দুই বছর আগে , নেপালি দৌড়বিদ মীরা রাই কাঠমুন্ডুর একটু বাইরে , সীভাপুরি নাগারজুন জাতীয় উদ্যানে দৌড়াতে গেলেন।  যখন তিনি পাহাড়ী পথ ধরে এগুচ্ছিলেন , তিনি কয়েকজন দৌড়বিদের সাথে মিলিত হলেন এবং তাদের সাথে কিছুক্ষন দৌড়ালেন , কথা বললেন এবং হাসলেন।  তারা তাকে কিছুদিন পরে আসতে বললেন, যেটাকে তিনি প্রশিক্ষণ দৌড় ভাবলেন।  যখন তিনি আসলেন , দেখলেন এটা আসলে একটি প্রতিযোগিতা - the Kathmandu West Valley Rim 50K – যা শুরু হতে চললো।

 

 

রাই কখনো পাহাড়ি দৌড়ে অংশ নেননি।  সে ভোজপুরের একটি পর্বতময় গ্রাম থেকে এসেছেন , যেখানে তার পরিবার পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করে।  শৈশবকালে , সে ছাগলের পিছনে ছুটেছেন, জ্বালানীকাঠ সংগ্রহ করেন, ২০ কেজি ওজনের চালের বস্তা বয়েছেন এবং পানি আনতে পর্বতে উঠানামা করেছেন।  সে একটি ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখেছেন, কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকায় বেড়ে উঠায় সুযোগ ছিলো না, বিশেষকরে মেয়েদের জন্য।

‘’সাধারণত এখানে কোন সুযোগ নেই’’, রাই বলেন, যেকিনা বার বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেন, ‘’ কেউ মেয়েদের পড়ার সুযোগ দেন না, মেয়েদের পড়ার খুব সময় নেই।’’

তাই যখন তার বয়স ১৪ মাওবাদী বিদ্রোহীরা তাদের গ্রামে এলো, সে তাদের সাথে যোগ দেয় এবং নেপালের জঙ্গলে দুই বছর প্রশিক্ষণ নিয়ে কাটায়।  যদিও সে বাড়ী ফিরে আসে কিন্তু তার মন বসছিলো না।  সে কাঠমুন্ডু আসে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে কারাতে গুরুর কাছে শিখতে, কয়েকটি দৌড়ে অংশ নেন, এবং কাজের খোজ করেন, কিন্তু খুব কমই সফল হোন।  যখন তার টাকা আর আশা শেষ হয়ে যাচ্ছিলো, সে নিজেকে একটি বড় পাহাড়ি পথে দৌড়ের স্টার্টিং লাইনে খুঁজে পেলো।

অন্য দৌড়বিদের থেকে সে আলাদা কারণ তাঁর খাবার নেই, অথবা দৌড়ের আধুনিক সরঞ্জামাদি।  ৩১ কিমি রাস্তা পাথর, কাদা, বৃষ্টি ইত্যাদিতে ভরা।  এটি মীরার পূর্বেকার দৌড়ের চাইতে অনেক বেশি, এবং সে এমন ক্লান্ত আর কখনো হয় নি।  মজার কথা হলো মীরা একমাত্র নারী যে দৌড়টি শেষ করেছে। 

“ জঘন্য এই ট্রেইলটি শেষ করে সে প্রমাণ করলো তাঁর মধ্যে বিশেষ কিছু  আছে”, নেপালের কাঠমুন্ডু ভিত্তিক ট্রেইল রানিং এর প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড বুল বললেন।  অবশেষে , বুল মিরার থাকা, খাওয়া, ভিসা এবং দৌড়ে অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।  পরের বছর সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দিলেন ২৭ বছর বয়সী এক নারী যিনি কিনা এমন জায়গা থেকে এসেছেন যেখানে নারীরা তেমন একটা খেলাধুলা করেন না।  ২০১৫ তে, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক দৌড় মঞ্চে পৌঁছানোর পর, মীরা অর্জন করলেন অসাধারণ পুরষ্কারঃ Skyrunning World Championships এ দ্বিতীয় স্থান।

অনেক মানুষের বিশ্বাসই আমাকে সুযোগ নিতে উৎসাহী করেছে, এবার আমি তাদের সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিতে চাই যাতে অন্যরাও সুযোগ নিতে পারে। মীরা রায় , অ্যাডভেঞ্চারার অব দ্য ইয়ার

২০১৬ তে, মীরা দৌড় চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, ছিড়ে যাওয়া লিগামেন্ট তাকে সার্জনের ছুরির নিচে পড়তে বাধ্য করে।  তাই দৌড়ানোর বদলে তিনি অন্যদের উৎসাহিত করতে মনস্থির করেন। তাই তিনি তাঁর নিজের গ্রামে প্রথম দৌড় প্রতিযোগিতা আয়োজন করেন।  তিনি যে সব বাচ্চাদের জুতা নেই তাদের জন্য ৯০ জোড়া জুতার ব্যবস্থা করেন এবং দৌড়ের সাথে জড়িত মানুষদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন, ইতালিতে দৌড়ের সময় পাস্তা বিক্রির টাকা, এবং তাঁর দৌড় নিয়ে বানানো মুভি , মীরা , যা  Banff Mountain Film Festival এ ফাইনালে উঠেছিল ।

 

 

মধ্য অক্টোবরের দিকে একশ থেকে বেশি মানুষ উৎসবে অংশ নিতে আসেন এবং ভোজপুরের শুষ্ক এবং তাপদগ্ধ এলাকায় ছোট একটি দৌড়ে অংশ নেন। মীরা ১৫-৩৫ বছর বয়সী মানুষদের গোলমাল উপভোগ করলেন, পাহাড়ের ঢালে তাদের গর্জন, নামার সময় মজার হাসি, নতুন দৌড়ের আনন্দ পর্বতে আলোড়ন তুললো। তাদের মুখে আনন্দ তাকে জাগিয়ে তুললো।

“ এক কথায় মীরা কোনটা সম্ভব তা করে দেখালো” নিরাজ কারকি বলেন, যিনি একজন বন্ধু এবং নেপালের দুইবারের বিজয়ী পর্বত আরোহী। “ এমনকি সবচেয়ে খারাপ অবস্থা থেকে উঠে এসেও, যখন চেষ্টা করবেন তা সম্ভব হবে, সত্যিকারের প্রচেষ্টা এবং মানুষ একত্রিত হয় সুযোগ সৃষ্টি করতে। এবং এই সুযোগ তিনি ছড়িয়ে দিতে চান।”

 অ্যাডভেঞ্চারঃ আপনার নিজ গ্রামে ট্রেইল রানিং চালু করার ধারণা কিভাবে আসে?

মীরাঃ আমি সমগ্র নেপাল থেকে মেয়েদের ম্যাসেজ পাই যারা আমার মত হতে চায় , আমার মত দৌড়াতে চায়। কোন জায়গাতে না পৌঁছানোর চাইতে তারা কিছু একটা করতে চায়, যদি তারা, তেমন সুযোগও না পায়। আমি অনেক কিছু করতে সক্ষম হয়েছি কারণ অনেক মানুষ আমার বিশ্বাস রেখেছে এবং সুযোগ পেয়েছে এবং আমি তাদের প্রতিদান দিতে চাই। নেপালে আমাদের একটি কথা প্রচলিত আছে “Khana pugyos, dina pugos,” যার অর্থ , “ যদি আপনার পর্যাপ্ত খাবার থাকে তবে আপনার দেয়ার মত পর্যাপ্ত আছে”।

অ্যাডভেঞ্চারঃ আপনি এই দৌড় শেষ করে কি অর্জন করতে চাচ্ছেন? মানুষকে দৌড়ে উৎসাহী করা?

মীরাঃ অবশ্যই মানুষকে দৌড়ে উৎসাহী করা, এবং দেখুন যদি আমরা দৌড়বিদ পাই তবে আমরা সাহায্য করতে পারবো। নেপালে ক্রীড়াবিদদের জন্য স্পন্সর পাওয়া কঠিন ব্যাপার। শুধু তাই নয়, খেলাধুলাতে তেমন কোন সহায়তা নেই যাতে করে তারা চর্চা করতে পারে এবং পরিণত হয় এবং দৌড়ে অংশ নিতে পারে। এখানে ট্রেইল রানিং এর প্রতিষ্ঠাতারা ভালোই কাজ করেছেন, আমি অনেক সৌভাগ্যবান – আমি দৌড় শিখেছি এবং নেপালের বাইরে অনেক দৌড় উপভোগ করেছি। আমি চাই সবাই এই সুযোগটা পান এবং শুধু খেলায় সহায়তা নয় সাথে করে মেয়েদেরও খেলায় সহায়তা করা।

 অ্যাডভেঞ্চারঃ আপনি নেপালের নারীদের সুযোগের অভাবের কথা বলেছেন। এখানে নারীদের অবস্থানটা আসলে কেমন?

মীরাঃ সাধারণত, নেপালে আমার মত গ্রামের জীবনটা কৃষিভিত্তিক। নারীরা এখানে শুধু গৃহস্থালী কাজ, পরিষ্কার করা, এবং রান্নার কাজ করে পাশাপাশি গৃহপালিত প্রাণীর খাবার, আগুন জ্বালানোর কাঠ সংগ্রহ এবং প্রায়ই এই কাজ করতে অনেক দূর পাড়ি দেয়। সংক্ষেপে বললে নারীরা এখানে পুরুষদের চেয়ে বেশি কাজ করে। নারীরা জীবনকে কঠিন হিসেবে দেখে এবং এর বাইরে কিছু চিন্তা করে না, সকাল থেকে সন্ধ্যা কাজই করে যায়। আমার মা সারাক্ষণ বাসায় থাকেন, বাইরে গেলে কেবল বাজার পর্যন্ত, তাও হঠাত ।

অ্যাডভেঞ্চারঃ আপনি কেন মনে করেন খেলাধুলা নেপালের নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

মীরাঃ  অবশ্যই স্বাস্থ্য, কিন্তু নেপালের নারীরা বেশীরভাগ সময় বন্ধি থাকেন, বিশদভাবে বলতে গেলে গৃহস্থালী কাজের বাইরে তাদের কোন জীবন নেই।

শুধুমাত্র খেলাধুলার সুযোগের অভাব না বরং কোন কিছু করার আত্মবিশ্বাস নাই। আমার জন্য , খেলাধুলা আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং নিজেকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে এবং এটি সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলা শুধু দৈনিক কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা নয় কিন্তু বাধাধরা জীবন থেকে বিরতি এবং এটি বিশাল এক রোমাঞ্চ।

সাক্ষাতকারটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফি থেকে নেয়া। লিখেছেন - Kate Siber

উৎসঃ http://www.nationalgeographic.com/adventure/adventurers-of-the-year/2017/mira-rai-nepal-trail-runner/