প্রতিটা ট্যুর শেষ করে যখন অভিজ্ঞতা লিখতে বসি, অভ্র কীবোর্ডের শব্দ গুলো তখন যেন বেইমানী শুরু করে। মনে হয় ঠিক ঠাক কিছুই বর্ণনা করতে পারছি না।

যাইহোক, তাও শুরু করি....

যারা সেফলি ট্র‍্যাকিং করতে চান এবং এডভেঞ্চারপ্রিয়, তাদের জন্য একেবারে আদর্শ জায়গাটির নাম সীতাকুণ্ড। কিছুদিন আগেই এক দিনের সীতাকুণ্ড ট্যুর শেষ করে আসলাম। আপনাদের সুবিধার জন্য একদম হুবুহু ট্যুরের খুঁটিনাটি তুলে ধরার চেষ্টা করব।

ঢাকা থেকে রাতের বাসে রওনা দিলে খুব ভোরে আপনাকে সীতাকুণ্ড নামিয়ে দিবে। চেষ্টা করবেন ১২ টা বা তার পরের বাসে উঠতে, যাতে আলো ফোটার আগেই সীতাকুণ্ড নামিয়ে না দেয়। ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড ভাড়া ৪৮০ টাকা। সুপারভাইজারকে বলে রাখবেন যেন সীতাকুণ্ডের ইকো পার্কের সামনে নামিয়ে দেয়।

ইকো পার্কের গেটে নেমে হাল্কা নাস্তা খেয়ে, কিছু শুকনো খাবার কিনে নিয়ে প্রস্তুতি নিন জীবনের জোস একটা অভিজ্ঞতার জন্য।

সুপ্তধারাঃ

সুপ্তধারা ঝর্ণায় যাওয়ার জাগ্রত সিঁড়ি। মোট ৪২৪ টা সিঁড়ি ছিল।সুপ্তধারা ঝর্ণায় যাওয়ার জাগ্রত সিঁড়ি। মোট ৪২৪ টা সিঁড়ি ছিল।

ইকো পার্কের গেট থেকে সিঞ্জি নিয়ে পার্কের মেইন গেটে চলে যান, ভাড়া জন প্রতি ১০ টাকা। সেখানে ইকো পার্কের টিকেট কাটতে হবে। টিকেট ২০ টাকা প্রতিজন। মেইন গেটে সিঞ্জি পাওয়া যায়, নরমালি সহস্রধারা পর্যন্ত ৩০০ টাকা ভাড়া। তবে সাজেশন থাকবে যাওয়ার সময় সিঞ্জি না নিয়ে হেঁটে রওনা দিন। তবে হাঁটা একটু কষ্টদায়ক, যেহেতু পাহাড়ের রাস্তা ধরে উপরে উঠতে হবে। তবে কষ্ট ছাড়া এডভেঞ্চারের ফিল নেয়া ক্রাইমের পর্যায় পরে।

সুপ্তাধারায় যাওয়ার পথে ইকো পার্কের এই রাস্তাটায় কিছুক্ষন পর পর পাবেন ফুলশূন্য ফুলের বাগান। কেন সেখানে ফুলশূন্য, সেটা না হয় কতৃপক্ষের জন্য প্রশ্ন রইলো।

ইকো পার্কের এই রাস্তাটির বিশেষত্ব হলো, কিছুক্ষণ বাদে বাদে বিশাল সাইনবোর্ডে লিখা ছোট কবিতা বা কিছু অর্থবহ বিশেষ লাইন অথবা সতর্কবাণী। যেটা একদম ইউনিক অন্যান্য পার্ক থেকে।

যাইহোক, ২৫-৩০ মিনিট হেঁটে পৌঁছে যাবেন সুপ্তধারা ঝর্ণার প্রবেশপথে। প্রায় ৪২৪টি সিঁড়ি নিচে নেমে যেতে হবে মূল সুপ্তাধারা থেকে প্রবাহিত পাহাড়ি ঝিরিপথের মুখে। ধীরে ধীরে সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামুন। বেশ কয়েকবার রেস্ট নিয়ে নিন। তাড়াহুড়ো করবেন না একদম, বৃষ্টির দিনে কিছুটা পিচ্ছিল থাকতে পারে। তাই ট্র‍্যাকিং শু বা ফ্রিকশন বেশি এরকম জুতা পরলে ভাল হয়। সিঁড়ি থেকে নেমে হাতের বামের ঝিরিপথ ধরে এগোতে শুরু করুন। সুপ্তধারা নামকরণের পেছনে কারণ হলো, এই ঝর্ণা বর্ষাকাল ছাড়া সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

সিঁড়ি যেখানটায় শেষ, তার পর থেকেই পাহাড়ি ঝিরিপথ শুরু। এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।সিঁড়ি যেখানটায় শেষ, তার পর থেকেই পাহাড়ি ঝিরিপথ শুরু। এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

ঝিরিপথে সর্বোচ্চ কোমর সমান পানি কিছু জায়গায়, তাছাড়া নরমালি হাটু সমান পানি। লাঠি সাথে রাখবেন অবশ্যই। সাবধানে ধীরেসুস্থে এগোবেন। নীচে পিচ্ছিল পাথর, তাই এংলেট পায়ে দিয়ে হাঁটা ভালো।

মাঝে কিছু জায়গায় ছবি তোলার জন্য ব্রেক নিতে পারেন।

 

ছবি তোলার জন্য ব্রেকছবি তোলার জন্য ব্রেক

এক থেকে দেড় ঘন্টা কষ্ট করে হেঁটে অনেকটা দূর থেকে যখন সুপ্তধারার পানি পতনের শব্দ কানে বাজবে, তখনি জোরে নিশ্বাস নিন, হার্টকে শান্ত করুন, কারণ একটু পরের সেই অতিপ্রাকৃত দৃশ্যটা দেখার জন্য হার্ট মোটেই প্রস্তুত থাকবে না।

ঝিরিপথের মাতাল জলধারাঝিরিপথের মাতাল জলধারা

 

ঝর্ণা টর্ণা কিচ্ছু নেই, সব বানানো গল্প, মন যখন এরকম আভাস দিচ্ছে, ঠিক তখনি সুপ্তাধারার দেখা পাই আমরা, সবাই একসাথে সজোরে আকাশ বাতাস কাপানো চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছিলাম ".... ... ..... " (শব্দ তিনটা উহ্যই থাকুক, পাবলিক প্লেস বলে কথা )

এক কথায় অবিশ্বাস্য সেই দৃশ্য।

অবিশ্বাস্য সেই দৃশ্যঅবিশ্বাস্য সেই দৃশ্য

ছবি এবং স্মৃতি সংরক্ষনের কাজ শেষ করে আমার অনুরোধ, ঝর্ণাটার ঠিক নিচে গিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকুন, অনুভব করার চেষ্টা করুন প্রকৃতির অপরূপ হিংস্রতাকে। শ্রদ্ধা করুন প্রকৃতির নিষ্ঠুরতাকে।

ঝিরিপথ দিয়ে ঠিক যেই পথে গিয়েছেন, ঠিক সেই পথ দিয়ে চলে আসুন। সিঁড়িপথ দিয়ে উঠতে বেশ কষ্ট হবে। রেস্ট নিয়ে নিয়ে উপরে উঠুন। উঠে বেঞ্চে বসে শুকনো খাবার গুলো খেতে পারেন, অবশ্যই প্রচুর পানি নিয়ে নিবেন সাথে।

 

সুপ্তধারা - সহস্রধারাঃ

সুপ্তধারা থেকে আরও ২৫-৩০ মিনিট হাঁটলে সহস্রধারার সিঁড়িপথ। সেখানে সিঁড়ি প্রায় ৫৫০+ হলেও সুপ্তধারারর সিঁড়ির মত এবড়োখেবড়ো নয়। আর কোন ঝিরিপথ পাড়ি দিতে হবে না। সিঁড়ি থেকে নেমেই দেখতে পাবেন অনেক উঁচু থেকে পতিত হওয়া অবিরাম সহস্রধারা। তুলনামূলক ভাবে সুপ্তধারা থেকে অনেক সহজগম্য বিধায় এখানে অনেকেরই দেখা পাবেন। সহস্রধারার মূল আকর্ষণটা হলো এখানে আপনি মূল ঝর্ণার ঠিক নিচে চলে যেতে পারবেন একদম সহজে।

ফেরার সময় ঝর্ণাটার সামনের পাথরটায় একা কিংবা প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকুন, চোখ রাখবেন ঠিক সহস্রধারার চূড়ার দিকে। কথা দিলাম, সময়টা সেখানে থেমে যাবে আপনার।

সহস্রধারার সহস্র ধারাসহস্রধারার সহস্র ধারা

উঠতে ইচ্ছে না করলেও এবার উঠতেই হবে, কারণ আবার ৫৫০+ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে। এই ট্যুরের সবচেয়ে কষ্টদায়ক মুহূর্ত মনে হয় এটাই। মনে হবে, অনন্তকাল যুগ ধরে সিঁড়ি বাইছেন, তাও শেষ হচ্ছে না।

সহস্রধারা - বাঁশবাড়িয়া বীচঃ

সহস্রধারা বেরোতে বেরোতে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল। সিঞ্জি নিয়ে সোজা চলে আসুন ইকো পার্কের গেটে। ভাড়া ৩০০ টাকা। সেখান থেকে বাসে বা টেম্পুতে করে বাঁশবাড়িয়া যাবেন। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। হেল্পারকে বললেই নামিয়ে দিবে। বাঁশবাড়িয়া নেমে নরমাল কোন হোটেলে ভাত খেয়ে নিন। সেখান থেকে সিঞ্জি নিয়ে চলে যাবেন বাঁশবাড়িয়া বীচে। ভাড়া জন প্রতি ২০ টাকা।

বাঁশবাড়িয়া বীচের সম্পর্কে বলতে গেলে যে শব্দগুলো মাথায় আসে, তা হলো "স্নিগ্ধতা" "প্রশান্তি"।

বাঁশবাড়িয়া বীচে সূর্যাস্তবাঁশবাড়িয়া বীচে সূর্যাস্ত

বীচটি ফুটবল খেলার জন্য আদর্শ। তবে আমার সাজেশন হলো, সবুজ ঘাসের গালিচায় বসে বিকালটা স্নিগ্ধতায় কাটিয়ে দিন। সারাদিনের ক্লান্তি কাটানোর এরচেয়ে ভালো উপায় আর হতে পারে না। সূর্যাস্তটা দেখেই রওনা দিন।

সন্ধ্যার বাসে করে ঢাকা ব্যাক করুন।

 

বিঃদ্রঃ

যথা সম্ভব কম জামাকাপড় নিন, এবং সম্ভব হলে ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ ব্যবহার করুন। ঝিরিপথে হাঁটার জন্য থ্রি কোয়াটার ব্যবহার করুন, এবং সর্বপরি খেয়াল রাখবেন, আপনার দ্বারা প্রকৃতির যেন কোন ক্ষতি না হয়। বোতল, চিপ্সের প্যাকেট ইত্যাদি ব্যাগে রাখুন, পরে ডাসবিনে ফেলে দিবেন।