ভার্সিটির এডভেঞ্চার ক্লাবের সাথে আমার প্রথম বড় ট্যুর । ট্যুরে যাওয়ার আগে ক্লাব থেকে মিটিং ডাকা হলো । তিথী আপু সবার অন্তরে কম্পন ধরিয়ে দিলেন - থাকা খাওয়া খুব একটা ভালো হবে না , জোঁকের ভয় আছে ঝর্ণার ঐদিকে । এরপর সিদ্ধান্ত নিতে একটু সময় লাগলো - যাবো নাকি যাবো না , গরমে পারবো নাকি । তখন চিন্তা করলাম প্রতিবারই কিছু না কিছু থাকবে যা ভ্রমণে যাওয়ার জন্য বাঁধা হতে পারে । এইবারই চলে যাই দেখা যাক কি হয় ।

টাকা দিয়ে ভ্রমণে যাওয়ার তালিকায় নাম তুলে ফেললাম । যাওয়ার পথে সবচেয়ে সুন্দর যা দেখেছি তা হলো সূর্যোদয়ের সাথে মেঘনা নদীর মৃদ্যু উত্তাল রূপ । খুব ইচ্ছা করছিল ঝাপ দিই যদিও সাঁতার পারি না নতুবা একটা স্পীড বোটে করে ঘুরে বেড়াই । আমি ঘরকুণো মানুষ ক্লাবের সাথেই সিলেটে চা বাগান দেখা প্রথম, যেটা ঢাকার বাহিরে প্রথম পা ফেলাও বলা চলে একদিক দিয়ে । আবার সেই ক্লাবের হাত ধরেই চট্টগ্রাম । বাস থেকে নেমেই আমাদের প্রথম গন্তব্যস্থল ছিল খৈয়াছড়া ঝর্ণা ।

গন্তব্যস্থল খৈয়াছড়া ঝর্ণা গন্তব্যস্থল খৈয়াছড়া ঝর্ণা

আমদের সবারই জানা আছে - " কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে " । ঝর্ণায় পৌঁছাতে আমাদের তেমন কোন কষ্টই হলো না । এতেই দেখা গেলো ঝর্ণার যে রূপের সন্ধানে আমরা এসেছিলাম তা সে লুকিয়ে ফেলেছে । বর্ষা না এলে সে সেই রূপ আর প্রকাশ করে না । আমার জন্য তাই সই যা দেখলাম , ঝর্ণা দেখতে কেমন তাই না হয় দেখলাম । এরপর সেদিনের মতো ইস্তফা দেয়া ঘোরাঘুরি থেকে ।

ঝর্ণা দেখতে কেমনঝর্ণা দেখতে কেমন

হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া এই তো গেলো প্রথম দিন । পরের দিন ছিল সবচেয়ে বেশি অসাধারণ । কিভাবে স্বাভাবিকভাবে পাড় করে ফেললাম এখন চিন্তা করে কূল পাই না । ক্লাবের সবার প্রাণশক্তির কোন তুলনা হয় না । দ্বিতীয় দিনের প্রথম গন্তব্যস্থল ছিল ইকো পার্কের সহস্রধারা ঝর্ণা দেখা ।

পাহাড়ের রাস্তাপাহাড়ের রাস্তা

পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে উপরে ওঠার অভিজ্ঞতাটা মজার ছিল ।বেশ শক্তিই খরচ হয়েছে সেখানে । সিফাত আপু দেখি হঠাত করে উলটো হয়ে হাঁটছে এবং পরামর্শ করলো এভাবে হাটলে নাকি কষ্ট কম হয় । এক জায়গায় গিয়ে লিখা দেখলাম সহস্রধারা ঝর্ণা এইদিকে । নিচে তাকিয়ে দেখি লম্বা সিঁড়ির পথ নিচে নেমে গেছে । সঠিক জানি না তবে প্রায় ৫০০ কিংবা তার বেশি সিঁড়ি ছিল । খুব সহজেই নিচে নেমে গেলাম এবং আবারো রূপ লুকিয়ে রাখা ঝর্ণার দেখা পেলাম । এখান থেকে আসার সময় কুংফু পান্ডা মুভির একটি সংলাপ মনে পড়ে গেলো - " মাই অল্ড এনেমি স্টেয়ার্স " . তাও সবাই কিভাবে যেন এটাও বেশ দ্রুতই পাড় করে ফেললাম । এটি শেষ হতেই এই ভ্রমণের তালিকায় থাকা সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটির উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হলাম ।

চন্দ্রনাথ মন্দিরচন্দ্রনাথ মন্দির

দূর থেকে পাহাড়ের উপরে কমলা রঙের এক মন্দির দেখা যায় ও টাই নাকি চন্দ্রনাথ মন্দির । যতো কাছে যাই ততো মুগ্ধ হই । নিজেকে ততো ক্ষুদ্র মনে হতে থাকে এই জগত সংসারে । পাহাড়ের বিশালতা বর্ণনাতীত । সবুজের চাদড়ে ঢেকে থাকা এক বিশালতার নামই মনে হয় পাহাড় । যতোই উপরে উঠি মন্দিরের ততোই নিকটবর্তী হই । প্রায় অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে চন্দ্রনাথ মন্দিরের আগে আরেকটি তুলনামূল ছোট পাহাড়ের উপর অবস্থিত ছোট মন্দিরের কাছে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিই । সে জায়গা থেকেই এক অপরূপ দৃশ্য দেখি ।

আলো ছায়ার খেলা আলো ছায়ার খেলা

আলো ছায়ার খেলা । বাতাসের দাপটে মেঘগুলো পাহাড়ের দিকে এগুতে থাকে । আর মেঘ সরে যেতেই শহরের একেক জায়গায় সূর্যের আলোয় রাঙা হতে থাকে । সূর্যের আলোর আগমনে ছায়া এক পা এক পা করে পিছাতে থেকে । গাছের এক পাশে ছায়া আরেক পাশে আলো কি এক মনোরম দৃশ্য । এই আলোরও কি যেন এক গুন ছিল , কেমন যেন ভোরের আলোর মতো স্নিগ্ধতা ছিল । এই দৃশ্য উপভোগ করেই পরে আরো চমৎকার দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় এগুতে থাকলাম দল বেঁধে ।

গন্তব্যে পোঁছাতেই এক রকম তৃপ্তি পেয়ে গেলাম । সেই রাস্তা থেকে দেখতে পাওয়া ছোট মতোন কমলা রঙের মন্দিরে আমরা এখন পৌঁছে গেছি । বাতাসের শীতলতা ছিল , ছিল মনোমুগ্ধকর অসীম পর্যন্ত দৃষ্টি , সবুজের সমারোহ আর কি লাগে । এজন্যই হয়তো আমরা বেঁচে আছি । সেই চুড়া থেকে নামার সময় আমরা অন্য পথ ধরলাম যা দিয়ে নামা তুলমূলক সহজ । জানামতে ৯৭৩ টা সিঁড়ি পাড় করতে হয়েছে আমাদের পাহাড়ের পাদদেশে আসতে । একপ্রকার ঘোরের মধ্যেই কেটেছে পুরো দিন । রূপের পর রূপ দেখে ।

মহাময়া লেকেমহাময়া লেকে

পরের দিন গেলাম মহাময়া লেকে । নামটা কোন অজানা কারণে আমার খুব পছন্দ হয়েছে , খুব খুব বেশি । পানি হালকা ছুঁয়েও দেখলাম । এই লেকে নৌকা নিয়ে ঘুরে রুপ আস্বাদন করতে হয় যা আমাদের মতো এতো বড় দল নিয়ে করা সম্ভব ছিল না । খুব দ্রুতই কেটে গেলো কিন্তু অতীব সুন্দরভাবে । তাসবিতা ম্যামের কন্ঠের রবীন্দ্রসঙ্গীত অপূর্ব ছিল । রাস্তায় ম্যামের সাথে গান নিয়ে যে ছোট্ট আলোচনা হয়েছিল তা স্মৃতিতে বিশেষভাবে থেকে যাবে । ম্যামের সাথে নতুন পরিচয় তাই ম্যামের কথাই বললাম আর তমাল স্যার এবং কাওনাইন স্যার সম্পর্কে কিছু বলার নাই তারা সফরসঙ্গী হিসেবে সবসময়ই চমতকার । বেশ কয়েকজনের সাথে ভালোভাবে পরিচিত হলাম । প্রাপ্তির খাতায় এই ছোট্ট ভ্রমণ অনেক কিছুই দিলো ।