মে মাসের দুই তারিখ খুব ভোরে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভাঙতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়ায় দাঁত কপাটি লেগে গেলো। তখনও মাত্র আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি অবাক হলাম। মে মাস শীতকাল না, মে মাসে কুত্তা মারা গরম পড়ে। তাও শীত লাগে কেন?

আমি পাশ ফিরে বেড়ার ঘরের ছোট্ট কাঠের জানালায় চোখ দিতেই খুব সম্ভব এখন পর্যন্ত আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাই। জানালা দিয়ে সবুজ পাহাড়। পাহাড়ের মাঝে লেক। পাহাড় থেকে সাদা কুয়াশা লেকের নীল পানিতে পড়ছে।

 

সংগৃহীত ছবি...তবে কটেজ থেকে দৃশ্যটা এরকমই!সংগৃহীত ছবি...তবে কটেজ থেকে দৃশ্যটা এরকমই!

 

ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এবার গন্তব্য কেউক্রাডং জয়। সমাজ বইয়ে সবসময় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই পাহাড়ের কথা পড়ে এসেছি,আজ তার চূড়ায় পৌঁছে যাবো ভেবে পার্টে উঠে গেলাম। কিছুদূর যেতে পার্টগুলো পাহাড় বেয়ে নেমে গেলো। এবারের পথ আরো কষ্টকর। বগালেক আসার পথ কিছুটা হলেও কয়েক জায়গায় সমতল ছিলো,এবার পুরো উঁচু। পাহাড় বেয়ে উঠতেই আছি,মাঝেমাঝে যমের মত হাজির হয় সরু গিরিখাদ। সরু রাস্তা,পাহাড়ের সাথে পিঠে ঘেঁষে হাঁটতে হচ্ছে,একটু এদিক সেদিক হলেই সোজা গভীর খাদে। সেই খাদে কি আছে দেখাও যায় না। রুটটার ভয়াবহতা আর রোমাঞ্চ হুমায়ূন আহমেদ সাহেব বুঝাতে পারতেন,অনেকে বিশ্বাসও করতেন। আমি বুঝাতে পারছি না,তাছাড়া অনেকে গাঁজাখুরি গল্পও মনে করবেন। দোষ নেই, এরকম জায়গাও বাংলাদেশে আছে সেটা সেদিনের আগে আমিও বিশ্বাস করতাম না।

 

কেউক্রাডং যাওয়ার পথে....আমি অর্ধেক গিয়ে রাগ করে বসে ছিলাম,কেন এঝানে যাচ্ছে,কি লাভ গিয়ে, ইত্যাদিকেউক্রাডং যাওয়ার পথে....আমি অর্ধেক গিয়ে রাগ করে বসে ছিলাম,কেন এঝানে যাচ্ছে,কি লাভ গিয়ে, ইত্যাদি

রওনা দিয়েছিলাম ভোর ছয়টায়। সাড়ে দশটায় কেউক্রাডংয়ের চূড়ায় পা রাখলাম। কেউক্রাডংয়ের সৌন্দর্য বর্ণনা আমি দিচ্ছি না। শক্তি সামর্থ্য থাকলে দেখে আসুন,নইলে ছবি সংযুক্ত করা আছে,দেখে নিন।

 

 

কেউক্রাডং যাওয়ার পথে....দার্জিলিং পাড়া।কেউক্রাডং যাওয়ার পথে....দার্জিলিং পাড়া।

কেউক্রাডং..।কেউক্রাডং..।

 

চূড়া থেকে মেঘও আপনার নিচে!চূড়া থেকে মেঘও আপনার নিচে!

 

উল্লেখ্য সেই যাত্রায় বগালেকে যা একটু ছবি তুলা হয়েছিলো। কেউক্রাডং থেকে জাদিপাই তেমন ছবি তোলা হয়নি। সবাই সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত ছিল,ইলেকট্রিক গেজেট কেউ ইউজ করেনি।

কিছুক্ষণ মেঘের মধ্যে ঘুরলাম,ছবি তুললাম। আবার তাগাদা। এবার গন্তব্য জাদিপাই। গাইড আগে থেকেই যারা দুর্বল তাদের সতর্ক করে দিলো,কষ্ট সহ্য করতে না পারলে থাক। কে মানে কার কথা!

আবার হাঁটা। জাদিপাই যাওয়াটা আমার জীবনের কিংবা যারা যায়,সবার জীবনে খুব সম্ভব কষ্টকর কিছু অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি। কেন?এক কথায় বলি,কেউক্রাডং থেকে জাদিপাই যেতে বা নামতে লাগে তিন ঘণ্টা,উঠে আসতে লাগে সাত ঘণ্টা। চিন্তা করছেন,কি পরিমাণ খাড়া? চিন্তা করে লাভ নেই অবশ্য,চিন্তার অতীত।

তবে সুখের কথা,অতিরিক্ত বিপদজনক বলে কর্তৃপক্ষ সাময়িক ভাবে জাদিপাই যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে। অতএব কেউক্রাডং পর্যন্ত যাও,খুশি মনে চলে আসো। 

 

জাদিপাই ঝর্ণাজাদিপাই ঝর্ণা

 

জাদিপাই যাওয়ার পথে এক মারমা পাড়া। এখান থেকে হাতের বামে যেতে হয়।এরপরই জাদিপাইয়ের সবচেয়ে কষ্টকর যাত্রাপথের সূচনা।জাদিপাই যাওয়ার পথে এক মারমা পাড়া। এখান থেকে হাতের বামে যেতে হয়।এরপরই জাদিপাইয়ের সবচেয়ে কষ্টকর যাত্রাপথের সূচনা।

 

এরপর ফিরে আসা। জাদিপাই থেকে কেউক্রাডং,কেউক্রাডং থেকে বগালেক। বগালেকে শেষ রাত,শাহেদ ভাইয়ের গা ছম ছম ভূতের গল্প শুনে শুনে কাঁচা আমের ভর্তা খাওয়া। পরদিন ফিরে আসা।

এই ছিলো এক স্মরণীয় অধ্যায়ের গল্প। ট্র‍্যাজেডি বিহীন এক সুখের চারদিনের গল্প। এই গল্পে সবাই চমৎকার ছিলো,এ টু জেড সবাই!

গাইড কাজল দা,অন্যান্য দলের গাইডরা যেখানে ট্যুরিস্ট ক্লান্ত হলেই রেগে যাচ্ছিলো,সেখানে এই লোকটা আমরা দশ মিনিট হেঁটে ক্লান্ত হলেই স্যালাইন বানিয়ে খাওয়াচ্ছিলেন। কিংবা ঢাকা থেকে আসা গ্রুপটা,আমাদের জাদিপাই থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরতে দেখে যারা নিজেরা সরে আগে আমাদের খাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

ফিরে আসার পর আরো একটা মাস অবসরে ছিলাম। সেই একমাসে একদিন নেভাল যাবো বলে বের হয়ে অর্ধেক গিয়ে মত পালটে দুশো টাকা পকেটে নিয়ে কক্সবাজার চলে গেলাম। সেই কথা পরে হবে,হয়তো হবে না। জীবনে বান্দরবান ট্যুরটা বেস্ট হলে এই কক্সবাজার যাওয়া ছিলো সবচেয়ে বাজে।

এরপর অনেক জায়গায় বেড়াতে গিয়েছি,সবখানে কিছু না কিছু অপূর্ণতা ছিলো। কোথাও ডিএসএলআর ছিলো না,কোথাও বা ডিএসএলআর থাকলেও সার্কেলের ভেতরে দুই গ্রুপ হয়ে ঝগড়া লেগে মন খারাপ হয়েছে।

এই জার্নিটায় কোন অপূর্ণতা ছিলো না। কারো মধ্যে মন কষাকষি হয়নি,কোন ঝগড়াঝাঁটি হয়নি,কোন আফসোস করারও দরকার পড়েনি।

"আমি অকৃতী অধম বলিয়া কম করে তো কিছু মোরে দাওনি।

যা দিয়াছো তারই অযোগ্য ভাবিয়া কাড়িয়াও তো কিছু নাওনি!"

.

তো এই ছিলো কথা। যদি এডভেঞ্চার প্রিয় হোন,শক্তি সামর্থ্য আর সাহস থাকে,তাহলে নেক্সট ছুটি পেলে কক্সবাজারে গিয়ে এক সাগর দেখা কিংবা ঢাকায় গিয়ে আর্টিফিশিয়াল জিনিশ দেখার চেয়ে বান্দরবানের কোন এক ট্রেকিং রুট ঘুরে আসুন। বগালেক রুটটা ছাড়াও থানচি নাফাকুম রেমাক্রি নামক আর‍ও কয়েকটা দুর্গম রোমাঞ্চকর রুট আছে।

ঘুরে আসুন,অবসর থাকলে,পরীক্ষা শেষ হলে অগ্রীম পড়া শুরু আগে,মেট্রিক দিয়ে মাত্র কাজল স্যারের কাছে যাওয়ার আগে। সেখানে কাটানো কটাদিন বাকি জীবনে হাসির ফুয়েল হবে,যেমনটা এখন আমার হয়! 

ওহ হ্যাঁ....মেট্রিকের পর আমি আমার ওই সুন্দর জীবনটার প্রেমে পড়েছিলাম। আপনারাই বিচার করুন,এত সুন্দর জীবনের প্রেমে না পড়ে থাকা যায়?