- “লাল পানির নদী দেখেছ কখনো"? আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো নিক। মুখে মিটিমিটি হাসি। 
- “না ত। এ নদীর পানি খেলে কি নেশা হবে নাকি ? পাল্টা প্রশ্ন করি আমি। 
- "আরে ধুর। এ পানি সেই পানি না।" হাত নেড়ে কথাটা উড়িয়ে দেয় নিক। খানিকটা আশাহত অবার ভান করি আমি। 
- “ও। তাহলে পানি লাল হবার কারন কি ? লোহার আধিক্য না লাল মাটির মিশেল ?” 
নেতিবাচক ভাবে মাথা নাড়ে নিক। জবাব দেয় না। মিটিমিটি হাসে। 
- “রেড ক্রিকের পাড়ে গেলেই জানতে পারবে।" রহস্য করার চেষ্টা করে সে। 
- “খান্ট ওয়েট ঠু গেট দেয়ার।" আমিও তাল দেই।

ট্যুর পুর্ব মিটিং এ বসেছি আমরা কজন আউটডোর রিক্রিয়েশান সেন্টার (সংক্ষেপে রেক সেন্টার) এর ইকুইপমেট স্টোর রুমে। চারিদিকে ক্যানু, তাবু, লাইফ জ্যাকেট, হাইকিং ব্যাগ ইত্যাদি হাবিজাবি টাল করে থরে থরে সাজিয়ে রাখা। এর মধ্যে মাঝে ফাকা জায়গায় মেঝেতে গোল হয়ে বসেছি আমরা ন'জন। নিক হচ্ছে আমাদের গাইড। তার সাথে সহকারী গাইড হিসেবে আছি কুড়ি বছর বয়সি স্বর্ণকেশী সুন্দরী তরুনী তেরেজিয়া।( না তেরেসা লিখতে গিয়ে ভুল করিনি।) আর সহযাত্রীদের মধ্যে আছে চিনা তরুনী ইফেং । সে এখানে ফার্মাকোলজিতে পিএইচডি করছে। দারুন এডভেঞ্চারপ্রিয় এক মেয়ে। কদিন আগেই টাফ মাডার নামে এক অবস্টাকল রেস শেষ করে এসছে পিটসবার্গ থেকে। আরো আছে বিবাহিত যুগল আয়ান আর এনি। আয়ান লাইব্রেরীতে চাকরীরত জানতে পারলাম। ইংরেজিতে যাকে বলে নার্ড সেই গোত্রীয়। ফিলসফি তে পিএইচডি। এছাড়া দু'জন আন্ডারগ্রাড ছাত্রী, আনুশকা আর মেই । সবশেষে বিশালদেহী যুবক এন্থনী। কথা প্রসংগে জানালো এইসব হাইকিং-ক্যাম্পিং তার রেগুলার করা হয়। হাবভাবে বুঝিয়ে দিল এসব জংগল-ফংগলে রাত কাটানো তার কাছে নস্যি ।

যে সময়ের কথা বলছি সেটা সেপ্টেম্বারের মাঝামাঝি। পূর্ব উপকূল দিয়ে হারিকেন ফ্লোরেন্সের আগমন বার্তা জানিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে রেডিও-টিভি-ইন্টারনেটে। এরই মধ্যে রওনা দেয়বার জন্য তৈরী হচ্ছি ডলি সডসের উদ্দেশ্যে। বৃষ্টিস্নাত একটা রাত কাটাবো জংগলের মধ্যে। নিক জানালো এরি মধ্যে একজন সাইন আপ করে টেকাটুকা দিয়েও আসেনি। তারমানে আমরা ক'জন একটু বেশি পাগল। না হলে এই দূর্যোগের সময় জংগলে যায় ? গাইডদের সাথে আলোচনা করে স্টোর থেকে আমাদের সাইজমতো হাইকিং ব্যাগ , জুতো , হাইকিং লাঠি, এসব নিয়ে নিলাম। বাসায় ফিরে ব্যাগে সিন্থেটিক কাপড়-চোপড়, ক্যামেরা, ডায়েরী আরো টুকটাক জিনিস্পাতি ভরে তাড়াতাড়ি ঘুম দিলাম। পরদিন চলে আসতে হবে একই জায়গায়।

 

Naved
ছবিঃ যাত্রার জন্য গোছগাছ করে নিলাম সবকিছু।Naved

পরদিন সকালে এসে দেখি নিক আর টেরেজিয়া আরো জিনিসপত্র টাল করে রেখেছে। স্টোভ, ক্যানিস্টার, রান্নার পাতিল, তাবুর ব্যাগ, খাবার আরো হাবিজাবি। ভাগেযোগে যা পারি সব ব্যাগে ভরে নিয়ে মিনিভ্যানের পিছনে লাগানো ট্রেইলারে তুলে দিয়ে ভ্যানে উঠে পড়লাম সবাই। মরগানটাউন থেকে আড়াই ঘন্টার ড্রাইভ ডলি সডস। এ পর্যায় এসে আগ্রহী পাঠক নিশ্চই অধৈয্য হয়ে উঠেছেন ? আরে ভাই, ডলি সডস জায়গাটা কিরাম ? আসলে জায়গাটা এত বৈচিত্রময় এক বাক্যে বুঝিয়ে দেওয়া কঠিন।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই থেকে প্রায় পাচ হাজার ফিট উচুতে অবস্থিত পাথুরে এক জায়গা, মননগালেহা ন্যাশনাল ফরেস্টের একাংশে প্রায় ১৭ হাজার একর জায়গা জুড়ে এর অবস্থান। কি নেই সেখানে। তীব্রবাতাসের সাথে প্রতিনয়ত যুদ্ধ করতে করতে বেকেচুড়ে যাওয়া গাছের গুড়ি, ক্ষয়ে যাওয়া উচু উচু পাথরের চাঁই, কাটাঝোপে পূর্ন বিস্তির্ন অনুর্বর জমি, আবার আছে মানুষ্যসৃষ্ট বিশাল ঘাসময় প্রান্তর। এর মূল আকর্ষন হচ্ছে , যার জন্য প্রতি বসন্তে প্রকৃতিপ্রেমিক পর্যটকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে এখানে ক্যাম্পিং করার জন্য, তা হলো অবিশ্বাস্য সুন্দর বর্নিল প্রান্তর অবলোকন করা যায় এসময়। ১৮শ শতকের দিকে ডাহলেস নামক এক জার্মান পরিবারের দখলে ছিলো এই জায়গা, সেই থেকে নাম হয়েছে ডলি। আর সডস একটা আঞ্চলিক শব্দ, যার মানে হলো পাহাড়ের উপরে অবস্থিত বিস্তীর্ণ উম্মুক্ত ঘাসভূমি। নেট থেকে একটা ছবি দিয়ে দিলাম নিচে ধারনা দেবার জন্য।

 

Naved
ছবিঃ বসন্ত বর্ণালীতে সজ্জিত ডলি সডস। (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত )Naved

কানান ভ্যালি স্টেট ফরেস্ট আর ব্ল্যাকওয়াটার ফলস পেরিয়ে ডলি সডসের কাছাকাছি আসতেই আকাশে দেখা দিতে লাগলো কালো মেঘের ঘনঘটা। বুঝলাম হারিকেন জোনের ভেতরে চলে এসেছি। দমকা হাওয়া দিয়ে গুড়ি গুড়ি বৃষতি শুরু হলো। নিক মূল রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের রাস্তা ধরলো। আমাদের উদ্দেশ্য রেড ক্রিক ট্রেইলের কাছে অবস্থিত লগ কেবিন এর জায়গা। পৌছে রাস্তার পাশে গাড়ী থামিয়ে ট্রেইলার থেকে ব্যাগ নামিয়ে নিলাম সবাই একে একে। রেইন জ্যাকেট নিয়ে নিয়েছিলাম সবাই রেক সেন্টার থেকে, এবার গায়ে চড়িয়ে নিলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে গাড়ির পাশে দাড়িয়ে দুপুরের খাওয়া সারলাম স্যান্ডউইচ দিয়ে।

 

Naved
ছবিঃ এখন এমন মেঘ করুক যেন মেঘ ছিঁড়ে কোনদিন চাঁদ উঠতে পারে না।Naved

 

Naved
ছবিঃ ডলি সডসে আপ্নাদের আমন্ত্রন।Naved

এবার শুরু হলো অভিযানের মূল পর্ব। গোল হয়ে ঘিরে দাড়ালাম। নিক শুরু করলো তার ব্রিফিং -

- "এবার আমাদের আসল অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। লোকালয় থেকে আমরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো। এখান থেকে রেড ক্রিক ট্রেইল ধরে প্রায় মাইল দুই হেটে আমরা পৌছাব ক্যাম্পিং -এর জায়গায়। রেড ক্রিকের পাড়ে। এরপর সেখানে তাবু খাটিয়ে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করা যাবে।" বলা শুরু করলও নিক। ওর চেহারায় বেশি উৎসাহ দেখলাম না। এর কারন যে আকাশের গম্ভীর অবস্থা তা বেশ বোঝা গেল।

- "এসব সরকার অধিকৃত প্রাকৃতিক অঞ্ছলের পরিবশ সংরক্ষনের জন্য কঠোরভাবে 'কোন চিহ্ন রেখে যাবো না' (লিভ নো ট্রেস) এই মুলনীতি মেনে চলা হয়। তাই ময়লা আবর্জনার জন্য আমরা ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছি সেসবে সব ভরে নিয়ে আসতে হবে। আর প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য আমরা সাথে করে এনেছি বেশ কটা পু-কিট।" একটা পু-কিট বের করে এর ভেতরের জিনিস্পাতি বের করে দেখালো। জরুরী কর্ম সারার জন্য সবকিছু তাতে ভরে দেয়া আছে। সাথে আছে গর্ত খোড়ার জন্য একটা ছোট্ট শাবলও । তারপর কি কি পজিশানে মাটিতে কিংবা গাছের গুড়িতে বসে কর্ম সারা যায় তার কয়েকটা নিদর্শন একেবারে ত্রিভঙ্গ মুরারি হয়ে দেখিয়ে দিলো।

NavedNaved

ছবিঃ রেড ক্রিক ট্রেইল ধরে এগোচ্ছি আমরা।

এবার পিঠে ব্যাগ নিয়ে ট্রেইল ধরে সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে লাগলাম সবাই। সবার আগে নিক । হাতে হাইকিং লাঠি নিয়ে নিয়েছি আমিও, বেশ সুবিধা হচ্ছে হাটায়। সরু ট্রেইল চলে গেছে বনের ভেতর দিয়ে। কখনো চড়াই, কখনো উৎরাই। একজায়গায় পথের দুপাশ ভরে ফুটে আছে নাম না জানা বুনো ফুল। চোখে একরকম প্রশান্তি লাগে দেখলে।

 

Naved
ছবিঃ পথের দুধারে ফুটে আছে বুনো ফুল।Naved

আরো কিছুদূর হাটার পর সামনে পড়লো ছোট একটা খাড়ি। পাথরের উপর সাবধানে পা দিয়ে পেরোতে লাগলাম আমরা। শ্যাওলা জমে কোনো কোনোটা ভয়ানক পিচ্ছিল। সতর্ক থাকতে হচ্ছে।

 

Naved
ছবিঃ "এই পাথরটায় পা দেয়া যায়।" দেখিয়ে দিচ্ছে নিক।Naved

 


ছবিঃ ছোট স্রোতধারা গিয়ে মিশেছে মূল ধারায়।

এরকম বেশ কয়েকটা ছোট ছোট খাঁড়ি পার হবার পর অপর পাড়ে এসে কিছুক্ষন জিরিয়ে নিলাম। তেরেজিয়া ম্যাপ বের করে বুঝিয়ে দিলো আমাদের বর্তমান অবস্থান। ফের শুরু হলো পথচলা।

 

(চলবে)........................