আপনি অত্যন্ত ব্যস্ত একজন মানুষ, একই সাথে ইট-কাঠের শহরে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। এখন দরকার সবুজের শান্তি, কিন্তু সময় কই? সপ্তাহে হয়ত একদিনই একটা ছুটি পান, ওতে আর কদ্দূরই বা যাওয়া যায়? যায়, যদি আপনি সঠিক জায়গাটা জানেন। একদিনেই আপনি ঘুরে আসতে পারেন অসাধারণ কিছু ঝর্ণা আর সবুজের মাঝ থেকে।

ফেনী আর চট্টগ্রামের মাঝামাঝি মিরসরাই থেকে সীতাকুন্ডের জায়গাটা জুড়ে আছে অনেক অনেক ঝর্ণা। বেশিরভাগেরই নাম এখনো অজানা। এমনই কিছু রূপসীকে দেখতে চলে গেলাম কমলদহ ট্রেইলে। একেকটা ট্রেইলে বেশ কিছু ঝর্ণা আর অসংখ্য ক্যাসকেড এর দেখা পাওয়া যায়। কমলদহ ট্রেইলে যে ঝর্ণাগুলো আছে সেগুলোর বেশ কয়টার নামই এখনো অজানা। গাইড ভেদে নামও বদলাতে থাকে- কেননা একেকজন একেক নাম বলে দেয়। মোটামুটি ৩ টা ঝর্ণার নাম পরিচিত- বড় কমলদহ, ছাগলকান্দা ও ছুরিকাটা।

নাম না জানা এক ঝর্ণানাম না জানা এক ঝর্ণা

 

কমলদহ যাওয়ার বেশ কিছু উপায় আছে। সবচেয়ে সহজটা হল চট্টগ্রামগামী যেকোন বাসে উঠে যাওয়া। মিরসরাই নামিয়ে দেবে যেকোন চট্টগ্রামের বাস। টিকেট ৪৮০ করে। কিন্তু হুটহাট প্ল্যান এ এসব বাসের টিকেট যোগার করা একটু কষ্ট। অন্য দুটা উপায় হচ্ছে মেইল ট্রেন এ করে সীতাকুন্ড গিয়ে নেমে টেম্পু করে মিরসরাই আসা কিংবা ফেনীর যেকোন বাসে উঠে ফেনী নেমে এরপর লোকাল বাসে মিরসরাই যাওয়া। ফেনীর বাসে টিকেট ২৭০ আর লোকাল বাসে আরো ৬০, মোট খরচ পরে এক্ষেত্রে ৩৩০ টাকা। যেহেতু মেইল ট্রেনে সীট পাওয়ার একটা জটিলতা আছে তাই আমরা শেষের পদ্ধতিটা অনুসরণ করাই উচিৎ মনে করলাম। হালকা ব্যাগে একটা শুকনা জামা আর প্যান্ট নিয়ে ১১:৩০ এ বাসে উঠে পরলাম।

ভোর ৪:৩০ এ বাস ফেনী পৌছে গেল। লোকাল বাস ছাড়বে আরো আধা ঘন্টা পর, এই সময়টুকুতে পেট পুজো সেরে নিলাম। শরীরে যথেষ্ট শক্তি তো লাগবে, প্রচুর হাটাহাটি করতে হবে তো সারাদিন! প্রায় সাড়ে পাঁচটার দিকে বাস ছাড়ল। সাতটার দিকে পৌছে গেলাম মিরসরাইয়ের বড় দারোগার হাটে। এখান দিয়েই ঢুকতে হবে ট্রেইলে। কিছুদূর হেটে রেললাইন পার হয়ে একটা গাইড ঠিক করে নেওয়া হল। নয়ত ট্রেইলে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। হয়ত মাইলের পর মাইল হাটতে থাকব, ফেরার পথটা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। যাই হোক, গাইড ঠিক করে এরপর শুরু করলাম হাটা, ঝর্ণার উদ্দেশ্যে।

অনেক অনেক দিনের কাজের চাপ, রাস্তার জ্যাম, কোলাহল সব ছেড়ে হঠাৎ গিয়ে পরলাম সবুজ-শান্ত প্রকৃতিতে। চারিদিকে সবুজ আর পায়ের নিচে ঝর্ণার বয়ে আসা শীতল পানি। বয়ে আসা ঝর্ণার পানির পথকে বলা হয় “ছড়া”।

সবুজের মাঝে আলোর খেলাসবুজের মাঝে আলোর খেলা

 

ছড়াছড়া

 

ছড়াছড়া

পুরো কমলদহ ট্রেইলটায় অনেক লম্বা একটা ছড়া ধরে ধরেই এগিয়ে যাওয়া। খুব দ্রুতই “বড় কমলদহ” ঝর্ণার দেখা মিলল। ঝর্ণার শব্দ আমার কাছে সবচেয়ে মধুর একটা শব্দ মনে হয়, নেশা ধরিয়ে দেয় সেই আওয়াজ! কিছুক্ষণ সেখানে সময় কাটিয়ে ঝর্ণার পাশ দিয়ে উপরে উঠে গেলাম, ঐ পথেই যেতে হবে। তবে ওঠা এত সহজ ছিল না, একে তো পিচ্ছিল ঝর্ণার পাথর সাথে বেশ খাড়া পাহাড়। মাটিতে গ্রিপ করা বেশ কষ্টসাধ্য। কিছুটা বাদর-ঝোলা হয়েই গাছপালা ধরে ধরে ঝর্ণার উপরে গিয়ে নামলাম। সেখানে আবার আরেকটা ছোটখাটো ঝর্ণা। দূর থেকে বা ছবিতে দেখে বোঝার উপায় নেই এই ছোট ঝর্ণাগুলোতেও পানির কি প্রচন্ড প্রবাহ!

বাদর-ঝোলা হয়ে উঠে এই ঝর্ণার দেখা মিললবাদর-ঝোলা হয়ে উঠে এই ঝর্ণার দেখা মিলল

                         

এরপর পুরো রাস্তাতেই একটু পরপর ক্যাসকেড চোখে পরল। ক্লান্ত হলেই একটু গা ভিজিয়ে নেওয়া। হাটতে হাটতে আরেকটা ঝর্ণা পেয়ে গেলাম, যেটার নাম উদ্ধার করা যায়নি। নাম জানিনা তাতে কি, ইচ্ছেমত দাপাতে তো মানা নেই!

 নাম না জানা আরেকটা ঝর্ণা নাম না জানা আরেকটা ঝর্ণা

 

চলছে ক্যাসকেডে ছবি তোলা                                          চলছে ক্যাসকেডে ছবি তোলা

                                            

এই ফাঁকে আমিও তুলে নিলাম একটা ছবিএই ফাঁকে আমিও তুলে নিলাম একটা ছবি

                                   

তবে বেশ ডুবোডুবি হল ছাগলকান্দা ঝর্ণায় এসে । ঝর্ণাটার আকৃতি ভীষণ সুন্দর, যদিও খুব উঁচু না, তবে দেখলে মন ভাল হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ঝর্ণার সামনে যে ছোটখাটো জলাশয়ের সৃষ্টি হয় তাঁর মধ্যে ডুবে থাকা। শীতল আর স্বচ্ছ পানির পরশটাই অন্যরকম! পায়ের নীচে নেই কোন কাঁদা, শুধু পরিষ্কার বালি আর পাথর।  

ঝর্ণার পানিতে দাপাদাপিঝর্ণার পানিতে দাপাদাপি

                                                       

কিছুক্ষণ পর ওখান থেকে উঠলাম সেই ঝর্ণার মাথায়। আবারো সেই বাদর-ঝোলা পদ্ধতি। উপরে কিছুদূর গিয়ে একটা ছোট ঝর্ণার দেখা পাওয়া গেল। গাইড বলল এর উপরে আর কোন ঝর্ণা নেই, এইই শেষ। তাও একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে আসা হল যে আসলেই কিছু নেই। মনে পরল এদিকে আসার সময় হাতের ডানে আরেকটা পথ ফেলে আসা হয়েছে, সেটায় তো যাওয়া চাই! একটু থেমে হালকা খাবার খেয়ে নিলাম। এধরণের ঘোরাঘুরিতে শক্তি যেহেতু একটু বেশি খরচ হয় তাই শক্তির যোগানটাও সময়মত দেয়া চাই। খেজুর এক্ষেত্রে বেশ কাজে দেয়। পিনাট বার আর ম্যাংগো বারও নিয়ে যাওয়া যায়, বয়ে নিতেও সুবিধা আর শক্তিও পাওয়া যায় তৎক্ষণাৎ।

পথে দেখা মিলল পাহাড়ি কাঁকরোলেরপথে দেখা মিলল পাহাড়ি কাঁকরোলের

                                    

আরো অনেকখানি হেটে এসে সেই পথে ঢুকলাম। ওদিকে নাকি আরো দুটো নাম না জানা ঝর্ণা আছে। এই পথটা বেশ লম্বা, আর একটু বুনো। পাথরগুলোও বেশ পিচ্ছিল, সম্ভবত মানুষের পা বেশি পরে না। অনেক্ষণ হেটে শেষ দুটো ঝর্ণাও দেখা হয়ে গেল। একটা ঝর্ণা বেশ উঁচু, এবং প্রাকৃতিকভাবেই খুব সুন্দর ধাপ করা ঝর্ণার গায়ে। সহজেই একদম চূড়ায় উঠে যাওয়া যায়।

এর মধ্যে দিয়েই শেষ হল ঝর্ণা-দর্শন। ফিরে এসে খেয়েদেয়ে দুপুর ৩ টার মধ্যেই মিরসরাই এর দিকে রওনা দিয়ে দিলাম। ৪ টার দিকে বাসে করে ঢাকার পথে।

পুরো পথটা যে খুব সহজ ছিল তা না। অনেক জায়গাতেই পিছলে গেছি, কিংবা পিচ্ছিল পাথর দিয়ে বেয়ে বেয়ে ওঠার সময় ভয় পেয়েছি। এক জায়গায় দড়ি দিয়ে ঝুলে ঝুলে নামতে হয়েছে। জোঁকের কামড়ও খেয়েছি। কিন্তু এইসব মিলিয়েই আসলে পুরো অভিযানটা সম্পূর্ণ হয়। প্রতিটা ছোট ঘটনাই মনে রাখার মত বিষয়ে পরিণত হয়। সামনে কোন এক ছুটির দিনে আবার হয়ত রওনা দেব অন্য কোন ঝর্ণার উদ্দেশ্যে, নিয়ে আসব আরো কিছু অসাধারণ মনে রাখার মুহুর্ত।