারী সিদ্ধান্ত নিলাম।

ছাপরাখালির কেওড়া-বন ছাড়িয়ে আমরা যখন সাগরে পড়েছিলাম তখন জোর বাতাস ছেড়েছে। হালকা মেঘ দিগন্ত ঢেকে আগাম সন্ধ্যা নামিয়েছে। তবু মনে আশা, আঁধার ঘন হওয়ার আগেই আমরা কটকা পৌছাব। কটকা এখান থেকে ১০ কিলোমিটার পুবে; তবে ডুবোচরের জন্য সোজা যাওয়া যাবে না, সাগরে ঢুকতে হবে। ততক্ষণে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে আর ঝোড়ো হাওয়া বইছে। এর মধ্যেই অনেকটা সময় আমরা দক্ষিণে চলেছি; পুব-মুখো হতে পারি নি, হলেই বোট চরে ঠেকে যায়। কুল হতে দুরত্ব যত বাড়ছে, ঝড় ততই প্রবল আর সাগর উত্তাল হচ্ছে। বাঁচতে হলে কূলে ফিরতে হবে; কিন্তু বোট ঘোরাবার উপায় নেই, ঘোরাতে গেলেই বাতাসের ধাক্কায় বোট শুয়ে পড়ে। এক দফা ডুবতে ডুবতে বেঁচে যাওয়ার পর আমরা বোট ঘোরাবার চেষ্টা ছেড়েছি। সরাসরি ঝড়ের দিকে তাক করে বোট চলছে; আশা আছে কোন সময় আধা মিনিটের জন্য বাতাসের বেগ কমলে দ্রুত ইউ-টার্ন করব।

পাখির খোঁজেপাখির খোঁজে

বৃষ্টি আর বাতাসের চাঁটি খেয়ে বোটের ছাদে আমরা দুই প্রাণী প্রায় কুপোকাত, মাঝি-ভাই হালের-খুটি ধরে ঝুলে আছেন, আমি পানির ট্যাঙ্ক আঁকড়ে পড়ে আছি। বোট যতবার ডুবুডুবু হয়, ভয়ার্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে মাঝিকে অভয় দিই, ‘ভয় নাই ভাই, এখনই তুফানের তেজ কমে যাবে’। ঝড়ের দাপট বেড়েই চলে, আর বাড়ে মাঝির বিলাপ। জানিনে কেবিনের মধ্যে আমার তিন বন্ধু আর ইঞ্জিন-রুমে তিন মাল্লার কি হাল; ঝাল-মুড়ি মাখানোর কৌটায় চীনাবাদামের চেয়ে ভাল হয়তো নয়। ঢেউয়ের চুড়ায় বোট উঠে গেলে দূরে শ্যালার চরে বন-অফিসের বাতি চোখে পড়ে, বুঝতে পারি আমরা এখনও গহিন সাগরে হারিয়ে যাই নি।

সাগরের রোলার-কোষ্টারে অন্তহীন ফ্রি-রাইডের পর এল কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন, বাতাসের বেগ এক ধাপ নামল। মাঝি মাথা তুলে বললেন, ‘সার, ঘুরাই ফালাই?’ মুখের পানি মুছে হাঁ বলার আগেই বোট ঘুরে উত্তরমুখো হলো; পারফেক্ট ইউ-টার্ন। এখন জোয়ার আর ঝড় মিলে বোট ঠেলে দিচ্ছে ডাঙ্গার দিকে। বোটের বাতিতে দূরে দেখা দিল কেওড়া-বন। অবশেষে আমরা শ্যালাগাঙে ফিরে এসে কালামিয়ার ভারানিতে নোঙর ফেললাম। অবিশ্বাস্য হলেও দেখা গেল বোটের সবাই, সব কিছু ঠিকঠাক আছে! না, সব কিছু নয়; মাঝি বললেন, ‘আমার পোলার ফটুডা ভিজি শ্যাষ’।