লেখা- রাহুল বণিক 

৮০০০ টাকায় পশ্চিম বাংলার সর্বোচ্চ পিক ১১৯৩০ ফুট উচ্চতার সান্দাকফু সামিট ট্রেক করে সফল ভাবে শেষ করতে সক্ষম হলাম জানুয়ারির ৩১ তারিখ! 
যাদের মনোবল প্রচন্ড, খাড়া পথে হাটতে তেমন কষ্ট হয় না আর পাহাড় ভালোবাসেন তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ আর রোমাঞ্চকর ট্রেকিং অভিজ্ঞতা এই সান্দাকফু সামিট!

এত উচুতে উঠে যখন নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হবে কিন্তু চোখের সামনে বিশাল হিমালয়ান রেঞ্জ যার মধ্যে কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, মাকালু, পান্ডেম, থ্রি সিস্টারস আর এভারেস্ট যখন দেখতে পাবেন, তখন মনে হবে এইতো স্বর্গ!
মূলত মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা হয়। গাড়ি করে যাওয়া অথবা ট্রেকিং দুইটাই করা যায় সান্দাকফু পৌছাতে গেলে। গাড়ি ভাড়া ৪৮০০ রুপি (নিয়ে যাবে+একরাত সান্দাকফু থাকবে+পরদিন সকাল ১০টায় ফেরত আসবে)। আর ফালুট পর্যন্ত যেতে চাইলে ৮০০০ রুপি গুনতে হবে। একটা জিপে ৮ জন আরামসে যেতে পারবেন। গাড়ি মানেভঞ্জন থেকেই পাওয়া যাবে।

তবে ওয়েস্ট বেঙ্গলের হাড় কাপাঁনো শীত আর অপার্থিব পাহাড়ি সৌন্দর্য্যের ১৫ আনাই মিস করে যাবেন গাড়িতে গেলে! 
আমরা ৬ জন গিয়েছিলাম খুলনা থেকে। দার্জিলিং ছিলাম ২ রাত, পাহাড়ে ছিলাম ৪ দিন ৩ রাত।

স্লিপিং বুদ্ধস্লিপিং বুদ্ধ

যেভাবে যাবেনঃ
ঢাকা-খুলনা- ৫৫০
খুলনা- বেনাপোল- বর্ডার- বনগা- শিয়ালদাহ- ৪৫+১০+ ৩০(রুপি)+ ২০(রুপি)
*এখান থেকে সব হিসাব রুপিতে: 
শিয়ালদাহ- নিউ জলপাইগুড়ি (পদাতিক এক্সপ্রেস রাত ৯:৩০)- ৩৬০
নিউজলপাইগুড়ি- শিলিগুড়ি জিপ স্ট্যান্ড - ২০ (শেয়ারড মাহিন্দ্রা)
শিলিগুড়ি- দার্জিলিং- ১৫০ (শেয়ারড জিপ)

দার্জিলিং আমাদের প্রধান গন্তব্য ছিল না। তাই অতবেশি আগ্রহ ও ছিল না দার্জিলিং ঘোরার। তবুও আশেপাশের দর্শনীয় জায়গা গুলা ঘুরে নিলাম। জিপ রিজার্ভ করা যায় ২২০০-২৫০০ রুপি দিয়ে। যেদিন যাবেন দার্জিলিং, সেদিনই সন্ধ্যায় গাড়ি ঠিক করে রাখুন। পরদিন ভোরে বেরিয়ে পড়তে হবে।

যা যা ঘুরিয়ে আনবেঃ
১. টাইগার হিল ২. বাতাসিয়া লুপ ৩.রক গার্ডেন ৪. হিমালয়ান মাউন্টেইনিয়ারিং ইন্সটিটিউট ৫. চিড়িয়াখানা ৬. মিউজিয়াম সহ আরো কয়েকটা পয়েন্ট। রোপওয়ে তে চড়তে পারেন। ৫ কিমি রোপওয়েতে চড়তে ২০০ রুপি খরচ হবে।

দার্জিলিং ঘুরতে বড়জোড় একদিন সময় লাগবে। হোটেল ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ রুপি সর্বোচ্চ। দার্জিলিং পেট্রোল পাম্পের কাছেই হোটেল "Groove Hill" এ ছিলাম আমরা। এক রুমে ৫ জন থাকা যায়। প্রতি রুম ৯০০ রুপি করে। দাম কম হলেও রুম ভালো। রাতের খাওয়া দাওয়া "Big Bazar" এর পাশেই বাঙ্গালি রেস্তোরাঁ "Ana Mistan and Restaurant" এ করতে পারেন। কম খরচে (১০০ রুপির মধ্যে) অনেক সুস্বাদু বাংলা খাবার পাবেন। ব্যাকপ্যাক হোটেলের কাউন্টারে রেখে দার্জিলিং ঘুরতে বের হবেন আর বিকালে এসে মানেভঞ্জন এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন।

কালাপোখরি-ছবির মত সুন্দর গ্রাম কালাপোখরি-ছবির মত সুন্দর গ্রাম

দার্জিলিং জিপ স্ট্যান্ড থেকে শেয়ারড জিপ পাওয়া যায় মানেভঞ্জন এর। খরচ ১০০-১২০ রুপি। যদি বিকেল হয়ে যায় আর মানেভঞ্জন এর গাড়ি না পাওয়া যায় তবে ৩০ রুপি দিয়ে চলে যান "সুকিয়াপোখরি" বাজারে। সেখান থেকে এভেইলেভল জিপ ছেড়ে যায় শেয়ারে মানেভঞ্জন এর উদ্দেশ্যে।

তবে শেয়ারড জিপে যেতে চাইলে দুপুর ২টার মধ্যে যাওয়া ভালো, পরে তেমন পাওয়া যায় না। 
মানেভঞ্জন থেকে শুরু হয় ট্রেকিং। আশেপাশে জিজ্ঞেস করলেই কোথা থেকে গাইড পাওয়া যায় দেখিয়ে দিবে। 
গাইড কে প্রতিদিন দিতে হবে- ৮০০ রুপি
সিংগালিলা পার্কের টিকেট (অত্যাবশ্যক) - ২০০ রুপি
ক্যামেরা থাকলে তার জন্য- ১০০ রুপি
পাহাড়ে সব কিছুরই দাম বেশি। টানা ৪ দিন (৩দিন উঠা আর ১ দিন নামা) ট্রেকিং যেহেতু করতে হবে তাই পরিমাণ মত চকলেট, নুডুলস, বিস্কিট নিয়ে যান মানেভঞ্জন থেকে।

মানেভঞ্জন থেকে চিত্রে হয়ে মোট ১৪ কিমি হাটার পর পৌছে যাবেন প্রথম দিনের গন্তব্য "তুমলিং" এ। প্রথম দিনটা একটু মানিয়ে নিতে কষ্ট হতে পারে। পরদিন থেকে ঠিক হয়ে যাবে। তুমলিং এ নেপালিদের কটেজ আছে। ভাড়া দামাদামি করে নিবেন তবে মাথাপিছু ৩০০ রুপির উপরে নয়। 
ডিনারে নুডলস যেটা নিয়ে আসলেন সেটা রান্না করে দিতে বলবেন। ২টা ডিম সহ কুকিং চার্জ মোটামোটি ৫জনের রান্নায় ১০০ থেকে ১৮০ রুপির মধ্যে হয়ে যাবে।
রাতে ভেজ-থালিতে ভাতও পাওয়া যাবে ১৫০-২০০ রুপির মধ্যে। 
ঘুমিয়ে পড়ুন সকাল সকাল। পরদিন ১৬ কিমি হাটতে হবে। ভাগ্য আর আবহাওয়া ভালো থাকলে তুমলিং থেকে দেখা হয়ে যাবে ‘স্লিপিং বুদ্ধ’ খ্যাত হিমালয়ান রেঞ্জের সাথে।

পরদিন ভোরে নাস্তা (২ রুটি, ১ডিম - ৬০ থেকে ৭০ রুপি) করে বেরিয়ে পড়ুন কালাপোখরির উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি খাড়া পথ, পাথুড়ে রাস্তা আর মেঘের উপর দিয়ে হাটতে হাটতে বেলা ৩ টার আগেই পৌছে যাবেন বুদ্ধিস্ট ভিলেজ কালাপোখরি তে। 
এখানে মোটামোটি কালো জলের একটা লেক আছে। বুদ্ধ ধর্মাবলম্বিদের কাছে এটা পবিত্র স্থান। তাই পবিত্রতা বজায় রেখে কটেজে উঠে পড়ুন। 
এখানে আমরা ছিলাম "পান্ডেম" কটেজে। 
৫ জনের মোট ভাড়া পড়েছিল -৮০০ রুপি।
দুপুরে ভাত/নুডলস খেতে পারেন- ১২০-১৫০/ ২০-৪০রুপি
আশপাশটা ঘুরে নিন। রাতের খাবার খেয়ে ঘুম দিন।

৩য় দিনের ট্রেক তুলনামূলক ছোট কিন্তু খাড়া পথটা বেশি। মোট ৭ কিমি হাটার পরেই আপনি পৌছে যাবেন আপনার ওয়াইল্ডেস্ট ড্রিম "সান্দাকফু" তে। প্রথম ৪০-৫০ মিনিট সমতল আর তার পরের ১.৫-২ ঘন্টা খাড়া পথ। কষ্ট হলেও পিকে উঠার পর আর কষ্ট থাকবে না, প্রায় ১২০০০ ফুট উচ্চতার নেশাটাই আলাদা। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে বিকেলের সূর্যের লাল আভায় উপভোগ করুন হিমালয়ান রেঞ্জের পর্বতমালা আর খোদ এভারেস্ট! পরদিন ভোরটাও একই ভাবে উপভোগ করুন।

পরদিন সকালে সান্দাকফুতে নাস্তা করে শুরু করুন ফেরার যাত্রা। ফ্রি-ফল টেকনিকে ( শরীরের ভর ছেড়ে দৌড়ে নিচে নামা) প্রায় ১৮ কিমি নিচে শ্রীখোলা গ্রাম পর্যন্ত নামতে হবে। মাঝখানে "গুরদুম" পড়বে। নুডলস খেয়ে আবার নামা শুরু করুন। আমরা ৮:৩০ এ সান্দাকফু থেকে যাত্রা শুরু করে দুপুর ১:৩০ এর মধ্যে শ্রীখোলায় পৌছে যাই। সেখানকার নেপালিদের ভাষ্যমতে অনেক তাড়াতাড়িই নেমে আসছি আমরা। শ্রীখোলা নামক ট্রেইল বয়ে যাওয়া সুন্দর এই শ্রীখোলা গ্রামে এক রাত থাকতে পারেন। খরচ আগের কটেজগুলার মতোই।

পরদিন সকালে শেয়ারড জীপে করে ফিরে আসুন সরাসরি শিলিগুড়ি। ভাড়া ৩৫০-৪০০ রুপি পারহেড। সময় ৩-৪ ঘন্টা। শিলিগুড়ি থেকে নিউজলপাইগুড়ি এসে ট্রেন/বাস দুইটাই পাবেন। যেভাবে গিয়েছিলেন একই কায়দায় সুস্থ শরীরে ফিরে আসুন মাতৃভুমিতে।

এই ৪ দিনের ট্রেকিং চেষ্টা করবেন দুপুরের দিকে/আগেই ওইদিনের গন্তব্যে পৌছানোর। দুপুরের পর আবহাওয়া প্রচন্ড খারাপ থাকে, ১২০-১৩০ কিমি বেগে ঠান্ডা কুয়াশা ও বাতাস বইতে থাকে।

কাপড়-চোপড়ের ক্ষেত্রে "লেয়ার" টেকনিক ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয়। ভারী জ্যাকেট না পড়ে চেষ্টা করুন কয়েক লেয়ারে হালকা কাপড় পরার। এতে ঠান্ডা আর কষ্ট দুইটাই কমে যাবে।

যেসকল জিনিস/ব্যাপার নেয়া/করা অত্যাবশ্যকীয়ঃ
১. একটা প্যারাসুট জ্যাকেট (wind cheater)
২. ভালো সোল+গ্রিপ ওয়ালা একজোড়া হাইনেক জুতা (অবশ্যই আগে এক সপ্তাহ পরে অভ্যস্ত হয়ে নিবেন, নতুন জুতা নিয়ে যাবেন না)+ উলের মোজা
৩. মোটা হাতমোজা
৪. মাংকি ক্যাপ+ মাফলার
৫. গ্যাসের ওষুধ, পেইন কিলার, মুভ, ব্যান্ডেজ, স্যাভলন
৬. ট্রেকিং এর সময় দাঁড়িয়ে রেস্ট নিন, মুখ দিয়ে নিশ্বাস না ছেড়ে নাক দিয়ে ছাড়ার চেষ্টা করুন,
বসতে যাবেন না, পা ধরে যাবে। 
৭. পানি যথাসম্ভব কম খাবেন। 
৮. নিশ্বাস নিতে সমস্যা হবে। নিরাপত্তার জন্য ইনিহেলার নিয়ে যান। 
৯. পাসপোর্ট কাছাকাছি রাখুন, পথে অনেক বার এন্ট্রি করতে হবে।
১০. জিন্স পরে ট্রেকিং না করাই ভালো, দুইটা ট্রাউজার লেয়ারে পরে নিন।

সান্দাকফুসান্দাকফু

নেপাল-ইন্ডিয়া দুইদেশের মধ্য দিয়েই ট্রেকিং রুটটি গেছে। দুই দেশের সংস্কৃতি উপভোগ করার জন্য অন্যতম একটি ট্রেকিং জোন সান্দাকফু। সান্দাকফু যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় মার্চ-এপ্রিল। বসন্ত থাকে সেসময়, ঠান্ডাও তুলনামূলক কম থাকে, প্রচুর রডোডেনড্রন ও ফুটে থাকে এসময়। তবে যারা বরফে ট্রেক করতে চান আর প্রতিদিন মাইনাস টেম্পারেচারে থাকার মনোবল নিয়ে প্রস্তুত তাদের জন্য ভালো সময় জানুয়ারি মাসটা। মেঘের উপরে পাহাড়ের বিশালতা আর নীল দিগন্ত সূর্যখেলা যাদের প্রচুর টানে আমি তাদের বলব একবার গিয়ে আসুন। এভারেস্টে উঠার শখ চেপে বসবে মাথায়।

মোট খরচ- 
১.দার্জিলিং ২ দিন এক রাত ১৫০০ রুপির মধ্যে হয়ে যাবে
২. মানেভঞ্জন-তুমলিং-কালাপোখরি-সান্দাকফু-শ্রীখোলা ৫ দিন ৪ রাত ৪৫০০ রুপির মধ্যে হয়ে যাবে। 
সর্বমোট ৬০০০ রুপি মানে প্রায় ৮০০০ টাকায় ভ্রমণ শেষ হয়ে যাবে। তার পরও সেফটি হিসেবে+ যদি শপিং করতে হয় নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা নিয়ে যান।