এক.
ভিসা, নাগাল্যান্ড, হর্ণবিল উৎসব ও আমরা পর্যটক কতিপয়
ভ্রমণ শুরুর আগেও থাকে ভ্রমণের কত কত গল্প! তার উপর আমাদের এবারের ভ্রমণ ঐতিহাসিক ও বহুমাত্রিক। গল্পে গল্পে ঠাসা। পুরো ভ্রমণের সবকিছু তুলে ধরা যেমন কঠিন তেমনি আমার সাধ্যেরও অতীত। তবুও সকালের আলো যেমন মেঘ, কুয়াশা, ধুলোর আস্তরণ আর বৃক্ষশাখার পল্লবঢাল অতিক্রম করে মাটির কাছে পৌঁছতে চায় তেমনি এই ভ্রমণ কাহিনীও আপনাদের মানসকুঠির কাছাকাছি পৌঁছার জন্য সাধনা চালিয়ে যাবে। 

বাম থেকে দ্বৈপায়ন দা, মুহিত ভাই, আমি অধম, নদিম ভাই, পাখির ডানা মেলে সামনে অপু আর পেছনে অণু ভাই। একেবারে ডানদিকের ভদ্রলোক কোথ্থেকে এসে ফ্রেমে ঢুকলো কে জানে! ছবিটা তুলেছে মিচ। ছবিতে তন্ময় কৈরী ও প্রণব কৈরী নেই। তাহারা তখনো এসে পৌঁছান নাই। আগামী পর্বে চেরাপুঞ্জিতে তাদের দেখা মিলবে।বাম থেকে দ্বৈপায়ন দা, মুহিত ভাই, আমি অধম, নদিম ভাই, পাখির ডানা মেলে সামনে অপু আর পেছনে অণু ভাই। একেবারে ডানদিকের ভদ্রলোক কোথ্থেকে এসে ফ্রেমে ঢুকলো কে জানে! ছবিটা তুলেছে মিচ। ছবিতে তন্ময় কৈরী ও প্রণব কৈরী নেই। তাহারা তখনো এসে পৌঁছান নাই। আগামী পর্বে চেরাপুঞ্জিতে তাদের দেখা মিলবে।

এবারের ভ্রমণে আমরা আট জন পর্যটক আছি। আমাদের ভ্রমণদলের নাম দেয়া হয়েছে ‘টিম নাগা’। পরিচয় করিয়ে দেই সবার সাথে। দলে আমার সাথে আছেন বাংলাদেশের দুইবার এভারেস্টবিজয়ী একমাত্র পর্বতারোহী এম. এ. মুহিত, আছেন বিশ্বপর্যটক তারেক অণু এবং তানভির অপু - দুই সহোদর, আছেন আমাদের দুই ভ্রমণরসিক ডাক্তার-বন্ধু তন্ময় কৈরী ও তার ছোটভাই ডাক্তার প্রণব কৈরী আর আছেন স্বল্পভাষী, দীর্ঘদেহী ও বিশাল বপুর মালিক নাদিম ভাই, যিনি মাঝেমধ্যে হারিয়ে যান আর আমরা হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজেটুজে তাকে আবার দলে ঢুকাই। 

মেঘালয় মানে মেঘের আলয়, মেঘের বাড়ি। খুবই যথার্থ এই নামকরণ।মেঘালয় মানে মেঘের আলয়, মেঘের বাড়ি। খুবই যথার্থ এই নামকরণ।

আমরা এবার বহুল আলোচিত, অনন্য ও অদ্বিতীয় হর্নবিল উৎসব দেখার জন্য বিষ্ময়কর নাগাল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছি। নাগাল্যান্ড নামটা শুনলেই ভেতরে কেমন একটা আলোড়ন তৈরি হয়!নাগাল্যান্ড ভারতের সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাত রাজ্যের একটি। উত্তর-পূর্ব ভারতে এর অবস্থান। এক সময় নাগাল্যান্ড বাংলাদেশিদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কেউ যেতে পারতো না। এখন সিকিম যেমন। নাগাল্যান্ড নিয়ে বহু ঘটনা শুনতাম, মিথের মতো। এখানকার আদিবাসীরা নাগাযোদ্ধা হিসেবে অনেক আলোচিত। তারা যুদ্ধে জিতলে প্রতিপক্ষের মাথা কেটে নেয়। এইসব যোদ্ধাদের বলে ‘হেড হান্টার’ বা মস্তক শিকারী। শুনলেই কেমন গা ছমছম করে। নাগাল্যান্ডের গভীর অরণ্যে এখনো নাকি তাদের বসতি আছে। ইন্টারনেটে বহু তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্যগুলো কতটা সত্য আর কতটা মিথ কে জানে! নাগাল্যান্ডের জঙ্গলে নাকি বাঁদর চোখেই পড়ে না, রাস্তাঘাটে কুকুর কদাচিত দেখা যায়, কোথাও ইঁদুর  নেই। সাপ-বেজি, পোকামাকড়ও কম। ওরা যা পায় সব নাকি ধরে খেয়ে ফেলে। কী সাংঘাতিক! নাগাবাসীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিলো সে গল্প যথাসময়ে জানতে পারবেন। 

আমাদের গাড়ি চলছে ডাউকি বর্ডারের দিকেআমাদের গাড়ি চলছে ডাউকি বর্ডারের দিকে

২০১০ সালে এই নিষিদ্ধ রাজ্য বাংলাদেশিদের উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। তারপর থেকে ‘ইনার লাইন পারমিট (আইএলপি)’ নিয়ে বাংলাদেশিরা নাগাল্যান্ড ভ্রমণ করতে পারে। আমি নিজে পর্যটন ব্যবসার সাথে জড়িত বলে নাগাল্যান্ড পর্যটন দপ্তরের সাথে কিঞ্চিত যোগাযোগ আছে। দপ্তরের সেক্রেটারি সাহেবের কাছ থেকেই এসব তথ্য জানা। তিনি আরো জানিয়েছেন, এর আগে এই উৎসবে কোনো বাংলাদেশি দল কখনো যোগ দেয়নি। সে হিসাবে আমরাই অফিসিয়াললি প্রথম পর্যটক দল। উৎসবে যোগদিতে হলে বিদেশিদের আগে থেকে নাম রেজিস্ট্রিশন করতে হয়, ইনার লাইন পারমিট পেতে হয়। ফলে পর্যটন দপ্তর প্রকৃত ডেটা পায় - কোন বছর কোনদেশ থেকে কতজন পর্যটক যোগ দিয়েছিলো। 
যাই হোক, হর্নবিল উৎসবের নাম হর্নবিল কেন, এ প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর জানা নেই। হর্নবিল একটি পাখির নাম। বাংলায় যাকে আমরা ধনেশ পাখি বলে জানি। নাগাল্যান্ডের লোককাহিনীতে এই পাখির অনেক উপস্থিতি আছে। তাছাড়া এই পাখিটার মতো উৎসবটাও বহু বর্ণে বর্ণীল। এক সময় বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এই পাখি বেশ দেখা যেতো। হলুদ লম্বা ঠোঁটের জন্য বিখ্যাত। বিশাল আকার। অপূর্ব সুন্দর দেখতে এই পাখি এখন বিলুপ্তির পথে। একটা পাখি শিকার করলেই কয়েক কেজি মাংস পাওয়া যায়, তাই শিকারির নজরে পাখিটা শুরু থেকেই শীর্ষলক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলো। এই হর্নবিল পাখি নাগাল্যান্ডের যুদ্ধ, বীরত্ব, ইতিহাস, লোককাহিনী আর ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে।  নাগাদের সেরা যোদ্ধাদের মাথার মুকুটে বীরত্বের প্রতীক হিসেবে থাকতো এই ধণেশ পাখির পালক। নাগাল্যান্ডের নানা জাতির মধ্যে উৎসব লেগেই থাকে।  উৎসবকে তারা পবিত্র কর্ম বলে মনে করে। ফলে সকল উৎসব উদযাপনে তাদের আগ্রহ, উদ্দীপনা, শ্রদ্ধা আর একাগ্রতার কোনো কমতি নেই। আর এত সব উৎসবের মধ্যে হর্নবিল উৎসব হলো সবচেয়ে সেরা, সবচেয়ে জাকজমক পূর্ণ। রাজ্য সরকার এ আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক। বাস্তবায়ন আর নিরাপত্তার দায়িত্ব ভারত সেনাবাহিনীর। 

মেঘালয়ের পথ.....মেঘালয়ের পথ.....

সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকরা আসে এই উৎসব দেখতে। উৎসবের উৎসব হলো এই হর্নবিল ফেস্টিভ্যাল। বলা হয় - ফেস্টিভ্যাল অব ফেস্টিভ্যালস। নাগাল্যান্ডের নানা জাতির সংস্কৃতি, জীবনযাপনের গল্প, তাদের সুখ-দুঃখের সাতকাহন বিভিন্ন উপস্থাপনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় এই উৎসবে। থাকে তাদের বাড়ি ঘরের প্রমাণাকৃতির মডেল। বৈচিত্রময়, দারুণ দেখতে। তারা বসবাস পদ্ধতি, খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি অনেক কিছুই তুলে ধরা হয় এখানে। চলে প্রতি বছর ১লা ডিসেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর টানা দশ দিন। এক সময় মাত্র ১ দিন ছিলো এই উৎসবের আয়ূ। প্রচন্ড চাপ সামলাতে না পেরে সময়কাল ১দিন থেকে ৩দিনে বাড়ানো হয়। তাতেও সামলাতে না পেরে পরবর্তীতে ১ সপ্তাহ করা হয়। একসময় উৎসবের এই সময়কালও যথেষ্ট হলো না, বাড়িয়ে করা হলো ১০ দিন। উৎসবের তিন মাস আগে থেকেই নাগাল্যান্ডের কোহিমা শহরের সব হোটেল, মোটেল এমনকি হোমস্টে পর্যন্ত প্রায় সবকিছু বিক্রি হয়ে যায়। তাই গত বছর থেকেই আমরা এই ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করে তক্কে তক্কে ছিলাম। আগেভাগেই পারমিট জোগাড় করে সব সার্ভিস বুক করে রেখেছি। 
আপনি যদি ম্যাপ খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন গাড়ি পথে নাগাল্যান্ড গেলে আপনাকে মেঘালয়, আসাম এই দুই রাজ্য পাড়ি দিতেই হবে। আর নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা শহর থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে মনিপুর। সুতরাং সবাই মিলে ভাবলাম, নাগাল্যান্ড দেখার জন্য যখন এতটা দূরেই যখন যাচ্ছি তখন আর একটু দূরের মনিপুর নয় কেন! মনিপুরতো বারবার আসার স্থান নয়, হয়ত সারা জীবনে আর কখনো এখানে আসা হবে না। এই প্রথম, এই-ই শেষ। সুতরাং সবার সম্মতিক্রমে মেঘালয়, আসাম আর নাগাল্যান্ডের সাথে মনিপুর রাজ্যও আমাদের ভ্রমণ তালিকায় যুক্ত হয়ে গেলো। এবার যায় কোথায় সবাই আমারা উত্তেজনায় টগবগ আর আনন্দে হৈ হৈ করতে লাগলাম। আমি আমার সমস্ত সোর্স আর গবেষণা কাজে লাগিয়ে মোট ১২ দিনে - সবচেয়ে  বেশি, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে আকর্ষনীয়  - যা যা দ্রষ্টব্য সেগুলো ভ্রমণ পরিকল্পনায় যোগ করে ফেললাম। 
আর এখন আমাদের সেই বহুকাঙ্খিত ভ্রমণ যাত্রার মাহেন্দ্রক্ষণ। মাস ডিসেম্বর। সাল ২০১৪। 

পাহাড় বেয়ে বেয়ে মাউলিনং গ্রামের পথেপাহাড় বেয়ে বেয়ে মাউলিনং গ্রামের পথে

ভিসা জটিলতা সম্পর্কে একটু বলে রাখা দরকার। ভারতীয় ভিসা বলে কথা। নিয়ম হচ্ছে, যে ডাউকি বর্ডার থেকে ভারতে ঢুকবে তাকে ডাউকি বর্ডার থেকেই ফিরতে হবে। আর যারা বেনাপোল বর্ডার থেকে ভিসা পেয়েছে তারা বেনাপোল বর্ডার ছাড়া অন্য কোনো বর্ডার ব্যবহার করতে পারবে না। আমার ৩ বছর মেয়াদী ভিসা আগে থেকেই বেনাপোল বর্ডার থেকে করা।  ফলে বাড়ির পাশের শিলং রাজ্যে যাওয়ার জন্য একেবারে বিপরীতমুখে আমাকে যাত্রা করতে হয়েছে। বাংলাদেশের মানচিত্রের কিনারা ধরে ঘুরে ঘুরে ২/৩ দিন পর শিলং-এ পৌঁছতে হয়েছে। অপু ভাইর ফিনল্যান্ডের পাসপোর্ট। সুতরাং তার মহা আনন্দ। যে কোনো বর্ডার থেকে ঢুকতে এবং যে কোনো বর্ডার থেকে বেরুতে পারবে। অণু ভাই এই ট্যুরে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে। সুতরাং তিনি অভাগাদের দলে। নাদমি ভাই, দ্বৈয়পায়নদা, তন্ময় দা ও প্রণব কাইরী বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে দাউকি বর্ডার থেকে ৬ মাসের মাল্টিপল ভিসা পেয়েছে। লক্ষনীয় হলো, তারা যদি আগামি ৬ মাসের মধ্যে কখনো কলকাতা যেতে চান, তাহলে ডাউকি বর্ডার দিয়ে আসাম হয়ে দিন দুয়েক পরে কলকাতা পৌঁছতে হবে। লে হালুয়া! আমাদের এভারেস্ট বিজয়ী মুহিত ভাইর ভিসা বড়ই স্পেশাল। ভিআইপি ভিসা। এই ভিসা পররাস্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি আসে। সার্ক ভিসা। আগমী ৩ মাস তিনি এই ভিসা দিয়ে শুধু ভারত নয়, সার্কের সবগুলো দেশের সবগুলো পোর্ট থেকে যতবার খুশি ততবার যাতায়াত করতে পারবেন। লে হালুয়া! মশা মারতে কামান দাগানো আরকি। কোনো ই-টোকেন ফোকেনের বালাই নেই। এই ভিআইপি ভিসা নিয়ে বর্ডারে কী-যে কা- হয়েছিলো সে-গল্প আসিতেছে। 
আমার ভিসা বেনাপোল বর্ডার থেকে। ফলে আমি ছিলাম সবচেয়ে বিপদে। আমাদের ভ্রমণ শুরুর তারিখ ৩ ডিসেম্বর হওয়া সত্ত্বেও আমি ঢাকা থেকে কলকাতা রওয়ানা হয়েছি ৩০ নভেম্বর রাতে। ১ ডিসেম্বর তারিখ মাঝ রাতের ট্রেনে শিয়ালদা থেকে যাত্রা শুরু করে পরদিন ২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পৌঁছেছি আসামের রাজধানী গুয়াহাটি। গুয়াহাটি রেলস্টেশন থেকে ট্যাক্সি পাকরাও করে সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর শিলং শহরে পৌঁছেছি রাত সাড়ে নয়টা নাগাদ। ৪২ ঘন্টার ভ্রমণ শেষ করে একদিন আগেই শিলং পৌঁছে গেছি। 
৩ ডিসেম্বর শিলং শহরে ঘোরাঘুরি করলাম। ঢাকা থেকে বন্ধুরা আসছে পরের দিন, ৪ ডিসেম্বর। গাড়ি নিয়ে তাদের রিসিভ করতে যাবো সকাল সকাল। ভ্রমণের সব আয়োজন - হোটেল, গাড়ি-ঘোড়া, নাগাল্যান্ড আর মনিপুরের ইনার লাইন পারমিট ইত্যাদি সব ঠিকঠাক আছে কিনা চেক করলাম সারাদিন। সব আয়োজন রেডি।