সকালে উঠে নাস্তা করেই বেরিয়ে পড়লাম ভুটানের আইকন হিসেবে খ্যাত টাইগার নেস্টের উদ্দেশ্যে।  মিনিট চল্লিশেক গাড়িতে চড়ে পৌঁছে গেলাম ট্র্যাকিং পয়েন্টে, এখান থেকে প্রায় তিন ঘন্টা পাহাড়ে ট্র্যাকিং করে টাইগার নেস্টের দেখা পাওয়া যায়। ভাড়া করা ঘোড়ার পিঠে চড়েও অবশ্য অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত যাওয়া যায়। আমরা আপন পদযুগলেই ভরসা রাখলাম, প্রত্যেকে একটি করে জুতসই লাঠি কিনে নিয়ে শুরু করলাম ট্র্যাকিং।  নানান দেশের নানান বয়সী পর্যটক দারুণ উৎসাহে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঘোড়ার পিঠেও আছে বড় একটি সংখ্যা। আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠছি আর রাস্তা ক্রমেই খাড়া হচ্ছে। ঘোড়সওয়ারদের দেখে কেমন জানি একটা ভয় কাজ করছে, একবার যদি ঘোড়ার মতিভ্রম  হয় তবে পাহাড়ের গভীর খাদে পড়ে তার সওয়ারের হালুয়া হয়ে যেতে সময় লাগবে না! অভি হঠাত আমাদের তিনজনকে ঘোড়া থেকে সাবধান থাকতে বললো, আর সাথে সাথেই একটি বেয়াড়া ঘোড়া তার পশ্চাতদেশ দিয়ে অভিকে পাশ থেকে দিলো এক ধাক্কা! আমরা হাসতে হাসতে শেষ, কোনো বিপদ ঘটে নি।

ঘোড়ার পিঠে আরোহীঘোড়ার পিঠে আরোহী

উপরে উঠছি তো উঠছিই, রাস্তাতো শেষ হয় না। একটু পর পর বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামছি, অনিক ক্রমেই পিছনে পড়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম যে আমরা নিজেদেরকে যতটা শক্ত-সমর্থ ভাবি আসলে ততটা নই, অনেকটা আনফিটই বলা চলে। প্রায় দেড় ঘন্টা ট্র্যাকিং করার পর আমরা পৌঁছলাম মিড পয়েন্টে, এখানে একটি রেস্তোরাঁ আছে যেখানে বসে অল্প কিছু নাস্তা, জুস, ও পানি খেলাম। তারপর আবার শুরু করলাম ট্র্যাকিং, ইতোমধ্যে অবশ্য বেশিরভাগ পর্যটক রণে ভঙ্গ দিয়েছে। প্রচন্ড খাড়া পাহাড়ে উঠতে গিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত, অবশ্য চারপাশের অপার্থিব সৌন্দর্য বারবার আমাদেরকে পুনরোজ্জীবিত করে তুলছে।

মাঝে মাঝেই বিশ্রাম নেওয়ার সময় সেলফিমাঝে মাঝেই বিশ্রাম নেওয়ার সময় সেলফি

আরও ঘন্টা খানেক ট্র্যাকিং এর পর আমরা পৌঁছালাম টাইগার নেস্ট। এটি মূলত ৩০০০ ফুট উপরে পাহাড়ের খাঁজে প্রতিষ্ঠিত একটি বোদ্ধ মন্দির। সর্বপ্রথম ৩০০ বছরেও বেশি আগে ১৬৯২ সালে দৃষ্টিনন্দন এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়। ভূটানীদের কাছে এটি ভীষণ পবিত্র একটি স্থাপনা। ভুটানীরা বিশ্বাস করে যে, বৌদ্ধ গুরু রিনপোচে তিব্বত থেকে একটি বাঘিনীর পিঠে চড়ে এই পাহাড়ের চূড়ায় এসে সাধনায় বসেছিলেন। একারণেই  এর এই নামকরণ। দুর্গম এই স্থানে এত বছর পূর্বে এটি স্থাপিত হয়েছে ভাবলেই বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়!

পাহাড়ের খাঁজে টাইগার নেস্টপাহাড়ের খাঁজে টাইগার নেস্ট

সেখান থেকে নামার সময় এক আর্জেন্টাইন বৃদ্ধার সাথে আমাদের আলাপ হয়। এই বুড়ো বয়সে পাহাড়ী পথে ট্র্যাকিং করে শেষ পর্যন্ত আসার পরও তার মুখে স্ফিত হাসি বিদ্যমান। ভালো-মন্দ জিগ্যেস করার পরই তিনি ইংরেজি ছেড়ে আর্জেন্টাইন ভাষায় কি কি যেন বলা শুরু করলেন! আগা-মাথা কিছুই না বুঝে আমরা শুধু মাথা নাড়িয়ে গেছি। শেষমেষ বাংলাদেশে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে সবাই মিলে একটি ছবি তুলে বিদায় নিলাম। অবশ্য কুশল বিনিময় ছাড়া আমাদের অন্যসব কথাবার্তার কিছু তিনি বুঝেছেন কিনা আমার যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে!

আর্জেন্টাইন বৃদ্ধার সাথে আড্ডাআর্জেন্টাইন বৃদ্ধার সাথে আড্ডা

নামতে গিয়ে সময় তেমন একটা লাগে নি। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই একই পথে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে নেমে এলাম নিচে। ইয়োনটেন আমাদের অপেক্ষাতেই ছিল, তার গাড়িতে উঠে সোজা হোটেলে। দুপুরের খাবার খেয়ে অল্প একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য রুমে গেলাম, অনিক সোজা বিছানায়। অগত্যা অনিককে ছাড়াই আমরা তিনজন বের হলাম পারো জং আর তার সাথে বয়ে চলা নদীর ধারে বসে ভূটানের শেষ বিকেলটা কাটাবো বলে। মূল সড়ক থেকে কাঠের পুল পাড় হয়ে গেলাম জং এর ভিতরে। আশেপাশে অনেক চেরিফুলের গাছ, গোলাপি রঙের দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

চেরি ফুলচেরি ফুল

আমরা আস্তে করে নেমে গেলাম নদীর কিনারে, পাথরের উপর বসে শেষ বিকেলের আলোয় দেখতে লাগলাম বরফগলা নদীর সৌন্দর্য। হেডফোনটা কানে লাগিয়ে প্রিয় গানের তালে এক মায়াবী ভূবনে হারিয়ে গেলাম! বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, গোধূলির আবছা অন্ধকার ভেদ করে একটি একটি করে জং এর সবগুলো রঙিন বাতি জ্বলে উঠছে। নদীর স্ফটিক স্বচ্ছ পানিতে পড়ছে তার ছায়া। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকার মত দৃশ্য! বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে হোটেলে ফিরে দেখি অনিক নিচে বসে কফি খাচ্ছে, আমরাও কফি খেয়ে সবাই মিলে বের হলাম কিছু স্যুভেনিয়র কিনতে। টুকটাক কেনাকাটা করে একটা জম্পেশ ডিনার সেরে রুমে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।  

আলোকোজ্জ্বল পারো জংআলোকোজ্জ্বল পারো জং

পরদিন ভোরবেলায় উঠে পারোকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম ফুয়েন্টশেলিং এর উদ্দেশ্যে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় স্বর্গীয় সৌন্দর্যঘেরা রাস্তায় চলতে চলতে মেঘের দল একটু পরপর ঘিরে ধরছে। যেন ওরা জানে- আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল! ভালোবাসার ডাক উপেক্ষা করতে না পেরে গাড়ি থামিয়ে মেঘের আলিঙ্গনে বন্দী হলাম। সামনে চলতে চলতে পাহাড় চূঁড়ায় দেখা দিলেন ভোরের সূর্য মামা। উপর থেকে মিষ্টি রোদ লুটিয়ে পড়ছে সাদা মেঘের ভেলায়।

সকালের অপার্থিব সৌন্দর্যসকালের অপার্থিব সৌন্দর্য

হঠাত দেখলাম রাস্তার উপর বসে কিছু বানর খেলা করছে। আমাদের গাড়ি কাছে যেতেই ভেংচি দিয়ে পাশে সরে গেলো। দূর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে একটি ঝর্ণাধারা দেখতে পেলাম, সবুজ পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলা দুধ সাদা নহর। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতেই বললো যে এর পাশ দিয়েই আমরা যাব। আঁকাবাঁকা পথে ঘুরতে ঘুরতে আমরা পৌঁছলাম ঝর্ণার কাছে, অনেক পথ বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা। কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে আবার রওনা দিলাম। মাঝখানে একটি রেস্টুরেন্টে থেমে নাস্তা করে প্রায় ৫ ঘন্টা পর পৌঁছে গেলাম ফুয়েন্টশেলিং। ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে যখন ভুটান গেইট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি তখন মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এই অল্প কদিনেই ভালোবেসে ফেলেছি ছোট্ট সুন্দর, ছিমছাম আর শান্তিপ্রিয় এই দেশকে। যাই হোক, ভুটানকে বিদায় জানিয়ে ভারতের জয়গাঁও ইমিগ্রেশন অফিসে কাজ শেষ করে ড্রাইভার ইয়োনটেনকে ছেড়ে দিলাম, এই কয়দিন চমৎকার সার্ভিস দিয়েছে এই লোকটি। জয়গাঁও থেকে অল্প কিছু চকলেট কিনে রওনা দিলাম চেংড়াবান্দা সীমান্তে। রাস্তার দুইপাশে সারি সারি চা বাগান, গাড়িতে চালিয়ে দিলাম অঞ্জন দত্তের গান কাঞ্চনজঙ্ঘা। মাঝখানে গাড়ি থানিয়ে চা-মিষ্টি খেয়ে নিলাম। সীমান্তে পৌঁছে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে ঢুকে গেলাম আপন দেশে। সেখান থেকে রাতের বাসে ঢাকা।

ভুটান ভ্রমণের কেচ্ছাঃ দ্বিতীয় পর্ব

ভুটান ভ্রমণের কেচ্ছাঃ প্রথম পর্ব (জয়গাঁও- ফুয়েন্টশেলিং হয়ে থিম্পু)