‘দিনে স্লেজ চালাই আর রাতে আমি সূর্যোদয়ের ছবি তুলি’-এ অদ্ভূত কথাটা আমাকে  বললো রবার্ট। দারুণ রগুড়ে মানুষ। এক সকালের পরিচয়ে পুরোনো বন্ধুর মত আমরা তাকে বব বলে ডাকতে শুরু করেছি। স্‌ভালবার্ডের হিমবাহে সেই আমাদের পথ-প্রদর্শক। আমার ক্যামেরাটা দেখে সে বললো-‘আমিও নিকন ক্যামেরা ব্যবহার করি, তবে আমার লেন্স ভিন্ন, আমি শুধু ল্যান্ডস্কেপ তুলি’। ল্যান্ডস্কেপ? এখানে তো কোন ল্যান্ড দেখি নি, চোখ ধাঁধানো তুষারের চাদরে সব ল্যান্ড ঢাকা! আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম- ‘বব, এই সাদা হিমবাহের সাম্রাজ্যে তুমি ল্যান্ডস্কেপ তোলো কোথায়!’

উত্তর মেরু থেকে মাত্র দশ ডিগ্রি দূরে স্‌ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জ। দ্বীপের একমাত্র শহর লঙইয়ারবেন। বিশাল হিমবাহের এক কোণে খুদে একটা জনপদ। মেরুর এত কাছে আর কোন বসতি নেই পৃথিবীতে। এই ডিপ-ফ্রিজের মধ্যে কেন যে মানুষ বাস করে জানিনে। সারা বছর কঠিন তুষারের নিচে ঢাকা থাকে এ শহর। গাছপালা, লতাগুল্ম কিছু নেই। ৫০-৬০ টি কাঠের বাড়ী। দেড় হাজার মানুষের বাস। রাস্তায় একজন  মানুষের দেখা পাওয়া মহা ভাগ্যের ব্যাপার। দাওয়ায় বরফে ডুবে থাকা সাইকেল দেখে বোঝা যায় শিশুরা সারাদিন বাইরে আসে নি।

নভোচারীর নিঃছিদ্র পোশাক পড়ে হিমবাহেনভোচারীর নিঃছিদ্র পোশাক পড়ে হিমবাহে

 

এখানে বছরের চার মাস সূর্য ওঠে না। মার্চ মাসে প্রথম সূর্য দেখা দেয়। বেলা ১২ টায় সূর্যোদয় হয়, ১টায় অস্ত যায়। ৮ মার্চ থেকে শহরে সূর্য-উৎসব শুরু হয়। এ দ্বীপের মানুষের সবচেয়ে বড় আনন্দোৎসব। এক সপ্তাহ ধরে চলে। চার মাস সূর্য  গরহাজির থাকেন-তাই এত সমাদর! আমাদের দেশের সূর্যের মত প্রতিদিন সক্কাল বেলা এসে হাজির হলে তাকে কে পুছতো।

নভোচারীর নিঃছিদ্র পোশাক পড়ে হিমবাহেনভোচারীর নিঃছিদ্র পোশাক পড়ে হিমবাহে

 

আমরা লঙইয়ারবেন শহরে উদয় হয়েছি এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। তদ্দিনে সূর্য এখানে পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। ২৪ ঘণ্টাই আকাশে সূর্য থাকে; অস্ত যায় না। তবে খুব স্তিমিত সূর্য, দিগন্তরেখা থেকে বড় জোর দশ ডিগ্রি ওপরে ওঠে; আমাদের দেশের ভোর সাতটার মত। ২৪ ঘন্টায় সূর্য পুরো আকাশটা একবার চক্কর দেয়; রাত ১২ টায় দিগন্তের কাছাকাছি নেমে আসে, তারপর আবার ওপরে উঠতে থাকে। বব বললো-‘এখানে সূর্যোদয়ের ছবি তুলতে রাত বারোটার পর ক্যামেরা নিয়ে বসতে হয়। তবে, এক রাত বসলেই কাজ হয়ে গেল এমন ভাগ্য কম মানুষেরই হয়। তুষার-ঝড় আর হোয়াইট-আউট তো লেগেই আছে। আকাশে সূর্য আছে বোঝা যায়, দেখা যায় না। ক্যামেরা নিয়ে বের হলে আরও কম দেখা যায়। ক্যামেরার সাথে সূর্যের এ লুকোচুরি, ওয়াল্‌রাসের সাথে মেরুভালুকের কানামাছি খেলার মত-পাঁচ মাস ধরে চলতে থাকে। জানোতো, আমাদের এই দ্বীপে পাঁচ মাস দিন, চার মাস রাত, দেড় মাস সকাল আর দেড় মাস বিকেল। এসো আজ রাতে আমার সাথে সূর্যোদয়ের ছবি তুলবে।’

 

পৃথিবীর শেষ প্রান্তে সূর্যের এই অদ্ভূত আচরণ আমার মত রোদে-পোড়া দেশের মানুষকে বোঝানো কি আর সহজ কাজ। বব চেষ্টার ত্রুটি করে নি। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে তখন হাই-পিচ ঝিঁ-ঝিঁ শব্দ চলছে। রক্ত হীম করা বাতাসে দু ঘন্টা স্লেজ হাঁকানোর পর হয়তো সবার মাথায়ই এমন হুইসেল বাজে। নাকি এক নতুন রূপকথার দেশের ঘুমন্ত সূর্যের আজগুবি গল্প শুনে মাথায় সিটি বাজতে শুরু করেছে! হাবার মত মাথার হেলমেটটাতে দুমদাম কিল মারতে মারতে আমি বললাম-‘ইম্‌পসিবল বব, রাত বারোটায় সূর্যোদয়ের ছবি তুলবো, তোমার কি মাথা খারাপ!’

আমাদের স্লেজের মিছিল এগিয়ে চলছেআমাদের স্লেজের মিছিল এগিয়ে চলছে

 

স্লেজ থামিয়ে হিমবাহের ঢালে দাঁড়িয়ে সবাই দম নিচ্ছিলাম। আমরা দশ জন বিদেশি অভিযাত্রী, আমাদের গাইড বব, আর বাহন ছটি স্লেজ ও ৩৬টি কুকুর। লঙইয়ারবেন ছেড়ে এসেছি দু ঘন্টা আগে। আমাদের মত নব্য স্লেজ-চালককে বার বার থেমে দম নিতে হয়। আমরা নভোচারীর নিঃছিদ্র পোশাক পড়ে হিমবাহে নেমেছি, তবু এক ঘন্টা স্লেজ চালালে আমাদের শরীর হীম হয়ে আসে। ঘন্টায় ঘন্টায় স্লেজ থেকে নেমে বরফের মধ্যে ডন-বৈঠক দিয়ে শরীর গরম করে নিতে হয়। এ বিরতিকে তাই দম নেয়া না বলে দম দেয়া বলাই ভাল। তবে, কুকুরগুলোর জন্য দম নেয়াটা খুব দরকার। একনাগাড়ে বেশিক্ষণ দৌড়ালে কুকুরের শরীর উত্তপ্ত হয়ে যায়। কুকুরকে থামতে হয় শরীর ঠাণ্ডা করার জন্য; স্লেজ থামানোর সাথে সাথে কুকুরগুলো বরফের মধ্যে সটান শুয়ে শরীরের তাপ কমায়।

স্‌ভালবার্ডে আমরা কেউ বেড়াতে আসি নি; যাত্রাবিরতি করছি। আমাদের গন্তব্য উত্তর মেরু। প্রথমে অস্‌লো নগর থেকে আমরা নরওয়ের শেষ প্রান্তে ট্রম্‌সো শহরে এসেছিলাম; সেখান থেকে এলাম মহা-উত্তরের এই দ্বীপে। আবহাওয়া ভাল থাকলে দু দিনের মধ্যে চার্টার করা বিমান এখান থেকে উত্তর মেরুর বরফ-টুপিতে নিয়ে যাবে আমাদের। এই দুটো দিন আমাদের সুযোগ এ দ্বীপের সিল, ওয়াল্‌রাস, রাইন-ডিয়ার, অওক, কিটিওয়েক,আর ফাল্‌মার দেখার। স্‌ভালবার্ডে মেরুভালুক আছে শত শত; কিন্তু সুন্দরবনের বাঘের মতই বহু ভাগ্যে তার দেখা মেলে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিণতি হয় দূর্ভাগ্যজনক। মাঝে মাঝে শহরের মানুষ মেরুভালুকের কবলে মারা পড়ে। লঙইয়ারবেন পৃথিবীর একমাত্র শহর যেখানে সড়কের পাশে লেখা আছে ‘সাবধান, মেরুভালুক’।

আমাদের স্লেজের মিছিল এগিয়ে চলছেআমাদের স্লেজের মিছিল এগিয়ে চলছে

 

মাত্র ৪০০ বছর আগেও স্‌ভালবার্ডের অস্তিত্ব মানুষের অজানা ছিল এবং বিশ শতকের আগে এখানে কোন মানুষ বাস করে নি। ১৯০৬ সালে খনি থেকে কয়লা ওঠানো শুরু হলে এখানে লোকালয় গড়ে ওঠে। তবে, কয়লা খনি এখন বন্ধ। গবেষক আর পর্যটকদের আনাগোনা আছে বলে শহরটা আজও উজাড় হয়ে যায়নি। গবেষকের এখানে আসে হিমবাহ, উত্তুরে আলো, মেরুভালুক ও চরম আবহাওয়ায় টিকে থাকা নানা জাতের প্রাণি পর্যবেক্ষণ করতে। পর্যটক আসে প্রধানত মধ্যরাতের সূর্য দেখতে, অথবা ‘উত্তুরে আলো’ নামে খ্যাত মেরুর আকাশে নীল আলোর ঝালর দেখতে, আর হিমবাহে স্কি করতে। মে মাসে এখানে স্কি ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়। এপ্রিলে আমাদের মত মেরু অভিযাত্রীরা এখানে যাত্রাবিরতি করে।

আমাদের দম নেয়া শেষ হলে বব তার স্লেজ ছাড়ল। এক মিনিটের বিরতি দিয়ে একে একে আমরা আমাদের স্লেজ ছাড়লাম। দুই স্লেজ কাছে এলে মাঝে মাঝে দু দল কুকুরের মধ্যে ভয়ঙ্কর লড়াই বেধে যায়। তাই দু স্লেজের মাঝে দূরত্ব রাখাটা খুব জরুরী। হিমবাহের ঢাল দিয়ে আমাদের স্লেজের মিছিল এগিয়ে চলছে। অওক, কিটিওয়েক, আর ফালমার পাখির অভয়াশ্রমগুলো রয়েছে উপকূলরেখা বরাবর। উপকূলে মেরুভালুক থাকে বলে সে দিক আমরা এড়িয়ে চলছি। শীতের ঘুম ভেঙ্গে সদ্য জেগে ওঠা ক্ষুধার্ত মেরুভালুকের সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছে আমাদের নেই। হঠাৎ সাক্ষাৎ হয়ে গেলে আমরা যে তার আহার্য হতে অনিচ্ছুক তা জানিয়ে দেবার জন্য বব একটা দশাসই রাইফেল সাথে এনেছে। শহরের গণ্ডি ছেড়ে আসলে রাইফেল সাথে নেয়াটা এখানে বাধ্যতামূলক।

 স্লেজের ছয় কুকুরের কাছে বিদায় নিলাম স্লেজের ছয় কুকুরের কাছে বিদায় নিলাম

 

আমাদের আজকের ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল স্লেজ চালানোর হাতেখড়ি নেয়া আর দিকচিহ্নহীন হিমবাহে চলার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। সারাদিনে আমরা শুধু জানলাম কেমন করে কুকুরকে হার্নেস পড়িয়ে স্লেজে জুড়তে হয়, কেমন করে এদের দৌড় শুরু, থামা, আর ডানে-বায়ে মোড় নেয়ার সঙ্কেত দিতে হয়। আর জানলাম হিমবাহ যত ভয়ঙ্করই হোক না কেন অনুসন্ধিৎসু মানুষকে কখনো সে রুখে দিয়ে পারে না। দিনের শেষে শহরে ফিরে আমার স্লেজের ছয় কুকুরের কাছে বিদায় নিলাম। হিমবাহে আমাদের টিকে থাকাটা আজ এদের উপরেই তো নির্ভর করে ছিল।