কোনো কোনো দিন ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা আমাদের জীবনে পরম বা তিক্ত দু’ধরণের অভিজ্ঞতাই দিয়ে থাকে। তিক্ত অভিজ্ঞতার বীপ্সা ঘন ঘন হলেও তার বিপরীতে পরমাভিজ্ঞতার মাত্রা নেহাত কমই বটে। অনেক অনেক বছর পরে আজকের দিনটি শুরু হলো পরম এক অভিজ্ঞতার পরশে।

কর্মস্থলে এসে দরজায় ঢুকবার আগেই চোখ পড়লো সম্মুখে পড়ে থাকা একটি মৃত পাখির উপর। সঙ্গে সঙ্গে মেজাজটা বিগড়ে গেল; কেয়ারটেকার ব্যাটা বুঝি সারারাত দেদার গিলেছে, ঘুম ভাঙ্গেনি এখনও কুম্ভকর্ণের। কে এখন পাখিটি তুলে ওঁচলাকুড়ে ফেলবে? আমি? ভাবতেই গা গুলিয়ে এলো। এড়িয়ে পাশ কেটে ভেতরে ঢুকলাম। কাজে মন বসাতে পারছি না, খচখচ করছে মনটা। উচ্ছিষ্টটুকু বোধহয় এখনও ওখানেই পড়ে আছে, বেরুলেই আবার চোখে পড়বে। ভাগ্যিস এ দেশে কাক চিলেরা নেই, নইলে অঙ্গব্যবচ্ছেদ বিদ্যার ব্যবহারিক ক্লাশ শুরু করে দিত। ধুর, খুব বাজে ভাবে শুরু হলো দিনটা। ধোঁয়াওঠা এক মগ কফি গিলে পরবর্তী কর্ম সম্পাদনে অর্থাৎ ধোঁয়া গিলতে বেরিয়েছি, দেখলাম শ্মশ্রুমণ্ডিত এক বৃদ্ধ পরম যত্নে পাখিটিকে তুলে নিয়ে একটি সফেদ রুমালে মুড়ে সাইকেলের পেছনে রাখা ভেতরটা তুলো দিয়ে আবৃত একটি বাক্সে শুইয়ে রাখছে। বৃদ্ধের চোখে বাস্প।

একটি মৃত পাখিএকটি মৃত পাখি

অতি সামান্যই বোধহয় দৃশ্যটি, তবু হঠাৎ করে কয়েক পলের জন্যে তা স্বর্গীয় মনে হল। এই চিত্র আমার প্রতিদিনকার চিরচেনা পৃথিবীর থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন। কেয়ারটেকার এলে নির্দয় চিমটা দিয়ে উঠিয়ে পাখিটিকে জৈব-ওঁচলাকুড়ে ফেলতো; কিন্তু রাস্তার প’রে পড়ে থাকা সামান্য একটি পাখির মৃতদেহের প্রতি বৃদ্ধের এই নমনীয়তা আমার শুস্ক মনে নাম না জানা এক ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে গেল।

বুঝলাম এই বৃদ্ধ সাধারণ কেউ নয়। সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করলাম- তুমি পাখি ভালবাসো বুঝি? নোংরা হলদেটে গোঁফ দাঁড়ির ফাঁক দিয়ে হলদেতর দাঁত বের করে একটু হেসে বৃদ্ধ বললো- আমি মানুষ বাদে পৃথিবীর তাবৎ জীবজন্তুদের ভালবাসি। কৌতুক করে বললাম- তা বাবা, মানুষ তোমার কি ক্ষতি করেছে? আর তাছাড়া মানুষকে ভাল না বাসা অত গর্বের কিছু নয়। বিজ্ঞের মত চোখ দুটো কুঁচকে সে বললো- দেখো বাপু, মানুষকে ভালবাসবার জন্যে এই পৃথিবীতে কয়েক কোটি মানুষ আছে এবং মানুষের গড়া স্বয়ং ঈশ্বরও আছেন, কিন্তু পশুপাখিকে ভালবাসবার মানুষের সংখ্যা শুন্য না হলেও খুবই কম। আমি সেই কমেদের একজন। অল্পক্ষণেই এই সংখ্যালঘু লোকটিকে ভাল লেগে গেল। সে পাখিটির মৃত্যুহেতু ব্যক্ত করলো। ফিনল্যান্ডের ভাষায় অর্থাৎ ফিনিশে পাখিটির নাম কেপিউতিক্কা (Kapytikka), ইংরেজীতে Great Spotted Woodpecker আর বাংলায় খুব সম্ভব বাতাবি কাঠকুড়ালি, যাই হোক এটি একটি কাঠঠোকরা। আমার কর্মক্ষেত্র দালানের এক তলায়, বারান্দা নেই। এর উপরের সবগুলো ফ্ল্যাটেই ঝুলন্ত বারান্দা। ফিনিশরা বারান্দার ব্যাপারে বেশ শৌখিন। রঙবেরঙের গাছপালা দেখা যায় প্রায় প্রতিটি বারান্দায়। শীতপ্রধান দেশ বলে বেশীরভাগ বারান্দাই থাকে স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা। আমার ঠিক উপরের বারান্দায় গাছপালার পরিমান একটু বেশীই, দূর থকে উড়ে আসতে থাকা কাঠঠোকরার চোখে তা বনানীরই একটি অংশ বলে মনে হয়েছে হয়তো; দু’পায়ে কোনো এক গাছের কাণ্ড খামছে ধরে মনের সুখে ঠোকরানোর আশায় সে মহানন্দে উড়ে আসছিল। বেচারা কাঠঠোকরা, বারান্দার শৌখিন ক্ষুদ্র বাগান আর শূন্যের মাঝে মানুষের তুলে দেয়া কৃত্রিম কাঁচের বেড়া তার চোখে পড়েনি। বেগ ও বাঁধার ব্যাপক সংঘর্ষে ঘাড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। জীবন দিয়ে নিউটনের ৩য় সুত্রের সার্থকতা প্রমান করেছে। বৃদ্ধের এক বোন থাকে উল্টোদিকের দালানে। তারই ফোন পেয়ে ৬ কি মি সাইকেল হাকিয়ে বৃদ্ধ ছুটে এসেছে।

ঘাড় ভাঙ্গা কাঠঠোকরাঘাড় ভাঙ্গা কাঠঠোকরা

তাকে জিজ্ঞেস করলাম- এখন কি করবে পাখিটিকে নিয়ে। মুচকি হেসে সে জানালো- ঘণ্টা দুয়েক পরে ফিরবার পথে তোমাকে জানিয়ে যাবো। দুই ঘণ্টায় লাঞ্চ সারলাম, সহকর্মীদের সঙ্গে গুলতানি মারলাম। মিছে কইব না, বুড়োকে নিয়ে ঠাট্টাতামাসাও হলো কিছুটা। রাশিয়ান বন্ধু রোমানের মতে বুড়োর মাথার নাটবল্টু ঢিলা, স্পেনিশ বন্ধু হুয়ান বললো- কর্মহীন মানুষেরা অকর্মে দারুণ উৎসাহী; অর্থাৎ ‘নাই কাজ তো খই ভাজ’ টাইপের কিছু একটা। যাইহোক বুড়ো তার কথা রাখতে ঘণ্টা দুই বাদে এসে তার ক্যমেরায় তোলা কয়েকটি ছবি আমাকে দেখালো।

কাঠঠোকরার শেষকৃত্যানুষ্ঠানকাঠঠোকরার শেষকৃত্যানুষ্ঠান

চিরনিদ্রায় শায়িত কাঠঠোকরা, কাঠের ডাল দিয়ে চিহ্ন রাখা, যাতে বৃদ্ধ পরে এসে স্থানটি চিনতে পারেচিরনিদ্রায় শায়িত কাঠঠোকরা, কাঠের ডাল দিয়ে চিহ্ন রাখা, যাতে বৃদ্ধ পরে এসে স্থানটি চিনতে পারে

ছবি দেখাতে দেখাতে গড়গড় করে বলে গেল- এই কাজ তার শখেরও নয়, পেশাও নয়; প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তার এই নেশা। তার ৬৪ বছরের জীবনে পথে ঘাটে পড়ে থাকা অসংখ্য পাখিকে সে নিজ হাতে দাফন করেছে। আহত পশুপাখিদের সে তুলে নিয়ে পশুহাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করে। এতে তার কিছু খরচপাতিও হয়। সে টাকার জন্যে সে কারো কাছে হাত পাতে না। নভেম্বর ডিসেম্বর দুই মাস সান্তাক্লস সেজে ঘুরে বেরিয়ে কিছু রোজগার করে, সে অর্থটুকু সম্পূর্ণ ব্যায় করে পথে ঘাটে বনে বাদারে পড়ে থাকা অসুস্থ পশুপাখিদের পেছনে; আর নিঃসন্তান বিপত্নীক বুড়োটির পেট চলে যায় সরকারী ভাতায়।

ছবিগুলো দেখে মনে হল পৃথিবী সত্যিই সুন্দর আর পৃথিবীর ভিন্নধর্মী নাটবল্টু ঢিলা মানুষগুলো সুন্দরতর। এই বুড়োটি এখন আমার খুব ভাল একজন বন্ধু, তাঁর নাম- এনসিও কেম্পে।তাঁর সম্পর্কে জানবার আছে অনেক কিছু। ধীরে সুস্থে জানছি। সময় সুযোগ হলে আপনাদেরও জানাতে ভুলবো না।

সব শেষে এনসিওকে জিজ্ঞেস করলাম ফিউনারেলে কি প্রার্থনা করছিলে? বিশাল এই পৃথিবীটাকে উপহাস করবার মত এক গাল হেসে সে বললো- বাইবেলের কোনো মন্ত্র অবশ্যই নয়। আমি শুধু পাখিটির উদ্দেশ্যে বলেছি- ও সুন্দর ছোট্ট পাখি, আমি তৃপ্ত; কেননা মহাপ্রস্থানকালে তুমি এটুকু অন্তত জেনে গিয়েছো যে তুমি মোটেই অবহেলিতটি নও।

(প্রথম ছবিটি নেট থেকে নেয়া; বাকীগুলো এনসিওর ক্যামেরায় তোলা।)