আমরা এসেছিলাম এক পথে। ফিরছি আরেক রাস্তা ধরে। এটা পায়ে হাঁটার রাস্তা। এখান থেকে জিন্নাপাড়া হয়ে নাফাখুম যাবো আমরা। পরের রাস্তা মোটামুটি সহজ। জিন্নাপাড়ায় আর্মি ক্যাম্প আছে। বেশ বড় পাড়া। ওদেরকে পাশ কাটিয়ে আমরা চলে এসছি একদম সমতল ভূমিতে। ঝিরিটা এখানে মোটামুটি বড় খালের রুপ নিয়েেছে। বেশ কয়েকবার পার হতে হয় ঝিরিগুলো।

এক জায়গায় পানির এতো স্রোত পারই হতে পারছি না। শেষমাথায় আটকে গেছি। বারবার পানিতে ভিজে জিন্স প্যান্ট একেতো ভারী হয়ে গেছে অনেক তার উপর আগের দুদিনের স্ট্রেস।  মনে হচ্ছিলো পা তুললেই ভেসে যাবো পানির তোড়ে। যারা পাহাড়ি ঝিরিগুলোতে এসেছেন কিংবা পার হয়েছেন তারা আন্দাজ পাবেন। ওই অবস্থায় বেণু আর পিটার  পানিতে নেমে হ্যাচকা টানে আমাকে তুলে ফেলেছে নদীর পাড়ে।

রাত ৮ টা মতন বাজে। পূর্ণিমার আলো আছে। হাঁটতে অতো অসুবিধা হচ্ছেনা। আমরা সেই দুপুর থেকে হাঁটছি। আমাদের খাবারের রসদও ফুরিয়ে এসছে। আমাদের টার্গেট নাফাখুমের কাছাকাছি কোন পাড়ায় রাতে থাকা।পিটার এ পথে অনেক আগে একবার এসেছে। বেণু আসেইনি কখনো। পিটার বারবার বলছে আরেকটু হাঁটলেই আমরা পাড়া পাবো কিন্তু পাড়া আর পাইনা।

খালটাকে ঠিক কতবার আড়াআড়ি পার হইছি এখন মনে করতে পারছি না তবে ৮ থেকে ১০ বারের কম না। এই অন্ধকারে প্রচন্ড স্রোত সামলে পার হওয়াটা কোন সুখের ব্যাপার না। তার উপর জোঁকের আক্রমণ তো আছেই। শরীরের ঠিক কোন জায়গায় জোঁক কামড়াচ্ছে সেটার ও কোন বোধ হচ্ছে না! আসলে টানা তিনদিনের ধকল আর অতীব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে শরীরের ব্যথা বেদনার কোন অনুভূতিই পাচ্ছি না মনে হয়!

রাত ১০ টার দিকে সত্যিকারভাবেই আমাদের শরীরে আর শক্তি নেই হাঁটার। ক্যাস্প করতে হবে। আর কোন গতি নাই আমাদের।পিটার বারবার বলছে আরেকটু হাঁটলেই পাড়া পাবো কিন্তু ওর কথার কোন বিশ্বাস হচ্ছেনা। সুতরাং এ রাতটা রেমাক্রি খালের পাড়েই থাকবো।

টেন্ট সাথেই আছে।খালের পাড়ে একটা সুন্দর চরের মতোন পেয়েছিলাম আমরা। দুটো টেন্টই পিচ করা হলো। ক্ষিদায় অস্থির অবস্থা সবার। কিন্তু দেখা গেছে আমাদের চাল, ডাল, মশলা সবকিছু আছে কিন্তু হাড়িপাতিল সব পাড়ায় পাঠিয়ে দিয়েছি আমরা কার্বারিদার সাথে। আসলে ক্যাম্প করবো এমন প্ল্যানই ছিলোনা আমাদের। সে যাই হোক এখন কি করা যায় ভাবছি।

অনিক  ছেলেটার খাবার দাবারের আইডিয়া খারাপ না। সে বলে ম্যাগি নুডলস আছে ওগুলো কাঁচা খাবো আর ডিরেক্ট রেমাক্রি খালের পানি! নুডলস জিনিসটা কাঁচা খেতে যে অতো খারাপ না এটা জীবনে প্রথম বুঝেছিলাম আমরা! ফানুস ছিলো লাস্টপিস। একটু ছিড়ে গেছে। তাও কেমন সুন্দর উড়ে গেলো....রক্তিমের কস্ট করে ফানুস আনাটা পুরোপুরি সার্থক!

সকাল ৭ টার দিকে বেণু আর পিটার উঠেই ডাকাডাকি শুরু করেছে। ওরা কাঁচা নুডলস খেয়ে অভ্যস্ত না। পাড়ায় যেতে হবে আমাদের আর ভাত খেতে হবে। ৯ টার দিকে হাঁটা শুরু করেছি আর আধাঘন্টা পরেই একটা পাড়ায় পৌছে গেছি। এটার নাম চেয়ারম্যান পাড়া। আমরা আসলে পাড়ার খুব কাছেই ছিলাম।

যাই হোক ওখানে হেডম্যানের বাড়িতে আমাদের যা যা ছিলো (তেল, নুন, মশলা, চাল ডাল এসব) সব দিয়ে দিয়েছি।পাহাড়ে ভালো শসা পাওয়া যায় তবে ওগুলোর সাইজ অরেক বড়। আমরা মাচানে শুয়ে শুয়ে রিলাক্স করছি । পিটার আর বেণু দুমদাম রান্না করে ফেলেছে। খেতে গিয়ে মনে হচ্ছে... আহা কতদিন ভাত খাইনি!

পাড়া থেকে বিদায় নিয়ে নিচের দিকে নামছি। অল্প কতদূর যাবার পরেই প্রচন্ড পানির শব্দ। আমরা নাফাখুমের কাছাকাছি এখন। আমরা এখন রিলাক্স মুডে। আর তেমন তাড়া নেই আমাদের। খুমের কাছেই অনেকক্ষণ বসেছিলাম। আরেকটা ট্যুরিস্ট গ্রুপ ছিলো ওখানে শুধু।

হঠাৎ অনিক বলে ওর নাকি ছোট একটা মোবাইল আছে তাতে ছবি তোলা যায়। আমাদের মোবাইল সব অনেক আগেই বন্ধ চার্জের অভাবে। তবে এধরণের ট্যুরে খুব দামি মোবাইল নেযাটা রিস্কি। অনেক পানির পথ থাকে। আমাদের দামি ক্যামেরা গেছে এই পানি ঢুকে যাবার জন্য। সুতরাং মোবাইল আনলেও ওটাকে পানিনিরোধী কিছুতে রাখতে হবে। ওই পিচ্চি মোবাইলে মনে হয় দুচারটা ছবি তোলা হলো। তারপর আবার রওনা।

এর পরের পথটা কোন ঝামেলা নেই। মোটামুটি প্লেইন জায়গা। ঝিরিটাকে বেশ কয়েকবার পার হতে হয় ওটাই যা একটু কস্ট। আসার সময় এক ঝিরির ধারে পানি খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি এক সাপ। ওইটাও মে বি পানি খেতে আসছে। যাই হোক আমার পানি খাওয়া হয়নি। উল্টা দৌড় দিয়েছি ওইটাকে দেখে! তবে আসার সময় একটা মজার জায়গা পেয়েছিলাম। আমি আর রক্তিম বেশ কিছুটা এগিয়ে ছিলাম। অনিক আর ধ্রুব অনেকটা পেছনে। ওদের হাঁটতে একটু কস্ট হচ্ছে সম্ভবত।

একটা জায়গা অনেকটা লেকের মতন। তার পাশে খালটা ঘুরে গেছে। পানির স্পিড অনেক এখানে। পিটার আর বেণু বলে আপনারা লাইফ জ্যাকেট নিয়ে গ্লাইড করেন আর ওইপাশ থেকে ধরবো আমরা। আমার সাহস হয়নি। রক্তিম করেছিলো। ভেসে যাবার চান্স ছিলো তবে এ জিনিসটা চরম ইন্টারেস্টিং। আমরা পানিতে আরো কতরকমের মজা করা যায় এসব আবিস্কার করতে করতে অনিক ধ্রুব চলে এসেছে।

আবার হাঁটা শুরু। কিছুদূর যাবার পর মনে হচ্ছে ট্যুরিস্টের কাফেলা! সবাই নাফাখুম দেখতে যাবে। কাঁধে ভারী ভারী ব্যাগ নিয়ে কোমরসমান পানি পার হচ্ছে... আহা অসাধারণ সব দৃশ্য। আমি মোটামুটি গুণেছিলাম। প্রায় ১০ থেকে ১১ টা গ্রুপে কম করে ১০০ জনের উপর তারমধ্যে ৪০% ই মেয়ে! আমাদের দেশে নারী ট্রাভেলারের সংখ্যা বাড়ছে। এটা খুবই পজিটিভ একটা ব্যাপার।

প্রায় তিনঘন্টা হাঁটার পর আমরা রেমাক্রিমুখ একটা জায়গায় পৌছে গেছি। এখানেই রেমাক্রিখালটা বাঁক খেয়ে আরো উপর দিকে চলে গেছে। রেমাক্রিমুখ জায়গাটা এতো অসাধারণ... প্রকৃতি কি সুন্দর ন্যাচারাল স্টেপ বানিয়ে রেখেছে...বসে থাকতেই ভালো লাগে। আমরা অনেকক্ষণ বসে ছিলাম ওই জায়গায়। তবে একটু সাবধানে থাকতে হয়, জায়গাটা খুব পিচ্ছিল ধরণের তাই। এই জায়গার উপরেই বিখ্যাত রেমাক্রি বাজার।

আমরা ব্যাক করবো এখান থেকেই। আজকের মধ্যে চিটাগং পৌছতে হবে। দুপুর তিনটার দিকে আমরা রওনা দিলাম। আবার সেই রো টাইপ বোটে চড়বো।রেমাক্রি থেকে এ জার্নিটা কি যে অসাধারণ... আমরা যাচ্ছি স্রোতের দিকেই। পানির স্পিডের সাথে ব্যালান্স করে বড় বড় পাথরের পাশ দিয়ে খুব সাবধানে চালাতে হয়। তা নয়তো বোট উল্টে যাবে কিংবা বোটের প্রপেলার ভেঙ্গে যাবে। এলাইনে খুব এক্সপার্ট ছাড়া কেউ এখানে চালাবার সাহস করবে না।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর আমরা তিন্দুর বড়পাথর জায়গাতে চলে এসছি। বোট চলছে। আমরা পুরা রিলাক্স মুডে। বিকেল ৪ টার দিকে আমরা থানচি পৌছে গেছি। কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না। বেণু আর পিটার এখান থেকে আবার ব্যাক করবে ওদের পাড়াতে। এই দুতিনদিনে এদের সাথে কি যে চমৎকার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে..পুরো ট্যুরে আমার ভারী ব্যাকপ্যকটা পিটারের কাঁধেই ছিলো বলতে গেলে..এ ছেলেগুলো আমাদের জন্য অনেক করেছে। তার জন্য ওদের হয়তো আমরা কিছু টাকা দিয়েছি কিন্তু আন্তরিকতা বা ভালোবাসার পেমেন্ট কখনো টাকাতে হওয়া সম্ভব না।

 অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে একটা জিপ পেলাম আমরা। আরো একটা গ্রুপ যাবে আমাদের সাথে। সন্ধ্যার পরে কোন জিপ ছাড়তে দেয়না থানচি থেকে তারপরেও আমরা কিভাবে যেনো রওনা দিয়ে দিলাম। মাঝে একবার আটকেছিলো বলিপাড়ার আর্মি ক্যাম্পে,  ড্রাইভার কিসব কথা বলে আবার রওনা দিয়ে রাত ৯টার দিকে আমরা বান্দরবান শহরে। জিপটা মোটামুটি ঝড়ের বেগে চালিয়ে এসছে। এরপরের গল্প খুব সহজ। বাসে উঠে রাত ১২ টার দিকে  কর্নফুলী ব্রিজের গোড়ায়। চট্টগ্রাম পৌছে মনে হচ্ছিলো আমরা লাস্ট দুতিনদিন কোন আজগুবি রাজ্যে ছিলাম, বাস্তব দুনিয়ার সাথে যার কোন সম্পর্কই নাই!

গল্পটা মোটামুটি সহজভাবে লেখার চেস্টা করেছি। পুরো ৪ দিন ছিলাম পাহাড়ে। এ ট্যুরটার সবচাইতে স্পেশাল ব্যাপার হল যখন থানচি থেকে রওনা দিচ্ছি তখনো জানি না যে আসলে ঠিক কোথায় যাচ্ছি বা কি হতে পারে। প্যানডোরার বাক্স খোলার মতন একের পর এক চমক ছিলো আমাদের সামনে। আমার আরো একবার যাবার ইচ্ছে আছে এখানে যদি সময় পাই। এগল্পটা লিখেছি প্রায় সাড়ে তিনবছর পর... গল্প লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে আবার সেই জুমঘরের মাচানে শুয়ে আছি। ওই রাতটা সত্যিকারভাবেই একটা ফ্যান্টাসি আমার কাছে...ক্যামেরাটা নস্ট হয়ে গেছিলো,মনটা সত্যিই খারাপ হয়েছে। এত্তো সুন্দর জায়গা, কিন্তু কোন ছবি নেই তেমন। তবে আসল ছবিটা রয়ে গেছে মনের মধ্যে...খুব সম্ভবত ওটাই আসল ছবি।