শিরোনাম শুনেই বুঝতে পারছেন এইটা একটা শর্ট ট্রিপের গল্প। খুব আনপ্রেডিক্টেবল সিচুয়েশন থেকে হুট করে একটা ট্যুরের গল্প।

বাসায় বলে দিয়েছিলাম আর ঘুরতে যাবো না.. বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ চলে তাই পড়াশোনায় মন দিবো। মিড ব্রেকে বাসায় গেলাম। এলাকায় সাথের ছেলেপেলে মোটামোটি বাসায় যাওয়ার আগে থেকেই প্ল্যান করছে বান্দরবান যাওয়ার! আমার আবার ভালোই সুবিধে! ক্যাম্পাস আর এলাকায় একই টাইপের ট্রাভেলার বন্ধুবান্ধব আছে। যাবো না যাবো না বলে আসছিলাম বাসায় যাওয়ার পর থেকে। কিন্তু মাথায় ঘোরাঘুরির পোকাটা ঝিঝি করেই তো তাই ইচ্ছেটা ফেলে দিই নাই।

প্রথমে বগালেকের কথা থাকলেও সেখানে যেহেতু আমার যাওয়া হয়েছে তাই ওদের নাফাখুমের আইডিয়াটা মাথায় ঢুকিয়ে দিলাম। কিন্তু বললাম না আমি যাবো! শেষমেষ যেদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চিটাং এর ট্রেন রাত দুইটায় ওইদিন রাত ১১ টায় ঠিক করলাম যাবোই! ক্লাস-ল্যাব চুলোয় যাক!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চট্টগ্রাম পৌছাতে সকাল হলো। নেমেই খুঁজতে লাগলাম বান্দরবানের বাস কোথা থেকে ছাড়ে। আবিষ্কার করলাম চট্টগ্রাম স্টেশনের আশেপাশে কোন বাস কাউন্টার থেকেই বান্দরবান যায় না বাস। বান্দরবানের বাস ছাড়ে বদ্দারহাট থেকে। আমরা বদ্দারহাট না গিয়ে স্টেশন থেকে দুই কদম এগিয়ে গিয়ে কেরানীহাটের বাসে উঠে গেলাম। ভাড়া ১০০ টাকা, সময় লাগে ২ ঘন্টা। কেরানীহাট থেকে বান্দরবানের বাস পাওয়া যায়। ভাড়া ৩৫ টাকা, সময় লাগে ১ ঘন্টার কিছু বেশি। বান্দরবান পৌছে গেলাম সকাল ১০ টার দিকে। সেখান থেকে থানচি যাওয়ার বাসস্ট্যান্ড বললেই অটো নিয়ে যাবে। ভাড়া ১০টাকা। বাসস্ট্যান্ড এ গিয়ে নাস্তা করে ১১ টার বাসের টিকেট কাটলাম। বাসের ছাদে করে যাবো ৭জন। ছাদে হলেও ভাড়া কিন্তু এক টাকাও কম রাখেনি ওরা। ২০০ টাকা ভাড়া থানচি পৌছাতে লাগবে ৪ ঘন্টা। পরে বাসের ছাদে উঠে যখন বান্দরবানের আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা ধরে বাস একবার উপরে আরেকবার নিচে, একবার  পুরো ডানে আরেকবার বামে যেতে লাগলো বুঝলাম ২০০ টাকা খুব কমই নিয়েছে তারা। যারা প্রথম যাবেন থানচি অবশ্যই ছাদে করে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।থানচির যাওয়ার পথে বাসের ছাঁদেথানচির যাওয়ার পথে বাসের ছাঁদে

ছাদে গেলে বান্দরবানের আসল সৌন্দর্য্য চোখে পড়বে। বাসের ভেতরে অনেক গরম। খোলা চুলে হাওয়া লাগিয়ে বান্দরবানের বিউটি গিলতে গিলতে বিকেল সাড়ে ৩ টা নাগাদ পৌছে গেলাম থানচি।

থানচি থেকে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে শেষ বোট যায় বিকেল ৪টায়। বোটে উঠার আগে কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হয়। থানচি অফিস থেকে একটা ফর্ম নিতে হয় ১০০ টাকা দিয়ে, সেখানে পূরণ করে থানচি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে জমা দিয়ে আসতে হয়। এত কিছু করতে করতে আমাদের প্রায় ৫টা বেজে গেলো। পুলিশ গ্রীন সিগনাল দিয়ে দিলেও বিজিবি ছাড়তে নারাজ। তাঁদের কথা হলো এই সময় পানি কম, তার উপর থানচি থেকে রেমাক্রি যেতে মিনিমাম ৩ ঘন্টা লাগবে, সন্ধ্যা হয়ে যাবে, নৌকা পাথরে ঠেকে দূর্ঘটনা হতে পারে। আর নৌকার জার্নিটা একটা আলাদা আকর্ষণ এই নাফাখুম ট্রিপে। তাই সাঁঝের বেলা গিয়ে মিস করতে চাইলাম না।

থেকে গেলাম থানচি সেদিন রাতে। রুমভাড়া করলাম নৌকা ঘাটের কাছেই ১০০০ টাকায়।

বিজিবি ক্যান্টিনে রাতের খাবার ব্যবস্থা হলো। দুই পিস মুরগী, আলু ভর্তা, ডাল আর আনলিমিটেড ভাত গাইডসহ ৮ জন খেলাম। ১৫০ টাকা জনপ্রতি। বলতে ভুলে গেছি, থানচি থেকে নাফাখুম যেতে গাইড লাগবে দুইজন। প্রথম জন থানচি থেকে রেমাক্রি নিয়ে যাবে আর নিয়ে আসবে আপনাকে, প্রতি বেলায় তাকে দিতে হবে ৫০০ টাকা, কিন্তু আমাদের থেকে ১০০০ টাকা রেখেছে ভুলভাল বলে। আর ২য় জন রেমাক্রি থেকে নাফাখুম নিয়ে যাবে, নাফাখুম যেতে যেহেতু সময় লাগে ১.৫-২ ঘন্টা তাই রেমাক্রি থেকে যে গাইড নেয়া হয় তা সাধারণত ১ দিনের জন্যই নেয়া হয়,তাকেও  প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে দিতে হবে পরের দিনগুলার জন্য যদি আমিয়াখুম, ভেলাখুম, সাতভাইখুম যাওয়ার ইচ্ছে থাকে। তবে যদি সময় ৪-৫ দিন হাতে থাকে আমি মনে করি আমিয়াখুম, ভেলাখুম এইগুলো দেখে আসা ফরজ।

আরেকটা কথা, সমস্যা বাঙ্গালিতে। ওই যে বললাম ভুলভাল বলে ১০০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, আমাদের থানচির গাইড বাঙ্গালি ছিল, পুরোটা ট্রিপেই বহু ছলচাতুরীর চেষ্টা করেছে ব্যাটায়। যাই হোক, চেষ্টা করবেন মারমা গাইড নেয়ার।

রাতের ভুঁড়িভোজে ইচ্ছেমতো পেটপূজা করে নিলাম, সারাদিনের অভুক্ত কিনা। খেয়ে দেয়ে একটু সাঙ্গু নদীর তীরে বসলাম, ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। পুরো থানচি নিস্তব্ধ। এই নিস্তব্ধতার প্রেমে হাবুডুবু খাই প্রতিনিয়ত। ঘুরতে গেলেই মাথার উপরে চাঁদ খানা যে কোথা থেকে এসে পড়ে বুঝে উঠতে পারি না। অসম্ভব ভালোবেসে ফেলি হঠাৎ করে দেশটাকে আর এই পরিবেশটাকে।

অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসেছিলাম, গল্পগুজবে ভাটা পড়ছিলো না বিন্দুমাত্র। অনেকক্ষণ পর যখন বুঝতে পারলাম মশা রক্ত খেয়ে ঢোল হয়ে মরে পড়ে আছে তখন গা ঝাড়া দিয়ে রুমের দিকে পা বাড়ালাম। আমাদের রুমটা আবার বিশেষ একটা  রুম ছিল, এক পা ফেলা যায় এমন একটা সিড়ির ১০-১২টা ধাপ পার হয়ে দুইতলায় মাচাং টাইপের একটা রুম যেখানে ৮ জন ঘুমাতে পারে। আগামীকাল সকাল ৫টায় উঠতে হবে এই ভেবে হালকা আড্ডা শেষ করে প্রথম দিনের ইতি টেনে চলে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।

আমার ট্রেকিং এক্সপেরিয়েন্স মোটামোটি ভালোই বলা চলে, ২-৩ বছরের ট্রেকিং লাইফে দেশী-বিদেশী অনেক গাইডের সাথেই পরিচয় হয়েছে। থানচিতে এই প্রথম দেখলাম গাইড, ট্রাভেলার এর পরে ঘুম থেকে উঠতে! আমি ভোর ৫টায় উঠে গেলেও গাইড বাবাজী আসতে পাক্কা ১ ঘন্টা সময় নিয়েছে। একটা পানির বোতল কিনে উঠে পড়লাম নৌকায়, আগের দিনই ঠিক করে রেখেছিলাম যাওয়া-আসা প্রতি নৌকা সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। প্রতি নৌকায় ৪-৫ জন বসা যায়, এর বেশি বসতে দেয় না, আমাদের ৭জনের দুইটা নৌকা লেগেছিল।

নৌকা ঘাট, থানচিনৌকা ঘাট, থানচি

 

থানচি-রেমাক্রি নৌকাভ্রমন টা যে কারোরই স্মরণীয় হতে বাধ্য। চারপাশে সাদা পাথর ছড়ানো সাঙ্গু নদীর বুক চিড়ে লম্বা চিকন নৌকা যখন যাচ্ছিলো পানির উপর তখন কুয়াশা ছিল।থানচি-রেমাক্রি নৌকাভ্রমন টা যে কারোরই স্মরণীয় হতে বাধ্য। চারপাশে সাদা পাথর ছড়ানো সাঙ্গু নদীর বুক চিড়ে লম্বা চিকন নৌকা যখন যাচ্ছিলো পানির উপর তখন কুয়াশা ছিল।

 

হালকা শীত শীত আমেজে ভোর বেলার অপার্থিবতা অনুভবেই স্বার্থকতা ছিল নাফাখুম ট্রিপের। হালকা শীত শীত আমেজে ভোর বেলার অপার্থিবতা অনুভবেই স্বার্থকতা ছিল নাফাখুম ট্রিপের।

বড় পাথরের পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম হারিয়ে যাচ্ছিলাম পাথরের টেক্সচারে। নৌকার সাথে পাল্লা দিয়ে নৌকা সামনে চলে যাচ্ছিলো।

সকাল ৬:৩০ টায় থানচি থেকে রেমাক্রির পথে, সাঙ্গুতে নৌকা দৌড়. সকাল ৬:৩০ টায় থানচি থেকে রেমাক্রির পথে, সাঙ্গুতে নৌকা দৌড়.

বড় পাথরের রাজ্যে, মাঝি একটা পাথর দেখালো যার নিচের অংশে অনেকগুলো ছোট ছোট কলসির মতো হয়ে গেছে, তারা এই পাথরের নাম দিয়েছে কলসি পাথর।বড় পাথরের রাজ্যে, মাঝি একটা পাথর দেখালো যার নিচের অংশে অনেকগুলো ছোট ছোট কলসির মতো হয়ে গেছে, তারা এই পাথরের নাম দিয়েছে কলসি পাথর।

 

পানি কম থাকলে কিছু পথ নৌকা থেকে নেমে হেটে যেতে হবে। ম্যাক্সিমাম ৫ থেকে ১০ মিনিটের মত হাঁটতে হবে আবার নৌকায় উঠে যেতে হবে।পানি কম থাকলে কিছু পথ নৌকা থেকে নেমে হেটে যেতে হবে। ম্যাক্সিমাম ৫ থেকে ১০ মিনিটের মত হাঁটতে হবে আবার নৌকায় উঠে যেতে হবে।

 

ভীষণ রোমাঞ্চকর, ভয়ংকর কায়াকিং টাইপের এই বোট জার্নি শেষে সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ পৌছে গেলাম রেমাক্রি।রেমাক্রিতে মোটামোটি মারমা সম্প্রদায়ই বেশী।

 

সুন্দর ছোট একটা গ্রাম রেমাক্রি। পানির দুইপাশে চারটে মতো বাঁশের ঘর আছে।সুন্দর ছোট একটা গ্রাম রেমাক্রি। পানির দুইপাশে চারটে মতো বাঁশের ঘর আছে।

 

কালক্ষেপণ না করে কাধের ব্যাগগুলা রেমাক্রিতে থানচির ১ম গাইডের কাছে রেখে হাটা শুরু করলাম গলায় ক্যামেরা আর মাথায় গামছা পেঁচিয়ে।

 

ট্রেকিং শুরুর পথেট্রেকিং শুরুর পথে

 

ট্রেইল এট্রেইল এ

দূর্ভাগ্যবশত সবগুলো মোবাইল ফোন একটা কমন ব্যাগে রাখা ছিল বলে ট্রেকিং এর সময় ছবি তুলতে পারি নি, তবে আমার জন্য এটা সৌভাগ্যই বটে। চোখ জুড়ে শুধু প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্য্যধারা পান করতে করতে গিয়েছি পুরো পথ। নাফাখুমের ট্রেকিং বর্ষাকালে বেশ বিপদজনক হলেও গ্রীষ্মে এই পথের চেয়ে সহজ পথ হয় না। ৬ কিমি একদম ফ্ল্যাট পথ আরামসে ২ ঘন্টায় শেষ করা সম্ভব, আর যারা প্রো লেভেলের তাদের ১-১.৫ ঘন্টাতেই হয়ে যাবে।

 

গল্প করতে করতে কয়েকবার ঝিরিপথ পার হলাম কোমড় সমান পানিতে নেমে। বেশ ভালো লাগছিলো, একবার ডাঙ্গা একবার জল! আড্ডা দিতে দিতে কখন যে দুইঘন্টা পার হয়ে গেল বুঝলামই না। টনক নড়লো জলপ্রপাতের শব্দে, বুঝলাম এসে গেছি ডেস্টিনেশনে, নাফাখুমে! সকাল পৌনে ১১টায় নাফাখুম পৌছালাম।

 

নাফাখুম জলপ্রপাতনাফাখুম জলপ্রপাত

এই সময়টায় মানে মার্চের দিকে নাফাখুমে পানি একটু কম থাকে, মধ্যমানের। তাই বলে খুমের গভীরতা নিয়ে কোন ধরণের প্রশ্ন তোলা যাবে না। এই গভীরতা নিয়ে গাইডকে প্রশ্ন করেছিলাম, বলেছিলাম নিচ থেকে পাথর বের হয়ে আসে নাই তো? উত্তরে গাইড বলেন "কেয়ামত আগ পর্যন্ত নাফাখুমের তলা থেকে পাথর বের হবে না!" পানি কম থাকলেও নাফাখুম দেখে মনটা ঠান্ডা হয়ে গেল।  ঝটপট কয়েকটা ক্যামেরায় ক্লিক করে রেডি হয়ে নিলাম গোসলের জন্য। যারা সাঁতার জানেন না ভুলেও লাফ দিতে যাবেন না। আর সাঁতার জানেন বা না জানেন পানিতে নামার পর উঠে আসবেন কোথা দিয়ে সেটা একটু চিহ্নিত করে রাখুন।

নাফাখুমের সৌন্দর্য্য নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই, শুধু একটা কথাই বলবো এত পানি দেখে যেকারো মন ভালো হতে বাধ্য।

দুপুর পৌনে বারোটায় ফেরার পথ ধরলাম। এখন একটু ক্লান্ত লাগছিল কারণ প্রচুর দাপাদাপি করেছি নাফাখুমে। তবে ১ টা নাগাদ রেমাক্রি পৌছাতে তেমন অসুবিধা হয় নি।

ফেরার পথেফেরার পথে

 

রেমাক্রি পৌছে বেশি করে কলা খেয়ে নিলাম। পাহাড়ি কলা, দুইটা ৫টাকা। দশ মিনিটের ব্যবধানে গাইডের কাছে রাখা ব্যাগ সহ নৌকা চলতে শুরু করলো। সকাল বেলায় এই পথটাতে আমরা কুয়াশা পেয়েছি আর ভরদুপুর এ পেয়েছি সাঙ্গু নদীর ভরা যৌবন। এর চেয়ে ভালো রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন আর হতেই পারে না।

থানচি ফেরার সময় থানচি ফেরার সময়

থানচি থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে শেষ বাস ছাড়ে বিকেল ৩টায়। বাস ধরাটা খুব জরুরী তাই মাঝিকে তাগাদা দিতে লাগলাম। ঠিক দুপুর তিনটায় থানচি পৌছে দেখি বাস ছেড়ে গেছে আড়াইটায়।

ঐ যে বললাম ভাগ্য ভালো হয় আমাদের সবসময়, থানচি গিয়েই চার জনের একটা গ্রুপ পেলাম, তারাও বান্দরবান যাবেন। একটা চান্দের গাড়ি নিয়ে নিলাম সাড়ে চার হাজার টাকায়। সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি তাই গাড়ি ঠিক করেই খেতে বসলাম থানচি বাজারের এক হোটেলে। আনলিমিটেড ভাত, আপু-পেপের তরকারী, টমেটো চাটনি আর পাহাড়ি মুরগী দিয়ে পেট পুরে খেয়ে নিলাম, ১২০ টাকা খরচ হলো।

খাওয়া-দাওয়া শেষে গিয়ে চান্দের গাড়ির অবস্থা দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেল, উপরে কোন শেডিং নেই, যেহেতু ছেলেপেলে দাঁড়িয়ে যেতে চায় এই পথটা তাই ওই গাড়িটা ছাড়তে হলো। পরে গাড়ির ড্রাইভার আবার রাগ দেখিয়ে চলে গেল। শেষমেষ উপায়ন্তর না দেখে নরমালি যে ভাড়া চার থেকে সাড়ে চার হাজার সেখানে ৬০০০ টাকায় লাস্ট চান্দের গাড়িটা ভাড়া করলাম, থানচি থাকতে চাচ্ছিলাম না আমরা। বাস যে পথ পাড়ি দেয় ৪ ঘন্টায় চান্দের গাড়ির সময় লাগে মাত্র ২.৫ - ৩ ঘন্টা। সন্ধ্যা ৭টায় বান্দরবান পৌছালাম।

সারাদিনের জার্নি শেষে আমার আরো দুইটা বড় জার্নি বাকি ছিল, ১ম টি বান্দরবান থেকে ঢাকা, ২য় টি ঢাকা থেকে খুলনা। সেউ রাতেই এত কষ্ট করতে ইচ্ছে করছিল না। বান্দরবানের "হোটেল প্যারাডাইস" এ উঠে গেলাম। ৭ জনের ৪ বেডরুমে ২ বছর আগেও থেকে গিয়েছি এই রুমটাতে। আগের বারের মতোই ১৮০০ টাকা নিলো, তবে ১৫০০ টাকা দিলেও হতো। প্যারাডাইস থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলে ছোট্ট একটা ভাতের হোটেল আছে, তুলনামূলক অন্য সব দোকান থেকে কম দামী মনে হলো এবং খাবারও বেশ ভালো, ভর্তা+ভাত ৩০ টাকা, মাছ+ভাত ৫০ টাকা আর মুরগী+ভাত ৬০ টাকা। মুরগী-ভাত খেয়ে প্যারাডাইস এর সামনে ব্রীজের উপর কিছুক্ষণ বসলাম কিছুক্ষণ। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘুমন্ত বান্দরবানকে এনজয় করতে লাগলাম।

রাত বাড়লো, বুঝলাম চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম। পরদিন সকাল ৯:৩৫ এ ঢাকার বাস আমার। আমি একাই যাচ্ছি ক্লাস-ল্যাবের কারণে। অন্যরা নীলাচল-নীলগিরি ঘুরবে। দুই বছর আগে দেখে গিয়েছিলাম একবার। নীলগিরি এখন চান্দের গাড়ির ভাড়া ৪৫০০-৫০০০ চায় যেখানে আমাদের সময় ২৭০০ টাকা দিয়ে নীলগিরি নিলাচল দুইটাই ঘুরে এসেছি। যাই হোক, অতশত চিন্তা না করে ঘুম দিলাম।

পরের দিন ৮টা উঠে সুন্দর একটা শ্যাম্পু বাথ দিয়ে একদম কুল হয়ে নিলাম কারণ সামনে টানা ১৯ ঘন্টা জার্নি, বান্দরবান-ঢাকা-খুলনা। সকাল ১০ টায় বান্দরবান থেকে যাত্রা করে ভোর ৪টায় খুলনা নামলাম। সয়ে গেছে, বাংলাদেশে এর চেয়েও বড় জার্নি করেছি ২৮ ঘন্টার সেইন্টমার্টিন যাওয়ার সময়, ইন্ডিয়ায় ৪৪ ঘন্টা। সে গল্প পরে হবে।

আমি সবসময়ই একটা কথা বলি, বাংলাদেশি+ট্রাভেলার হয়ে কেউ যদি জীবদ্দশায় বান্দরবান  একবার হলেও না যায় তবে তার জীবনের ষোল আনাই বৃথা। বান্দরবান এমন এক জায়গা যেখানে মাসখানেক কাটালেও ঘুরে শেষ করা যাবে না।

তাই সাজেশান হলো এখনো যদি বান্দরবান না গিয়ে থাকেন তবে ফ্রি টাইম দেখে ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে বের হয়ে পড়েন, আর বান্দরবানের মূল সৌন্দর্য পেতে হলে যেতে হবে অনেক ভেতরে,করতে হবে ট্রেকিং। একবার ট্রেকিং এ মজা পেয়ে গেলে পাহাড় ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করবে না লিখে দিতে পারি। হ্যাপি ট্রাভেলিং।