৪ ডিসেম্বর - শুরুর দিনের শুরুটা 
শীতে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ঘুম ভেঙে গেলো। বালিশের তলা হাতড়ে ঘড়িটা বের করে দেখি সকাল সাড়ে ৫টা। হোটেলের রুম হিমশীতল হয়ে আছে। মনে হলো খোলা আকাশের নিচে হিমালয়ের বরফের ওপর শুয়ে আছি। হোটেলটা শিলং শহরের লাবান-এর বাত্তিবাজার এলাকায়। নাম বনি গেস্ট হাউজ। এটা ছোট পাহাড়ি ঢালে গেস্ট হাউজটা। রুম হিটার চলছে, তবু কেন এত ঠান্ডা লাগছে বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, জানালার পর্দাটার একটা কোণা দুলছে। তার মানে জানালাটার একটা পাট সারা রাত খোলা ছিলো। জানালার পর্দা সরাতেই চোখে পড়ল কালচে নীল আকাশটা। কোনো তারা নেই। পশ্চিমের আকাশটা বড়ই শোকার্ত, ব্যাথিত আর থমথমে। বৃষ্টির কোনো নাম গন্ধ নেই। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস পর্দাফর্দা উড়িয়ে ধাক্কা মেরে রুমে ঢুকলো। মনে হলো, যাদুর মতো কলজেটা জমে গেলো। তাড়াতাড়ি জানালাটা বন্ধ করে রাথরুমে ঢুকলাম। 
ভ্রমণে আমি যতটা সম্ভব কম কাপড় চোপড় নেই। লম্বা ভ্রমণ হলে কয়েকদিন পর পর সুযোগ বুঝে দরকারি কাপড় চোপড় ধুয়ে ফেলি। গতকাল রাতেও কিছু কাপড় ধুয়েছি। তারপর রুম হিটারের কাছে শুকাতে দিয়েছি। একটা কাপড়ও শুকোয় নি। ভেজা কাপড়গুলো দ্রুত ওয়াটার প্রুফ ব্যাগে ভরে ব্যাকপ্যাকে চালান করে দিলাম। ঘড়িতে ছটা বাজে। ডাউকি বর্ডারে যেতে হবে। ঢাকা থেকে আজকে ভ্রমণ বন্ধুরা আসবে। কথা মতো কাজ হলে দশটা নাগাদ তারা বর্ডার ক্রস করবে। আমি সাড়ে নয়টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে বর্ডারে থাকতে চাই। আমার শিলং এর বন্ধু জন ওয়াংখার সব আয়োজনের দায়িত্বে। তাঁর আসার সময় হয়ে গেছে। তারপরও একটা ফোন করলাম। জন ফোন ধরছে না। তার মানে জন কি এখনো ঘুম থেকেই ওঠেনি? সর্বনাশ! মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। যাত্রার শুরুর দিনটায় আমি কোনো ঝামেলা চাই না। হোটেলের সাথে কাল রাতেই সব দেনাপাওনা চুকিয়ে ঘুমিয়েছি। সকালে সোজা ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে উঠবো। 
তাড়াতাড়ি জনকে আবার ফোন দিলাম। এবার ফোন ধরলো - ‘হ্যালো, আমি আর দশ মিনিটের মধ্যে হোটেলে পৌঁছচ্ছি। তুমি নিচে নামো।’ বলেই লাইন কেটে দিলো। নো গুড মর্নিং, নো গুড বাই। জন আমার টেনশনটা বুঝতে পেরেছিলো হয়তো। ভ্রমণে সহযোগীরা টেনশন টের না পেলে বড় বিপদ। ব্যাগ নিয়ে সোজা নিচে নেমে  এলাম। এই হোটেলে লবি বলতে কিছু নেই। সুতরাং সামনের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে লাগলাম। 
জন সাড়ে ছয়টার একটু পরেইচলে আসলো। সাথে মারুতি সুজুকি সাইজের একটা ছোট গাড়ি। বড় জোড় ঠেসে ঠুসে ৩ জন বসতে পারবে। আমরা মানুষ মোট ৮ জন। গাড়ির সাইজ দেখে আমারা মাথা ঘুরে গেলো। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। 
আমার চেহারায় লেখা প্রশ্নটা জন চট করে পড়ে ফেললো, ‘এটা তোমার চূড়ান্ত গাড়ি নয়।’ বলেই সে একগাল হেসে বরফ ঠান্ডা হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘গুড মর্নিং।’ 
যাক বাবা আশ্বস্ত হওয়া গেলো। আমিও উত্তরে ‘গুড মর্নিং’ বলে আসল কাহিনীটা জানতে চাইলাম। 
জন ব্যাখ্যা করলো, ‘তোমার ভ্রমণের মূল ড্রাইভার খাসীপল্লীর তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে সাড়ে সাতটায়। খাসী পল্লী ডাউকি বর্ডার যাওয়ার পথেই। আমরা এই ছোট গাড়িতে এখান থেকে সেই তিন রাস্তার মোড়ে যাবো। তারপর আমি ফিরে আসবে শিলং। তুমি মূল ড্রাইভার নিয়ে চলে যাবো ডাউকি।’ বেশ, আমি আশ্বস্ত হয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। 
গাড়ি চলতে শুরু করলো। দশ মিনিটের মধ্যে শিলং শহর থেকে বেরিয়ে এলাম। পুরো শহর বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। রাস্তার কমলা বাতিগুলো জ্বলছে। পুরো পথে দু’একটা গাড়ি চোখে পড়লো মাত্র। পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত জুড়েই দেখেছি সন্ধ্যার পর সবাই ঘরে ঢুকে যায়। দোকান-পাট, রেস্তোরা, ঝপাঝপ বন্ধ। সকাল হয় নয়টা-দশটায়। এগারটা-বারোটায় কাজ-কর্ম শুরু হয়। 
ভ্রমণে আমার কাছে ড্রাইভারের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ড্রাইভার চাইলে আপনার লাখ টাকার ভ্রমণকে বিষিয়ে নরকীয় করে তুলতে পারে আবার সাধারণ ভ্রমণকে চিরস্মরনীয়ও করে তুলতে পারে। 
আমাদের ড্রাইভারের নাম মিচেল। ডাক নাম মিচ। জাতিতে খাসি। পুরো মাথা কামানো। দুই কানে দুল। গায়ে দামি কালো লেদার জ্যাকেট। গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে পথের দিকে চেয়ে আছে। সকালে সূর্যের আলো তার চেহারায় পড়ে তাকে আরো সম্ভ্রান্ত করে তুলেছে। আমাদের তথাকথিত ড্রাইভার চরিত্রের বিন্দুমাত্রও তার মধ্যে নেই। কাছে আসতেই জন পরিচয় করিয়ে দিলো। মিচ হেসে হাত বাড়ালো। চোখে পড়ল তার পান খাওয়া লাল দাঁতগুলো। হাসিতে, চোখে, মুখে, আনন্দে, পুরো অবয়বে তার আন্তরিকতার শোভাযাত্রা। আমার ব্যাগটা নিজ হাতে তুলে নিয়ে গাড়ির পেছনে রাখলো। টাটা সুমো নন-এসি গাড়ি। আট জনের জন্য উপযুক্ত। হাতে সময় কম। জন দ্রুত বিদায় নিয়ে শিলং ফিরে চলল। আর মিচ আমাকে নিয়ে কুয়াশা-মেঘের কুন্ডলী ফুঁড়ে ডাউকি বর্ডারের দিকে গাড়ি হাঁকালো। 

আমাদের গাড়ি চলছে ডাউকি বর্ডারের দিকেআমাদের গাড়ি চলছে ডাউকি বর্ডারের দিকে

মিচেলের সাথে সম্পর্ক আরো সহজ করতে কিছু কথপোকথন শুরু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘মিচ, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?’
মিচ বললো, ‘স্ত্রী, একছেলে আর এক মেয়ে।’
আমি কী ভেবে যেন অনুমান করলাম, ‘তোমার ছেলে বড় তাই না?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। কী করে বুঝলে?’ মিচ অবাক হলো। 
অনুমান খেটে গেলো দেখে আত্মতৃপ্তি হাসি হাসলাম, ‘সাধারণত আমরা বড় সন্তানের কথা আগে বলি। আমারো এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে বড়।’ 
আবারো জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কত বছর ধরে গাড়ি চালাও?’
মিচ দুই সেকেন্ড ভেবে উত্তর দিলো, ‘বাইশ-তেইশ বছরতো হবেই। আগে বড় বাস চালাতাম। এখন স্বাধীন পেশা।’
আমি শুরুতেই ওর ভেতর ড্রাইভার ব্যাপারটা লক্ষ্য করিনি। বললা, ‘এটা তোমার নিজের গাড়ি।’
‘জ্বী, স্যার।’ মিচের কণ্ঠস্বর গর্বদীপ্ত। 
আমার স্যার শুনতে কানে অস্বস্তি লাগলো। বললাম, ‘স্যার বলো না। কল মি আখতার।’
সাথে সাথে আজ্ঞাবহের জবাব, ‘ওকে আখতার।’
জানতে চাইলাম, ‘তুমি কি ডাউকি বর্ডার গিয়েছো আগে?’
সামনে একটা ট্রাক বাঁক নিয়ে এগিয়ে আসছে। মিচ গাড়ি কমাতে কমাতে বলল, ‘কয়েকবার গিয়েছি। অধিকাংশই চিনি। তোমরা যেখানে যেখানে যাবে সেগুলো আমার চেনা আছে। ’
শুনে ভালো লাগলো। বললাম, ‘বেশ বেশ।’ দেখলাম ট্রাকটা কাঠের গুড়ি নিয়ে শিলং এর দিকে চলে গেলো। 
মিচ গাড়ি চালাতে দক্ষ। বাঁক ঘোরার সময় তার গতি ও কৌশল লক্ষ্য করার মতো। তার স্ত্রী সরকারি কর্মকর্তা, ছেলে কলেজে পড়ে, মেয়ে স্কুলে। তাদের ফলাফলও ভালো। 
সকালের সোনালী আলোয় পাহাড়গুলোর মাথা উজ্জ্বল হয়ে আছে। গাড়ি চলছে মাঝারি গতি নিয়ে। মাঝে মাঝেই ছোট ছোট পাহাড়ি বসতি চোখে পড়ছে। অধিকাংশই খাসিপল্লী। মিচ নিবিষ্ট মনে গাড়ি চালাচ্ছে। রাস্তার এক পাশে পাহাড়ের খাড়া দেয়াল নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে অন্য পাশে অতল খাদ যেন মৃত্যুদূত, হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গাড়ি ডানে বামে মোড় নেয়ার সময় নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠি। পাহাড়ি পথে গাড়ি ভ্রমণ তাই বেশ রোমঞ্চকর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন হৃদয় কাড়ে তেমনি আতঙ্ক হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে দেয়। কিন্তু এই বেলা ক্ষুধায় পেট মোচড়াচ্ছে। এখনো সকালের নাস্তা করা হয়নি। আমাদের চালক মিচকে সেকথা জানাতেই মিনিট খানেকের মধ্যেই এক বিচ্ছিন্ন প্রান্তরে একটি মাত্র ছোট পাখির বাসার মতো খবার দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করালো। 
দুজনে গাড়ি থেকে নেমে রেস্টুরেন্টের মধ্যে ঢুকতে গিয়েই থমকে দাঁড়ালাম। আপনি নিশ্চয়ই মনে মনে এখন ভাবছেন, আমরা এমন আজব চিজ কী দেখলাম যা প্রবেশ-দরজার কাছে হঠাৎ আমাদের পাথর বানিয়ে দিলো! সংকোচে আড়ষ্ট করে ফেললো! মাঝে মাঝে তাই ভাবি, ভ্রমণ কেন নেশাগ্রস্ত করে, ভ্রমণ কেন জীবনের সমস্ত দিশা কেড়ে নেয়, আর নতুন দিশার প্রেমে উদভ্রান্ত ও দিশেহারা করে দেয়। পথের পাশের এই ছোট্ট রেস্টুরেন্টটার পুরো মেঝে এত পরিচ্ছন্ন, এত সুন্দর, এত গোছানো যে জুতা নিয়ে পা-টা রাখতেই পারলাম না। আমি জীবনে এই প্রথম কোনো খাবার রেস্টুরেন্টে খালি পায়ে ঢুকলাম। পুরো রেস্টুরেন্টটা এক সুশ্রী যুবতীর তত্বাবধানে চলছে। বোঝা-ই যাচ্ছে এই খাসী রমনীই এর অধিকর্তা, খাদ্য প্রস্তুতকারী এবং পরিবেশনকারী। স্বচ্ছ একটা ছোট্ট কাপে টকটকে লাল এক কাপ চা আর একটা রুটি খেয়ে তৃপ্তিতে হৃদয় ভরিয়ে ফিরে চললাম পথের টানে। স্মৃতিতে গেঁথে রইলো একটা সুন্দর অলংকৃত বাজুওয়ালী হাত। স্মৃতিতে স্বর্ণখচিত হয়ে রইলো চেরাপুঞ্জির মিষ্টি রোদ মাখা একটি অপূর্ব সকাল। 

জানালার কাঁচ নামিয়ে দিয়েছি। সূর্য পুরোপুরি উঠে গেছে। হালকা বাতাসে মন ফুরফুর করছে। এক সময় রাস্তার দুপাশে আর পাহাড় দেখতে পেলাম না। পাহাড় দিগন্তে সরে গেলো। গাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় মাঠের মাঝখান থেকে চলতে লাগলো।  মনেহলো আফ্রিকার কোনো জীপ সাফারিতে আছি। এক্ষুনি দূরের কোনো ঘাসের ঝোপ থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়বে সিংহ, সাথে গোটা তিনেক শাবক। পুরো যাত্রাপথ দারুণ উপভোগ করছিলাম।  কিন্তু ডাউকির কাছাকাছি আসতেই পথ খারাপ হতে শুরু করলো। 

(চলবে)

উত্তর-পূর্ব ভারতের ৪ রাজ্য ও হর্নবিল উৎসব ১ম পর্ব