লেখা ও ছবি- তামিম সাহেব 

মেট্রিকের পর প্রেমে পড়েছিলাম।

মেট্রিক পরীক্ষা....সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট....স্কুল জীবনের শেষ পরীক্ষা। মেট্রিক মানেই 'অনেক বড় হয়ে গেছি ভাব' চলে আসা,মেট্রিক মানেই স্কুল ড্রেসটা চিরতরে বিদায় জানানো,মেট্রিক মানেই তিন মাসের অবারিত ছুটি!

মেট্রিক নিয়ে এরকম নানান কথা শুনতে শুনতে এক সময় আমি মোহাম্মদ ওয়ায়েস তামিম,চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ব্যাচ দুই হাজার পনেরোর নাকের গোড়ায় মেট্রিক এসে খটখট করে। কয় তারিখ পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা মনে নেই,খুব সম্ভব তারিখটা ছিলো ফেব্রুয়ারির এক তারিখ। আর লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিলো মার্চের দশ তারিখ।

তবে ঠিক তখনই তৎকালীন বিরোধী দলের মাথায় দেশের কল্যাণের কথা মাথায় আসে। শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী হরতাল আর অবরোধ। পাছে পেট্রোল বোমা মেরে দেয় কিনা,এই ভয়ে পরীক্ষা পেছানো হয়। রবিবার হরতাল দিলে পরীক্ষা দেওয়া হত সোমবার। বিরোধী দল বুদ্ধি করে সেদিনও হরতাল দিতো। ফলে সেদিনের পরীক্ষাও পেছনো হতো। এক সময় সূচি সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়ে শুধুমাত্র শুক্র আর শনিবার পরীক্ষা হতে থাকে।

পরীক্ষা চলাকালীন সময়টা কষ্টকর ছিলো। কত আর ধৈর্য রাখা যায় আসলে! পুরা সপ্তাহ তাই ঘুমাতাম,বৃহস্পতিবার নাকে মুখে হয়ে যেত সব পড়া। রাত জাগতে হতো,সকালে ভোরে উঠতে হতো। ঘুমে চোখে লেগে আসতো,তাও পড়তে হতো," যে লেন্স এক গুচ্ছ সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছকে...."

একটি দুটি করে এক সময় থিউরি শেষ হয়। তবু লেজের মত লেগে ছিলো প্র‍্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। কয় তারিখ শেষ প্র‍্যাকটিক্যাল ছিলো তাও মনে নেই। তখন আসলে ঘোরের মধ্যে ছিলাম....আসলেই পরীক্ষা শেষ?মেট্রিক পরীক্ষা শেষ?আর বাকি নেই?আগামী তিন মাস পড়া ছাড়া?!!

সিটি গার্লসে পরীক্ষার কেন্দ্র ছিলো। বাসায় আসি,ফ্রেশ হওয়ার সময় হুট করেই মনে পড়ে,এই সাদা ইউনিফর্ম আজকে শেষবারের মত পড়েছিলাম। এরপর আর কোনদিন পড়া হবে না। হয়ও নি!

সেদিন থেকে আনন্দময় দিনের সূচনা। সবকিছু ভালো লাগতো কোন পড়াশোনা নেই বলে। পরিপূর্ণ সুখী একজন মানুষ। সকালে দশটা এগারোটায় ঘুম থেকে উঠতাম,নাস্তা করে বের হতাম,সারাদিন টো টো করে দুপুরে বাসায় এসে কিছু খেয়েই আবার বের হয়ে রাত পর্যন্ত ঘুরে বাসায় এসে টিভি।

রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতাম,সকালে এতটায় উঠে ঐ চ্যাপ্টার পড়তে হবে জাতীয় কোন চিন্তা থাকতো না।

(মাত্র সেদিন পরীক্ষা শেষ....।) (মাত্র সেদিন পরীক্ষা শেষ....।) 

 

এভাবে বিশ পঁচিশ দিন কাটে। মেট্রিকের আগে ফ্রেন্ডরা সবাই মিলে সিরাজগঞ্জ এক বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিলো। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ ছিল বলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে কোথাও যাবো বলে ঠিক হয়।

লাবিব প্রস্তাব করে বান্দরবান ঘুরে আসার। উল্লেখ্য,বন্ধু মীর ইলহাম আজমল লাবিব ছিলো সার্কেলের অতীব ভালো ছেলে। সে কোনদিন জাহান্নামে গেলে অন্য সবার অভিভাবক সবাইকে কান ধরে জাহান্নামে দিয়ে আসবে বলে একটা কথা সার্কেলে প্রচলিত ছিলো।

লাবিব বান্দরবান ঘুরে আসার জন্য চারদিন সময় বরাদ্দ করে। বান্দরবানে ঘুরার মত কিছু জায়গার নাম বলে,যদিও নীলগিরি নীলাচল ছাড়া আর কোনটার নাম বুঝি নাই। বান্দরবানের চারদিন কেন থাকতে হবে,নীলগিরি নীলাচল ছাড়া সেখানে আর আছেই বা কি,এটা ভেবে অবাক হই।

যাত্রা শুরু করি এপ্রিলের ত্রিশ তারিখ সকালে। যাত্রা সঙ্গী মোট আটজন। সাথে ছিলেন দেখাশোনার জন্য জুড়ে দেওয়া এক বন্ধুর বড় ভাই। সিনিয়র এই ভাই যাবে শুনে প্রথমে সবাই মন খারাপ করলেও বাস আধা ঘণ্টা চলার পর আবিষ্কার করি,কি "জিনিস" আমাদের সাথে যাচ্ছে! তিনি কোনদিকেই আমাদের চেয়ে কম না।

বান্দরবান পৌঁছে কিছু খেয়ে চাঁদের গাড়ি করে নীলগিরি যাই। মেঘের সারি,উঁচু পাহাড় দেখে মুগ্ধ হতে দেখে সেই ভাইয়াটা বলেন,"আগামীকাল থেকে নেক্সট তিনদিন এমন তিনটা জায়গায় নিয়ে যাবো,যেগুলা দেখে পরে নীলগিরি নীলাচল দেখে মুগ্ধ হওয়ার কথা ভেবে হাসবি,লজ্জা পাবি,কেউ নীলগিরি সুন্দর বললে হাসি আসবে। "

(নীলাচলে....) (নীলাচলে....) 

 

কথা সত্য হয়েছিলো।

প্রথম রাতে আমরা হোটেল ছিলাম। এক রুমে আমি,রাহিক,মুগ্ধ,ওয়াকার,রিফাত। আরেক রুমে শাহেদ ভাই সহ বাকিরা।

পরদিন খুব ভোরে বগালেকের জন্য রওনা দিতে হবে বলে শাহেদ ভাই দ্রুত ঘুমাতে বলেন। তার রুমের সবাই ঘুমিয়ে গেলেও আমাদের রুমে ঘুম ছিলো না। হোটেলের চার তলায় শুধু আমরা আটজনই ছিলাম। প্রথমে ঠিক করি অন্য রুমের চারজনকে ভয় দেখাবো। প্ল্যান মোতাবেক গায়ে কালো চাদর দিয়ে মাটিরে হামাগুড়ি দিয়ে ওদের দরজায় নক করি। তারা বেশ কয়েকবার "কে কে" করে সাড়া না পেয়ে আর দরজা খুলেনি।

দ্বিতীয় দিন শুরু : পহেলা মে,দুই হাজার পনেরো,ভোর ছয়টা। নির্জন বান্দরবান শহর জেগে ওঠার আগেই আমাদের জীপ ছেড়ে দিলো। উদ্দেশ্য বগা লেক। গাড়িতে শাহেদ ভাইয়া যে ভাসাভাসা তথ্য দিলেন তার সারমর্ম ছিলো এই যে,বান্দরবানে নীলগিরি নীলাচল হলো সাধারণ জায়গা,পার্কের মত। তবে এই দুইটা জায়গা ছাড়াও বান্দরবানে বেশ কয়টি দুর্গম ট্রেকিং রুট আছে। এসব রুটের পদে পদে আছে এডভেঞ্চার,আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আমরা এখন সেরকমই একটা রুট ট্রেকিং করে যাব বগালেক। বগালেক থেকে পরদিন কেউক্রাডং,এরপর আরো দুর্গম জাদিপাই।

প্রথমে যাই রুমা বাজার। ট্রেকিংয়ে প্রতি টিমে একজন গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই রুমা বাজার থেকে আমাদের সাথে জুটে গেলো গাইড কাজল দা। নুন্যতম বয়স আঠারো লাগতো,তাই আঠারো দিয়ে নাম এন্ট্রি করে চাঁদের গাড়িতে করে কিছুটা পথ পাড়ি দিই।

পথটা ভয়ানক ছিলো। উঁচু,এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি রাস্তা। সবাই গাড়ির রড জানালা শক্ত করে ধরে বসে থাকি,ছেড়ে দিলেই গড়িয়ে নিচে পড়ে যাবো অবস্থা!

কিছুদূর গিয়ে গাড়ি পথে যাত্রা শেষ হয়। সামনের দশ কি বারো কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা গাড়ি চলাচলের উপযোগী নয়। পথটা হেঁটে যেখানে ছিলাম সেখান থেকে সাতাইশশো ফুট উঁচুতে উঠে বগালেক পৌঁছাতে হবে। ঘড়িতে তখন সময় দুপুর একটা। গাইড জানালেন,এই পথ পাড়ি দিতে আমাদের বয়সী পোলাপানের চার ঘণ্টার বেশি লাগে না!

 

(এখান থেকে হেঁটে চলার পথ শুরু...।)(এখান থেকে হেঁটে চলার পথ শুরু...।)

 

 

আমরা হাসিমুখে হাঁটা শুরু করলাম। চার ঘণ্টা হাঁটবো,এ আর এমন কি! চারদিকে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য,দূরে উঁচু উঁচু পাহাড়,মাটির রাস্তা,দুই দিকে গভীর খাদ। মাঝে মাঝে রাস্তা খাড়া হয়,মাঝেমাঝে ঢালু।

প্রথম কয়েক ঘণ্টা হাসিমুখে চলে আসলেও এক সময় সবার মুখ থমথমে হয়ে আসে। ঘড়িতে তখন সময় আড়াইটা। গাইডকে আর কতক্ষণ লাগবে জিজ্ঞেস করতেই গাইড হাসিমুখে বলে,"এইতো দশ মিনিট।"

 

(একটা সময় সবার মুখ থমথমে হয়ে আসে...।)(একটা সময় সবার মুখ থমথমে হয়ে আসে...।)

 

 

ঘড়িতে যখন বিকেল চারটা,তখন আবার গাইডকে ক্লান্তমুখে জিজ্ঞেস করি,"কিরে কাজল দা,আর কতক্ষণ? বগালেক কই?"

গাইড আবার হাসিমুখে উত্তর দেয়,"চলে আসছি বদ্দা। আর দশ মিনিট। "

এভাবে দশ মিনিট করতে করতে এক সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা নাগাদ আমরা বগালেক এসে পৌঁছাই। তখন সন্ধ্যা ছুঁই,লেকের শান্ত সবুজ পানি। এসব দেখে বইয়ের ভাষায় সকল ক্লান্তি চলে যাওয়ার কথা,বাস্তবে আমাদের যায়নি। বগালেক উঠেই শাহেদ ভাই আর গাইড চলে গেলো সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে,কটেজ আর নাম এন্ট্রি করতে। আমরা ওইখানেই মাটিতে মরার মত পড়ে থাকলাম।

শেষের দুই কিলোমিটার পথ ক্রমে সরু আর এবড়োখেবড়ো আর কষ্টকর হয়ে আসছিলো। এই পথটুকু সবচেয়ে কষ্টকর ছিলো।শেষের দুই কিলোমিটার পথ ক্রমে সরু আর এবড়োখেবড়ো আর কষ্টকর হয়ে আসছিলো। এই পথটুকু সবচেয়ে কষ্টকর ছিলো।

 

 

আমাদের দলে এই তিনজনের স্ট্যামিনা বেশি ছিলো। তাই আমাদের আধা ঘণ্টা আগেই এরা বগালেক দেখার সৌভাগ্য লাভ করে।আমাদের দলে এই তিনজনের স্ট্যামিনা বেশি ছিলো। তাই আমাদের আধা ঘণ্টা আগেই এরা বগালেক দেখার সৌভাগ্য লাভ করে।

 

 

বগালেক যাওয়ার পথে...।বগালেক যাওয়ার পথে...।

 

(উঠেই মাটিতে পড়ে ঘুম....।)(উঠেই মাটিতে পড়ে ঘুম....।)

 

নাম এন্ট্রি হলো,ছোট একটা বেড়ার ঘরের দোতলায় আমাদের থাকার জায়গা হলো। গাইড এসে ফ্লোরে বেড বিছিয়ে দিলো।

আমরা গোসল করতে নামলাম বগালেক। সৌভাগ্যবশত সেদিন পূর্ণিমা ছিলো। হুমায়ূন আহমেদ সাহেব বনের পূর্নিমা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন,তিনি পাহাড়ের উপর পূর্ণিমা দেখলে কি করতেন কে জানে! লেকে গোসল করছি সবাই,মাথার উপর বিশাল চাঁদ,চাঁদের আলোয় লেকের পানি আলোকিত,পাহাড়ের ভেতর থেকে নানান অদ্ভুত শব্দ।

(সেদিন পূর্ণিমা....!)(সেদিন পূর্ণিমা....!)

 

গোসল করে ভাত খেয়ে লেকের ধারে আগুন জ্বালিয়ে বসলাম। সাথে সাথে মনে হলো,সৃষ্টিকর্তা মন থেকে চাওয়া কোন শখ অপূর্ণ রাখেন না। সবসময় স্বপ্ন দেখতাম,স্কুলের ফ্রেন্ড সার্কেলটার সাথে কোথাও যাবো। ঠিক যেরকম জায়গায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম,সেরকম জায়গায় তখন বসে আছি। কোন নেটওয়ার্ক নেই,ইলেক্ট্রিসিটি নেই,যন্ত্রের ছোঁয়া নেই। মাথার উপর ভরা পূর্নিমা,পাশে সব প্রিয় বন্ধু। অবস্থা এমন ছিলো,নেটওয়ার্ক না থাকায় কেউ মোবাইল ব্যবহার করতে পারছিলো না। তাই আড্ডায় কেউ আলাদাভাবে মোবাইল টিপতেও ব্যস্ত ছিলো না।

(বগালেকের ধারে....।)(বগালেকের ধারে....।)

 

রাত এগারোটা করে সবাই ঘুমাতে গেলাম।এবার সবাই এক রুমে ফ্লোরে গণবিছানায়। শাহেদ ভাই বারবার বলে দিল,খুব ভোরে উঠে কেউক্রাডংয়ের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিতে হবে। অতএব সব দুষ্টামি বাদ দিয়ে যেন অতিসত্বর সবাই ঘুমিয়ে যায়। আর যে ঘুমাবে না,সেটা তার ব্যাপার,তবে সকালে সে উঠতে না পারলে তাকে লাথি মেরে উঠানো হবে।

 

রাতের বগালেক! (ছবি-সংগৃহীত)রাতের বগালেক! (ছবি-সংগৃহীত)

 

সব কিছু শেষ করে রাত বারোটা নাগাদ ঘুমিয়ে যাই। এই পর্যায়ে এসে একটা ভৌতিক ঘটনা শেয়ার করছি। বগালেক নিয়ে অনেক ভৌতিক লোককাহিনী প্রচলিত আছে। রাত বারোটায় ঘুমিয়ে আমার ঘুম রাত দুটো কি তিনটার দিকে ভেঙে যায়। আবছা ঘুম ঘুম চোখে আমি ঘরের ভেতর জানালার সামনে "কিছু একটা" দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। অদৃশ্য আকর্ষণে আমি উঠে "তার" কাছে যেতে চাচ্ছিলাম,পাশে শাহেদ ভাই ছিলেন,তিনি আমাকে চেপে শুইয়ে দিয়ে গায়ে হাত পা তুলে দিলেন।

জানালার ধারে আসলেই "কিছু একটা" ছিলো,এই ব্যাপারটার সত্যতা জানা যায় সেখান থেকে ফেরত আসার পর। শাহেদ ভাইয়ের নাকি ঘুম আমার আগেই ভেঙে গিয়েছিলো এবং তিনিও সেই একই অশরীরী দেখেছিলেন। দেখেছিলেন বলেই আমি উঠতে চাইতেই আমাকে চেপে ধরে ছিলেন।

পাঠক,ভয় পাওয়ার কারণ নেই। সামান্য ভৌতিক ঘটনা না ঘটলে কি আর এডভেঞ্চার হয়?

তাছাড়া কটেজে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অশরীরী তো কারো ক্ষতি করছে না। সে মধ্যরাতের প্রকৃতি দেখছে,দেখুক। আপনি তখন ঘুমান, শুধু খুব ভোরে উঠে পড়ুন। কেন বলছি? সেটা আগামী পর্বে! 
(চলবে...)