চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গল।।  দুই দিনের ট্যুর।
হঠাৎ করে বুধবার রাতে ঝোক উঠলো শ্রীমঙ্গল যাবো আমরা ৫ জন।
পরদিন অফিস শেষে বের হলাম টিকেটের উদ্দেশ্যে। যেহেতু আগে থেকে কোন প্ল্যানিং ছিল না তাই পাবো না জেনেও কমলাপুরে একটু ঢু মারতে গেলাম। কিন্তু সফল হলাম না। পরবর্তীতে বাসই ভরসা। শ্যামলী বাসে টিকেট কাটা হলো । ভাড়া ৩৮০ টাকা শ্রীমঙ্গল রাত ১১:৩০ এ।
প্রচন্ড ভীড়ের কারণে বাস ছাড়ল ১২ টায় কিন্তু দক্ষ ড্রাইভার সাই সাই করে চালিয়ে আমাদের ভোর ৫ টায় নামিয়ে দিল শ্রীমঙ্গল। সুনসান নীরব শ্রীমঙ্গল দেখতে অসাধারণ লাগছিল। শ্রীমঙ্গল শহরে অনেক গুলো ভালো মানের হোটের আছে। আমরা ছিলাম ৫ জন। হিমেল ভাই,ভাবী,আসাদ ভাই, আসিফ ভাই আর আমি। আমরা উঠলাম হোটেল শ্রীমঙ্গল এ। ভাড়া রুম প্রতি ১০০০ টাকা কিন্তু আমরা মূলত ২ দিনের সার্ভিস নিয়েছি। 
কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে সকাল নয়টা বেরিয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে।
হোটেল থেকে নেমেই একটি সি এন জি ভাড়া করা হল সারাদিনের জন্য। সারাদিনের জন্য সি এন জি ভাড়া করা হল ১২০০ টাকায়। সি এন জি ড্রাইভার জামশেদ ভাই অসাধারন একজন ভালো মানুষ। 
যাত্রা শুরু। প্রথমে রাস্তার দুধারের অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌছলাম ভানুগাছ।

ছবি: রাস্তার দুই ধারের সৌন্দর্য..ছবি: রাস্তার দুই ধারের সৌন্দর্য..

ভানুগাছ বাজারে নাস্তা পর্ব সেরে চলে গেলাম রবীন্দ্রপুর চা বাগানে। সকালের মিষ্টি আলোয় চা বাগানে ঘুরাঘুরি করা আর চা শ্রমিকদের তিন কুড়ি চা পাতা সংগ্রহ করা দেখাটা ছিল এক কথায় অসাধারণ।

ছবি: চা শ্রমিকরা তিন কুড়ি চা পাতা সংগ্রহ করছে।
 
শীতের চা বাগানের তুলনায় বর্ষার চা বাগান অধিক সুন্দর। চা বাগানে ঘুরাঘুরি আর ছবি তোলা শেষে আবার জামশেদ ভাইকে নিয়ে আমরা গেলাম মাধবপুর লেক। এখানে দেখতে পাওয়া যাবে ১০০ বছরেরও অধিক বয়সী চা গাছ। ছবি: চা শ্রমিকরা তিন কুড়ি চা পাতা সংগ্রহ করছে।

ছবি: শতবর্ষী চা গাছছবি: শতবর্ষী চা গাছ

চারদিকের সবুজে ঘেরা এই লেকের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করে তুলবে। লেকের কিনারার পদ্ম ফুল লেকটিকে আরো বিশেষিত করে তুলেছে। একটু সময় নিয়ে  লেকের পাড়ে  হাটলে লেকের বাতাস শরীরকে শীতল করে তুলবে। 

ছবি: মাধবপুর লেক।ছবি: মাধবপুর লেক।

চা বাগানে সমৃদ্ধ পাহাড়ের উপর থেকে দেখতে পারেন সম্পুর্ন লেকের ভিউ।  

ছবি: পাহাড়ের উপর থেকে মাধবপুর লেক।ছবি: পাহাড়ের উপর থেকে মাধবপুর লেক।

মাধবপুর লেকে সময় কাটিয়ে চলে গেলাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। লাউয়াছড়া উদ্যানের ঢুকার জন্য টিকেট কাটতে হবে। ছাত্র ছাত্রীদের জন্য ২০ টাকা আর বাকিদের জন্য ৫০টাকা। উদ্যানে ঢুকার কিছুক্ষন পরই দেখা মিলবে১৯৫৫ সালে সুট্যিং করা " Around the world in 80 days" hollywood movie এর স্যুটিং প্লেস ঐতিহাসিক রেললাইন।

ছবি: Around the world in 80 days" hollywood movie এর স্যুটিং প্লেস ঐতিহাসিক রেললাইন।ছবি: Around the world in 80 days" hollywood movie এর স্যুটিং প্লেস ঐতিহাসিক রেললাইন।

লাউয়াছড়ার ভিতর ঢুকেই শুনতে পাওয়া যায় নানা রকম পাখির নানান রকম সুমিষ্ট ডাক। পায়ে হেটে পাখির ডাক শুনতে শুনতে আর বানর দেখতে দেখতে চলে যেতে পারেন লেবু বাগান, খাসিয়া পল্লী।

ছবি: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের যেখানে সেখানে দেখা যাবে এমন নির্ভীক বানরছবি: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের যেখানে সেখানে দেখা যাবে এমন নির্ভীক বানর

লাউয়াছড়া উদ্যান ঘুরে চলে গেলাম বীরশ্রেষ্ঠ বধ্যভূমি। এছাড়াও আশেপাশে রয়েছে বি টি আর আই এর চা জাদুঘর।

ছবি:  বীরশ্রেষ্ঠ  বধ্যভূমি ছবি:  বীরশ্রেষ্ঠ  বধ্যভূমি 

বধ্যভূমি ঘুরে আমরা আমাদের জামশেদ ভাইকে নিয়ে চলে গেলাম বাইক্কা বিলে। বাইক্কা বিল শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার রোডে যেতে হবে। শ্রীমঙ্গল থেকে বাইক্কা বিল প্রায় ১৬ কিলোমিটার যার মধ্যে রাস্তা খারাপ হওয়ায় ১.৫ কিলোমিটার রাস্তা হেটে যেতে হবে।
হাইল হাওড়ের বাইক্কা বিলে কাটানো একটি সন্ধ্যাটি হয়ে উঠতে পারে আপনার জন্য এক অসাধারণ মুহূর্ত। 
মূল আকর্ষণ শীতকালে হলেও বর্ষাকালে বিলের চারদিকের থৈ থৈ পানি আর পাখির সুমধুর কলতান শুনতে শুনতে সূর্যাস্ত দেখা নিঃসন্দেহে আপনাকে বিমোহিত করে তুলবে। 

ছবি: বাইক্কা বিলের সন্ধ্যাছবি: বাইক্কা বিলের সন্ধ্যা

ছবি: বাইক্কা বিলের সন্ধ্যাছবি: বাইক্কা বিলের সন্ধ্যা

ছবি: বাইক্কা বিলের সন্ধ্যাছবি: বাইক্কা বিলের সন্ধ্যা

বাইক্কা বিলে সূর্যাস্ত দেখে আমরা চলে আসলাম শ্রীমঙ্গল। এবার সাতরঙা চা খাওয়ার পালা। আসল সাতরঙা চা খেতে হলে যেতে হবে আদি নীলকণ্ঠ টি কেবিনে। যেকোনো রিকশাকে বললেই হবে যে আপনি অরিজিনাল নীলকণ্ঠে যেতে চান। ভাড়া নিবে জন প্রতি ১৫-২০ টাকা। সাতরঙা চা ৭৫ টাকা আর আট রঙা  চা ৮৫ টাকা। 

ছবি: আদি নীলকন্ঠের সাতরঙা চা।ছবি: আদি নীলকন্ঠের সাতরঙা চা।

চা খেতে খেতে আড্ডা দিয়ে ডিনার করার জন্য কুটুমবাড়িই হতে পারে ১ম চয়েস।খাবারের মান ও পরিবেশ খুবই ভালো এবং খাবারের দামও সহনীয়। ডিনার শেষে পান চিবাতে চিবাতে হোটেল পৌছলাম রাত ১০:৩০ টায়। এবার বিশ্রামের পালা কারন পরদিন খুব ভোর বেলা উঠে যেতে হবে হাম হাম জলপ্রপাত।

ভোর ৫ টা। একের পর এক সবার এলার্ম বেজে উঠলো। সবাই ফ্রেশ হয়ে নতুন উদ্যম নিয়ে হাম হাম যাওয়ার জন্য বের হয়ে গেলাম সকাল ৬ টায়।আগের দিন রাতেই আমাদের পাইলট জামশেদ ভাইকে জানানো হয়ে ছিল আমরা হাম হাম যাচ্ছি এবং তাকেই আমদের নিয়ে যেতে হবে। তাই ঠিক ৬ টায় জামশেদ ভাইও রেডি হয়ে চলে আসলেন আমাদের হোটেলের সামনে। ভোরের শীতল হাওয়া গায়ে লাগাতে লাগাতে আমরা চলে গেলাম ভানুগাছ। সকালের নাস্তা সেখানেই সারা হল। সকলের নাস্তা শেষে ভানুগাছ থেকে হাম হামের পথে আগানোর পালা। হিমেল ভাই আর ভাবি জরুরী কাজে ঢাকা ব্যাক করায় আমরা তিনজনই এখন হাম হাম গমনকারী। 
সকালের শ্রীমঙ্গল আমাদের দিল এক ভিন্ন স্বাদ। নীরব শীতল রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় স্কুলের বাচ্চাদের দল বেধে বেধে স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য ছিল অসাধারণ । চা শ্রমিকরা বেরিয়েছে তাদের নিজ নিজ কর্মস্থল চা বাগানের উদ্দেশে।এভাবে প্রকৃতির রুপ দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম কলাবন।তবে রাস্তা খারাপ হওয়ায় আমাদের কলাবন থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার আগেই নেমে যেতে হল। চা বাগানের মাঝদিয়া এই ২ কিলো হাটাওটা ছিল অসাধারণ। আমদের জামশেদ ভাই ইতিমধ্যে একজন গাইড নিয়ে ফেলেছিল। কলাবনে খাবার অর্ডার দিয়ে ট্রেকিং শুরু। 
বড় ছোট মিলিয়ে মোট ১৮টি টিলা পাড় হয়ে যখন আমরা ঝিরি পথে নামলাম তখন যেন আর তর সইছিল না। তবে অবশ্যই জোক থেকে সাবধান।আমি ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৭-৮ টি জোকের শিকার হয়েছিলাম। তবে নারিকেল তেল কিংবা লবন কিংবা কেরোসিন তেল নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।হাতে আর পায়ে নারিকেল তেল মেখে হাটা শুরু করলে জোক থেকে কিছুটা হলে রেহাই পাওয়া যাবে। পাহাড়ি ঝিরি পথের সাথে অভ্যস্থ হলেও বাশবাগানের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝিরি পথ ছিল সম্পূর্ণই নতুন আমাদের জন্য। সবুজে ঘেরা ঝিরি পথে কখনো হাটু সমান কখনোবা কোমর সমান পানি দিয়ে হেটে যখন হাম হামের গর্জন শুনতে পেলাম তখন আর যেন তর সইছিল না।

ছবি: হাম হাম যাওয়ার পথে বাশবাগানের ভিতরের ঝিরি পথ। ছবি: হাম হাম যাওয়ার পথে বাশবাগানের ভিতরের ঝিরি পথ।

হাম হামে পৌছেই সবার প্রথম এক্সপ্রেশন একটি জোরে গলা হাকিয়ে চিৎকার। সবুজে বেষ্টিত এই ঝর্নার পানি অত্যন্ত শীতল। ঝর্নায় প্রায় ঘন্টা দুয়েক লাফালাফি,দাপাদাপির পর আমরা পুনরায় যাত্রা শুরু করলাম। হাম হাম জলপ্রপাতে ঢুকার একটু আগে হাতের বাম পাশ দিয়ে একটু এগুলেই আরেকটি ছোট খাটো আরেকটি ঝর্নার দেখা মিলবে।

ছবি: হাম হাম জলপ্রপাতছবি: হাম হাম জলপ্রপাত

ছবি:ভরা বর্ষায়  হাম হাম জলপ্রপাত। ছবি:ভরা বর্ষায়  হাম হাম জলপ্রপাত। 

অবশেষে আবার ২ ঘন্টা পাহাড়ি টিলায় ট্রেকিং করে আমরা যখন কলাবন তখন আমাদের তিনজনের অবস্থাই শোচনীয়। ক্ষুধায় তিনজনের অবস্থাই কাহিল। সকালের অর্ডার দেয়া দেশী মুরগী দিয়ে ভাত খাওয়ার পর মিলল শান্তি। খাওয়া দাওয়া শেষে এবার জামশেদ ভাইয়ের কাছে যাবার পালা।আরো প্রায় ২০-৩০ মিনিট চা বাগানের বাতাস গায়ে লাগাতে লাগাতে পৌছে গেলাম যেখানে সি এন জি রাখা হয়েছিল। ফেরার পালা এবার। জামশেদ ভাই সাই সাই করে টান দিয়ে নিয়ে আসলেন আমাদের শ্রীমঙ্গল বাস কাউন্টারে। আজকের জন্য জামশেদ ভাইকে দেয়া হলো ১৪০০ টাকা।শ্যামলীতে রাত ১২:৩০ এর টিকেট কেটে আমরা চলে গেলাম হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে পানসীতে রাতের খাবার খেয়ে রাত সাড়ে ১২ টার বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে অবশেষে ভোর ৫ টায় বাসায় পৌছলাম।