আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে
উড়ে যাওয়া একটি পাঁপড়ির জন্যে
একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে 
- হুমায়ুন আজাদ

গ্রীষ্মের দিনগুলো ধরে রাখার জন্য মন খুব অস্থির হয়ে উঠে। শীতপ্রধান এই দেশে এক একটি গ্রীষ্ম সমুদ্রের এক একটি ঢেউয়ের মতন , খুব দ্রুত তীরে এসে মিশে যায়। অস্থির মন কর্মজীবনে সাপ্তাহিক ছুটিতে দৌড় দেয় পাহাড়ের দিকে। এইবার ঠিক করা হলো Grotto Mountain. 
গ্রোটো মাউন্টেন আলবার্টার বো-নদীর উপত্যকায় (Bow Valley) অবস্থিত একটি পর্বত।

 

Common Fireweed, Chamerion angustifolium.Common Fireweed, Chamerion angustifolium.

পর্বত প্রেমিকদের জন্য গ্রীষ্মের এই সময়টা স্বর্ণালী সময়। ভোর বেলায় পাহাড় চূড়ার নেশায় আবারো রওনা দিলাম আলবার্টার ক্যানমোর (Canmore) শহরের উদ্দেশ্যে।
কানাডার ওয়েস্ট সাইড-এ হাইওয়ের এর দু-পাশে খোলা সবুজ মাঠ শেষ হয়ে সুদূরে যেয়ে মিশেছে দিগন্তে কিংবা পাহাড়ে , সমুখে পাহাড়ে ঘেরা, আঁকাবাঁকা পথ।

কী ভালো আমার লাগলো আজ এই সকালবেলায়
কেমন করে বলি?
কী নির্মল নীল এই আকাশ, কী অসহ্য সুন্দর,
যেন গুণীর কণ্ঠের অবাধ উন্মুক্ত তান
দিগন্ত থেকে দিগন্তে;

HarebellHarebell

 

সবুজ খোলা মাঠ জুড়ে একের পর এক শৈল্পিক সাজে সজ্জিত খড়ের গাদা (Hay Bales) । দু পাশে চোখ জুড়ানো এই দৃশ্যের মাঝে ঘন্টা খানেক ড্রাইভ করে ট্রেইল এর কাছে চলে আসলাম।

কী ভালো আমার লাগলো এই আকাশের দিকে তাকিয়ে;
চারদিক সবুজ পাহাড়ে আঁকাবাঁকা, কুয়াশায় ধোঁয়াটে,
মাঝখানে চিল্কা উঠছে ঝিলকিয়ে।

চিরপুরাতনী ধরণী চিরপুরাতন নবীনচিরপুরাতনী ধরণী চিরপুরাতন নবীন

Alpine Club of Canada (ACC) অফিসের পাশেই ট্রেইল এর শুরু। মাউন্টেন ক্লাইম্বিং , হাইকিং এসব আউটডোর এক্টিভিটিজে যারা আসক্ত তাদের জন্য চমৎকার এই ক্লাব Alpine Club of Canada । ২২ টি লোকেশন আছে পুরো কানাডাতে । মাউন্টেন এর উপর নানারকম কোর্স অফার করে থাকে।

গাড়ি থেকে নেমে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ট্রেইল ধরে একটু যেতেই চারপাশে রকি মাউন্টেন-এর বিচিত্র শোভা। আলবার্টার Kananaski তে অবস্থিত বহুল পরিচিত পর্বত “ Three Sisters” এর দেখা খুব কাছ থেকে মিললো । পাশাপাশি এই তিনটা Peak – এর নামকরণ করা হয়েছে “ Three Sisters” ।
তারা পৃথকভাবে Big Sister (Faith), Middle Sister (Charity) এবং Little Sister (Hope) নামে পরিচিত। অনেক আর্টিস্ট এই নিয়ে অনেক পেইন্টিং ও করেছে।

ছোট্ট ট্রেইল ধরে হেঁটে যাচ্ছি, দুপাশে নানা রকম নানা সাজে গাছ –গাছাড়ি, লতা -পাতা। কখনো কখনো মনের অজান্তে অনেক্ষন থেমে পরোক্ষ করে দেখি এদের রং,পাতার বাহার। আলো ঢুকে পরে ফাঁকে ফাঁকে। পাহাড়ে গা ঘেঁষে সবুজ ঘাস। ঘাস দেখলেই গড়াগড়ি দিয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে শৈশবে। নরম ঘাসের পরশ আর সদ্য ধান- কাঁটা গাছের শিখরের খোঁচা স্মৃতিতে এসে পায়ে আঁকুবাঁকু করে। সবুজ ঘাসে সাদা ছোট ছোট পাহাড়ি ফুল চার পাশে , এভাবেই স্মৃতির বাঁকে পথ-চলা।

 

Blanket Flower (Gaillardia aristata)Blanket Flower (Gaillardia aristata)

দূরের একটা পাহাড়ের চূড়া মেঘের সাথে মিশে মনে হচ্ছিলো ভলকানো। পাহাড়ের শীর্ষ দেশ থেকে ধোয়া বের হচ্ছিলো। মেঘ আর পাহাড় মিলে দারুন মরীচিকা। প্রকৃতির বিস্ময়কর খেলায় অনেক বিচিত্র পাহাড়ি ফুলেরও দেখা মিললো। বার বার নজর কেড়ে নিচ্ছিলো সূর্যমুখীর ফুলের মতো দেখতে একটা পাহাড়ি মায়াবী ফুল। নাম Blanket Flower (Gaillardia aristata)

পাইন গাছ চির সবুজ, কিন্তু মৃত্যুর প্রাক্ষলে কিছু কিছু পাতা লাল বর্ণ ধারণ করে অপুরূপ শোভা ছড়াচ্ছে চারপাশে।

লেখকলেখক

 

রবি ঠাকুরের কথা ভেসে আসলো “আমরা নতুন চাই নে, আমরা চাই নবীনকে। এঁরা বলেন, মাধবী বছরে বছরে বাঁকা করে খোঁচা মেরে সাজ বদলায় না, অশোক পলাশ একই পুরাতন রঙে নিঃসংকোচে বারে বারে রঙিন। চিরপুরাতনী ধরণী চিরপুরাতন নবীনের দিকে তাকিয়ে বলছে, "লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু তবু হিয়া জুড়ন না গেল ” 
টিং টিং একটা শব্দ দূর থেকে কানে ভেসে আসছে। শব্দের উৎসের কাছাকাছি এসে দেখলাম এক প্রবীণ লাঠিতে এলুমিনিয়াম এর একটা পাত, অনেকটা চাবির রিং এর মতো দেখতে, ঝুলিয়ে রেখেছে যাতে লাঠির সাথে লেগে শব্দ করে , এবং সে শব্দ শুনে ভাল্লুকরা কাছে আসার সাহস করবে না। চিরপুরাতন ধরণীর এই চিরপুরাতন নবীনকে দেখে অবাক হলাম। বয়েস ৭৪ , জাপান থেকে বেড়াতে এসেছেন। নাম ‘কিকুতি’। 
থুতনিতে কিছু সাদাছিটে দাঁড়ি। হালকা অবশিষ্ট্য কয়েকটা গোঁফ। চোখে মায়াবী, তীক্ষ্ণ,জ্ঞানী দৃষ্টি যেন হাজার বছরের গল্প নীরবে বলছে। 
ক্যালগারিতে ঘুরতে এসে ইতিমধ্যে ৭ টা মাউন্টেন আরোহণ করে ফেলেছেন । কাঁধে বোহেমিয়ান ঝুলি নিয়ে ধীরে ধীরে উনার এই পাহাড়ে উঠা। 
তুমি সুন্দর যৌবনঘন
রসময় তব মূর্তি 
দৈন্যভরণ বৈভব তব
অপচয়পরিপূর্তি। 
নৃত্য গীত কাব্য ছন্দ
কলগুঞ্জন বর্ণ গন্ধ 
মরণহীন চিরনবীন
তব মহিমা স্ফূর্তি।

Pine Tree's GluePine Tree's Glue

ধীর গতিতে উনি উঠছেন একের পর এক পা দিয়ে । আমাদের বলল সামনে এগিয়ে যেতে। বিদায়, দেখা হবে আবার এই বলে। একটু এগিয়ে যেতেই আমার পর্বত আরোহী বন্ধু বলল , আমি ৭৪ বছর বয়েসে এই লোকের মত হতে চাই ।
প্রবীণত্বের নবীনতায় ভরপুর হল আমাদের হৃদয় । অর্থহীন জীবনের নিরর্থকতার সৌন্দর্য কিছু প্রান ঢেলে দিল আগামি দিনগুলতে । 

নির্মল সৌন্দর্যনির্মল সৌন্দর্য

 

চারপাশে ফুলের সতেজ নির্মল সৌন্দর্য অপরূপ করে তুলেছে এই ট্রেইল । এইভাবে বেশ অনেকটা পথ পাড়ি দিলাম। হঠাৎ পাইন গাছে ঝুলে থাকা আঠার (Glue) এর গন্ধে বিভোর হলাম । দু হাতে কিছু আঠা মেখে নিলাম । এই রকম মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ আমি কখনো কোনো প্রসাধনীতে খুঁজে পাইনি । কয়েক টুকরো জট বাঁধা শক্ত আঠা গাছের ডাল থেকে নিয়ে ব্যাগে ভরে নিলাম, বাসাই নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখব। 
এইভাবে পথ চলতে চলতে, পাহাড়ে উঠতে উঠতে এসে পোঁছালাম False Summit এ । False Summit এবং True Summit মোটামুটি কাছাকাছি থাকে। অনেক পর্বত আরোহী কিংবা যারা পাহাড়ে নতুন অথবা উচ্চতা ভয় পান, এই False Summit পর্যন্ত যান। এর পর নেমে পড়েন।
Ture Summit - এর দিকে পাহাড়ের কিনারা ধরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। বাঁ-পাশে অদ্ভুত রকমের সুন্দর পাহাড়। মনে হচ্ছিলো এক ঝড় এসে বয়ে গেছে এই রুক্ষ পাহাড়ে। মুড়ানো কিন্তু অসম্ভব স্থির । হঠাৎ তীব্র বাতাস শুরু হলো।বাতাসে প্রায় উপচে পড়ছিলাম। আশে পাশে সাপোর্ট নিয়ে নিজেকে ধরে রাখবো তার কোনো উপায় নেয়। সঙ্গী হলো হাড়কাঁপুনী ঠান্ডা। আমাদেরকে একদম শীর্ষে পৌঁছুতে হবে এই পণ নিয়ে চলছি।
এবারও অসতর্কতা। গ্লাভস, টুপি কিছু নিয়ে আসিনি। ব্যাগের মধ্যে একটা টি-শার্ট ছিল, ওটা দিয়ে কান মুখ বেঁধে নিলাম, কিছুটা হলেও রক্ষে। এভাবে ঝড়-ঝাপ্টা সয়ে অবশেষে পাহাড় চূড়ায় True Summit এ এসে পৌছুলাম ।
বাতাসের তান্ডব নৃত্যে, আর হাঁড়কাঁপানো ঠান্ডায় Summit -এ রাখা বাক্স খুলতে পারলাম না। সই কিংবা হালকা কিছু ভালো লাগা অনুভূতি লিখে রাখতে পারলাম না।
তড়িঘড়ি করে নামা শুরু করলাম।বাতাস কোনো ভাবে কমছে না। নিজের শরীরের উপরে কোনো বিশ্বাস নেই এই মুহূর্তে। 
এই বুঝি উড়ে যাবো বাতাসের অতল শুন্য গহব্বরে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে সামনের দিকে যাচ্ছি। 
এভাবে চলতে চলতে অবশেষে বাতাসের গতি একটু স্বাভাবিক হলো। পরে জানতে পারলাম - ওই জায়গাটুকুতে অনেকগুলো পাহাড়ের একসাথে এক বিশেষ অবস্থানের কারণের সবসময় প্রবল ভয়ঙ্কর বাতাস থাকে। সেদিন বাতাসের বেগ ছিল ঘন্টায় ৭৫ কিলোমিটার।

সব নদী ফুরায় জীবনের সব লেনদেন। 
পাহাড় চূড়ার সব লেনদেন চুকিয়ে মন্থর গতিতে চেনা পথে নিজের আনমনে নেমে পড়ছি। পকেটে রাখা মোবাইল ফোনে গান বেজে চলছে
চেনা দুঃখ চেনা সুখ
চেনা চেনা হাসিমুখ
চেনা আলো চেনা অন্ধকার
চেনা মাটি চেনা পাড়া
চেনা পথে কড়া নাড়া
চেনা রাতে চেনা চিৎকার

Grotto Mountain
Elevation: 2,706 m (8,878 ft)
Location: Alberta, Canada
Total Hike Time: 8 Hours