“The mountains are calling and I must go.” — John Muir

শনিবার সকাল সাতটাই অ্যালার্ম বেজে উঠলো। আগের দিন রাতে হাইকিং ব্যাগে সব জরুরি জিনিস পত্র যেমন হ্যান্ড -গ্লাভস , কানটুপি, জ্যাকেট (যদিও এখন সামার কিন্তু মাউন্টেনকে কখনো অবজ্ঞা করতে নেই ) সানস্ক্রিন, পানির বোতল, বেয়ার স্প্রে (Bear Spry)। ভাল্লুকরা শীতের দীর্ঘ ছয়মাসের শীতযাপনতা (Hibernation) থেকে এখন জেগে উঠা শুরু করেছে। সুতরাং বেয়ার স্প্রে সাথে নেয়া নিতান্ত জরুরি।

আর সব চেয়ে জরুরি জঙ্গলের মধ্যে যেসব জায়গাই ভাল্লুকের বিচরণ থাকে সেসবখানে চলার সময় কিছু ক্ষন পরপর আওয়াজ করা কিংবা গান করা । হয়তো কোনো একদিন হয়ে উঠতে পারেন জাতীয় পর্যায়ের সংগীত -শিপ্লী , বনে- জঙ্গলে ভাল্লুকের ভয়ে গাইতে গাইতে বড় গায়েন। দল বেঁধে যাওয়া অনেকটা নিরাপদ , এবং গল্প (আওয়াজ) করে করে যাওয়া, এতে ভাল্লুকরা ভয়ে পেয়ে কাছে আসা থেকে বিরত থাকে। ইদানিং পর্বতে যাচ্ছি এক পর্বত -পাগল মানুষের সাথে , বয়েস ৪৫। নাম এন্ডি (Andi Kosasih), ঘন্টার পর ঘন্টা কেবল পর্বত নিয়ে আমাদের আলাপ চলে। আগেই ঠিক করা হয়েছে সকাল আটটায় আমরা ম্যাকডোনাল্ড কফি শপে মিট করবো , আর ওখানে থেকে এক গাড়িতে রওনা দিবো এই হৃদ-পর্বতে (হার্ট মাউন্টেন) । হার্ট-মাউন্টেন (হার্ট মাউন্টেন) ক্যালগারি শহর থেকে ৪৫ মিনিট ড্রাইভ ,যারা এই মাউন্টেন এ আসতে ইচ্ছুক – ওনাদের জন্য বলছি, Trans-Canada Highway ধরে আসতে থাকবেন এবং Exit 115 নিবেন, এবং সাইন দেখতে পাবেন হার্ট ক্রিক মাউন্টেনের ।

পাহাড়ী ফুলপাহাড়ী ফুল

গাড়ি পার্ক করে ,ট্রেইল ধরেই ডুকে পড়লাম সবুজের মধ্যে। বছরের এই সময়টাতে অপূর্ব সবুজ চারদিক । রৌদ তেমন ছিলনা কিন্তু বেশ সতেজ চারপাশ। বাতাসের জোরালো শব্দে সুর খুঁজার চেষ্টা করছিলাম, সবুজের গাঢ়ত্বকে চোখের দৃষ্টি দিয়ে টেনে মনের কুটুরে বন্দি করে রাখতে চাচ্ছিলাম যাতে সবুজ কেবল সবুজ হয়ে থাকবে অনন্ত সময়ের জন্য। দুপাশে গাছ , আর পথপাশে ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার (Wild-Flower) এরই মাঝে এই পথ চলা - আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ। ফুল দেখতে সুন্দর , কিন্তু সব ফুল মায়াবী হয়না। মায়াবী হয় পাহাড়ি ফুল । স্বেচ্ছায় ফুটে , আনন্দ ছড়িয়ে হারিয়ে যায় প্রকৃতির ঋতুচক্রে। এই রকম এক পাহাড়ি ফুলের দেখা মিলল। নাম Indian Paintbrush রকি মাউন্টেনে ঝড়ে পড়া ছোট ছোট রক, এবড়ো থেবড়ো ঝরে পড়া পাতা , মাঝে মাঝে পাইন গাছের শিকড় ট্রেইলটাকে একটা বিচিত্র রূপ দিয়েছে।

পর্বতপর্বত

সুন্দর কানানাস্কি (Kananaski) শহরকে পিছনে রেখে উপরের উঠে চলছি পাহাড় বেয়ে । পিছন ফিরলেই পুরো শহরটাকে দুচোখে দেখতে পাচ্ছি। মাউন্টেনটা বেশ খাড়া । যারা শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ে চিন্তিত তাদের মেদ বুড়ি একাকার করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার জন্য এই রকম পাহাড়ের তুলনা নেই । যত উপরে উঠছি ততই চারপাশের উঁচু উঁচু পাহাড়গুলো দৃশ্যমান হচ্ছে পাহাড়ে সাথে চোখ-চোখি এক পকলে চেয়ে থাকি । রকিজের ট্রি - লাইন (Tree-Line) ছেড়ে শুরু হলো স্ক্র্যাম্বিলিং (Scrambling)। পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে এবড়ো থেবড়ো পড়ে থাকে হাজার-হাজার লাখ-লাখ কোটি-কোটি পাথরের টুকরো । এ পাথরের টুকুরোর উপর হেঁটে হেঁটে উপরে উঠাকে স্ক্র্যাম্বিলিংবলা হয় । এতে শরীরের অনেক পরিশ্রম হয় ,পা থেকে পাথর খসে যায়,তাই স্ক্র্যাম্বিলিং ডিফিকাল্ট হয়ে পড়ে। কতক্ষন স্ক্র্যাম্বিলিং করছেন , কতটুকু উপর পর্যন্ত করছেন ,কতটা খাড়া এসবের পর ভিত্তি করে পাহাড়ের ডিফিকাল্টিজ নির্ধারণ করা হয় । এই হার্ট মাউন্টেনটা বেশ ডিফিকাল্ট গোছের। যদিওবা আমার আগে দুবার আসা হয়েছে . অ্যান্ডির এ প্রথম। স্ক্র্যাম্বিলিং করতে করতে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে এক পযায়ে আমরা আর উপরে উঠার পথ খুঁজে পাচ্ছিলামনা । বিশাল একটা পাথরের দেয়াল কয়েক শত ফুট। এই দেয়াল ঘেঁষে উপরে উঠা সম্ভব না। একটু পথের নাগালের জন্যে পাথর ধরে দেয়াল ঘেসে উপরে উঠলাম । কিন্তু অনেক বিপদজনক।

পাথরেও ফুল ফোটেপাথরেও ফুল ফোটে

পথহারা পথিক কিসের সন্ধানে মৃত্যুরপথ খুঁজো তুমি। নাহ, এই রিস্ক নেয়া যাবেনা। কিন্তু এই হার্ট-মাউন্টেন নিয়ে যখন পড়ছিলাম, জানতাম পাহাড়ের চূড়ায় যাবার একটা পথ রয়েছে ।কিন্তু কোনো ভাবে সেই পথটা খুঁজে পাচ্ছিলামনা সেসময় । কথিত আছে - পাহাড়কে অবজ্ঞা করতে নেই । শুরু তুমুল তুষার ঝড় - এই রকম একটা গ্রীষ্মের সময়ে এবং সাথে আইসরেইন । আর দুইজন পাহাড় চূড়ার নেশায় মত্ত । পর্বত-আরোহীদের তৃপ্তি মেটেনা যদি পাহাড় চূড়ায় যেতে না পারে। সুনীলের কবিতার মতো এখানে আমার কোন অহঙ্কার নেই। এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে। এই ক্ষমা চাইতে যাওয়া একটা জয়। জয়ের আনন্দে বিহ্বল হতে চাই। জানতাম উপরে উঠার কোথাও একটা নিদর্শন আছে । সে নিদর্শন পাবার লোভে দুই লোভী আবার পাহাড় বেয়ে নিচে নাম শুরু করলাম। নিচে নামতে নামতে হঠাৎ দেখলাম দূর থেকে একটা লোক কমলা রঙের ব্যাকপ্যাক নিয়ে একটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে বাঁক নিচ্ছে। ওহে কমলা ব্যাগ,তুমি দিয়েছো আমায় পূর্ণ করে কোমলিত হলো হৃদয় আমার,পাহাড় চূড়ার সন্ধানে ইয়েস! পেয়ে গেলাম চূড়ায় উঠার পথ। তুমুল ঝড় ,তুমুল তুষারের ঝাপ্টা গালে ,মুখে লাগছে । প্রচন্ড ব্যথা। জানিনা কিসের সাথে তুলনা করবো কিন্তু লাগছে বেশ।শুধু কাছের পথ ছাড়া চার- পাশে আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলামনা . শীতের কাপড় না আন।তে প্রচণ্ড ঠান্ডা। আউলা বাতাসে বাউলা চুলে বরফ লেগে জমে গেছে , বরফ সরাতে পাচ্ছিলাম না চুল থেকে। ভাগ্যের পায়ে দুর্বল প্রাণে ভিক্ষা না যেন যাচি। কিছু নাই ভয়, জানি নিশ্চয় তুমি আছ আমি আছি। মৃত্যুপথে এই রবিদা ঢুকে পড়ছে । রবিদা একদম বাঙালির রন্দে রন্দে ঢুকে বসে আছে। রবিদার চিন্তা বাদ দিতেই বুঝতে পারলাম তুষাঝড়ে কাপড় ভিজে শেষ, দু-পা বুটের মধ্যে সাঁতার কাটছে। আর শীতে শরীর অবশ হয়ে আসছে। The child is grown The dream is gone I have become comfortably numb. Ego! বাংলা শব্দটা জানিনা । পর্বত-আরোহীদের এই Ego র সাথে ওয়েদারের একটা বোঝা-পড়া দরকার। আমাদের Ego আমাদেরকে চতুর্থ চুড়াই টানছে । কিন্তু মন আর শরীর যুদ্ধে শরীরের পরাজয়য়ে অগত্যা নামা শুরু করলাম। প্রচন্ড তুষারপাত হওয়ায় ট্রেইল-এর নিশান খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছিলো । আমার বন্ধু এনডি তার মাউন্টেন GPS ব্যবহার করে পথ খুঁজার চেষ্টা করছে। দুইজনই তীব্র ঠান্ডার তীব্র যন্ত্রনায় ভুগছি। দ্রুত নামবার চেষ্টা করছি, আর অন্য দিকে বাতাস একেবারে উড়িয়ে নিচ্ছে আমাদের। এভাবে চলছিল দুই-তিন ঘন্টা আমাদের নিচ্ছে নামার তাড়া। হাতের আঙ্গুল একদম অবশ। বুঝতে পাচ্ছিলাম না এইটা কি আমার আঙ্গুল। এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছ আমার অস্তিত্ব? পাচ্ছ না? তোমার জন্ম চোখে শুধু ভুল আকার, ওটা নয়, ওটা চুল। এই হলো আমার আঙ্গুল, এইবার স্পর্শ করো,---না, না, না, থরথর কাঁপছিলাম। এভাবে আমরা ফিরে এলাম অবশেষে। প্রচণ্ড বৃষ্টিও শুরু হলো। হয়ে যাক কষ্টের সাথে বৃষ্টিবিলাস। গাড়িতে এসে সাথেসাথে ভিজা কাপড় চেঞ্জ ! শরীরের অবস্থা স্বাভাবিক হতে ৩০-৪৫ মিনিট সময় লেগে গেল। অবশেষে Drive-Thru দিয়ে একটা হট-চকলেট। কী অমৃত সুধা পান করিলাম আজ তোমাকে ছুঁতে যেয়ে ।

তুষার মানবতুষার মানব

Heart Mountain, আলবার্টা ঠিক দক্ষিণে বো- নদীর (Bow-River) উপত্যকায় অবস্থিত একটি পর্বত । পাহাড় চূড়ায় তার সুন্দর হৃদয় আকৃতির জন্য হার্ট-মাউন্টেন নাম দেয়া হলো। কিন্তু আজকে এই আবহাওয়া অতি যত্নে তাকে পাহারা দিয়ে রেখেছে। একসময় হয়ত বলে উঠবে ওঠ্ ছুঁড়ি! তোর বিয়ে......।

উচ্চতা: ২১৩৫ মিটার (৭০০৩ ফুট) উচ্চতা লাভ (Elevation Gain) : ৮৭৫ মিটার (২৮৭০ ফুট) Best Season to Scramble: মে - অক্টোবর