কেওক্রাডং আরোহণের পর তাজিংডং আরোহণের নেশা পেয়ে বসলো। তখন পর্যন্ত জানতাম বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং বা বিজয়। তাই দেশের সর্বোচ্চ স্থানে পা রাখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। বিভিন্ন ভাবে খোঁজ খবর নিয়ে আমরা ১০ জন তাজিংডং অভিযানে বাহির হলাম। তাজিংডং দুই দিক দিয়ে যাওয়া যায়। বগালেক, কেওক্রাডাং হয়ে ও থানচি দিয়ে। যেহেতু আমরা বগালেক, কেওক্রাডং আগের বছরই গেছি, তাই থানচি দিয়ে যাবার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করলাম। অনেক জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নভেম্বর মাসের ২৯ তারিখে রওনা দিলাম বান্দরবনের উদ্দেশ্যে তাজিংডং আরোহণের লক্ষ্যে। বান্দরবান নেমেই চাঁদের গাড়ীতে করে থানচি এবং সেখান থেকে সর্পিল সাঙ্গু নদীর বুক চিরে রেমাক্রি চলে গেলাম। ও হ্যা আমরা প্রথমে যাব অপূর্ব সুন্দর নাফাখুম ঝর্না দেখতে। রাতে রেমাক্রিতে সাঙ্গু নদীর ধারে বাঁশের তৈরী পাহাড়ি গেস্ট হাউজে রাত্রি যাপন করে ভোর বেলা রওনা দিয়ে আড়াই ঘন্টা ট্রেকিং করে নাফাখুমে পৌঁছালাম।

রেমাক্রিখুমে আমরারেমাক্রিখুমে আমরা

অদ্ভুত সুন্দর এই পাহাড়ী ঝর্না। অপরুপ সুন্দর এই ঝর্নার রুপ সুধা পান করে ফেরার পথে রেমাক্রিখুমের সুশীতল জলে জলকেলি করে রেমাক্রি বাজারে এসে পাহাড়ি আলুর তরকারি দিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা বাদে। নাফাখুম যাবার সময় পড়ে গিয়ে আমাদের দলের সদস্য ডাঃ রায়হানের ডান হাতের দুইটা হাড়ই ভেঙ্গে গেল। যাহোক কোনো রকমে গামছা দিয়ে বেঁধে ব্যাথা নাশক ইন্জেকশন দিয়ে আমরা থানচি ফিরে আসলাম।

ট্যুর প্লান অনুযায়ী আগামীকাল আমাদের মূল লক্ষ্য তাজিংডং। কিন্তু রায়হানের হাত ভাঙ্গার সাথে যুক্ত হলো সুমনের ডায়রিয়া ও বাবুর দোদুল্যমানতা। আর রফিক, রুহুল ও মাহা তো ইস্তফাই দিয়ে দিল। এদিকে গাইডও নিষেধ করছে। আমাদের বয়স বেশী হওয়ার কারনে আমাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব হবেনা। এই অবস্থায় কি করবো বুঝতে পারছিনা! পড়লাম মহা দুশ্চিন্তায়। একবার মনে হচ্ছে বাদ দেই। কিন্তু  পরক্ষনেই ভাবছি এত আশা করে, এত কাছে এসে চলে যাব? মানতেই পারছিনা।

নাফাখুম নাফাখুম

যা হোক শেষ পর্যন্ত রায়হান ভাঙ্গা হাত নিয়েই যেতে রাজী হওয়াতে যাবার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে গেল। কথায় আছে সমস্যা যখন আসে চারদিক থেকেই আসে। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হলো। পরদিন ভোর বেলা রওনা দিব এমন সময় কয়েকজন বিডিআর সদস্যের সাথে দেখা। তারা যেতে দিবে না। গাইডকে তো একটা থাপ্পড়ই দিয়ে দিল।

তাদের বক্তব্য আমরা ৪ বছর এখানে আছি আমরা কখনো সাহস করিনি। তাছাড়া ওখানে বাংলাদেশ সরকারের কোন বাহিনী নেই। মোদ্দা কথা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। ওখানে কিছু হলে আপনাদের কে নিরাপত্তা দিবে? ইত্যাদি ইত্যাদি। । শেষ পর্যন্ত অনেক অনুরোধ করে যাবার অনুমতি পাওয়ায় সংগে সংগে আল্লাহর নাম নিয়ে রওনা দিলাম রফিক, মাহা ও রুহুল বাদে,  একটি স্বপ্ন পূরনের উদ্দেশ্যে।

নাফাখুম থেকে ফেরার পথেনাফাখুম থেকে ফেরার পথে

চারিদিকে সবুজ পাহাড়, আঁকা বাঁকা পাহাড়ী পথ ও নির্মল বাতাসে মনটা ভরে গেল। মনে হচ্ছে একটা স্বপ্নের মধ্যে আছি। কিন্তু স্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফিরে আসতে খুব একটা সময় লাগলো না।  থানচি থেকে কিছুদূর যেতেই বুঝলাম কপালে অনেক দুঃখ আছে। পথ কত জটিল তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া শুরু করলাম। যেমন কষ্ট, তেমন রিস্কি। সত্যি বলতে এটাকে পথ বলা যায় না। কোথাও পাহাড় ভেংগে একটু পা ফেলার জায়গা হয়েছে তো কোথাও গাছের গুল বা বাশঁ ফেলা আছে বা লম্বা করে দেওয়া আছে।

একপাশে পাহাড় আর অন্য পাশে হাজার ফিট খাদ। কোন ভাবে একবার পা ফসকে গেলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা একজন অন্য জন থেকে একটু ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকলাম যেন কেউ পড়ে গেলে একাই যায় অন্য জনকে সাথে না নিতে পারে। রাস্তার এই অবস্থা দেখে সবার ঈমান মজবুত হয়ে গেল। উপরে ওঠার সময় আল্লাহ আকবর ও নীচে নামার সময় সুবাহানাল্লাহ বলতে বলতে পথ চলতে থাকলাম।

তাজিংডং যাওয়ার পথে তাজিংডং যাওয়ার পথে

প্রায় ৩ ঘন্টা হাটার পর একটি পাড়ায় পৌঁছালাম, নাম বোর্ডিং পাড়া। যেন সাগরে এক টুকরো খঁড়কুটোর সন্ধান পেলাম। ঝিরির ধারে বসে শুকনো খাবার ও পানি খেয়ে  আবার শুরু হলো আমাদের পথচলা।  এদিকে পানি ও খাবার কমতে থাকলো। তার সাথে বাড়তে লাগলো বাবুর ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। খাবার ও পানি রেশনিং করা শুরু হলো। এরপর কাইথন পাড়ায় পৌঁছে পাহাড়ী কলা ও গুড়ের চা খেয়ে আবারও শুরু করলাম আমাদের তাজিংডং অভিযান। কাইথন পাড়া পার হয়ে  যখন সিম্পলাম্পি পাড়ার উদ্দেশ্য রওনা দিলাম, তখন জীবন আর চলছে না। মনে হচ্ছিল আসার সিদ্ধান্তটা সঠিক হয়নি। বিডিআর এর কথা শোনা উচিত ছিল। আর মনে মনে ভাবছি আসলেই কি এর কোন শেষ আছে? আর আমরা কি সেটা পারবো? কিন্তু এখন তো আর পিছনে যাওয়া সম্ভব না। তাই কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে মাথায় এক গাদা চিন্তা নিয়ে ছুটে চললাম অজানাকে জানতে। কাইথন পাড়া থেকে সিম্পলাম্পি যাওয়ার রাস্তাটা অনেক খাড়া। আবার কয়েক ঘন্টা হাটার ফলে শরীরের  অবস্থাও খারাপ।

তাজিংডং যাওয়ার পথে একটি উতড়াই তাজিংডং যাওয়ার পথে একটি উতড়াই

সবার প্রস্রাব পায়খানা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। এমন কি! ডায়রিয়ার আক্রান্ত সুমনেরও। এই যখন অবস্হা তখন বাবুর একটা কথা শুনে সবাই না হেসে পারলাম না। গায়র রং কালো হওয়ার কারনে, আমরা যাকে এ্যামব্রোস বলে ডাকি সেই বাবু বললো আমিতো কালো হয়ে গেলাম। যাহোক একদিকে হাসি তামাসা, অন্য দিকে টেনশন করতে করতে সিম্প্লামপি পাড়ায় যখন পৌছালাম, তখন বিকেল ৩.৩০ টা বেজে গেছে।

আমরা কারবারির বাসায় পানি খেয়ে ও  পানি নিয়ে এবং ওনার কাছ থেকে দুটা মুরগি কিনে নিয়ে যার একটির ওজন ৩.৫০ কেজি ও অন্যটির ২.৫০ কেজি নিয়ে আবার রওনা দিলাম। আর সেই সাথে বুঝতে পারলাম আমরা কত উপরে উঠেছি। কারন যে বাকলাই আর্মি ক্যাম্প ( সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে যায়) অনেক উচুঁতে ছিল, এখন সেটা অনেক নীচুঁতে চলে গেছে। এখান থেকে অবশ্য তাজিংডং এর পথটা তুলনামূলক সহজ।

আমরা শেষ পর্যন্ত যখন তাজিংডং পৌছালাম তখন বিকেল ৪.৩০ টা বাজে। হুররে! তাজিংডং পাহাড়ে চলে এসেছি। কিন্তু উপরে উঠব কিভাবে? এখানে কেওক্রাডং এর মত সিঁড়ি নেই। আমি ও সুমন শুরুতে উঠতে শুরু করলাম ৪ হাত পা লাগিয়ে বেয়ে বেয়ে। অতি কষ্টে সবাই উঠে চিৎকার শুরু করলাম। শুধু রায়হান পারলো না হাত ভাংগা ছিল বলে। এখানে সামান্য কিছু জায়গা পরিষ্কার করা হয়েছে। চারদিকে গভীর জঙ্গল।

বন্ধুর রাস্তাবন্ধুর রাস্তা

কেওক্রাডং পাহাড়ের মত এখানে কোন নেম প্লেট নেই। এখান থেকে সাকাহাফং পাহাড়, দূরের উপজাতি গ্রাম দেখা যায়। বর্ষায় এলে মেঘ ছোঁয়া যেত। ব্যানার নিয়ে ছবি তুলে নামতে শুরু করলাম চার হাত পা লাগিয়ে। তাজিংডং জয় করে মনে এক রাশ প্রশান্তি নিয়ে রওনা হলাম শেরকর পাড়া অভিমুখে যাত্রা। কিন্তু এই প্রশান্তি দুশ্চিন্তায় রুপ নিতে সময় লাগলো না। কিছু পরেই আমাদেরকে একা রেখে ধুপ করে সূর্য মামা দিগন্তে হারিয়ে গেল। পড়লাম মহা বিপদে।

এতক্ষন তো পথটা তবু দেখতে পাচ্ছিলাম। অন্ধকার হওয়ায় সেই উপায়ও নাই। আবার নাকে ভেসে আসছে মরার পচা গন্ধ। আতংকে সবার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। চুপচাপ ও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছি। কিন্তু পথ যেন আর শেষ হয় না। তবে এই পথ টুকু অন্ধকারে সামান্য চাঁদের আলোয় কিভাবে পাড়ি দিয়েছি, তা শুধু আল্লাহই ভাল জানেন। তারপর রাতে যখন শেরকর পাড়া এসে পৌঁছলাম, তখন যেন হাতে স্বর্গ পেলাম।

এটাও একটা বম পাড়া। এখানে বারবিকিউ করা হলো। আর মুরগীর ঝোল দিয়ে জুম চালের ভাত। অসাধারণ স্বাদ। সবাই খুব মজা করে খেলাম। আমি আমার জীবনে এত বেশী কোনদিন খাই নাই। তারমানে এই না যে খুব সুস্বাদু ছিল। বরং বাসায় হলে মুখেই তুলতাম না। আসলে সারাদিনের পরিশ্রমের কারনে এত ক্ষুধা লেগেছে যে পাথর খেয়েও হজম খাওয়া সম্ভব।

তাজিংডং শীর্ষে আমরা তাজিংডং শীর্ষে আমরা

যাহোক পাড়ার এক বম চাচার বাসায় বাশের বিছানায় (বাশের মেঝে) ব্যাগ কে বালিশ বানিয়ে দিলাম এক ঘুম। সকালে যখন টয়লেটে যাব তখন ঘটলো মজার এক ঘটনা। বদনা হাতে নেওয়ার সাথে কয়েকটা শুকর তেড়ে আসলে ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু পরক্ষনেই বুঝলাম ভয় পাবার কারন নেই। কারন তারা চলে গেল টয়লেটের নীচে মল খাবার জন্য। এরপর নাস্তা করে তাজিংডং জয়ের মধুর স্মৃতি নিয়ে রওনা দিলাম থানচির উদ্দেশ্যে। একটা বড় স্বপ্ন সত্যি হলো। আমি শুধু একটা কথা বলবো। ভারতের কাশ্মীর, সিমলা, মানালী, দার্জিলিং ঘুরেও এমন রোমাঞ্চিত হইনি।