‘এই, হ্যালো, পিছে হটো, পিছে হটো, আর এগিয়েছ কি মরেছ’। সাহেবি ভদ্রতার ধার না ধেরে অভিযাত্রীদের কানে তালা লাগিয়ে চিৎকার করে দলপতি বলল, ‘শিগ্‌গির পিছে আসো, ওভার-হ্যাং ভেঙ্গে পড়বে’। আমার উদ্দেশ্যেই এত সব চ্যাঁচামেচি, আমিই ফালমারের ফটো তোলার জন্য দলছুট হয়ে হিমবাহের প্রান্তে চলে এসেছি। আর সব অভিযাত্রী লাঞ্চ-প্যাকেট নিয়ে দলপতির পাশে বৃত্যাকারে দাঁড়িয়ে আছে। সকালে লঙ্গিয়ার্বেনের উষ্ণ আস্তানা ছেড়ে অন্তহীন হিমবাহে নেমে টানা চার ঘণ্টা আইস-স্কুটার হাঁকিয়ে সবাই ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, স্তিমিত; ইতি-উতি তাকাবার উৎসাহ নেই কারো – শুধু এই রাইফেলধারী হামবড়া দলপতিটা ছাড়া।

হিমবাহেহিমবাহে

SPITSBERGEN এ লেখকSPITSBERGEN এ লেখক

আমারও উৎসাহ ছিল না হিমবাহের কার্নিশে ঝুল-বারান্দার মত লটকে থাকা জমাট বরফের ওভার-হ্যাং কত ভর নিতে পারে তা পরখ করার। চার ঘণ্টা আইস-স্কুটারের ক্লাচ ধরে রাখার পর লাঞ্চের ঠোঙা ছেঁড়ার জোরটুকুই ছিল না আঙ্গুলে। আমরা বারেন্টস আর গ্রীনল্যান্ড সাগরের উত্তরে চির-শুভ্র দ্বীপ-পুঞ্জ সভালবার্ডের হিমবাহ পার হচ্ছি। এপ্রিলের ১১ তারিখ, এখন এখানে ২৪ ঘন্টা দিনের আলো। বরফ-ঢাকা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার জন্য আইস-স্কুটার অসাধারণ এক বাহন; কিন্তু মুশকিল হলো, সারাক্ষণ এর ক্লাচ চেপে ধরে ধরার সহজ কাজটুকু এ মহা-হিম জগতে যে কী এক জ্বালাতন তা দু-হাতের শীতল ও অচল পেশিগুলো প্রতি মূহুর্তে জানান দিচ্ছিল। তাই একটু শ্যাডো-বক্সিং করে জমাট পেশি সচল করার মতলবে দল থেকে সরে হিমবাহের কার্নিশের দিকে হাঁটা দিয়েছিলাম।

আইস-স্কুটার অসাধারণ এক বাহনআইস-স্কুটার অসাধারণ এক বাহন

আইস-স্কুটারেআইস-স্কুটারে

দু মিনিট হাঁটার পর হঠাৎ দেখলাম এক ঝাঁক ফালমার উড়ে এসে কার্নিশের নীচে ঢুকে গেল। সম্ভবত এরা ‘উত্তরে ফালমার’ – উত্তর-মেরুর ১০ডিগ্রির মধ্যে টিকে থাকা প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী পাখি। ভার কমানোর জন্য দূরবীন রেখে এসেছি, খালি চোখে দেখে শনাক্ত করতে হলে আরো কাছে যেতে হবে। শতাধিক কিটিওয়েক এবং ফালমার বার বার কার্নিশের নীচে ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। বরফের নীচে নিশ্চয়ই এদের বাসা করার মত শক্ত পাথুরে দেয়াল রয়েছে – আশা করি আমার ভারে ভেঙে পড়ার মত নাজুক হবে না বরফের ওভার-হ্যাং। মেরু-ম্যারাথন সম্পন্ন করে উত্তর মেরু হতে সদ্য ফিরছি বলে আমি কিছুটা ঘোরের মধ্যে আছি, মনে হচ্ছে ওভার-হ্যাং ভেঙে পড়লেও পাঁচশ মিটার নীচে বরফ-ঢাকা ইস্ফোর্ডেন সৈকতে আছড়ে মরব না, স্ফীত বুকে ফালমারের সাথে বাতাসে ভেসে বেড়াব।

অভিযানঅভিযান

ফেস্টনিঞ্জেন সৈকতে বরফ ফুটো করে বেরিয়ে আসা রিং-সিল আর ওয়ালরাশের ছবি তুলতে গিয়ে টেলিলেন্সসহ আমার ভারী-ক্যামেরা ঠান্ডায় জমে অচল হয়ে গেছে। নিরুপায় হয়ে জ্যাকেটের পকেটে লুকানো খুদে ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বাংলাদেশের দ্বিতীয় অভিযাত্রী তারেক অণুও তার ক্যামেরা নিয়ে আমাকে অনুসরণ করছে। বুঝতে পারছি, একটু বেশিই ঝুঁকি নিচ্ছি; কিন্তু এগিয়ে না গেলে এই খেলনা-ক্যামেরায় কি ভাল ছবি আসবে! আমরা এগোচ্ছি আর ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক করছে। কিন্তু মনমতো ছবি নেওয়ার আগেই হতভাগা দলপতির নজর পড়ল এদিকে, আর শুরু হলো হাঁক-ডাক। আমরা সুবোধ বালকের মত অ্যাবাউট_টার্ন করলাম। তবে মনে মনে দলপতির শ্রাদ্ধ করতে ছাড়লাম না, ‘মেরু-ভালুকের ভয়ে কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে নিজেকে জেনারেল মনে করেন কি; আরে বাবা, কার্নিশে কতটুকু ঝুঁকি তা কি আমি বুঝি নে, আমি মরলে আপনার বউ কি বিধবা হবেন’!

ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক করছে।ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক করছে।

আমরা ফিরে এলে একে একে সব আইস-স্কুটার স্টার্ট হলো। এবার অবতরণ, প্রায় ৭০ ডিগ্রি ঢাল দিয়ে নেমে আসা। মনে হয় এই বুঝি আইস-স্কুটার উলটে যাবে; কিন্তু যায় না – এমন কি আমার মত নব্য-চালকের হাতেও এর বিশাল বেল্ট বরফ আঁকড়ে তরতর করে এগিয়ে চলে। হিমবাহ হতে নেমে শুরু হলো বরফ-ঢাকা ইস্ফোর্ডেনের ওপর দিয়ে মনোহর ড্রাইভ। হিমবাহের যে কার্নিশে আমরা উঠেছিলাম তা এখন আমাদের মাথার ওপরে। মনে হয় যেন বরফের এক বিশাল কাস্তে আকাশে ঝুলে আছে। ওপর থেকে দেখে আমরা মোটেই বুঝিনি কত ঠুনকো আর ভঙ্গুর এই ওভার-হ্যাং। না বুঝে কিছু আগে এর প্রায় শেষ মাথায় গিয়ে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। এখন সে স্থানটি দেখে শরীরে শীতল-ঘাম বয়ে গেল; দলপতির প্রতি আমার চাপা ক্ষোভ গলে সৈকতের তুষারে মিশে যেতে মোটেই দেরি হলো না।