লেখা ও ছবিঃ মনিকা আহমেদ মায়া 

সময়, সুযোগ আর সামর্থ্য এই তিনের মিলিত রুপে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে, রচিত হয় ইতিহাস। আমার নিজেরো বহুদিনের একটা পুরোনো স্বপ্ন ছিল যাকে লালন করছিলাম গত ৩ বছর থেকে কিন্তু ওই যে ৩ বিন্দু কখনওই এক হচ্ছিল না তাই স্বপ্ন ছোয়াও অধরাই থেকে যাচ্ছিল।

#কেওক্রাডং_পর্ব:
অবশেষে বহু কাংখিত সেই স্বপ্ন ছোয়ার সুযোগ এসে গেল এই মাসের ১৫ তারিখ রাতের বাসে যখন আমরা ২৫ জনের দল বাংলাদেশের ৫ম সর্বোচ্চ চুড়া কেওক্রাডং সামিটে রওনা দিলাম।

বান্দরবান এসে রিজার্ভ বাসে প্রথমে রুমা বাজার সেখান থেকে চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করে পুরো দল নিয়ে একেবারে বগালেক। সেখানে ফ্রেশ হয়ে অনেক ছবি তুলে দুপুরে খেয়ে রওনা হলাম কেওক্রাডাং পাহাড়ের উদ্দেশ্যে।

পৌছাতে আমাদের রাত ৮ টা বেজে গেল, তীব্র গরম থেকে বাচতে আমরা সুর্য ডোবার পরে অনেক পথ হেটেছি। রাতের খাবার খাওয়ার পরে কেওক্রাডং এর কটেজে বসে সবাই গল্প আর গানের আড্ডায় মেতে উঠি অনেক রাত পর্যন্ত।

কেওক্রাডং চূড়ায় কেওক্রাডং চূড়ায়

অনেকেই হয়ত ভাবছেন এই পাহাড়ই কি আমার অধরা মাধুরি ছিল ৩ বছর ধরে? তাদের জন্য বলছি, না এইটা আমার তৃতীয় বারের কেওক্রাডাং সামিট যা এখন আমার কাছে অনেকটা সহজ হয়ে গেছে। তারপরেও বলব যতবার এর চুড়ায় উঠি, আমার মাঝে একটা ঘোর লাগা কাজ করে।হয়ত পাহাড়ের প্রতি এক অদৃশ্য টান থেকেই এই অনুভব।

কেওক্রাডাং চুড়ায় সেই গভীর রাতের তারার আলোর মিছিলে পাশাপাশি বসে দুই বান্ধবী (সাদিয়া আর আমি) মুগ্ধ নয়নে আকাশের পানে চেয়েছিলাম তার সাথে কি আর অন্য কোন ভাল লাগার তুলনা চলে!

পরদিন সকালে সবাই কেওক্রাডং চুড়ায় সুর্যোদয় দেখে নাস্তা করে ফিরতি পথ ধরি বগালেকের দিকে যেখানে আগে থেকেই রিজার্ভ করা চাদের গাড়ি আমাদের অপেক্ষায় ছিল। বগালেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করে রুমা হয়ে বান্দরবন ফিরে আসি। রাতের বাসে গ্রুপের সবাইকে বিদায় দিয়ে আমরা ২ জন রয়ে গেলাম সাথে যোগ দিল আরো ৩ জন যারা মিলে পরদিন সকালে নতুন গন্তব্যে রওনা হলাম স্বপ্ন পুরনের পথে।

জতলাং যাবার পথেজতলাং যাবার পথে

#জোতলাং_পর্ব:
পরদিন ১৮ তারিখ সকাল ১০ টায় রওনা হলাম বান্দরবান শহর থেকে বাসে করে থানচি এরপর বোটে করে রেমাক্রি গাইড ছাড়াই তবে বিজিবির অনুমতি নিয়ে।

রেমাক্রি পৌছালাম প্রায় বিকেল সাড়ে চারটায় সেখান থেকে একজন লোকাল গাইড ভাড়া করলাম দলিয়ান পাড়ার উদ্দেশ্যে। যাত্রার শুরুতেই খাড়া ও আকাবাকা পাহাড়ি রাস্তা পার হয়ে সন্ধ্যা নাগাদ পৌছালাম দলিয়ান পাড়া। তখন প্রায় সন্ধ্যা ৭ টা। রুম ঠিক করে ফ্রেশ হয়ে সবাই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমানোর আগে কিছুক্ষন গল্প আডায় মেতে উঠলাম। একি সাথে পরদিন ভোরে জোতলাং যাওয়ার জন্য দুইজন গাইড ঠিক করা হল।

ভোর ৪ টার সময় এলার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভেংগে যায়। সবাই ফ্রেশ হয়ে আগে থেকেই বলে রাখা নাস্তা করে জোতলাং এর উদ্দেশ্যে বের হলাম, আমরা ৫ জন ( আমি, হারুন, শরীফ ভাই, সাজিন ভাই, কাওসার ভাই) আর সাথে দুইজন গাইড ( আবেন আর সাম্পই)।

জ-তলাং এর পাথুরে ট্রেইলজ-তলাং এর পাথুরে ট্রেইল

মুল অভিযানের শুরু এখান থেকেই, এখন পর্যন্ত জীবনেরর সবচেয়ে কঠিন পাহাড়ি পথ ধরে ৭ জনের দলটি মোটামুটি দ্রুত চলা শুরু করলাম। রওনা হবার আগে সবাই ধারনা দিয়েছিল জোতলাং সামিট করে ফিরে আসতে মোটামুটি ১৪ ঘন্টা সময় লাগবে। তাই পথের জন্য কিছু শুকনো খাবার নিয়ে নিলাম যাত্রার শুরুতেই।

পাহাড়ি পাথুরে খাড়া চড়াই আর গাছের শিকড় ধরে ধরে প্রায় চার হাত পা ব্যাবহার করে সবার আগে জোতলাং চুড়ার শীর্ষে পৌছে যায় আমাদের গ্রুপের সাজিন, কাওসার, শরীফ সহ একজন গাইড সকাল ৯ টার মধ্যেই আর আমি কিছুটা পেছনে পড়ে যাই একজন গাইড সহ ক্লান্তিজনিত কারনে। পরে হারুন সহ আমরা তিনজন কিছুটা রেস্ট নিয়ে আবার চুড়ার দিকে হাটা দেই প্রায় ৪০ মিনিট পরে আগের ৪ জনের সাথে জোতলাং এর চুড়ায় মিলিত হই। এই চুড়ার পরেই বার্মার বর্ডার শুরু।

চুড়ায় উঠে আমাদের কারো আনন্দের সীমা রইল না যে যার ইচ্ছে মত গলা ছেড়ে গান হই হুল্লুড় আর আড্ডা খাওয়ায় মেতে উঠলাম। বাংলাদেশের ২য় সর্বোচ্চ চুড়ায় নিজের দেশের পতাকা বুকে নিয়ে চারপাশ দেখার অনুভুতির সাথে কোন কিছুরই তুলনা হয় না আর এ যদি ৩ বছরের আরোধ্য স্বপ্ন হয় তবে ত কথাই নেই।

পাহাড়ি ট্রেইল পাহাড়ি ট্রেইল

চুড়ায় বসে একটা কাগজে সবার নাম লিখে বোতলে রেখে আসা হয় একি সাথে।আর আড্ডায় সম্মিলিতভাবে একটা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেই, যেইটা আগের প্লানে ছিল দলিয়ান পাড়া ফিরে গিয়ে পরদিন ভোরে যোগি হাফং (৪ র্থ সর্বোচ্চ চুড়া) যাবার। কিন্তু গ্রুপের সবার উত্তেজনা এত বেশি ছিল কেউ আর অপেক্ষা করতে চাইল না। তাই একি দিনে দুই পাহাড় শীর্ষে যাবার নেশা চেপে বসল মনে।

কিন্তু মন আর শরীর দুইটা ভিন্ন জিনিস। জোতলাং থেকে নেমে আসতে আসতেই মনের বিরুদ্ধে শরীর বিদ্রোহ করে বসল। চুড়া থেকে নেমে আমাদের ৫ জনের মধ্যে আমি সহ ৩ জন রনে ভংগ দিলাম কিন্তু হারুন আর সাজিন ভাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যা কেউ করেনি আগে এমনকি পাহাড়ি কোন গাইডও আগে যায়নি একই দিনে দুই চুড়ায়। হারুন আর সাজিন ভাই সবার আগে নীচে নেমে প্রায় ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করতে থাকে আমি সহ টিমের বাকি সদস্যরা নীচে নামার অপেক্ষায়। আমরা নীচে এসে দেখি গাইড সহ তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমরা তাদের জানালাম যে আমাদের ৩ জনের পক্ষে আর যোগি হাফং সামিটে আজকে যাওয়া সম্ভব না।

এবার আমরা ৩জন একজন গাইড সহ ফিরে চললাম দলিয়ান পাড়ার দিকে আর হারুন, সাজিন ভাই আর গাইড রওনা হল যোগি হাফং সামিটে।

সামিট নোট সামিট নোট

পাড়ায় আমরা যখন পৌছালাম পাড়ার সবাই বিশাল করতালি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানাল কারন অনেক কম সময়ে দুপুর ৩ টার মাঝেই আমরা পাড়ায় ফিরে আসি। এবার অপেক্ষা বাকি দুইজনের যোগি থেকে ফিরে আসার।

অবিশ্বাস্য ইতিহাস গড়ে রাত ৮ টার দিকে গাইড আবেন সহ হারুন আর সাজিন ভাই পাড়ায় ফিরে আসেন।
তবে দলের ৩ জনের মাঝে সাজিন ভাই দুখ জনক ভাবে যোগি হাফং এর চুড়ার ১ ঘন্টা পুর্বেই ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন আর গাইড সহ হারুন চুড়া সামিট করে আসে।
আবার করতালি দিয়ে তাদের স্বাগত জানানো হল কারন হারুন ইতিমধ্যে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন একই দিনে জোতলাং আর যোগি হাফং চুড়া সামিট করে।

বাকি ৩ জনের মধ্যে ২ জন আগের শিডিউলের যোগি হাফং চুড়ায় যেতে না চাওয়ায় আমিও বাদ দিলাম আর সাথে হাতে পায়ের তীব্র যন্ত্রনা ত আছেই। সবাই নতুন পরিকল্পনা ঠিক হলে পরদিন সকালে দলিয়ানপাড়া থেকে নাফাখুম হেটে যাবার।

নাফাখুমনাফাখুম

পরদিন সকালে সবাই অনেক দেরিতে ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেংগে নাস্তা করে সাড়ে ১১ টার দিকে নাফাখুমের উদ্দেশ্যে লোকাল গাইড নিয়ে হাটা শুরু করলাম প্রচন্ড গরম আর খা খা রোদের মধ্যে। নাফাখুম এসে সবাই পানিতে দাপাদাপি করে বিকেল ৩ টার দিকে রেমাক্রির দিকে রওনা হলাম। বিকেল ৫ টার মধ্যে রেমাক্রি পৌছে কটেজে উঠে সবাই ফ্রেশ হলাম। আবার নতুন উদ্যমে গল্প আড্ডা গান শেষে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে রেমাক্রির পাড়ায় এক নতুন খেয়াল চাপলো পাহাড়ি নদীর তাজা মাছ কেনা হল যেটা আমি সহ কাওসার আর সাজিন ভাই মিলে কাটাকুটি করে কিছু মশলা মাখিয়ে মাছ সব ভাজি করলাম। গোল হয়ে বসে রেমাক্রি খালের পাশে স্রোতের কুলকুল শব্দের মাধুরির সাথে কুড়মুড়ে স্বাদের তাজা মাছ ভাজি যেন অমৃত লাগছিল। মাছ খাবার শেষে চোখে পড়ল তাজা খেজুরের রস সাথে সাথেই ৩ লিটার কিনে ৫ জন খেয়ে নিলাম, ঠান্ডা রসে অনেক তৃপ্তি লাগছিল। সেখান থেকে দ্রুত খাবার শেষ করে আমরা রওনা হলাম বোট নিয়ে থানচির পথে।

সদ্যধৃত পাহাড়ি নদীর মাছভাজাসদ্যধৃত পাহাড়ি নদীর মাছভাজা

থানচি পৌছাতে আমাদের দুপুর দেড়টা বেজে গিয়েছিল। ওইদিন ছিল আবার ২১ শে ফেব্রুয়ারি তাই নিজেই থানচি স্কুলের শহীদ বেদিতে ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালাম।

থানচিতে দুপুরের খাবার খেয়ে চান্দের গাড়িতে করে রওনা হয়ে অবশেষে বান্দরবন ফিরলাম বিকেল সাড়ে চারটার দিকে। ঢাকায় ফেরার বাসের টিকেট নিলাম ৩ জন আর বাকি দুইজন চট্টগ্রামের বাসের টিকেট নিল। হোটেলে মিষ্টিমুখ করে চট্টগ্রামের ২ জন বিদায় নিল আমাদের থেকে আর আমরা ৩ জন রাতের দিকে রওনা হলাম আর্মি ক্যান্টিনে রাতের খাবার খেতে। বসনিয়া রুটি, শিক কাবাব, মুরগির দোপেয়াজা, পেয়াজু, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর হালিম দিয়ে ভরপেট খাওয়া হল। ততক্ষনে ফেরার সময় হয়ে গেল আর আমরা রাত ১১ টায় রওনা হলাম চিরচেনা ঢাকার উদ্দেশ্যে।

নৌকায় করে থানচি ফেরানৌকায় করে থানচি ফেরা

হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলছে হানিফের ঢাকামুখি চেয়ারকোচ, ৭ দিনের টানা পাহাড়ি পরিভ্রমনে ক্লান্ত শরীর আর দুচোখ কিন্তু পাহাড় চুড়া স্পর্শের স্মৃতি নিয়ে মনের মাঝে যে আনন্দের অসীম ঝর্না বয়ে যাচ্ছিল তার রেশ ওই বাসের নিকশ কালো অন্ধকারের মাঝেও তিনজনের চোখেমুখে জ্ব্যজ্যলমান ছিল। আর আমি জানি আমার তৃপ্তি ছিল এভারেস্টের সমান উচু। হয়ত ভবিষ্যতে আরো দুর পাহাড় চুড়ায় যাওয়া হবে, নতুন গাইড আর টুরমেট নিয়ে নতুন অজানা পথে, সেইদিনের জন্য আমার গল্প তোলা থাকুক আজ এ পর্যন্তই!