ইকরামুল হাসান শাকিল 

পর্বতারোহী ও লেখক 

বর্ষা এলেই মনটা ছুটে যায় ঝর্ণার কাছে। কখন যাবো, কখন যাবো? মনটা অস্থির হয়ে উঠে। তাই এবারো ঝর্ণা দেখতে যেতে মনটা ছটফট করতে লাগলো। হঠাৎ করেই দিন তারিখ ঠিক করে ফেললাম। সাথে সঙ্গীও জুটে গেলো আটজন। মুন, সুমন হালদার, হুমায়ুন, মামুন, সবুজ, শিল্পী ও সত্যজিৎ রায়। ১৩ জুলাই রাত ১১.৩০ মিনিটে বাস আব্দুল্লাহপুর থেকে যাত্রা শুরু করে। তবে বাস ছাড়ার আগে জানতে পারলাম সবুজ, শিল্পী ও সত্যজিৎ রায় কোন কারণে যেতে পারছে না। তাই আমরা এখন পাঁচ জন।

 ঝিরিপথে ঝিরিপথে

প্রথমেই বাসে করে মীরসরাই নামলাম সকাল ৭ টায়। রাস্তায় জ্যাম থাকার কারণেই এতো দেরি। এখানেই সকালের নাস্তা সেরে লেগুনা করে নয়দুয়ার চলে আসি। তারপর গ্রামের রাস্তাধরে বেশ কিছুক্ষন হাটা। যেহেতু আমি এই ট্রেইলে আগেও চার বার এসেছি তাই আমরা কোন গাইড নেই নাই। গ্রামের ভেতর দিয়ে, শিম, পুঁইশাক, ধানের জমি, ছোট বড় গাছ পেছনে ফেলে আঁকাবাকা পথ ছেড়ে ঝিরি পথে নেমে এলাম। রোদ মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলছে। বৃষ্টি আসবে আসবে বলে আসছে না। তাই হাঁটতে আমাদের তেমন কষ্ট হচ্ছে না।

 ঝিরিপথে ঝিরিপথে

পাথর, আলোছায়া, শামুক ভেজা ঝর্ণার শীতল জল ঝরা বুনোফুল ভাসিয়ে নেমে আসছে কলকল ছলছল শব্দে। ঝিরিপথে নেমেই আমরা পা ভিজিয়ে নিলাম। পানি পাথর আর শেওলাময় পথে আমরা সবুজ আর পাহাড়ের গভীরে ঢুকে যাচ্ছি। পাখি আর পাখির কিচিরমিচির বরণ করে নিলো একদল ইট পাথরের যান্ত্রিক শহুরের প্রাণকে।

পানি পাথর আর শেওলাময় পথেপানি পাথর আর শেওলাময় পথে

আমরা ৫জন সদস্য যাদের মধ্যে কয়েকজন এই প্রথম কোন পাহাড়ি পথে এসেছে। পাহাড়ের কাছে এসেছে। ঝর্ণার কাছে এসেছে। কখনো ঝিরি পথে কখনো পাহাড়েরর ঢাল বেয়ে চলছি আমরা। যতই সামনে এগোই, ততই সৌন্দর্য বাড়ছিল। পিচ্ছিল পাথরের ওপর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে হাঁটতে হাঁটতে যখন সামনে হঠাৎ নাপিকাটাকুম জলপ্রপাতটা পেয়ে গেলাম, মনে হচ্ছিল এ আমি কোথায় এলাম? এটা কি সত্যি বাংলাদেশ? নাপিকাটাকুম জলপ্রপাতের ঠান্ডা পানিতে লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি করে আবার রওনা দিলাম ওপরের দিকে। আরও ঝরনা দেখা তখনো বাকি।

জলপ্রপাতের ঠান্ডা পানিতে লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপিজলপ্রপাতের ঠান্ডা পানিতে লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি

নাপিকাটাকুমের ওপরে রয়েছে আরেকটি জলপ্রপাত, যার নাম ছোট নাপিকাটাকুম। সেখান থেকে কলকল ছলছল করে পানি আসছে, উপচে পড়ছে বড় নাপিকাটাকুমে।  সৌন্দর্য পেছনে রেখে কর্দমাক্ত পাহাড়ি পথে আবারও চলতে শুরু করলাম আমরা। আমরা হেঁটে যাচ্ছি ঝিরিপথ দিয়ে। পানির প্রবাহ আর গতি এখানে আরও বেশি। যতই সামনে এগোচ্ছি মনে হচ্ছে, সৌন্দর্যের একেকটা আধার উন্মোচিত হচ্ছে। জানি না সামনে কী আছে। আর সামনে আরও খানিকটা এগিয়ে  বিশাল এক ঝরনা বাঘবিয়ানির পায়ের কাছে। এমন সবুজ পাহাড় এত রহস্য লুকিয়ে রাখার বিদ্যা কোথায় শিখেছে কে জানে? সমস্ত বন্য আদিমতা নিয়ে বাঘবিয়ানির ঝরনাধারা সশব্দে আছড়ে পড়ছে মাটিতে।  সেই পানিতে কেউ ধ্যানমগ্ন হয়ে, কেউ শুয়ে, কেউ বসে, যে যেভাবে পারে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলতে লাগল।  বান্দরকুম ঝরনা দেখা এখনো বাকি রয়েছে। একটা সময় পৌঁছেও গেলাম সেটির কাছে। বিশাল বান্দরকুম ঝরনার পানির তীব্র স্রোতে নিজেকে সঁপে দেওয়া আর রহস্যময় পাহাড়ের সৌন্দর্যের কাছে আরেকবার বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কীই-বা করার আছে আমাদের।খৈয়াছড়ার পথে এখন বেশ কয়েকটি খাবার হোটেল হয়েছে। এর মধ্যে পুরনো হলো ঝর্ণা হোটেল। আগে এখানেই খেয়েছি। এবারো এখানেই খেতে বসেছি। হোটেলটি আগের থেকে অনেক পরিপাটি হয়েছে। এখানেই দুপুরের খাবার খেয়ে আবার খৈয়াছড়ার পথে হাটা শুরু করলাম। পথে দেখা হচ্ছে অনেক ট্রেকারের সাথে। তারা নেমে আসছে। রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছে। অনেক পিচ্ছিল আর কাঁদা। এর মধ্যেই কচ্ছপ গতিতে এগিয়ে চলছি। আমরা সবাই যেহেতু তরুণ তাই খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। কাঁদাপথ, ঝিড়িপথ হেটে আমরা এসে পৌছালাম খৈয়াছড়ায়। এখানে এসে ঝর্ণার শীতলতা ও পানির শব্দ আমাদের মনটাকে ভরে দিলো। আমাদের দলে সবথেকে বেশি বয়স সুমন ভাই ও মুনের। তারা কিছুটা ক্লান্তও হয়ে গেছে। তাই তাদের দু’জনকে রেখে আমি, হুমায়ুন ও মামুন উপরের ধাপগুলো দেখতে উপরে উঠে গেলাম।

জলপ্রপাতের ঠান্ডা পানিতে লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপিজলপ্রপাতের ঠান্ডা পানিতে লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি

যেভাবে যাবেন-

যারা ঢাকা থেকে আসবেন,তারা পথিমধ্যে মীরসরাই নেমে গেলে ভাল। ঢাকা হতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যেসব বাস ছাড়ে সেই বাসেই আসা যায়। ভাড়া জনপ্রতি ৪৮০ টাকা নন এসি বাসে। মীরসরাই নেমে সকালের নাস্তাটা করে সিএনজি করে নদুয়ারহাটে চলে আসবেন। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। ভ্রমণের সুবিধার জন্য সাথে গাইড নেয়া ভাল। গাইডের জন্য মওসুম ভেদে ৩০০-৫০০ টাকা লাগতে পারে। নদুয়ার হাটে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। এজন্য মীরসরাই আসতে হবে। একদিনের মধ্যেই ঘুরে আসা যায়,তাই থাকার দরকার পরে না। থাকার জন্য সীতাকুন্ডে নিম্নমানের হোটেল পাওয়া যায়। ভাল হোটেলের জন্য শহরের দিকে আসতে হবে।

পাহাড়ি রাস্তাপাহাড়ি রাস্তা

সাথে যা নিতে হবে-

যেহেতু পাহাড়ি রাস্তা, সেহেতু ভালো গ্রীপওয়ালা বেল্টের স্যান্ডেল উত্তম। কারণ ঝিরিপথে হাটবেন তাই কাঁদা, পানি দিয়ে হাটতে হবে। কাটাছেড়ার হতে পারে, তাই কিছু ব্যান্ডেজ আর ডেটল জাতীয় এন্টিসেপটিক নিতে পারেন। যেহেতু ম্যালেরিয়া প্রবন এলাকা, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয় ডাক্তার এর সাথে কথা বলা উচিত।আর সাথে কিছু হালকা শুকনা নাস্তাা আর খাবার পানি এবং শুকনা কাপড়। আর যেহেতু বর্ষাকাল তাই বৃষ্টি হতে পারে কোন আগাম বার্তা ছাড়াই। তাই ছাতা অথবা রেইন কোট নিতে ভুলবেন না।

ঝর্ণার সৌন্দর্য নষ্টঝর্ণার সৌন্দর্য নষ্ট

সতর্কতা-

ঝর্ণায় গিয়ে অনেকে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। যার ফলে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। তাই ঝর্ণার উপরে বেশি লাফালাফি করবেন না। ঝর্ণার একদম পাড়ে দাঁড়াবেন না। কারণ ঝর্ণা অনেকট পিচ্ছিল হয়। ঝিরিপথে হাঁটার সময় সতর্কতার সাথে হাঁটবেন।

ঝর্ণার সৌন্দর্য নষ্টঝর্ণার সৌন্দর্য নষ্ট

প্লিজ আপনি পাহাড় ও  ঝর্ণায় যাবেন না-

প্রকৃতির প্রতি যার সচেতনতার অভাব আছে তার প্রকৃতির কাছে না যাওয়াটাই উত্তম। কারণ সে গেলে এই সুন্দর প্রকৃতি নষ্ট হয়ে যাবে। এখন একশ্রেণীর ট্রেকার তৈরী হয়েছে যারা শুধু ট্রেকিংই করে। তাদের মধ্যে কোন সচেতনতা নাই। যে যেভাবে পারছে পাহাড় ও ঝর্ণাকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। এবার ট্রেকিং করতে গিয়ে আমি খুবই অবাক হয়েছি। ঝর্ণার পানিতে বা ঝিরিতে পানির বোল, পলিপ্যাক, চিপস, চকলে এমন কি খাবারের প্যাকেট ফেলতে দেখে। যার ফলে ঝর্ণার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং প্রকৃতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যাদের মধ্যে এই বোধটুকু নেই তারা প্লিজ পাহাড় ও ঝর্ণায় যাবেন না।